গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে সিটিং-এ যেসব কথা আলোচনা করতেন তার কিছু অংশ এখানে সবার সাথে শেয়ার করা হচ্ছিল ! এখন আমাদের আলোচনা চলছিল ইউরোপের জার্মানীতে গুরু মহারাজ যখন গিয়েছিলেন – তখন উনি কি কি দেখেছিলেন , কি কি ঘটনার সম্মুখীন ওনাকে হতে হয়েছিল – ইত্যাদি সম্পর্কে ! এইসব কথা বলতে গিয়ে আমরা জার্মানী জাতির মানসিকতা , দুই জার্মানীর সংযুক্তিকরণ ইত্যাদি আলোচনা করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা এবং অবশ্যই জার্মানির অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিটলারের কথা এসে গেছে !
হিটলারের কথা আসাতেই ওনার সাথে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের অন্যতম পথিকৃৎ নেতাজি সুভাষচন্দ্রের সাথে হিটলারের দেখা হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে! আমাদের এই “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা”-য় প্রধানতঃ পুরোনো বনগ্রামের (আশ্রমের) কিছু কিছু চিত্র এবং Mainly গুরু মহারাজের সিটিংয়ে করা আলোচনা (আমি যেটুকু তখন যেমনভাবে বুঝেছি) এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয় । এই কথাগুলি হয়তো আগে ‘চরৈবেতি’-তে ‘কথা প্রসঙ্গে’ – আলোচনা হয়েছে , কিন্তু সেখানে খুব সাবধানে শুধু জিজ্ঞাসা-উত্তর টুকুই করা আছে । সেখানে লেখকের (সংকলকের) স্বাধীনতা একদম নাই বললেই চলে ! এখানে যেন খোলা আকাশ – একটু আলোচনা , একটু ব্যাখ্যার চেষ্টা , দু-একটা চরিত্র সংযোজন , অনেকগুলি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে করা আলোচনার একজায়গাকরণ (একত্রীকরণ) – ইত্যাদি করা হয়ে থাকে ৷ “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা”– তাৎক্ষণিক লেখা – আজকে লিখেই সঙ্গে সঙ্গে Type – এ বসতে হয় – না হলে সময়মতো Post করা যাবে না – সেই তাগিদ বা তাগাদা থাকে !
তাড়াতাড়ির মধ্যে এই কম্মো করতে গিয়ে কোন একটা বিশেষ আলোচনাতেও নানান প্রসঙ্গ এসে পড়ে ! কোন সময় হয়তো গুরুমহারাজ কোন বিষয় আলোচনা করেছিলেন – সেটা প্রাসঙ্গিক মনে হলেই, আগের আলোচনার সাথে জুড়ে দেওয়া হয় । তখন মনে হয় _এটা না করলে হয়তো ওই আলোচনাটা আবার বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যাবে, তাই লেখা হয় ! এই কারণে অনেক সময়তেই এক প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে – অন্যান্য কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা হয় , এতে জানিনা রসিক পাঠকের রসভঙ্গ হয় কিনা – কিন্তু এই লেখায় এইরকমটা হবে ! পাঠক-কুলকে আমার অনুরোধ – এটাকে আপনারা অনুগ্রহ করে allow করবেন !
আমরা আবার ফিরে আসি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে হিটলারের যখন দেখা হয়েছিল – সেই ব্যাপারে আমরা গুরু মহারাজের কাছে যা শুনেছিলাম সেই প্রসঙ্গে ! আমার দেখা – ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বহু মানুষ , বহু – বহু মানুষ (বিশেষত কলকাতার মানুষ বা স্থানীয় শিক্ষিত সমাজ) আশ্রমে প্রথমবার বা দ্বিতীয়বার এসেই গুরু মহারাজের কাছে নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে জিজ্ঞাসা তুলত ! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, প্রতিবার-ই দেখতাম গুরুমহারাজ আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে আলাদা আলাদা উত্তর দিতেন !
অনেককে উনি ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়ে – ঐ প্রসঙ্গে আলোচনা থেকেই বিরত থাকতে বলতেন ! আবার অনেক সময় উনি নিজে থেকেই অনেক আলোচনা করতেন । তবে নেতাজি যে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি এটা উনি অনেকবারই বলেছিলেন ৷ সাধু-সন্তরা ওনাকে তিব্বতে অথবা হিমালয়ের গভীরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করেছিল । সাইবেরিয়ার জেলে নেতাজীকে ইচ্ছে করেই রাখা হয়েছিল ওনার নিরাপত্তার খাতিরে ! কারণ সেই সময় বাইরে থাকলে বৃটিশ গুপ্তচরেরা বা ভারতীয় তৎকালীন নেতৃত্ব ওনার প্রাণসংশয় করে দিতে পারতো । পরবর্তীতে উনি সন্ন্যাসী হয়ে যান এবং গভীর সাধনায় মগ্ন হয়ে যান ! এইজন্যেই গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন সাইবেরিয়া জেলে ‘তোদের নেতাজির’ মৃত্যু হয়েছিল অর্থাৎ ভারতীয়দের মনে যে ‘নেতাজী’ ছিল, সেই সুভাষচন্দ্র এরপরে যে জীবন (সাধনায় সিদ্ধ জীবন)-লাভ করেন, সেই জীবনে উনি আরও উন্নত চেতনায় চলে যান ! মনোস্তরের যে চেতনায় পৌঁছালে – দূরে কোন পর্বতের গুহা কন্দরে বসে থেকেই সমাজের কল্যাণ , দেশের কল্যাণ করা যায়! যেমন সূর্য বহু দূরে থেকেও প্রতিনিয়ত সদাসর্বদা পৃথিবীর মঙ্গল করে যাচ্ছে – এক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটি-ই হয় !
