[ন’কাকা প্রসঙ্গে _নানারকম আলোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন ভক্তদের কথা যেমন উঠে আসছে, ঠিক তেমনি আমার নিজের কথাও কোন কোন সময় এসে যাচ্ছে। আসলে এই রচনাটা তো “আমার দেখা ন’কাকা”। তাই এইসব আসছে! সুধী পাঠকেরা মার্জনা করে দেবেন _এই আশা করি।]
বিভিন্ন ভক্তদের সাথে ন’কাকার সম্পর্ক নিয়ে যে এইসব আলোচনা করতে হবে – তা আমি সত্যি সত্যিই কোনদিন ভাবিনি !
অনেকদিন আগের একটা কথা মনে পড়ছে, তখন গুরুমহারাজ শরীরে ছিলেন – ফলে আশ্রমে তখন ন’কাকাকে প্রায় সবাই (ব্রহ্মচারী, সন্ন্যাসীরা) বয়োজ্যেষ্ঠ পিতার মতোই শ্রদ্ধা করতো। চরৈবেতি পত্রিকার সম্পাদক স্বামী স্বরূপানন্দ তো তখন দুবেলা ন’কাকাকে প্রণাম করার জন্য নারান (বর্তমান স্বামী সাধনানন্দ)-কে বাইরে দাওয়ায় বসিয়ে রাখতেন, গ্রাম থেকে ন’কাকা কখন আশ্রমে আসবেন সে খবরটা মহারাজ-কে দেবার জন্য ! ন’কাকা কার্যালয়ের কাছাকাছি এলেই উনি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিচে নেমে ওনাকে প্রনাম করতেন এবং নিজস্ব নানান সুবিধা-অসুবিধার কিছু কথা আলোচনা করতেন। সেদিন ন’কাকা ওনার সাথে কথা বলতে বলতে’ চরৈবেতি কার্যালয়ে’- ঢুকেই পড়লেন! স্বামী স্বরূপানন্দ সহ ওখানকার সবাই ন’কাকাকে বসিয়ে এটা-ওটা আলোচনা করতে লাগল। হটাৎ করে স্বামী স্বরূপানন্দ ন’কাকাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ” আচ্ছা ন’কাকা! শ্রীধরদা তাহলে (স্বরূপানন্দ আমাকে শ্রীধরদা বলেই সম্বোধন করে !) শুধু গুরু মহারাজের কথাই কি লিখবে ?” ন’কাকা সাথে সাথেই স্বরূপানন্দ মহারাজকে বললেন – ” না – না শ্রীধর আরো কিছু লিখবে !”
ন’কাকা যে সমস্ত লেখা চরৈবেতি পত্রিকায় বা অন্যান্য Magazine-এ (বিভিন্ন জায়গায় ‘সুভেনিয়র’ বা অন্য কোন Magazine-এ একটা লেখা দেবার জন্য অনেক ভক্তরাই ওনাকে অনুরোধ জানাতো, উনি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতেন ৷ কিন্তু ভক্তরা খুব জোর-জার করলে উনি কোনো না কোনো প্রবন্ধ লিখে দিতেন ।) দেবার জন্য লিখতেন, সেইটার খসড়া তৈরি করা হয়ে গেলেই, যে কোনো ভাবে সেটা আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতেন । বলতেন – “তুমি একটু দেখে ঠিক-ঠাক করে পাঠিয়ে দিও ৷” আমি সেই কাজটাই করতাম । সেইজন্য আমার কাছে ওনার শ্রীহস্তের লেখা অনেক পান্ডুলিপি-ই রয়েছে। সেগুলি যখনই হাতে নিই, আর ওনার মুক্তোর মতো হাতের লেখাগুলো দেখি, তখন সত্যিই চোখের জল আটকাতে পারি না !!
কি ভালো যে উনি বাসতেন – কতোটা বিশ্বাস করতেন বা মর্যাদা দিতেন – তা বলার নয় ! অবশ্য যে-কোনো মহাপুরুষদের এটাই সহজতা – তাঁরা যাকে একবার ‘শিব’ বলেন – তাকে আর কখনোই ‘পাথর’ বলেন না ৷ এটা গুরুমহারাজের ক্ষেত্রেও দেখেছি – ন’কাকার ক্ষেত্রেও দেখেছি ! ওনারা দুজনেই প্রথম দেখার পরেই কোনো এক ব্যক্তিকে প্রথম দিন যা বলেছেন, যেভাবে বা যতটুকু মর্যাদা তাকে দিয়েছেন – একেবারে শেষদিন পর্যন্ত সেই কথাই বলেছেন, তার সাথে সেই একইরকম Treatment করেছেন ! যে কোনো মহাপুরুষ এটাই করে থাকেন ! আমার তো মনে হয় যে কোনো মহাপুরুষদের চেনার এটি একটি অন্যতম লক্ষণ !
