এতদিন যত ধর্মীয় গ্রন্থাদি পড়েছেন_এটি সেগুলি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক!
বাউলানন্দের রচনা সবার জন্য নয়_একটু চিন্তাশীল-মননশীল ব্যক্তি ছাড়া এই সুক্ষ সুক্ষ তত্ত্ব বোধ করা সত্যিই কষ্টকর!
কিন্তু একবার ভিতরে ঢুকতে পারলে _বেশ মজা পাওয়া যায়। চেষ্টা করে দেখাই যাক না!!
______________০_______________
স্বামী বাউলানন্দ যখন পেরেন্টাপল্লীতে গিয়েছিলেন, তখন ঐ সমস্ত স্থান অত্যন্ত দুর্গম ছিল। এখন অবশ্য রাজামুন্দ্রি থেকে লঞ্চ চলাচল করে_ কিন্তু ওনাকে গোদাবরীর তীর ধরে হেঁটেই যেতে হয়েছিল এবং হয়তো স্থানীয় আদিবাসীদের সাহায্যে উনি নদী পার হয়েছিলেন পেরেন্টাপল্লীতে স্বামী বাউলানন্দ দীর্ঘদিন সাধনা করেছিলেন! উনি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত ছিলেন। ওই নির্জন অরণ্যে সাধন করে উনি শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপালাভও করেছিলেন। বেশ কয়েকবার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ওনাকে দর্শন দিয়েছিলেন এবং তাঁর জীবনের “কর্ম-সাধন” কি হবে, তা নির্দেশ করে দিয়েছিলেন। (ক্রমশঃ)
[পূর্ব সংখ্যায় স্বামী বাউলানন্দজী আলােচনা করেছিলেন । চিরস্থায়ী মন দুই ভিন্ন অবস্থায় তার অস্তিত্ব হারায় : (১) এককভাবে বিশ্বমনের সঙ্গে লীন হয়। (২) সামগ্রিকভাবে সর্বেসর্বায় লীন হয়। প্রথম ধারায় ব্যক্তি মন বিশ্বমনে লীন হয় কিন্তু জগতের অস্তিত্ব লােপ হয় না। দ্বিতীয় ধারায় ব্যক্তিমন সর্বেসর্বায় লীন হলে জগতের অস্তিত্ব লােপ পায়।]
জিজ্ঞাসা :– ঐ দুই ধারা কি কি ?
মীমাংসা :– জিজ্ঞাসার মাধ্যমে জানতে পারবে।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে ‘নিত্য’ বা ‘চিরন্তন’ সম্বন্ধে কি বলা যাবে ?
মীমাংসা :– ইহা ‘শর্ত সাপেক্ষ’ এবং ‘শর্ত নিরপেক্ষ’ —উভয়ের উর্ধ্বে।
জিজ্ঞাসা :– ব্যক্তি অহং কি দিয়ে গঠিত?
মীমাংসা :– ইহা পঞ্চভৌতিক উপাদান দিয়ে গঠিত।
জিজ্ঞাসা :– প্রথম শরীর ধারণের পর ব্যক্তি সত্তার যে প্রথম প্রবণতা জেগে উঠল তা থেকে ব্যক্তি-অহং-এর উৎপত্তি হল । ইহা পঞ্চ ভৌতিক উপাদান দ্বারা গঠিত। আপাত দৃষ্টিতে ব্যক্তি-অহং এবং ব্যক্তি বিশ্ব-অহং এক। এদের সমন্বয়ে ব্যক্তিমন ব্যক্তি সত্তায় পরিণত হয়। এর ফলে বুঝা যাচ্ছে ব্যক্তি-অহং এবং ব্যক্তি সত্তা একই। কিন্তু এদের নিজ নিজ স্বাতন্ত্র থাকে। আমাদের এই ধারণা কি ঠিক ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ ঠিক ।
জিজ্ঞাসা :– মনুষ্যসহ সমস্ত শ্রেণীর ব্যক্তি সত্তার ব্যক্তি-অহং-এর যে ‘শর্ত’ এবং ‘সম্বন্ধ’ তা কি এক ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, একই।
জিজ্ঞাসা :– কোনরূপ ব্যতিক্রম নাই ?
