গুরুজীর কাছে শুনেছিলাম_ স্বামী বাউলানন্দের বাঙালি শরীর ছিল। উনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সৈনিক ছিলেন। আজাদ হিন্দ্ বাহিনীর পরাজয়ের সময় অনেক বিপ্লবী-ই সাধু-সন্ত হয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। স্বামী বাউলানন্দও ছিলেন তেমনই একজন।
উনি ব্রিটিশ সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে চলে গিয়েছিলেন দক্ষিণ ভারতের গোদাবরীর তীরে অবস্থিত পাহাড় জঙ্গল ঘেরা পেরেন্টাপল্লীতে!(ক্রমশঃ)
[পূর্ব সংখ্যায় স্বামী বাউলানন্দজী আলোচনা করেছিলেন –সাধারণতঃ মানবীয় ও অমানবীয় শরীরের রক্ত হচ্ছে পুনঃ সৃজন শক্তি এবং যে স্নায়ুর মধ্য দিয়ে এই রক্ত সঞ্চালিত হয় তা হল পুনঃ সৃজন চেতনা। আর পুনঃ সৃজন শক্তির পরিণামগত বৃদ্ধির ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হয় তাকে সৃজন শক্তি বলে। এখন আবার এই প্রসঙ্গেই আলােচনা শুরু হচ্ছে।]
জিজ্ঞাসা :— এই সৃজন শক্তি উৎপন্ন হওয়ার ফলে কি হয় ?
মীমাংসা :– যথেষ্ট পরিণামে বৃদ্ধি পেয়ে এই শক্তি অন্যান্য স্নায়ুগুলিকে কাজ করার ক্ষমতা যােগায় ।
জিজ্ঞাসা :— ঐ স্নায়ুগুলি কি কি?
মীমাংসা :– ওরা হল সৃজন চেতনা।
জিজ্ঞাসা :— এই দুই শক্তির (পুনঃ সৃজন এবং সৃজন শক্তি) পরিমাণগত বৃদ্ধি এবং তার ফলে দুই চেতনার (পুনঃ সৃজন চেতনা এবং সৃজন চেতনা) যে কাজ তা কি মানুষকে কোন বিষয়, কর্ম এবং মানুষ সম্বন্ধে ধারণা অনুযায়ী যথাযথ কাজ করাতে সক্ষম নয় ?
মীমাংসা :– না। তারা মনুষ্য শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে পারে কিন্তু মানুষকে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করাতে পারে না।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে সেটা কি যা মানুষকে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করাতে সক্ষম ?
মীমাংসা :— সূক্ষ্ম শক্তি।
জিজ্ঞাসা :— সূক্ষ্ম শক্তি কি ?
মীমাংসা :– সৃজন শক্তির পরিমাণগত বৃদ্ধির ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হয় তাকে সূক্ষ্ম শক্তি বলে।
জিজ্ঞাসা :– সূক্ষ্ম শক্তির কাজ কি?
মীমাংসা :– এই শক্তি স্নায়ুর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্নায়ুকে কাজ করতে সাহায্য করে ।
জিজ্ঞাসা :— ঐ স্নায়ুগুলি কি কি?
মীমাংসা :– এগুলাে হল সূক্ষ্ম চেতনা। এরা ব্যক্তি সত্তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সজন এবং পুনঃ সৃজন চেতনার সঙ্গে এদের কোন মিল নাই। (সৃজন এবং পুনঃ সৃজন চেতনার সঙ্গে মনুষ্য শরীরের সম্পর্ক আছে)।
জিজ্ঞাসা :– সুতরাং, সূক্ষ্ম শক্তির উৎপত্তি, যথেষ্ট পরিমাণে এই শক্তি প্রাপ্তি এবং এর ফলে সূক্ষ্ম চেতনার ক্রিয়া—এইগুলিই তাে মানুষের নিকট মানববাচিত কাজ করার পক্ষে যথেষ্ট। আমাদের এই সিদ্ধান্ত কি ঠিক ?
মীমাংসা :— না; তােমাদের এই সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। যথেষ্ট পরিমাণে সূক্ষ্ম শক্তি প্রাপ্তি এবং তার ফলে যে সূক্ষ্ম চেতনা মানুষ পায় তাতে সে ধ্বংসাত্মক গতিতে কাজ করে।
জিজ্ঞাসা :– ধ্বংসাত্মক গতিতে কাজ করে– এর অর্থ কি ?
