ন’কাকা হঠাৎ করে শরীর ছেড়ে দিয়ে আমাদেরকে আবার নতুন করে (গুরু মহারাজের পর) অনাথ করে দিয়ে চলে গেলেন ! অনেক জিজ্ঞাসা , অনেক সমস্যার সমাধান যে এবার কি করে হবে – আমরা সেটা নিয়েই এখন গভীর চিন্তিত ! গুরুমহারাজ যাদের দীক্ষা দিয়েছিলেন বা ভার নিয়েছিলেন – গুরুমহারাজের স্থূল শরীর ত্যাগের পর (১৯৯৯) সেই ছেলেমেয়ে গুলি যেমন হঠাৎ করে আবিষ্কার করেছিলো যে, তারা বড় হয়ে গেছে বা তাদের বড় হোতেই হবে – কারণ তাদের মাথার উপর ছাদটা সরে গেছে , তাদের বাবা,তাদের গুরু,তাদের জীবনের ধ্রুবতারা __স্থূল শরীরে আর বিদ্যমান নাই !
ন’কাকার হঠাৎ করে চলে যাওয়াতেও (২০১৮) সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো ! যে ছেলে-মেয়েগুলিকে উনি দীক্ষা দিয়ে গেলেন বা যাদের ভার উনি নিলেন – এবার তারা কোন পথে যাবে ? তাদের সুবিধা-অসুবিধা , তাদের দুঃখ-আনন্দ , এক কথায় তাদের জাগতিক সমস্যা , আধ্যাত্মিক সমস্যার কথা কাকে বলবে – কাকে জানাবে ? জানাবার যদি কেউ না থাকে, তাহলে তাদেরকেও বড় হতে হবে –অন্ততঃ তাদেরকেও বড় হবার চেষ্টা করতেই হবে ! নাহলে স্রোতের টানে হাত ছেড়ে গেলে যেমন হাত-ছাড়া ব্যক্তি কোথায় ভেসে যায় – তলিয়ে যায় , এখানেও তেমনিই একটা ব্যাপার হবে ! তবে একটা আশা করাই যায় , যেহেতু তাঁদের (মহাপুরুষদের) আশ্বাস রয়েছে – ” মহাপুরুষরা যাকে একবার ধরেন , তার ইহকাল পরকালের ভার তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন ” – তাই আপাতভাবে কেউ কালস্রোতে খানিকটা ভেসে গেলেও , নাকানি-চোবানি একটুখানি খেলেও তিনি (ঐ মহাপুরুষ) চুলের মুঠি ধরে ঠিকই পাড়ে টেনে তুলবেন ৷ সুতরাং গুরু মহারাজের ছেলে-মেয়েরা “মাভৈঃ” – ন’কাকার ছেলে-মেয়েরা “মাভৈঃ” !!! চিন্তার কোনো কারণ নাই _শুধুমাত্র ওনাদেরকে স্মরণ মনন এবং ওনাদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালবাসা রাখলেই হবে।
যাইহোক, আবার আমরা ফিরে যাই ন’কাকার বিভিন্ন স্থানের সিটিং-এর কথায় ! যেগুলি বাদ দিয়ে চলে আসা হয়েছে – সেই ফাঁক গুলি Make-up করার চেষ্টা করি !এর আগে শ্রীরামপুর (হুগলি)-এ ন’কাকা যখন যখন যেতেন, সেইসময়কার অনেক কথাই বলা হয়েছে কিন্তু আরও কিছু বাকি পড়েছিল – এখন সেগুলি বলার চেষ্টা করি ৷ শ্রীরামপুরের গৌতম ভড় (স্ত্রী মন্দিরা ভড়)-এর বাড়িতে বনগ্রাম আশ্রমের বিভিন্ন মহারাজরাই আসতেন ! গৌতম যেহেতু বাড়ি ঘর তৈরির Planner এবং জমির Measurement করতে পারে – তাই যে কোনো আশ্রমের শাখায় নতুন Building তৈরি হলেই গৌতমের ডাক পড়তো – আর গৌতম সেই কাজকে ‘গুরু মহারাজের কাজ’ – জ্ঞান করে,প্রয়োজনে অফিস কামাই করে, নিজের খরচায় সেখানে গিয়ে কাজটি করে দিয়ে আসতো ! সেই হিসাবে শাখা আশ্রমগুলির ভারপ্রাপ্ত যে কোনো মহারাজের সাথেই গৌতমের ভালো সম্পর্ক ছিল বা আজও রয়েছে ! এই হিসাবে কাজে-অকাজে বিভিন্ন আশ্রম থেকে মহারাজরা , ব্রহ্মচারী বা সন্ন্যাসীরা ওর বাড়ি আসতো (এখনও আসে)। এদের মধ্যে ওখানে সবচাইতে বেশি আসা-যাওয়া করা বা থাকার লোকেরা ছিলেন __রায়না আশ্রমের নরেন মহারাজ , বাঁকুড়ার ধরমপুর আশ্রমের মানিক মহারাজ (স্বামী অখন্ডানন্দ) এবং প্রণতি মা (পরিব্রাজকা আনন্দপ্রাণা , যিনি পূর্বে করিমপুর আশ্রমের ভারপ্রাপ্তা ব্রহ্মচারিণী ছিলেন) !
