স্বামী বাউলানন্দজীর সাথে গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ প্রথম সাক্ষাতের কথা হচ্ছিল। গুরু মহারাজ বলেছিলেন_ “আমি তখন রায়নায় রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন-এর কাজে একটা ক্যাম্পে থাকতাম! সারাদিনের কাজের শেষে, ক্যাম্পের ছেলেদের পরের দিনের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে, প্রায় প্রতিদিনই আমি রাত্রে শ্মশানে চলে যেতাম! ওখানেই আমার রাতের পর রাত কেটে যেত! রায়নার জগাদা,হারু,মিহির__ এরা অনেক সময় আমার সাথে থেকেছে, ফলে ওদেরও সেই সময় অনেক রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে।
সে যাই হোক, সেদিনও একা একা শ্মশানে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছি _হঠাৎ আমার মনে হোল একটা আলোর জ্যোতি যেন আকাশ থেকে নেমে আসছে! সেই অদ্ভুত আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম, আলোর বলয়টি আমার সামনে এসে স্থির হয়ে গেল এবং তা অদৃশ্য হতেই _সেখান থেকে জ্যোতির্ময় ঋষিসদৃশ একজন মহাত্মা প্রকটিত হলেন! তিনি একটুও দেরী না করে আমার হাতটা ধরে বললেন _”চলো আমার সাথে!”
আমি __”কাউকে কিছু বলিনি”, “কোথায় যাব”, “কেন নিয়ে যাচ্ছেন”_ ইত্যাদি অজুহাত দেওয়ার চেষ্টা করলাম! তখন তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন_ “সময় খুব সংক্ষিপ্ত, একদম দেরি করা যাবে না”। এক্ষুনি যেতে হবে আমার সাথে!”_ এই বলে তিনি আমার হাতটা ধরে আমাকে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যেতে লাগলেন! হাওয়ায় ওনার বড় বড় চুল এবং দাড়ি উড়ছিল! আমার মাথাতেও তখন বড় বড় চুল ছিল, আমি খেয়াল করলাম_ আমার পড়নের কাপড়-চোপড় এবং মাথার চুলগুলো পতপত্ করে উড়ছে__ অর্থাৎ আমরা যে খুব গতিশীল ছিলাম সেটা বুঝতে পারছিলাম।” (ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~~~~~~~
*** আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~
<< স্বামী বাউলানন্দ >>
প্রশ্ন :– এই সূত্রে অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে আপনার কি বক্তব্য ? – যেমন বাঁচার জন্য সংগ্রাম, যােগ্যতমের বেঁচে থাকা ইত্যাদি। মানবের অস্তিত্বের প্রথমেই আসে বেঁচে থাকা বা টিকে থাকার কথা। মানবের সমস্ত কার্যকলাপ, রীতিনীতির লক্ষ্য হল বেঁচে থাকা। এই পরিস্থিতিতে কোন কাজটা ন্যায় এবং কোন কাজটা অন্যায় তা বিচার করা কি মানবের পক্ষে সম্ভব ?
উত্তর :– হ্যাঁ, সম্ভব।
প্রশ্ন :– কেমন করে ?
উত্তর :– ‘যােগ্যতমের বাঁচা’র অর্থ হচ্ছে–শরীর পেয়ে ব্যক্তিসত্তার বেঁচে থাকা। এর অর্থ ব্যক্তি সত্তার অস্তিত্ব পাওয়া বা বেঁচে থাকা নয়। কারণ শরীর ছাড়াও তাদের অস্তিত্ব থাকে। মানব হয়ে জন্ম নেওয়ার পর ‘বাঁচার জন্য সংগ্রাম’ এবং ‘বাঁচার যােগ্যতা’ সম্বন্ধে কোন প্রশ্নই থাকে না। অমানবীয় সত্তার বেঁচে থাকা এবং সংগ্রামের চূড়ান্ত ফল হল মানব-এর অভিব্যক্তি। এখান থেকে বরাবর আলােচ্য বিষয় হবে অগ্রগতি সম্বন্ধে–ঊর্ধ্ব অগ্রগতি ( upward progress ), যথাযথ অগ্রগতি, মানববাচিত অগ্রগতি এবং মানবের লক্ষ্য পূরণ ।
যেহেতু বর্তমানের মানব পূর্বে ছিল অমানবীয় সত্তা যেহেতু ‘মানবের লক্ষ্য পূরণ’-এর অর্থই হল অমানবীয় সত্তা সহ সমস্ত সত্তার ( এমন কি অশরীরি সত্তারও ) লক্ষ্য পূরণ । এটাই হল সমষ্টির প্রয়ােজন ও চাহিদা এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের লক্ষ্য। সুতরাং মানব শরীর ধারণ করে অবস্থান করার আগে পর্যন্ত যতদিন ব্যক্তিসত্তা অমানবীয় শরীর ধারণ করে অবস্থান করে ততদিন ‘বাঁচার জন্য সংগ্রাম’ এবং ‘যােগ্যতমের বেঁচে থাকা’—এই দুটি কথা তাদের ক্ষেত্রে প্রযােজ্য। তারপর নয়।
প্রশ্ন :– ঐ পদ্ধতিটা কি ?
