[হাওড়ার দেবকুমারের স্ত্রীর কথা হচ্ছিলো ]
সেদিন ওনার (ওই ভদ্রমহিলার) অন্তরের ভক্তি, বিশ্বাস ও ভালোবাসা দেখে সত্যিই নিজেকে খুবই লজ্জিত লেগেছিল ৷ শুধু মনে হচ্ছিলো এই ভক্তিমতী মহিলাটির এত শারীরিক কষ্ট কেন ভগবান ! উত্তরটাও মনে আসছিল যে, নিশ্চয়ই ওনার এই কষ্ট–অসুবিধা ,পূর্ব-পূর্ব জীবনের কর্মফল ! তবে সেই দিনই আমার মনে যে কথাটা এসেছিল সেইটা বলি | এই বাড়ির সদস্যরা বহুদিন থেকে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশনের(মঠ) সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও (দেবকুমার প্রতি সপ্তাহেই শনি-রবিবার বা অন্যান্য ছুটির দিনগুলিতে বেলুড়মঠে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ বিগত ত্রিশ বছর ধরে করে আসছে ৷ বেলুড় আশ্রমের বহু সিনিয়র মহারাজদের সাথে দেবকুমারের খুবই সুসম্পর্ক রয়েছে । স্থানীয় ছেলে হওয়ায় এবং ছোটবেলা থেকেই বেলুড়মঠে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করার সুবাদে দেবু বেলুড়ের বহু মহারাজের উত্থান-পতনও দেখেছে ! ওখানকার অনেক ভিতরকার খবরও রাখে ওরা !)তবু সেই হেন দেবকুমার ন’কাকার শরনাপন্ন কেন? দেবু যে দিন ন’কাকার কাছে দীক্ষা নেবার বাসনা আমার কাছে প্রথম ব্যক্ত করেছিল, সেইদিন আমার মনে খুবই আনন্দ-তো হয়েছিলই – এই জন্যেই খানিকটা বিস্মিতও হয়েছিলাম !
দেবু-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম – ” তুমি বেলুড়মঠের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখা সত্ত্বেও ওখান থেকে দীক্ষা নিলে না কেন ?”
দেবু বলেছিলো – ” দেখুন, আমার প্রথম থেকেই টার্গেট ছিল – আমার এমন একজন গুরু হবেন, যাঁকে আমি আমার বাড়ি নিয়ে আসতে পারবো, তাঁর কাছে যাবো, তাঁর একটু পদসেবা করবো, একান্তে তাঁর কাছটিতে বসে দুটো কথা শুনবো ৷ কিন্তু কয়েকশ’ লোকের সাথে মাইকে একই মন্ত্রে দীক্ষা নেবার ব্যাপারে আমার প্রথম থেকেই অনীহা ছিল । তারপর গুরুকে দূর থেকে দেখতে হবে, যখন খুশি তাঁর কাছে যাওয়া যাবে না, আমার বিপদে-আপদে-সম্পদে তাঁর দুটো পরামর্শ পাবো না – তাহলে তিনি আমার কি করে পথপ্রদর্শক হবেন ? আমি বহুদিন থেকেই মনে মনে স্থির করে নিয়েছিলাম যে, এই ধরনের গুরুর আমার প্রয়োজন নাই ৷ যদি কখনও তেমন মানুষ পাই, তাহলে তাঁর চরণে নিজেকে সমর্পণ করব ৷”
আমি এই কথায় _গুরু মহারাজের বলা একটি কথার মিল পেলাম| কথাটা হোল_”গুরু করবি শত শত মন্ত্র করি সার, মনের মত মানুষ পেলে তারে দিবি ভার” |
