স্বামী বাউলানন্দজীর সাথে গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের সাক্ষাৎ হ‌ওয়াটা _একটা চমকপ্রদ ঘটনা! গুরুজীর সাথে যেদিন ওনার প্রথম সাক্ষাৎ হয়_সেইদিন‌ই উনি শরীর চেয়েছিলেন! তাও এই সাক্ষাৎ হয়েছিল গুরুমহারাজের দ্বিতীয় শরীরের! কারণ গুরু মহারাজ তখন (রাত্রিতে) রায়নার শ্মশানে বসেছিলেন! ওনার স্থুলশরীরটা ওখানেই ছিল অথচ আর একটা শরীরকে(সূক্ষ্ম শরীর!) স্বামী বাউলানন্দ রায়নার শ্মশান থেকে আকাশমার্গ অবলম্বন করে সরাসরি পেরেন্টাপল্লীতে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।(ক্রমশঃ)
_______________০________________
প্রশ্ন :—এর আগে ( এই আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসার পূর্বে ) আমরা চিন্তা নায়কদের কাছে শুনে বা তাঁদের লেখা পড়ে বুঝেছি যে জগতের অগ্রগতি চলে আসছে, মানবের উত্তরােত্তর অগ্রগতি হচ্ছে এবং অগ্রগতির যে ধাপে আমরা এসে পৌঁছেছি তা হল মানবের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ধাপ। কিন্তু আপনি বললেন–সামান্য পরিবতন ছাড়া বর্তমান ধাপে ( সপ্তম ধাপে ) মানবীয় এবং অমনিবীয় সত্তার কার্যকলাপ এবং আচরণের দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোন পার্থক্য নাই। সুতরাং এ সম্পর্কে আমরা আরও বিস্তারিত জানতে চাই। এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করা যাবে ?
উত্তর :– শুরু করা হােক।
প্রশ্ন :– এ বিষয়ে সাধারণতঃ কটা ধাপ আছে ?
উত্তর—সাধারণতঃ পাঁচটা ধাপ ।
প্রশ্ন :—কি কি ?
উত্তর :—বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, জগতের সূচনা, মানবের সূচনা, মানব ইতিহাসের সূচনা এবং ইতিহাস।
প্রশ্ন :—পারস্পরিক সম্বন্ধবিশিষ্ট ধাপ কতগুলি ?
উত্তর :—ওদেরও সংখ্যা পাঁচ।
প্রশ্ন :—সেগুলো কি কি ?
উত্তর :—বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড কি, জগতের সূচনা কি, মানবের সূচনা কি, মানব-ইতিহাসের সূচনা কি এবং ইতিহাস কি ?
বিশ্ব (আকাশ) সব সময় রয়েছে। এতে পঞ্চভূত, পাঞ্চভৌতিক উপাদান, বস্তু, বস্তুর সূক্ষ্ম তত্ত্ব (মূলতত্ত্ব), প্রেম, জ্ঞান, শক্তি, ঐ সমস্তের চেতনা এবং আত্মচেতনা রয়েছে।
প্রলয়ের সময়ে পৃথিবী জলে দ্রবীভূত হয়ে গিয়েছিল। এই অবস্থায় পৃথিবী বহু কাল থাকল। যখন প্লাবন অপসারিত হতে লাগল তখন পৃথিবীর আবার গঠন আরম্ভ হল। প্লাবন অপসারণের আরম্ভ থেকে বহুকাল পরে পুনর্গঠিত পৃথিবীর উপরিভাগ জলের উপরে জেগে উঠল। এই হল জগতের সূচনা।
পৃথিবীর উপরিভাগ জেগে ওঠার বহুকাল পরে মানবের সূচনা। প্রথম ও দ্বিতীয় মানব সত্তার ( আদি পিতামাতার ) এই প্রথম বাসস্থান।
আদি পিতামাতার বংশধরেরা বহু কাল ধরে আদিম অবস্থায় ছিল। তারপর ঐ সমস্ত লােকের আদিমতার অবসান হল। অতঃপর এই অবরােহ ধাপে ধাপে বর্তমান অবস্থায় (সপ্তম ধাপে ) এসে পৌঁছেছে।