মীমাংসা :– না। ব্যক্তি অহং-এর উৎপত্তির পূর্বে সত্তার মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য থাকেনা।
জিজ্ঞাসা :– ব্যক্তি অহং-এর পূর্বেও কি সত্তার অস্তিত্ব থাকে ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, থাকে ।
জিজ্ঞাসা :– সমস্ত ব্যক্তি সত্তার মধ্যে একই মুহূর্তে কি সমস্ত ব্যক্তি-অহং-এর উৎপত্তি হয়েছিল ? ব্যক্তি-অহং-এর প্রথম প্রবণতা এবং গঠন কি একই সময়ে হয়েছিল ?
মীমাংসা :– না, একই সময়ে হয় নাই ।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে সত্তাগুলির মধ্যে পার্থক্য কেমন করে ব্যাখ্যা করা যাবে ?
মীমাংসা :– বিশ্ব সত্তার ব্যক্তি সত্তারূপে প্রকাশ একই সময়ে হয়েছিল । সত্তাগুলির মধ্যে কোনরূপ ভিন্নতা ছিল না। তারপর ব্যক্তি সত্তা শরীর ধারণ করতে লাগল । যে সত্তাগুলি প্রথম শরীর ধারণ করল তাদের মধ্যে প্রথম প্রবণতাটি জেগে উঠল । সত্তার মধ্যে ব্যক্তি অহং-এর এই হল সূত্রপাত। প্রথম শরীর ধারণের পর গঠন অনুযায়ী সত্তাগুলির মধ্যে শ্রেণীবিভাগ দেখা দিল। ব্যক্তি অহং সৃষ্টি হওয়ার পর সত্তাগুলির মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিল। এই যে ভিন্নতা তাও গঠন অনুযায়ী হল ।
জিজ্ঞাসা :– প্রথমবারে সমস্ত ব্যক্তি সত্তাই কি একই সময়ে শরীর ধারণ করেছিল ?
মীমাংসা :– না। একই সময়ে নয়। ব্যক্তি সত্তার প্রথম শরীর ধারণের মুহূর্ত থেকে এই পদ্ধতি অবিচ্ছিন্নভাবে বর্তমান সময় পর্যন্ত চলে আসছে।
জিজ্ঞাসা :– এতে প্রমাণিত হচ্ছে যে, এখনও এমন ব্যক্তিসত্তা আছে যারা একবারও শরীর ধারণ করে নাই। আমাদের এই ধারণা কি ঠিক?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, ঠিকই ।
জিজ্ঞাসা :– এই অশরীরি সত্তাগুলি যারা ‘শ্রেণী’ এবং ‘ভিন্নতা’ এই পদবাচ্য নয় তারা কি ঐ পদ্ধতি ( প্রথমবারে শরীর ধারণের পদ্ধতি) সমাপ্ত করে ঐ পদবাচ্য হবে ? না কি ঐ সত্তাগুলির অশরীরী অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটবে ?
মীমাংসা :– না, এর সমাপ্তি ঘটবে না। কারণ সত্তাগুলি ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থান করে, জগতে নয় ।
জিজ্ঞাসা :– ব্রহ্মাণ্ড কি ?
মীমাংসা :– আকাশ।
জিজ্ঞাসা :– জগৎ কি ?
মীমাংসা :– জগৎ হল পৃথিবী এবং পৃথিবীর বস্তু সমূহ।
জিজ্ঞাসা :– আকাশ পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত নয় ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, ইহা যুক্ত। কিন্তু আকাশ বস্তু নয়।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে আকাশ কি ?
মীমাংসা :– আকাশ হল সেই জিনিস যার মধ্যে পৃথিবী এবং পৃথিবীর বস্তুসমূহ রয়েছে। অর্থাৎ যার মধ্যে জগৎ রয়েছে।
জিজ্ঞাসা :– যে ব্যক্তি সত্তাগুলির মধ্যে ব্যক্তি-অহং তাদের স্বাতন্ত্র বজায় রেখে মিশে গিয়েছিল, সেই ব্যক্তি সত্তাগুলি মৃত্যুর পর কোথায় থাকে ?