উত্তর :– আধ্যাত্মিক পদ্ধতি।
প্রশ্ন :– তাহলে দেখা যাচ্ছে ‘বাঁচার জন্য সংগ্রাম’ এবং ‘যােগ্যতমের বেঁচে থাকা’– কথা দুটি একমাত্র অমানবীয় জাতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ দুটি কাজ চলছে এবং ফল স্বরূপ অমানবীয় সত্তা মানব সত্তায় পরিণত হচ্ছে। এটাই হল অমানবীয় জাতির অস্তিত্বের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। মানব জাতির অস্তিত্বের লক্ষ্য হল যথাযথভাবে কাজ করে উর্ধ্বগতি লাভ।—এই কাজ ঠিকমত চলছে না। আমাদের ধারণা কি ঠিক?
উত্তর :– হ্যাঁ, ঠিক তাই।
প্রশ্ন :– অমানবীয় সত্তার কাজের কি দুটো দিক (ন্যায় এবং অন্যায় ) নাই ?
উত্তর :– না, তাদের ক্ষেত্রে দুটো দিক নাই। কারণ, ( কর্ম সম্বন্ধে ) ন্যায় এবং অন্যায় বিচারযুক্ত চেতনা দিয়ে তাদের শরীর গঠিত নয়। মানব সত্তায় পরিণত হওয়ার আগে পর্যন্ত তাদের ক্রমাগত উর্ধ্ব প্রগতি হয়। মানব সত্তায় উন্নীত হওয়ার পর যদি তারা যথাযথভাবে কর্ম না করে তাহলে তাদের আর অগ্রগতি হয় না। কারণ ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার মত প্রয়োজনীয় চেতনা মানব সত্তার থাকে। কর্মের ক্ষেত্রে কোনটা ন্যায় এবং কোনটা অন্যায় তা তারা বিচার করতে পারে। সুতরাং মানবের ক্ষেত্রেই দু ধরনের অগ্রগতি ( উর্ধ্ব এবং বাহ্যিক ) আছে, অমানবের ক্ষেত্রে নয়। অমানবীয় সত্তা শুধু বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে অর্থাৎ ‘যােগ্যতমের বাঁচা’র নীতি তাদের জন্যই।
প্রশ্ন :– মৃত্যুর আগে পর্যন্ত যে সমস্ত মানব সত্তার উর্ধ্ব অগ্রগতি লাভ হয় নাই মৃত্যুর পর তাদের কি হয় ?
উত্তর :– তারা মানব সত্তাই থাকে এবং আকাশে অবস্থান করে। এই অবস্থায় তাদের শরীর থাকে না এবং শারীরিক কোন চেতনাও (সৃজন এবং পুনঃ সৃজন) থাকে না। অন্য যে সমস্ত চেতনা উর্ধ্ব প্রগতির মাধ্যমে তাদেরকে সমষ্টিতে পরিণত করতে সক্ষম সেই সমস্ত চেতনার সঙ্গে তারা অবস্থান করে। এই অবস্থায় তারা নিজ নিজ ব্যক্তি অহং নিয়ে অবস্থান করে। শরীর ধারণের পর ব্যক্তি সত্তার সৃজন শক্তি এবং পুনঃ সৃজন শক্তি থাকে।
প্রশ্ন :– এই অবস্থায় তারা সেখানে কি করে ?
উত্তর :– তারা তীব্রভাবে তাদের প্রচেষ্টা চালাবার জন্য প্রবৃত্ত হয়। মৃত্যুর পর তাদের এই প্রচেষ্টার ছেদ পড়েছিল।
প্রশ্ন :– এই অবস্থায় তাদের কি হয় ?
উত্তর :– ছেদ পড়া প্রচেষ্টাকে পুনরায় চালু করার প্রবণতা থাকায়, তাদের মানব শরীর গঠিত হয় ।
প্রশ্ন :– ঐ মানবীয় সত্তা কি অমানবীয় সত্তারূপে জন্মগ্রহণ করে না?
