[ ন’কাকার সাথে বিভিন্ন মহাপুরুষদের যোগাযোগের কথা বলা হচ্ছিল। ছোটবেলাতেই ন’কাকার ঁরী মা জগদম্বার দর্শন হয়েছিল। আজ সেই সব প্রসঙ্গ…..]
মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই ন’কাকার মাতৃদর্শন (মা জগদম্বা) হয়েছিল সেকথা আগে উল্লেখ করেছি ! গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কাছে আমি প্রথম ন’কাকার মাতৃদর্শনের খবরটা শুনেছিলাম। এই কথা শোনার পর একদিন সুযোগ পেয়ে আমি ন’কাকাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম – “ঁরী মাতৃদর্শনের ব্যাপারটা কি রকম ছিল ন’কাকা ?” উনি উত্তর দিয়েছিলেন । কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম সে উত্তর ছিল ছেলে-ভুলানো উত্তর !
উনি যেটা বলেছিলেন, সেইটা বলছি _ন’কাকা তখন খুবই ছোট, হয়তো ৪/৫-বছর বয়স! ঐ বয়সেই ওনার ঝোঁক চেপেছিল একটা আম কাটার ছুরি চাই ! ওনাদের বাড়ির মাকালীর মূর্তি আগে খুবই ছোট ছিল, তাই মা কালীর হাতের খাঁড়া-টাও খুবই ছোট ছিল। বালক ন’কাকা ঐ খাঁড়াটি পাবার জন্য আব্দার করতে শুরু করেছিলেন! মা-বাবা এইরকম একটা বায়না শুনে খুবই বকাবকি করেছিলেন, বলেছিলেন – “ঠাকুরের হাতের খাঁড়া নেবার কথা বলতে নেই !”
বালক ন’কাকার এতে ৺রী মায়ের উপর খুবই রাগ বা অভিমান হয়েছিল! আর এতেই কাজ হয়েছিল! সেই রাত্রেই ঁ মা স্বয়ং ওনার সামনে আবির্ভূত হয়ে স্বহস্তে তাঁর হাতের খাঁড়া-টা ন’কাকাকে দিয়ে দিয়েছিলেন !
ন’কাকার বলা ঐ কথাটা সত্য হোক অথবা ছেলে-ভুলানো – গুরুমহারাজের কাছে আমরা শুনেছিলাম ছোটবেলাতেই ন’কাকার ঁরী মাতৃদর্শন হয়েছিল! সুতরাং মাতৃদর্শনের কথাটা ১০০% সত্য ! তবে গুরুমহারাজের সঙ্গ করে আমাদের তো এইটুকু ধারনা হয়েছে যে, ঁরী মাতৃদর্শন মানে হোল নিজেই “ঁরী মা হয়ে ওঠা”!
ন’কাকার সাথে বিভিন্ন মহাপুরুষের যোগাযোগ হয়েছিল – যাঁরা তৎকালীন সময়ে শরীরে ছিলেন ! এঁদের মধ্যে বাবাজী মহারাজ ছাড়াও আমাদের পরম গুরুদেব স্বামী রামানন্দ অবধূত , বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর পরবর্তী শরীর স্বামী অদ্বৈতানন্দ , দক্ষিণ ভারতের বাবা বালস্বামী , তারাপীঠের শংকর ক্ষ্যাপা প্রমুখেরা রয়েছেন ৷ সূক্ষ্ম শরীরধারী মহাত্মাদের মধ্যে গুরু মহারাজের সাথে ভ্রমণকালীন ‘গীতগোবিন্দ’ রচয়িতা জয়দেব গোস্বামী , হৃষীকেশে শিবানন্দ সরস্বতী , হেতমপুর বা জয়দেব কেন্দুলির জয়শংকর বাবা প্রমুখদের সাথেও ওনার যোগাযোগ হয়েছিল । এই কথাগুলি ওনার মুখে শুনেছিলাম বলে উল্লেখ করা হলো! কিন্তু এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে , যে কোন মহাপুরুষের সঙ্গে-ই ওনার যোগাযোগ ছিল !
এই কথাটা কেন বলা হলো –তার কারণ রয়েছে!