মীমাংসা :– তারা ব্রহ্মাণ্ডে থাকে। এটা হল ব্যক্তি সত্তার অশরীরী অবস্থায় থাকা।
জিজ্ঞাসা :– যে সমস্ত সত্তা একবারও শরীর ধারণ করে নাই ( ফলে ব্যক্তি-অহং নাই ) এবং যে সমস্ত সত্তা একবার শরীর ধারণ করেছে ( ফলে ব্যক্তি-অহং যুক্ত)–এই উভয় প্রকার সত্তাই কি ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থান করে ? এই অবস্থার মধ্যে তাদের পার্থক্য কোথায় ?
মীমাংসা :– ব্যক্ত করা এবং বুঝার সুবিধার জন্য এখন হতে বরাবর যারা একবারও শরীর ধারণ করে নাই তাদেরকে ‘অশরীরী সত্তা’ এবং অন্যগুলিকে অর্থাৎ যারা একবার শরীর ধারণ করেছিল তাদেরকে ‘দেহমুক্ত সত্তা’ বলা হবে। অশরীরী সত্তাগুলি ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থান করে এবং নিজেদেরকে সমষ্টিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এদের মধ্যে প্রবণতা *থাকে। দেহমুক্ত সত্তাও ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থান করে। নিজেদেরকে ব্যষ্টি থেকে সমষ্টিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে প্রচেষ্টা তাদের দেহমুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গিয়েছিল, সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এদের মধ্যে থাকে।
জিজ্ঞাসা :– অশরীরী সত্তার মধ্যে কোন কোন প্রচেষ্টা ব্যতীতই সমষ্টিতে যাওয়ার প্রবণতা থাকে ?
মীমাংসা :– যেহেতু তারা অশরীরী, তাদের মধ্যে ব্যক্তি-অহং নাই। তাদের মধ্যে কোন চেতনাও নাই। তাদের ব্যক্তি অহং নাই বলে তাদের মধ্যে প্রেরণা দেবার কেউ থাকে না। চেতনা নাই বলে তাদের মধ্যে অনুপ্রাণিত হওয়ার কেউ থাকে না ।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে দেহমুক্ত সত্তা কেমন করে তাদের থেমে যাওয়া প্রচেষ্টাকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয় ?
মীমাংসা :– কারণ, যখন জগতে শরীরী অবস্থায় থাকে তখন ব্যক্তি-অহং নিজ শরীরের পুনঃ সৃজন এবং সৃজন চেতনা হতে শক্তি গ্রাস করে ব্রহ্মাণ্ডে দেহমুক্ত সত্তার কাছে ঐ শক্তি নিয়ে যায়। এই কারণে তাদের অহং, শরীরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে থেমে যাওয়া প্রচেষ্টাকে পুনরায় চালিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়। এটাও সমষ্টিতে নিয়ে যাওয়ার জন্যই ।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে, এ পর্যন্ত অশরীরী সত্তা কোন প্রচেষ্টা চালায় না। আমাদের ধারণা ঠিক ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, ঠিকই। কারণ তাদের কোন প্রচেষ্টা থাকে না। এমনকি তারা *একটা চেষ্টা করার জন্য আগ্রহীও হয় না।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে কতদিন ধরে দেহমুক্ত সত্তা তাদের এই থেমে যাওয়া প্রচেষ্টাকে চালায় ?
মীমাংসা :– যতদিন না তারা পুনরায় শরীর ধারণ করে । পুনরায় শরীর ধারণ না করা পর্যন্ত তারা এই প্রচেষ্টা চালাবে।
জিজ্ঞাসা :– পুনরায় শরীর ধারণ করে তারা কি করবে ?
মীমাংসা :– তারা এই প্রচেষ্টাকেই চালিয়ে যাবে।
জিজ্ঞাসা :– পুনরায় শরীর ধারণের জন্য কতদিন তাদেরকে ঐ অবস্থায় থাকতে হবে ?
