[আমরা আবার ফিরে যাব “বীরভূমে ন’কাকা” _প্রসঙ্গে । যেখান থেকে আমরা ছেড়ে এসেছিলাম _পঙ্কজ বাবুর অকস্মাৎ প্রয়ানের জন্য, এখন সেখানেই ফিরে যাবো। আজকের আলোচনায় গুরুমহারাজের প্রসঙ্গ-ও এসেছে!]
ন’কাকাকে যখনই কোন শাস্ত্রের শ্লোক তুলে বা কোন ধর্মশাস্ত্রের Reference দিয়ে _কোন আলোচনায় যেতাম, তখন দেখতাম ন’কাকা গুরুমহারাজের উল্লেখ করতেন! উনি বলতেন – ” তোমরা সব ‘পড়ে'(পড়াশোনা করে) পন্ডিত আর পরমানন্দ ছিল ‘না-পড়া’ পন্ডিত ! সব শাস্ত্র – সব গ্রন্থের বিদ্যা-ই ওর মুখস্থ ! যে যেখান থেকে জিজ্ঞাসা করবে – ওর উত্তর Ready ! সঙ্গে সঙ্গে তাকে ওই জিনিসটা ভালো করে বুঝিয়ে দেবে – শেষে আবার বলবে – ‘বুঝতে পারলে ?’ হুঁ..হুঁ.. বাবা ! ও হচ্ছে পরমানন্দ ! ও তো যে সে নয় – একেবারে সাক্ষাৎ জাতসাপ ! যাকে একবার ছুবলে দেবে – সেই বিষে নীল হবে !”
আমার মনে পড়ে যেতো গুরু মহারাজের কথা , উনি বলতেন – “সাধারণভাবে অধ্যাত্ম-পিপাসু মানুষেরা যখন তাদের অন্তরের তাগিদে এখানে ওখানে ঈশ্বরানুসন্ধানে ছুটে বেড়ায়, তখন প্রথমেই গুরুর অন্বেষণ করে । একবারেই তো সবাই সদ্গুরুর সন্ধান পায় না –– ঢোঁড়া , ঢেমনা করতে করতে অবশেষে জাত সাপের পাল্লায় পড়ে মানুষ! আর একবার জাত সাপের পাল্লায় পড়লে – সে দেয় ছুবলে ! সেই ছোবল একবার খেলে– বিষে নীল হতেই হবে , অর্থাৎ তার জাগতিক কামনা বাসনা উড়ে গিয়ে সে ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী হবেই হবে ৷”
গুরু মহারাজের কথা বা তাঁর নাম উল্লেখ হলেই ন’কাকার মুখমণ্ডল কেমন যেন উদ্দীপ্ত হয়ে যেতো – গুরু মহারাজের গৌরবের কথা বলে তিনি নিজেও যেন গৌরবান্বিত বোধ করতেন! ওনার ওই ধরনের উজ্জ্বল মুখমন্ডলের দিকে তাকিয়ে আমাদেরও মনটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যেতো !
তবে একটা কথা অন্ততঃ আমি ঠিকমত বুঝতে পারতাম না – যখন উনি বলতেন , “কাল পরমানন্দ এসেছিল , অনেক কথা হ’ল(গুরু মহারাজের শরীর ছাড়ার পরের সময়কালীন) !” আদিত্যপুর আশ্রমে উনি একথা বলেছেন , অন্যত্রও বলেছেন একাধিকবার !
প্রথম প্রথম যখন আদিত্যপুর আশ্রমে উনি যেতেন – তখন ঠাকুর ঘরের মেঝেতে ওনার রাত্রে থাকার ব্যবস্থা হোত । আমিও দু একবার ওনার সাথে ওখানে শুয়েছি , কিন্তু পরের দিকে ছেলেদের ঘরে (পূর্বদিকের বিল্ডিং-এ) অথবা নন্দ মহারাজের কাছে শুয়ে পড়তাম_ যাতে ন’কাকা ঠাকুরঘরে একাই থাকতে পারেন এবং রাত্রে গুরুমহারাজ বা অন্য মহাপুরুষদের সাথে যোগাযোগ করায় ওনার কোনো অসুবিধা না হয়!
তবে সকালের জমাটি চায়ের আসর বরাবরই বসতো! সেইরকম-ই একদিন সকালে চায়ের আসরে ন’কাকা নন্দ মহারাজকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন – “কাল রাতে পরমানন্দ (গুরু মহারাজ) এসেছিল ! অনেকক্ষণ ছিল – কিছু কথাবার্তাও হলো ! তোমাদের আশ্রমের উপর খুবই প্রসন্ন রয়েছে দেখলাম ! এই আশ্রমের অনেক কাজ হবে (তখন ২০১০/১১ সাল) ।”
আবার অনেক সময় দেখেছি , কেউ হয়তো তার কোন গুরুতর সমস্যা নিয়ে ন’কাকাকে জানালো অথবা কোন আশ্রমের মহারাজেরা তাদের নিজেদের মধ্যেকার সমস্যা বা আশ্রমের বিকাশের কোন সমস্যা নিয়ে ওনাকে নিবেদন কোরলো __ তখন দেখতাম ন’কাকা বলতেন – “আচ্ছা-আচ্ছা ! আমি পরমানন্দকে তোমাদের কথা জানাবো , ওর সাথে আলোচনা করে কি সিদ্ধান্ত হয় , তা তোমাদের পরে জানাবো।”
– এই যে কথাগুলি উনি বলতেন(অর্থাৎ গুরুমহারাজ এসেছিলেন) _এই ব্যাপারটা আমি ঠিক ধরতে পারতাম না ! একবার মনে হতো সত্যি সত্যিই বোধহয় রাত্রে ওনাদের মধ্যে যোগাযোগ হয় , আবার মনে হতো – ‘ না-না , তা নয় ! ধ্যানের গভীরতায় বা অন্তর্লীন অবস্থায় হয়তো কোন সূক্ষ্ম Communication হয় ওনাদের মধ্যে – উনি সেটাই আমাদের বলতেন !
মহাপুরুষদের সাথে মেলামেশা করার একটা অন্যতম বড় ঝুঁকি হচ্ছে – “ক্ষণে ক্ষণে সংশয় তৈরি হওয়া” ! এই বেশ বুঝতে পারছি_ উনি একজন নিশ্চয়ই মহাপুরুষ , কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে – ” যতটা ভাবছি উনি ততটাই ঠিক বটেন তো !”
আমার মনে হয় – এই যে মহাপুরুষদের সান্নিধ্য পাওয়ার পরও আমাদের চেতনা এখনও আকাশ স্পর্শ করতে পারলো না – এখনো যেন মাটিতেই গড়াগড়ি খাচ্ছে – এটা (মহাপুরুষদের প্রতি অসংশয় না হওয়া)-ই তার অন্যতম কারণ !
আপনারা যারা পরে এসেছেন – এই লেখাটা পড়ে হয়তো ভাবছেন – আপনি যদি আমার জায়গায় হতেন , তাহলে এই ভুলটি করতেন না , এই অপরাধে অপরাধী হোতেন না – কিন্তু সেটি কি হবার জো আছে ! “পঞ্চভূতের ফাঁদে , ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে” – এমন ভুবনমোহিনী মায়ায় আপনাকে ফেলে দেবে যে আপনি কোথায় হারিয়ে যাবেন – তার খোঁজ পাওয়াই দুষ্কর হয়ে যাবে !(ক্রমশঃ)