গুরু মহারাজ (স্বামী পরমানন্দ) একবার বলেছিলেন পৃথিবীতে সব সময় সাত জন মহাপুরুষ শরীরে বর্তমান থাকেন , আর অনেকেই সূক্ষ্ম শরীরে বা অন্য কোন অবস্থায় (অনিমা , লঘিমা ইত্যাদি সিদ্ধি প্রাপ্ত অবস্থায়) থাকেন ! এছাড়াও কিছু কিছু উন্নত সাধক বা সিদ্ধ মহাত্মারা তো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সবসময়ই রয়েছেন ! মাঝেমধ্যেই এই সমস্ত মহাত্মাদের মধ্যে বৈঠক হয় ! পৃথিবী গ্রহের ভালো-মন্দের ভার এনাদের উপর – তাই এইসব বৈঠক থেকেই স্থির হয় যে পৃথিবীর কোন প্রান্তে কোন মহাপুরুষকে কোন্‌ কোন্‌ দায়িত্ব পালন করতে হবে ৷ গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ যতদিন শরীরে ছিলেন – ততদিন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মহাত্মারা ওনার সাথে দেখা করতে আসতেন ! আমার স্থির বিশ্বাস ওই সমস্ত বৈঠকে গুরু মহারাজের সাথে ন’কাকাও উপস্থিত থাকতেন !
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শরীর ছাড়ার পর সারদা মা যেমন সংঘজননী রূপে আরও অনেক কাল শরীরে থেকে__ রামকৃষ্ণ মিশনের কোথাও কোনভাবে প্রত্যক্ষরূপে যুক্ত না থেকেও সবার আশ্রয়–সবার ভরসাস্থল হিসাবে রয়ে গিয়েছিলেন ৷ পরমানন্দ মিশনে ন’কাকার ভূমিকাও ছিল অনেকটা ঐরকমই ! গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দকে অকস্মাৎ হারিয়ে অজস্র ভক্তকুল যখন নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে একটু আলোর দিশা হাতরে হাতরে বেড়াচ্ছিল – তখন অতিসূক্ষ্ম শ্বেত শুভ্র আলোকজ্যোতির ন্যায় ন’কাকাকে পেয়ে ভক্তরা (হয়তো সবাই নয় , কিন্তু অন্তরে সকলেই ন’কাকাকে মান্যতা দিতো) অনেকখানি আশ্বস্ত হয়েছিল ।৷
গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ অহৈতুকী করুণায় তাঁর চতুঃপার্শ্বস্থ সকলকে [শুধু মানুষ নয় – পশু-পাখি , গাছ-পালা সকলকে – কারণ তিনি বলেছিলেন আমার এই স্থূল শরীরকে কেন্দ্র করে যদি কোন পরজীবী (উকুন , কৃমি , ভাইরাস , ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি) বাস করে তারাও সরাসরি মনুষ্য শরীর প্রাপ্ত হবে , তাদের Evolution তখন Revolution হয়ে যাবে ৷] যে দুরন্ত গতিতে সামনের দিকে অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন – সেটা আর কয়েক বৎসর বজায় থাকলেই ভারতীয় সমাজে ঋষির ছড়াছড়ি হয়ে যেতো (ঋষি অবস্থা অর্থাৎ সিদ্ধ অবস্থা , যে অবস্থায় পৌঁছালে আর মহামায়ার ভুবনমোহিনী ফাঁদে পা দিতে হয় না) ! গুরুমহারাজের আকস্মিক মহাপ্রয়াণে সমগ্র পরমানন্দ ভক্তকুল ওই অসম্ভব অগ্রগতি থেকে অনেকটাই শ্লথগতি হয়ে পড়েছিল (নিশ্চয়ই সবাই নয় , ব্যতিক্রম সবক্ষেত্রেই থাকে – তাই এখানেও অনেকেই নিজের নিজের অগ্রগতি বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে) ! আমাদের মধ্যে অনেকের কাছেই তখন শুনতাম – ” গভীর ধ্যানের মধ্যে ভীষণ আনন্দের প্লাবন বয়ে যেতো – আর জ্যোতিঃর্বলয়ের মধ্যে থাকতে থাকতে মনে হতো – ‘এই বুঝি আর একটুখানি’ – ব্যস্ , তারপরেই আমার ‘পরম প্রাপ্তি’ হয়ে যাবে ! ঐটুকু আর হচ্ছে না – তবে নিশ্চয়ই খুব শিগ্গিরই ওইখানে পৌঁছে যাবই যাব।”(ক্রমশঃ)