অবশ্য কোনো ব্যক্তিকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই মান বা মর্যাদা দেওয়া অথবা তার প্রতি একই ‘ভাব’ বজায় রেখে চলাটা তাঁদের পক্ষেই সম্ভব এবং তাঁদের কাছে ব্যাপারটা সহজও ! কারণ তাঁরা তো ওই ব্যক্তির সাত জন্ম অথবা চৌদ্দজন্মের একটা সংক্ষিপ্তসার রূপ দেখে নিয়ে – তবেই তার সাথে ঐরূপ Treatment করতে পারেন ! অন্যদের সে ক্ষমতা কোথায় ? আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা অন্য কারোর ‘বর্তমান’- টা দেখে তার সাথে মেশামেশি করতে শুরু করি! কিছুদিন পরেই (অর্থাৎ স্থান-কাল পাল্টালে) ওই ব্যক্তির আচরণের সামান্য কোনো হেরফের হলেই, আমরা আর তাকে সহ্য করতে পারি না – তার সঙ্গ ত্যাগ করি অথবা তাকে সঙ্গ ত্যাগ করতে বাধ্য করি !
কিন্তু যে কোনো মহাপুরুষ এটা কখনোই করেন না – ঈশ্বরের ‘অবতার-শরীরে’ যাঁরা আসেন তাঁরা তো এটা করতে পারেন-ই না । গুরুমহারাজ বারবার বলতেন – ” ঈশ্বর একটা জিনিসই পারেন না, আর সেটা হলো – তিনি কাউকে ত্যাগ করতে পারেন না ! কারণ ত্যাগ করলে তাকে রাখবেন কোথায় !”
গুরু মহারাজ এবং ন’কাকা উভয়ের ক্ষেত্রেই এই ঘটনা আমি প্রত্যক্ষভাবে ঘটতে দেখেছি ৷ গুরু মহারাজ যাকে গ্রহণ করেছেন – তার ইহকাল-পরকালের ভার তিনি নিয়েছেন ! কতবার তাঁকে সিটিংয়ে বলতে শুনেছি – ” এই যে তোরা দীক্ষা নিলি এতে কি হলো – আমার-ই ভার বাড়ালি !” আমরাই এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখেছি _যারা গুরু মহারাজের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন ঠিকই, পরে তাঁর সাথে বা আশ্রমের সাথে আর কোনোদিন কোনো যোগাযোগই রাখে নি ! এখন প্রশ্ন – তাহলে তাদের কি গতি হবে – তারা কি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই জনঅরণ্যে হারিয়ে যাবে, না – আধ্যাত্মিক জগতে বা আলোর জগতে প্রবেশ করার সুযোগ পাবে ?
হ্যাঁ – তারাও আলোর জগতে প্রবেশের ছাড়পত্র পাবে । গুরু মহারাজ বলেছিলেন – “জাত সাপে কামড়ালে বিষ শরীরে ছড়াবেই ! সদ্গুরু যেন জাত সাপ ! তাঁর কাছে যো – সো করে একবার পৌঁছালেই তিনি দেন ‘ছুবলে’ ! আর ধীরে ধীরে হলেও সেই বিষ শরীরে সংক্রামিত হবেই !” তবে, উনি আরো কিছু কথা বলেছিলেন – ” ট্রেনে করে রাজধানী যাওয়ার পথে কেউ হয়তো ঘুমোতে ঘুমোতে গেল, কেউ জালনার ধারে বসে পথের বিচিত্র দৃশ্য দেখতে দেখতে গেল, আর কাউকে হয়তো অজ্ঞান অবস্থায় বস্তায় ভরে মুখ বেঁধে – সিটের তলায় ভরে নিয়ে যাওয়া হলো ! ব্যাপারটা এই রকম হয় । তাই রাজধানী এক্সপ্রেসে একবার উঠে পড়তে পারলেই হোল। তবে সেখানে উঠে ছোটাছুটি করলেও কিন্তু কেউ আগে পৌঁছাতে পারবে না _রাজধানীতে সবাই একসাথেই পৌঁছাবে” [ক্রমশঃ]