মীমাংসা :— যাদের সূক্ষ্ম চেতনার বৃদ্ধি হয়েছে কিন্তু তা গুণগত অপটু আছে, তারা বিষয়, কর্ম এবং মানুষ (যেগুলির সংস্পর্শে আসে) সম্বন্ধে ঠিক ঠিক ধারণা করতে পারে । ঐকান্তিকতা নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা তাদের থাকে। যে কাজ তারা গ্রহণ করে তা সমাধা করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে এবং তাতে সফল হয়। কিন্তু কাজ এবং সফলতা সম্বন্ধে এদের কোন বিচার বিবেচনা থাকে না। তাদের এই কৃতকার্যতার ফল স্বরূপ যে দুঃখ কষ্ট অন্যরা ভােগ করে তার জন্যে তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র সহানুভূতির উদ্রেক হয় না। কাজ করতে গিয়ে যে বিষয় বা ব্যক্তির উপরে তারা কৃতকার্যতা লাভ করেছে, সেই বিষয় বা ব্যক্তি যদি দুঃখ কষ্ট পায় তাহলে তারা ভাবে তাদের সফলতা সম্পূর্ণ হয়েছে। তা না হলে তারা এই সফলতাকে অসম্পূর্ণ মনে করে। অতএব, তাদের সফলতার অর্থ হল লক্ষ্য প্রাপ্তির সঙ্গে অপরের দুঃখ কষ্ট। সুতরাং ফলপ্রাপ্তি যাই হােক না কেন, অপরের, বিশেষ করে মানুষের দুঃখ কষ্টই হল তাদের লক্ষ্য। এইরূপে যথেষ্ট পরিমাণে সূক্ষ্ম চেতনা পেয়েও যাদের তা গুণগত অপটু আছে, তারা ধ্বংসাত্মক গতিতে কাজ করে, মানবােচিত কাজ করে না।
জিজ্ঞাসা :– এই ধরনের লােককে অন্য ধরনের লােক হতে পৃথক করা কি সম্ভব ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :– কি ভাবে?
মীমাংসা :— স্বাভাবিক ভাবেই।
জিজ্ঞাসা :— স্বাভাবিক ভাবে–এর অর্থ কি ?
মীমাংসা :— এমন লােক আছে যাদেরকে কোন বিষয় (এ পর্যন্ত যা তাদের বােধগম্য হয় নাই) সম্বন্ধে কিছু বললে বেশ বুঝতে পারে। ঠিক ব্যক্তও করে। অপরকে তা শিক্ষাও দেয়। অপরকে তা অনুসরণ করার জন্য বলে। কিন্তু নিজের তা অনুসরণ করে না।
এই ধরনের লােকের মধ্যে কিছু কিছু লােক আছে যাদের এই শিক্ষা অনুসরণ করার ইচ্ছা হয় । কিন্তু তারা তা করে না। কোন বিষয় অবহিত হয়ে এবং তা অনুসরণ করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা পূর্ববৎ আচরণ করে।
জিজ্ঞাসা :– সূক্ষ্ম শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে না থাকার জন্যই কি এরূপ হচ্ছে না?
মীমাংসা :— না, এরকম নয়। যদি এই সূক্ষ্ম শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে তাদের মধ্যে না থাকে, তাহলে তারা শিক্ষা ঠিকমত নিতে পারে না, অপরকে শিক্ষা দিতে এবং তা অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ দিতে পারে না।
অনেকে আছে যাদেরকে কিছু শিক্ষা দিলে বলে, “আমরা বিষয়টা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি। এই বিষয়ের যথার্থতা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমরা এই শিক্ষাকে কার্যকরী করতে অনিচ্ছুক।” এই সমস্ত লােকেরও সূক্ষ্ম চেতনা আছে এবং এই চেতনা যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করে।
আবার অনেকে আছে যারা বলে, “আমরা বিষয়টা বুঝেছি। আমরা এটা অনুসরণ করতে ইচ্ছুক। কিন্তু আমরা অনুসরণ করতে পারি না। কেন এরকম হয় জানিনা।” এরাও এই লােকগুলির পর্যায়ে পড়ে। ওদের সঙ্গে এদের সামান্য প্রভেদ আছে।
জিজ্ঞাসা :– প্রভেদটা কি ?
মীমাংসা :– পরবর্তী লােকগুলি বােধ অনুযায়ী কাজ করতে ইচ্ছুক, কিন্তু তা করতে অক্ষম। পূর্ববর্তী লােকগুলি কেবলমাত্র তাদের বােধ অনুযায়ী কাজ করে না তাই নয়, তারা তা করতেও ইচ্ছুক নয়।
জিজ্ঞাসা :– এই পার্থক্যের কারণ কি?
