গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ বলে গেলেন “সাধুর জীবন হবে বিলাসবর্জিত !” স্বামী বিবেকানন্দ ১০০ বছর আগে এই একই কথা একটু অন্যভাবে বলেছিলেন – “হে ভারত ! ভুলিও না , সর্বত্যাগী শংকর তোমার আদর্শ !” “হে ভারত”– বলতে উনি ভারতবাসীকে বুঝিয়েছেন – এটা একটা মানে হতে পারে, কিন্তু “ভা-রত” কথাটিতে ‘ভা’ শব্দে জ্ঞান , দীপ্তি , আলো ইত্যাদি অর্থ বোঝায় ! অর্থাৎ সেই অর্থে “ভা-রত” কথার অর্থ দাঁড়ায় যিনি জ্ঞান-পিপাসু বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তি ! সত্যিই তো আধ্যাত্মিক ব্যক্তিই তো পারে সর্বত্যাগী শংকরকে আদর্শ করতে ! গুরু মহারাজ আর একদিন বলেছিলেন – “পৃথিবীতে দুটি জগৎ রয়েছে একটি ত্যাগের জগৎ অন্যটি ভোগের জগৎ ।” পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ ভোগের জগতেই থাকতে চায় । অর্থ-যশ-প্রতিপত্তি-স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে সুখে সংসার করতে চায় । যদিও যে আনন্দের সন্ধান মানুষ চায় – তা এরদ্বারা পায় না , ফলে একটা অতৃপ্তি আসে ৷ শাস্ত্র বলেছে “ন তৃপ্ততাম্” ! এই অতৃপ্তির জ্বালা বুকে নিয়েই মানুষ এগিয়ে চলে সন্মুখপানে৷ এইভাবে জন্ম-জন্মান্তর ধরে চলতে চলতে মানুষ পরিপক্ক হয় এবং মানুষের মধ্যে বৈরাগ্য আসে , তার জীবনে জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে , শরীরে কুলকুণ্ডলিনীর জাগরন ঘটে ৷ যদিও সদ্-গুরু বা কোন মহাপুরুষের কৃপাতেও এটা হতে পারে ! যেভাবেই হোক না কেন , এটা না হওয়া পর্যন্ত মানুষ ‘ত্যাগের জগতে’ – প্রবেশ করতে পারে না ! এই সংখ্যাটা খুবই নগণ্য – খুবই অল্প ! মানুষই পারে এই বীরের জীবন গ্রহণ করতে ! কিন্তু আর একবার ত্যাগের জীবন গ্রহণ করার পর ফের ভোগ-ঐশ্বর্যের জীবনে আসা-কে গুরু মহারাজ বলেছিলেন – ” থুথু ফেলে সেইটা পুনরায় চেটে খাওয়া !”
আমরা ফিরে যাই গুরু মহারাজের ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণকালীন বিভিন্ন ঘটনায় ! গুরু মহারাজ একবার জাহাজে করে সমুদ্রপথে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাচ্ছিলেন (খুব সম্ভবত গ্রীস এবং ক্রীট্ দ্বীপ রাষ্ট্রগুলিতে যাচ্ছিলেন) । জাহাজের কেবিনে বসে না থেকে উনি বেশিরভাগ সময়ে জাহাজের ডেকে বসে থাকতেন । দূরের সুবিস্তৃত জলরাশির দিকে চেয়ে তাঁর অধিকাংশ সময় কেটে যেত । ওনার মনে হতো এই পথেই (জলপথে) প্রায় ১০০ বছর আগে স্বামী বিবেকানন্দ যখন গিয়েছিলেন তখন কয়েকজন সন্ন্যাসী সমুদ্রের মধ্যে থেকে প্রকট হয়ে ওনার সাথে দেখা করেছিলেন এবং তাঁরা ওনাকে জানিয়েছিলেন যে , খ্রিস্টধর্ম আলাদা কোন ধর্মমত নয় , এটি বৌদ্ধধর্মের-ই পরিবর্তিত রূপ মাত্র ! এইসব নানা কথা ওনার ভাবনায় আসছিল এবং জাহাজের গতির সাথে সাথে তাঁর চিন্তারাশিও একটা থেকে অন্যটার দিকে এগিয়ে এগিয়ে চলছিল (যতদূর মনে পড়ছে উনি বলেছিলেন – প্রাচীন কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সাথে ওনারও সূক্ষ্মভাবে যোগাযোগ হয়েছিল) !