গৌতম ভড়ের ঘরের দরজা বনগ্রাম আশ্রমের এবং বিভিন্ন শাখা আশ্রমের যে কোনো মহারাজদের (ব্রহ্মচারিণীও) জন্য সব সময় খোলা থাকতো(এখনও থাকে) । তাই ন’কাকা গৌতমের বাড়িতে যাওয়া-আসা শুরু করার অনেক আগে থেকেই গৌতমের বাড়িকে কেন্দ্র করেও একটা ভক্ত পরিমন্ডল গড়ে উঠেছিল[যেহেতু _প্রনতি মা, অখন্ডানন্দ মহারাজরা ওর বাড়ি গেলেই স্থানীয় ভক্ত জনেরা জড়ো হোত __ওনাদের কাছে গুরুমহারাজের কথা শোনা বা সিটিং শোনার জন্য] ।
ফলে ন’কাকা ওর বাড়ি গেলে ওখানেও একটা সিটিং-এর ব্যবস্থা হয়ে যেতো ! পরবর্তীতে দেখতাম ন’কাকার অনুগামীরাও (হাওড়া থেকে , বীরভূম থেকে , বর্ধমান থেকে) ন’কাকার সাথে দেখা করার জন্য এবং তাঁর মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য ওর বাড়িতে এসে ভিড় জমাতো । গৌতম__ ওর বাড়িতে গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের পূজার ব্যবস্থা করতো – সেটাও অনেকের কাছে ছিল ওর বাড়ি যাবার একটা অন্যতম আকর্ষণ ! গুরু মহারাজের পূজা , আরতি , হোম-যজ্ঞ সবই হোতো ! এরপর প্রসাদ বিতরণ এবং সব শেষে খাওয়া-দাওয়া !
আমরা দেখতাম গৌতম প্রায় ১০০/১৫০ জন লোকের খাবার Arrangement কোরতো অর্থাৎ এককথায় শ্রীরামপুরের গৌতমের বাড়িতে ন’কাকা গেলে “ভজন এবং ভোজন”– সবদিক থেকেই ছিল একটা জমজমাট ব্যাবস্থা !
সবাই খুব আনন্দ পেতো বলেই ন’কাকাও গৌতমের বাড়ি যেতে ভালবাসতেন । গৌতমের আমন্ত্রণক্রমে দিন স্থির হলেই ন’কাকা আমাকে ফোনে জানিয়ে দিতেন _”বাবা! এবার তো একদিন শ্রীরামপুরে গৌতমের ওখানে একবার যেতে হবে!”
যতদিন আমি বনগ্রাম হাইস্কুলে ছিলাম , ততদিন শ্রীরামপুরে প্রোগ্রাম সেট্ হবার সাথে সাথেই জানতে পারতাম , তারপর নির্দিষ্ট দিনে যাত্রা ! কিন্তু আমি যখন বনগ্রাম আশ্রম ছেড়ে কাটোয়ার কাছে আমাদের গ্রামে চলে এলাম _তখন থেকে ফোনেই প্রোগ্রাম সেট্ হয়ে যেতো। এমনও হয়েছে – ন’কাকা মেমারি থেকে ট্রেন ধরে শেওড়াফুলি স্টেশনে (ওখানে নেমেই গৌতমের বাড়ি যাওয়া তখন সুবিধাজনক ছিল) অনেক আগেই পৌঁছে গেছেন , আমার কাটোয়া লোকাল তখনও পৌঁছায়নি – ন’কাকা স্টেশনে আধ-ঘন্টা / ৪৫মিনিট আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছেন ! আমি স্টেশনে নেমে ওনাকে যখন আমার জন্য ওভাবে অতক্ষণ ধরে বসে থাকবার কথা শুনতাম – তখন আমার চোখে জল চলে আসতো, আমার মতো সামান্য একজনের প্রতি ওনার ভালোবাসার কথা ভেবে !
এটা কে ‘কি’ ভালোবাসা বলবেন!! এটাই বোধহয় অপার্থিব ভালোবাসা ! এগুলিকেই বলে প্রত্যাশাবিহীন ভালোবাসা !!(ক্রমশঃ)