মীমাংসা :– পরবর্তী লােকগুলির (যারা কাজ করতে চায়, কিন্তু তা করতে অক্ষম) মধ্যে সূক্ষ্মশক্তির গুণগত দক্ষতা বিকাশ হতে শুরু করেছে। পূর্ববর্তী লােকগুলির (যাদের ইচ্ছাই হয় না) মধ্যে কেবলমাত্র সূক্ষ্ম চেতনার গুণগত দক্ষতা অনুপস্থিত তাই নয়, গুণগত দক্ষতার বিকাশ আরম্ভই হয় নাই।
অনেকে আছে যারা বলে, “আপনি যা বলছেন তা আমরা বুঝতে পারছি না। যে সমস্ত জিনিসের অস্তিত্ব আছে তাদের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক, তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি, উৎস এবং মৌলিকসূত্র, তাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য, লক্ষ্য পূরণ প্রভৃতি সম্বন্ধে আমাদের শিক্ষা দেবার দরকার নাই। যথাযথ (মানববাচিত) কাজ করতে গেলে যে মানববাচিত স্বভাব বিকাশের প্রয়ােজন—তার জন্য আমাদের মনােভাব এবং আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ সে বিষয়ে আমাদের নির্দেশ দিন। আমাদের যে জ্ঞান আছে সেই অনুযায়ী আমরা যা করছি তাতে আমরা সন্তুষ্ট নই। শিক্ষা না দিলেও আমরা বেশ বুঝতে পারি যে মানবীয় এবং অমানবীয় কর্মের ধারার মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। আমরা সুনিশ্চিত যে মানববাচিত কাজ করার সম্ভাবনা আমাদের মধ্যে আছে। সুতরাং ‘কেন’, ‘কখন’, ‘কোথা হতে’, বিষয়, কর্ম এবং আমাদের উৎপত্তি—এই সব সম্বন্ধে কিছু না বলে শুধু আমাদেরকে শিক্ষা দিন কেমন করে আমাদের কাজ করা উচিৎ।”
এই ধরনের লােকদের মধ্যে সূক্ষ্ম শক্তির গুণগত দক্ষতা আছে, কিন্তু এই শক্তি পরিমাণে অল্প। এইজন্য কোন নির্দেশ ছাড়াই বিষয়, কর্ম এবং নিজেদের সম্বন্ধে যেটুকু জ্ঞান তাদের আছে সেই জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করতে তারা ইচ্ছুক হয় (যদিও কেন, কখন এবং কোথা হতে বিষয়, কর্ম এবং তাদের উৎপত্তি–প্রভৃতি সম্বন্ধে কোন শিক্ষা দিলে তারা বুঝতে পারে না)।
জিজ্ঞাসা :– শিক্ষা দিলে বুঝতে পারে না অথচ যথাযথ কাজ করার ইচ্ছা আছে—এটা কি সম্ভব ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :– কেমন করে সম্ভব ?
মীমাংসা :— বিষয়, বস্তু এবং নিজেদের সম্বন্ধে যতটুকু জ্ঞান আছে ততটুকু করা সম্ভব। সাধারণতঃ মানুষের মধ্যে এ জ্ঞানটুকু থাকে।
জিজ্ঞাসা :– যতটুকু জ্ঞান আছে ততটুকু—এর অর্থ কি ?
মীমাংসা :— মানুষের মধ্যে এ সাধারণ জ্ঞানটুকু আছে যে তাদের শরীর এমন কিছু দিয়ে গঠিত যা অমানবীয় ব্যক্তি সত্তার নাই। তারা জানে—তাদের এবং অমানবীয় ব্যক্তি সত্তার কাজের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। তারা এও জানে এই পার্থক্য উভয়ের (অর্থাৎ তাদের এবং অমানবীয় সত্তার ) আচার, আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অমানবীয় ব্যক্তি সত্তার এই জ্ঞানটুকু নাই। সাধারণ জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করার ক্ষমতা নিয়ে তাদের শরীর গঠিত হয় নাই।।
জিজ্ঞাসা :– এই সাধারণ জ্ঞান কি সমগ্র মানব জাতির সব সময় থাকে ? নাকি কেবলমাত্র কিছু লােকের মধ্যে থাকে এবং তাও কখন কখন ?
মীমাংসা :—এই সাধারণ জ্ঞান সমগ্র মানব জাতির সব সময় থাকে।
জিজ্ঞাসা :— তাহলে মানুষের এই সব দুঃখ কেন ?
মীমাংসা :– এর কারণ হল সাধারণ জ্ঞান অনুযায়ী মানুষের কাজ করার অক্ষমতা।
জিজ্ঞাসা :– এর কারণ কি?
মীমাংসা :– এর কারণ হল সূক্ষ্ম শক্তির গুণগত অপটুতা, সূক্ষ্ম শক্তি পরিমাণে বেশী থাকুক বা নাই থাকুক। … [ক্রমশঃ]