প্রয়ােজনের অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ এবং অবিবেচক ভাবে বংশবৃদ্ধি করা ঐ সমস্ত লােকের স্বভাবে.দাঁড়াল। এই অতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহের ফলে তাদের মধ্যে কেউ কেউ খাদ্যদ্রব্য থেকে বঞ্চিত হল। এই বঞ্চনার ফলে কিছু লােক অপরের সংগৃহীত খাদ্যদ্রব্য ছিনিয়ে নিতে লাগল। এই সংগৃহীত খাদ্য সংরক্ষণের জন্য লােকের সতর্ক হওয়ার প্রয়ােজন দেখা দিল। খাদ্য দ্রব্য সংরক্ষণের জন্য সতর্ক হওয়ার ফলে কিছু লোক মিথ্যার আশ্রয় নিতে প্রবৃত্ত হল। এ থেকে শুরু হল অপহরণ । দ্রব্য অপহরণ স্ত্রী অপহরণ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাল । সপ্তম ধাপের প্রারম্ভে মানুষের এরূপ অবস্থা, আচরণ এবং কার্যাবলী ছিল। এই সময়ে আকৃতি ছাড়া মানবীয় এবং অমানবীয় জাতির কার্যকলাপ এবং আচরণের দিক থেকে কোন পার্থক্য ছিল না।সামান্য পরিবর্তন ছাড়া বর্তমানে একই অবস্থা চলছে। এমন কি অমানবিকতা সংশােধনের কোন লক্ষ্য মানবের নাই।
যদি তােমার এরকম ধারণা হয় যে লোকের অগ্রগতি হচ্ছে, বর্তমানে তারা উৎকর্ষতার চরম শিখরে পৌঁছেছে, এবং এই বর্তমান অবস্থাতেই ( সপ্তম ধাপে) তার প্রথম উৎকর্ষতার চরমে পৌঁছেছে, তাহলে বুঝা যাবে এরূপ ধারণা করার একটা যুক্তি আছে; কিন্তু তোমার এই যুক্তি জোরালাে নয় । সুতরাং তােমার ধারণা ভুল।
অপরপক্ষে আদি পিতামাতার আবির্ভাবের সময় থেকে মানবের সুচনা–যদি এরূপ ধারণা হয় তাহলে তােমার ঐ যুক্তিও থাকছে না। কারণ সেই সময় হতে অবরােহ ক্রমাগত চলে আসছিল।
যে কোনভাবেই হােক, মানবের অবস্থা সম্বন্ধে তােমার ধারণা ভুল।
প্রশ্ন :– শেষ ধাপের (সপ্তম ধাপের) প্রথম থেকে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত মানবের অবস্থা, আচরণ এবং কার্যকলাপের সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনটা কি অগ্রগতি নয় ?
উত্তর :– না। এটা মানবের একই অবস্থা এবং একই ধরনের কার্যকলাপের পরিবর্তিত ধারাবাহিকতা মাত্র। এই পরিবর্তিত ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে যদি ‘অগ্রগতি’ কথাটি প্রয়ােগ করতে হয় তাহলে বাহ্যিক অগ্রগতি ( মানবের অমানবিক অগ্রগতি) এবং উর্ধ্ব অগ্রগতি ( মানবের মানবোচিত অগ্রগতি) এর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে। সুতরাং মানবের বর্তমান অবস্থা, কার্যকলাপের ধরন যদি উৎকর্ষতা বা উচ্চমানের অগ্রগতি হয়ে থাকে, তাহলে তােমাকে তােমার ধারণা পাল্টাতে হবে এবং এই উৎকর্ষতাকে বাহ্যিক অগ্রগতি বলে মেনে নিতে হবে ( যা মানবের অমানববাচিত অগ্রগতি )।
প্রশ্ন :– বাহ্যিক অগ্রগতি কি ? মানবের অমানবীয় অগ্রগতি কথার অর্থই বা কি ?