ন’কাকার কাছে শুনেছিলাম গুরু মহারাজের সাথে সন্ন্যাসীবেশী সুভাষচন্দ্রের কাটোয়া_ব্যান্ডেল লাইনের ট্রেনে দেখা হয়েছিল ! তখন ওনার ছিল যোগসিদ্ধ শরীর ! তখন ন’কাকার কাছে এই কথা শুনে ঠিক যে অন্তর থেকে বিশ্বাস করেছিলাম _তা নাও হতে পারে! ব্যাপারটা এইরকম ছিল __’ঠিক আছে, উনি যখন বলছেন তখন… ‘! কিন্তু কিছুদিন আগে কেশব ভট্টাচার্য(কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট, যিনি মুখার্জি কমিশনের অন্যতম সদস্য ছিলেন)-এর লেখা “চক্রবুহে নেতাজী” _বইটি পড়ে জানতে পারলাম সন্ন্যাসীবেশী সুভাষচন্দ্র মাঝে মাঝেই নবদ্বীপ এবং কালনায় বিভিন্ন বাড়িতে আসতেন!!
এই কথাগুলো এখানে বলা হ’ল – শুধুমাত্র পাঠককূলের কৌতুহল নিরসনের জন্য । এবার আমরা আবার হিটলার প্রসঙ্গে ফিরে যাব ৷
গুরু মহারাজ বলেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানি সৈন্যবাহিনী পরাজিত হয়েছিল শুধুমাত্র (সুভাষচন্দ্রের কথা না মেনে) রাশিয়াকে একপ্রকার জোর করে যুদ্ধে নামানোর জন্য ! তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া তখন আয়তনে বিশাল – ! ইউরোপের বেশ খানিকটা অঞ্চল রাশিয়ার অন্তর্গত হওয়ায় — একে ‘ইউরেশিয়া’ বলা হয় ! জার্মান সৈন্যবাহিনী হিটলারের আদেশে রাশিয়ার খানিকটা অংশ দিয়ে মার্চ করে ঢুকে পড়েছিল (কোন একটা স্থানে মিত্রশক্তির সৈন্যবাহিনীর উপর আক্রমণ করার জন্য – রাশিয়ার ঐ অংশটা দিয়ে গেলে পথটা একটু সংক্ষিপ্ত হোত , তাই এই সিদ্ধান্ত ! রাশিয়ার ওই অঞ্চলটা এড়িয়ে অন্য পথ দিয়েও যাওয়া যেতো – কিন্তু হিটলারের জিদ্ !) ! আর সৈন্যদলের মার্চপাস্ট মানেই হোল সর্বাত্মক ধ্বংসলীলা ! সাধারণ মানুষজনকে মেরে , ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে , ফসলের ক্ষেত জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে দিতে ওরা এগিয়ে যায় ! এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল ! রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রথমেই নিষেধ করেছিল – কিন্তু ওরা সে কথায় কর্ণপাতও করেনি ! এরপর রাশিয়ান সৈন্যবাহিনী মিত্রপক্ষের সাথে গোপনে যোগাযোগ করে Plan তৈরি করে নিয়েছিল ! হিটলারের বাহিনীকে বিনা বাধায় রাশিয়ার সীমানায় সম্পূর্ণভাবে ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল (বিভিন্ন পরাক্রমী সেনানায়ক-সহ এই পদাতিক বাহিনী ছিল হিটলারের অপরাজেয় বাহিনীর অন্যতম বড় শক্তি) , এবার যেই মাত্র ওরা আগাতে আগাতে সামনে শত্রুপক্ষের সামনাসামনি হয়ে লড়াই শুরু করে দিল , অমনি পেছন থেকে নিজেদের সীমানার মধ্যে থাকা রাশিয়ান বাহিনী অতর্কিতে আক্রমণ করে জার্মানীর ওই বিশাল শক্তিশালী বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করে ফেলল ! ব্যস্ ! ঐ একটি পরাজয়-ই অক্ষশক্তির বাকি সৈন্যদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল এবং মিত্রশক্তির মনোবল শতগুনে বাড়িয়ে তুলেছিল। ফলে এই ঘটনার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই অক্ষশক্তি পরাজয় স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন _জাপানে যে দুটি পরমানু বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল, ওটার একেবারেই কোন প্রয়োজন ছিল না! ওটা শুধুমাত্র আমেরিকার(USA) দাদাগিরি প্রতিষ্ঠার জন্য আর যেহেতু তখন ওরা দুই ধরনের (ফিসন এবং ফিউসন) পরমানু বোমা তৈরি করে ফেলেছিল _তাই সেগুলো TEST করার একটা তো জায়গা দরকার, ওরা জাপানকেই সেই জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিল (কারণ যেহেতু জাপান ওদের পার্ল হারবার ধ্বংস করেছিল)! যুদ্ধের প্রয়োজনে এই অস্ত্রগুলি ব্যবহার করা হয় নি _কারণ যুদ্ধ তার কদিন আগেই থেমে গিয়েছিল! (ক্রমশঃ)