মীমাংসা :– শরীরের মৃত্যু হতে পুনরায় জন্ম –ব্যক্তি সত্তার দেহমুক্তি হতে পুনরায় শরীর ধারণ—এই সময়টুকু তারা জগতে অবস্থান করে।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে একবার শরীর ধারণ করে এবং তারপর দেহমুক্ত হয়ে সমস্ত সত্তাকে অশরীরী অবস্থায় ব্রহ্মাণ্ডে থাকতে হয়। এইসঙ্গে দেহমুক্তির ফলে যে প্রচেষ্টা এতদিন বন্ধ ছিল তা চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। আমাদের ধারণা ঠিক ?
মীমাংসা :– এ বিষয়ে পরে পুনরায় আলোচনা করা হবে ৷
জিজ্ঞাসা :– দেহমুক্ত সত্তার শরীর কি ভাবে গঠিত হয় ?
মীমাংসা :– প্রথম শরীর ধারণেই তাদের মধ্যে ব্যক্তি-অহং -এর উদ্ভব হয়। প্রথম শরীর ধারণের পর যে প্রচেষ্টার ছেদ পড়েছিল সেই প্রচেষ্টাকে চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এই অহং-এর মধ্যে থাকে। অহং-এর মধ্যে পুনঃ সৃজন শক্তি এবং সৃজন শক্তি থাকে । ঐ শক্তিগুলি ক্রিয়াশীল। ক্রিয়াশীল হওয়ায় শক্তিগুলি অহং-এর প্রবণতার দ্বারা উত্তেজিত হয়ে সব অবস্থাতেই কাজ করার জন্য সংগ্রাম করে । আবার সত্তাগুলির সমষ্টিতে যাওয়ার প্রবণতা থকে। সত্তাগুলির এই সংগ্রাম অহং -এর মধ্যে সংগ্রাম-প্রবণতা জাগিয়ে তােলে। শক্তিগুলির সংগ্রাম অহং-এর সংগ্রাম হওয়ায় তাদের (অহং*) প্রচেষ্টার ফলাফল সবসময় অনুভব করার আগ্রহ অহং-এর মধ্যে জেগে উঠে। শরীর অবস্থায় তারা যেমন উপলব্ধি করেছিল, এই আগ্রহ তাদের ঐ অবস্থার অনুরূপ। ক্রিয়ার জন্য পুনঃ সৃজন এবং সৃজন শক্তি নিজ নিজ চেতনা পায়। অহং-এর প্রবণতা অনুযায়ী আগ্রহের পরিতৃপ্তির জন্য ব্যক্তি সত্তা নিজ শরীর পায়। অহং-এর প্রবণতা এবং পুনঃ সৃজন এবং সৃজন শক্তির দ্বারা প্রবৃত্ত হয়ে এবং সত্তার প্রবণতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ব্যক্তির উপযুক্ত শরীর গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান গঠিত হয়।
এইভাবে ব্যক্তির পুনরায় শরীর ধারণের ক্ষেত্রে শরীর গঠনের জন্য যে উপাদান দরকার তা গঠিত হয়। শরীর গঠনের জন্য প্রয়ােজনীয় উপাদান নিয়ে ব্যক্তি সত্তা মায়ের গর্ভে পুনরায় জন্ম নেয় । মায়ের গর্ভে উপাদানগুলি শরীরে রূপ নেয়। মা যে খাবার খায় সেই খাবার হতে উৎপন্ন পুনঃ সৃজন শক্তি (রক্ত) নূতন শরীরের চেতনাগুলি শােষণ করে। মায়ের গর্ভে থাকাকালীন নূতন শরীর যে শক্তি গ্রহণ করে তা নতুন শরীরের পুনঃ সৃজন চেতনায় অন্তর্নিহিত শক্তি (পুনঃ সৃজন শক্তি )-র সঙ্গে যুক্তহয় । এইরূপে পুনঃ সৃজন শক্তি এবং চেতনা নূতন শরীরে বেড়ে উঠে। এরফলে শরীরেরও বৃদ্ধি ঘটে ।
জিজ্ঞাসা :– এই সম্ভাবনা কেবলমাত্র দেহমুক্ত ব্যক্তিতেই বর্তমান (অর্থাৎ যে সমস্ত ব্যক্তি সত্তা একবার শরীর ধারণ করেছে এবং দেহমুক্ত হয়েছে)। আমাদের এই ধারণা ঠিক ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, ঠিক। … [ক্রমশঃ]