উত্তর :– কোন ব্যক্তির সঙ্গে আচরণ করতে গিয়ে কিংবা বিষয়বস্তু নিয়ে আলােচনা করতে গিয়ে ঐ ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়ের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য যদি চিন্তা, ভাবনা, ক্রিয়া করা হয় বা বলা হয় তাহলে তা স্বার্থযুক্ত হয়ে পড়ে ।
মানবীয় এবং অমানবীয় উভয় জাতিই বর্তমান রয়েছে এবং উভয় জাতিই স্বার্থপরের ন্যায় কাজ করছে।
সমস্ত ধরনের অমানবীয় সত্তা সংসার পেতে সন্তান লালন-পালন করছে, সংসার রক্ষা করছে, বাসস্থানের ব্যবস্থা করছে, খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করছে, একে অপরের সঙ্গে আদান-প্রদান চালাচ্ছে, দল গঠন করছে, বিরােধ সৃষ্টি করছে, যুদ্ধ করছে এবং যুদ্ধে জয়লাভ করছে, পিছপা হচ্ছে। গভীরভাবে চিন্তা করে এবং পরিকল্পনা করে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিপুণভাবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে তারা যথাসাধ্য এগুলি করেছে। কিন্তু একে অপরের ক্ষতি করে যথেষ্ট পরিমাণে সুযােগ-সুবিধা ভােগ করছে।
মানবীয় সত্তাও অপর ব্যক্তি, অন্য বস্তু বা বিষয়ের ক্ষতি করে কাজ করে চলেছে এবং তা করছে স্বার্থপরের ন্যায়ই। বতমানের সমস্ত কার্যকলাপ এবং অগ্রগতি-~-সবই হচ্ছে অপরের ক্ষতি করে।
স্বার্থপর হওয়াটা অমানবীয় সত্তার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। তাদের শরীরের গঠনের দিক থেকে ইহা সঙ্গতিপূর্ণ । কিন্তু মানবীয় সত্তার ক্ষেত্রে স্বার্থপরতা অস্বাভাবিক । তাদের শরীরের গঠনের দিক থেকে এই স্বার্থপরতা অসঙ্গতিপূর্ণ। স্বাভাবিক গতিতে মানবিক সত্তায় উন্নীত হওয়ার জন্য স্বার্থপরতা অমানবীয় সত্তার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। কিন্তু উৎস এবং অধিষ্ঠানের সঙ্গে তারা (মানব) যে নিত্য অভিন্ন এই সত্য উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে স্বার্থপরতা মানবের মধ্যে বিরাট অন্তরায়। এই হিসাবে তােমার ধারণা ভুল। সেজন্য তােমার ধারণা সংশােধনের প্রয়ােজন।
প্রশ্ন :– এই স্বার্থপরতা অস্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও মানবের মধ্যে কেমন করে থাকল ?
উত্তর :– শারীরিক সুযােগ-সুবিধার যথাযথ ব্যবহার না করার জন্যই স্বার্থপরতা মানবের মধ্যে
রয়ে গেল।
প্রশ্ন :— অমানবিক সত্তার মধ্যেই বা কে স্বার্থপরতা নিয়ে এল ?
উত্তর :— তারা নিজেরাই।
প্রশ্ন :– কেমন করে ?
উত্তর :– শারীরিক সুযােগ সুবিধার যথাযােগ্য ব্যবহার করে।
প্রশ্ন :– তাহলে অশরীরি সত্তা শরীর ধারণ করে স্বার্থপরভাবে কাজ করে মানব সত্তায় পরিণত হচ্ছে। এই সত্তাগুলি মানব শরীর ধারণ করেও স্বার্থপরভাবে কাজ করছে ( যা এই অবস্থায় তাদের ক্ষেত্রে সঙ্গত নয়। কারণ এখন তারা মানব শরীর পেয়েছে । ) এই ধরনের অগ্রগতিতে তারা যে তাদের অধিষ্ঠানের সঙ্গে নিত্য অভিন্ন তা বুঝতে পারে না। আমাদের এই ধারণা কি ঠিক ?
উত্তর :– হ্যাঁ, ঠিকই। … [ক্রমশঃ]