[বীরভূমে ন’কাকা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে ন’কাকার সাথে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর প্রসঙ্গ এসে গেছে। কিছু স্থানে যাবার জন্য ভক্তরা অনুরোধ করলেও ন’কাকা এড়িয়ে গিয়েছিলেন অথচ…..]
ওই ফাঁকেই ন’কাকা বনগ্রাম আশ্রমের প্রলয় মহারাজের সাথে কোন আশ্রম ভক্তের ব্যবস্থাপনায় কামরূপ কামাখ্যা–শিলং– চেরাপুঞ্জি ঘুরে এসেছিলেন! সেবার যেহেতু ওই ধনী ব্যক্তিটির ব্যবস্থাপনায় সবকিছু হয়েছিল – তাই ন’কাকা আমাকে ওনার Tour Program-এর ব্যাপারে কিছু জানান-নি ! মহাপুরুষ মাত্রই প্রচন্ড মর্যাদা-বোধসম্পন্ন হন ! নিজের মর্যাদা ও অপরের মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে এত বেশি sincere থাকেন যে সাধারণ মানুষ তার ধারে কাছেও যেতে পারবে না ! প্রলয় মহারাজকে ন’কাকা খুবই প্রাধান্য দিতেন ! প্রলয় মহারাজও ন’কাকা বা ন’কাকিমার যে কোনো প্রয়োজনে ওনাদের পাশে থাকার চেষ্টা করতো ৷ ন’কাকা আমাকে প্রায়ই বলতেন – ” প্রলয় ছেলে হিসাবে খুবই ভালো ! সৎ , বিবেকবান , পরিশ্রমী , নিষ্ঠাবান – যোগী ছেলে। শরীর-স্বাস্থ্যটা দেখেছো – দোহারা চেহারা , ২০ বছর আগেও যেমন ছিল – এখনও তেমন-ই আছে ৷”
প্রলয় মহারাজ অন্যান্য কাজের ফাঁকে আশ্রমের জন্য বিভিন্ন রকমের Collection করে! বিশেষতঃ দুর্গাপূজার সময় আশ্রমের ৩০০/৪০০ ছেলেদের দু-সেট করে জামা-প্যান্ট , সমস্ত ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণী , সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীদের দু-সেট করে জামা-কাপড়/শাড়ি ও অন্যান্য সামগ্রী , বিভিন্ন শাখা আশ্রমগুলির মহারাজ বা ব্রহ্মচারিণীদের জন্য জামা কাপড়ের যোগান দেওয়ার দুরূহ কাজটি করে প্রলয় মহারাজ ! এটা একটা বিরাট ব্যাপার ! বেশ কয়েক লক্ষ টাকার জামা-কাপড় কিনতে হয় ! সারা বছরই প্রলয় মহারাজ বিভিন্ন রকম কালেকশন-এর সাথে যুক্ত থাকে – তাই তাকে অনেক ধনী ভক্তদের (যারা বেশি বেশি Donate করে) মান রাখতে হয়! গুরু মহারাজের অবর্তমানে ন’কাকাকেই সাধারণ ভক্তরা বেশী বেশী করে বাড়িতে আনতে চাইতো – সেই সুযোগটা প্রলয় মহারাজ কাজে লাগাতো! তাদের বাড়ির বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে , গৃহপ্রবেশ বা ভিত্তি পূজা, বিয়ে – পৈতা-অন্নপ্রাশন ইত্যাদি যে কোনো অনুষ্ঠানে ন’কাকাকে সঙ্গে করে নিয়ে তাদের বাড়ি হাজির হতো ! এতে সেই সমস্ত ভক্তদেরও মনের আশা মিটতো এবং তাদের ভালো লাগতো – আবার প্রলয় মহারাজের কাজটাও হোত !
এত কথা বললাম এইজন্য যে – আদিত্যপুর আশ্রম বা শ্রীরামপুর ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ন’কাকা সেখানেই যেতেন, যেখানে প্রলয় মহারাজই ন’কাকাকে নিয়ে যেতো ! কোন কোন বাড়িতে মুরারী মহারাজ (স্বামী নিষ্কামানন্দ)-এর সাথে ও ন’কাকাকে যেতে দেখেছি । মুরারী মহারাজের প্রতিও ন’কাকা খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন ! প্রায়ই বলতেন – ” মুরারী বনগ্রাম আশ্রমটাকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে , আশ্রমের যেখানে যে কাজে প্রয়োজন – সেখানেই ছুটছে ! এক দন্ড স্থির হয়ে বসে থাকতে পায় না ! এই রান্না ঘরে, তো ওই গোয়াল ঘরে – আবার কিছুক্ষণ পরেই দেখি মাঠে মাঠে ফসল দেখে অথবা জমির আল দেখে বেড়াচ্ছে ! কোন জমিতে জল আছে কি নেই , কোন জমিতে সার-চাপান লাগবে , কোন জমিতে কীটনাশক দিতে হবে – তাই দেখে বেড়াচ্ছে ! মাঠে যাবার তো ও ছাড়া আর লোক নাই ! মুরারীর অবর্তমানে আশ্রমের চাষবাস লাটে উঠবে ! মুরারীর মতো ঐরকম ভাবে আর কে করবে বাবা ! এখন যে সমস্ত ছেলেরা ব্রহ্মচারী হয়ে আসছে – তারা কি কাদায় কাদায় কোদাল হাতে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াবে ! ওরা তো চটি-জুতো পড়ে সকাল-বিকাল হাওয়া খেতে বেরোয় ! মুরারী-ই বা কি করবে বলো – পরমানন্দ (গুরু মহারাজ) দায়িত্ব দিয়ে গেছে – তাই করছে! যতদিন পারবে অর্থাৎ শরীরে কুলোবে ততদিন করবে , তারপর কি হবে তা পরমানন্দ-ই জানে ! মুরারীর পর যারা আশ্রম পরিচালনা করবে – তারা ‘ফুরানে’ (ঠিকা ভাগে) ভাগে দেবে , contract করে নেবে ! এত বিঘায় এত ধান বা অন্যান্য ফসল লাগবে – নিজেরা না পারলে এইভাবেই চাষ করতে হবে ৷”
ন’কাকা পারতপক্ষে কারো কাছ থেকে কোন উপকার এমনি-এমনি নিতে চাইতেন না ! যতটা পারতেন নিজে নিজে কষ্ট করে হলেও – নিজের কাজ নিজে সম্পন্ন করার চেষ্টা করতেন । আমি বনগ্রামে থাকাকালীন সময়ে দেখেছি – ন’কাকা সাইকেলে করে পাহারহাটি (ঔষধ আনতে বা অন্য কোন সামগ্রী আনতে) বা সামন্তীতে হাটের দিনে থলি ঝুলিয়ে বাজার করতে যাচ্ছেন! আমি জিজ্ঞাসা করতাম – “ন’কাকা , অন্য কাউকে বলে জিনিসগুলো আনিয়ে নিলেই তো হয় – আপনি নিজে কষ্ট করে যান কেন ?” উনি উত্তর দিতেন – ” বাবা ! অকারনে অন্য কাউকে কেন বিরক্ত করবো বলো ? যতদিন সামর্থ্য আছে করি !! তারপর না হয় অন্যের উপর নির্ভরশীল হবো ! তবে বাবা ! মানুষের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় কি লাভ? যদি নির্ভরশীল হোতেই হয় – তাহলে সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উপরে হওয়াই ভালো।” (ক্রমশঃ)