গুরু মহারাজদের এই সমুদ্রপথে এই যাত্রাটা বেশ কয়েকদিনের ছিল । ঐ জাহাজে অনেক যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন আমেরিক্যান তরুণ-তরুণী ছিল , যারা উচ্ছল-প্রাণচঞ্চল ! যারা সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত শুধু নাচ-গান , ছোটাছুটি , উপর-নীচ করে একেবারে জাহাজ মাতিয়ে রেখেছিল । কয়েকশো যাত্রীর সকলেই এই গ্রুপটাকে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বিশেষভাবে চিনে গিয়েছিল ! ওই জাহাজটি ছিল প্রধানতঃ প্রমোদ-তরণী ! বিভিন্ন মানুষেরা ছুটি কাটানোর জন্য এবং আমোদ-প্রমোদ করার জন্যই ওই ধরনের ট্রিপে যায় ৷ সেক্ষেত্রে গুরু মহারাজ ছিলেন ব্যতিক্রম ! প্রায় সমস্ত মানুষই ডিস্কো-তে নাচছে , ক্যাসিনো খেলছে , কেবিনে অথবা ডেকে বসে মদ্যপান করছে – কিন্তু একমাত্র গুরু মহারাজ জাহাজের ডেকের দূরতম কোন প্রান্তে অধিকাংশ সময়েই বসে থাকতেন – এই ব্যাপারটি ওই ছেলে-মেয়েগুলিও Notice করেছিল ৷
একদিন কেটে যাবার পর সম্ভবতঃ দ্বিতীয় দিনের কোন একটা সময়ে হঠাৎ করে ওরা গুরু মহারাজের টেবিলের কাছে এসে ওনাকে ঘিরে ধরে সবাই মিলে বসে পড়েছিল !
ওদের উদ্দেশ্য ছিল গুরুমহারাজকে নিয়ে একটু মজা করা! কারন এই যে ওদের এতো উচ্ছলতা_উশৃঙ্খলতার মধ্যেও ছেলেমেয়েগুলি এটা লক্ষ্য করেছিল যে, এই প্রমোদতরনীতে একমাত্র একটিই passenger রয়েছে _যে ব্যক্তি এতো হৈ-চৈ, এতো আনন্দের উপকরনকে উপেক্ষা করে সবসময়ই নিজেকে একান্তে রাখছিল। এটাই ওদের মনে গুরুমহারাজ সম্বন্ধে কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল। ঐ দলটিতে সাত-আটজন ছেলেমেয়ে ছিল, সবাই স্বল্পবেশি, তথাকথিত অতি আধুনিক _সবার হাতেই গীটার, মাউথ অর্গান ইত্যাদি কোন না কোন musical apparatus ছিল _ফলে ওরা ঐ বিশাল জাহাজের যখন যেখানে থাকছিল, সেখানেই নাচ-গান শুরু করে দিচ্ছিল।
গুরুমহারাজের কাছে ওরা যখন এসেছিল তখন ওদের হাতে wine – এর বোতলও ছিল। গুরুমহারাজকে ঘিরে বসে পড়ার পরেই ওরা গুরুমহারাজকে_ ‘ওনার পোষাক ঐরকম(গেরুয়া) কেন, সবসময় একা একা থাকেন কেন ইত্যাদি নানান জিজ্ঞাসা করে ওনাকে বিব্রত করার চেষ্টা করছিল! কেউ কেউ ওনাকে wine-ও offer করেছিল! কিন্তু ওদের সমবেত আক্রমণে গুরুমহারাজ একটুও বিচলিত হননি _বরং শান্তকন্ঠে ওদেরকে বলেন যে, এই সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর উনি নিশ্চয়ই দেবেন _কিন্তু তার জন্য তো তাদের কিছুক্ষণ ওনার কাছে শান্ত হয়ে বসে থাকতে হবে! সেইটুকু সময় কি তারা spare করতে পারবে? এই কথাগুলি উনি আমেরিকান style-এ ইংরাজীতে কথা বলেছিলেন এবং প্রথমেই সম্বোধন করেছিলেন _’Hello friends!’
যাইহোক, গুরুমহারাজের কথায় ওরা রাজী হয়েছিল এবং ওরা ওখানে বসে বসে ওনার সবকথা শুনেছিল! যে কথাগুলি উনি সেদিন বলেছিলেন _সেই সব আলোচনা হবে পরের দিন! (ক্রমশঃ)