দেবু বা দেবকুমার প্রথম ন’কাকাকে দেখেছিল শ্রীরামপুরে, সুদর্শন মাস্টারমশায়ের বাড়িতে । মাস্টারমশাই দেবুকেও ছোটবেলায় কিছুদিন পড়িয়েছিলেন –ফলে সেই ছোট থেকেই ওনার সাথে আলাপ । সুদর্শন বাবু যখন ন’কাকাকে দেখলেন এবং ন’কাকা সম্বন্ধে কিছু কিছু কথা জানতে পারলেন, তখন উনি ওনাকে যারা ভালোবাসতো – তেমন সকলকেই ন’কাকার খবর দিয়েছিলেন । ফলে ন’কাকা ওনার বাড়িতে গেলে – ওরা সকলেই ন’কাকাকে দেখার জন্য এবং ন’কাকার মুখে দুটো কথা শোনার জন্য আসতো ! সেই আলাপ ! তবে ন’কাকার সাথে দেবুর প্রথম আলাপের অন্ততঃ ৫/৭ বছর পর ওদের দীক্ষার ব্যবস্থা হয়েছিল ।
দেবুর স্ত্রীর যা শরীরের অবস্থা – আমি ভেবেছিলাম ওদের দীক্ষা নিশ্চয়ই সালকিয়ায় ওদের বাড়িতেই হবে । কিন্তু তা হয়নি – ওরা বনগ্রামে এসেছিলো ন’কাকার বাড়িতে এবং সেখানেই দীক্ষা হয়েছিল I
সেদিন আমিও বনগ্রামে উপস্থিত হয়েছিলাম দেবকুমারের আমন্ত্রণে । যদিও আমি জানতাম যে দেবকুমারের মনের অসম্ভব জোর – তবুও যেদিন আমি প্রথম শুনেছিলাম যে ওরা বনগ্রামে দীক্ষা নিতে আসবে, সেদিন আমি ওর স্ত্রীর পক্ষে এতটা জার্নির ধকল বা কষ্টের কথা ভেবে যদি দেবু অন্য ব্যবস্থা করতে পারে, সেটা মনে করিয়ে ছিলাম । কিন্তু দেবকুমার আমাকে বলেছিল যে – ” জীবনে একবার অন্ততঃ দেবমাল্য (দেবুর ছেলে)-র মা গুরুর বাড়িতে অন্নগ্রহণ করুক ! তাই ওর যত কষ্টই হোক না কেন আমি ‘ওকে’ রাজি করিয়েছি – দেখবেন ঠিক নিয়ে চলে যাবো ।”
সত্যিই সত্যিই তাই হয়েছিল, ওরা সকলেই এসেছিল ৷ ‘সকলে’– বলতে দেবু, দেবমাল্য, দেবমাল্যর মা (দেবুর স্ত্রী) এবং সালকিয়ার অন্য একজন ন’কাকার ভক্ত ভূতনাথ । ‘ভূতনাথ’- নামটা ন’কাকার দেওয়া নাম, ওর আসল নাম মনীশ জেটি ! ভূতনাথ আগে বডিবিল্ডার ছিল, ফলে ওর শরীর স্বাস্থ্য খুবই ভালো ।
ওইদিনে বনগ্রামে ন’কাকাদের বাড়ির দেবী মা করুণাময়ীর মন্দিরে পূজা দেবার পর ওদের সকলের দীক্ষা হয়েছিল ৷ দেবমাল্যর মায়ের শরীরের অবস্থা দেখে সেদিন ন’কাকিমাও খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন । প্রথমেই ওনাকে নিচের ঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল । বিকালের দিকে ওরা সকলেই ফিরে গিয়েছিল সালকিয়ায় ৷ পরে দেবকুমার আমাকে ওই ঘটনার উল্লেখ করে বলেছিল – ” জানেন শ্রীধরদা ! ঐদিন দেবমাল্যর মাকে নিয়ে অতোটা জার্নি করে যাওয়াটা সত্যিই একটা অলৌকিক ব্যাপার ছিল ! যে মহিলা ভালো করে উপর-নিচ করতে পারে না, বেশিক্ষণ একভাবে বসে থাকতেও পারে না – সে অতটা রাস্তা একভাবে বসে যাওয়া এবং আসা করলো কি করে ? এটা ভেবেই আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি !” ….. [ক্রমশঃ]