উত্তর :– না, কোন পরিস্থিতিতেই তারা ঐরূপ করতে পারে না।
প্রশ্ন :– আমরা পড়েছি বা শুনেছি যে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে মানবীয় সত্তা অমানবীয় সত্তার শরীর ধারণ করে। কিন্তু এখানে দেখছি এরূপ হয় না। এর কারণ কি ?
উত্তর :– অশরীরী সত্তা অমানবীয় সত্তায় পরিণত হয়। তখন তারা সৃজন এবং পুনঃ সৃজন চেতনাযুক্ত হয় । অমানবীয় সত্তায় ব্যক্তি অহং সৃষ্টি হয়। এই ‘অহং’ তার স্বাতন্ত্র না হারিয়েই সত্তার সঙ্গে মিশে যায়। উদ্ভিদ পর্যায়ের অমানবীয় সত্তা কেবলমাত্র সুখী হওয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষা করতে পারে। পুনঃ পুনঃ মৃত্যু এবং একই পর্যায়ের অমানবীয় সত্তার শরীর ধারণ করে স্বাভাবিকভাবে তারা নিম্ন মানের শক্তি (minor energy ) পায়। এরফলে তাদের নিম্ন চেতনা ( minor sense )-র বিকাশ হয়। মৃত্যুর পরে যাদের সংস্পর্শে তাদের নিম্ন চেতনা উন্নত হয়েছিল তাদের সঙ্গে সহবস্থান করতে করতে তারা নিম্ন পর্যায়ের অমানবীয় শরীর ধারণ করে থাকে। এই অবস্থায় তারা সুখ এবং সেইসঙ্গে নিরাপত্তাও আকাঙ্ক্ষা করতে পারে। এর ফলে তারা এক স্থান হতে অন্য স্থানে গমনাগমন করতে পারে। এর পূর্বের অবস্থায় অর্থাৎ তারা যখন উদ্ভিদ পর্যায়ে ছিল তখন এই গমনাগমন তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ, নিরাপত্তার জন্য আকাঙ্খা করার মত প্রয়োজনীয় চেতনা ( minor senses )-র বিকাশ তাদের মধ্যে হয় নাই। পুনঃ পুনঃ জন্ম এবং মৃত্যুর পর নিম্ন পর্যায়ের অমানবীয় সত্তাগুলি স্বাভাবিক ভাবে উচ্চমানের শক্তি ( major energy ) পেয়ে থাকে। এরফলে তাদের মধ্যে উচ্চ চেতনা ( major sense )-র বিকাশ হয়। এইভাবে মৃত্যুর পর তারা উচ্চ পর্যায়ের অমানবীয় সত্তার শরীর পায়। উচ্চ চেতনার বিকাশ হওয়ায় এই অবস্থায় তার সুখ এবং নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা করতে পারে এবং সেইসঙ্গে তার পূর্বের অবস্থার চেয়ে আরও বেশী সুখ এবং নিরাপত্তার জন্য চেষ্টা করে।
এই অবস্থাতেই উচ্চ পর্যায়ের অমানবীয় সত্তারূপে পুনঃ পুনঃ জন্মমৃত্যুর পর তার স্বাভাবিকভাবে উচ্চতর শক্তি (higher energy) পায় এবং তাদের মধ্যে উচ্চতর চেতনা ( higher sense )-র বিকাশ হয়। উচ্চতর চেতনার বিকাশ হওয়ায় তারা মানবসত্তা পাওয়ার যােগ্যতা অর্জন করে। উচ্চতর চেতনা পাওয়ার পর যখন তাদের শরীরের মৃত্যু ঘটে তখন নিম্ন এবং উচ্চ চেতনা, উচ্চতর চেতনার সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। এই উচ্চতর চেতনা (higher sense)ই অতঃপর ঐ ব্যক্তিসত্তার কাণ্ডজ্ঞানে রূপান্তরিত হয়। এইরূপে নিম্ন এবং উচ্চ চেতনা তাদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে। ঐ সত্তা যখন এই সূক্ষ্ম অবস্থায় থাকে তখন কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী কাজ করার জন্য প্রবৃত্ত হয়। ব্যক্তিসত্তার কাণ্ডজ্ঞান উন্নত মানবীয় চেতনা, পূর্ণ হওয়ায় এবং কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী কর্ম করার প্রবণতা থাকায় মানবীয় সত্তা সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর, সূক্ষ্মতম এবং অতি সূক্ষ্ম শক্তি পায় এবং তাদের মধ্যে এই সমস্ত শক্তির স্ব স্ব চতনার উন্মেষ হয়। এই চেতনা গুলি তাদেরকে প্রবণতা অনুযায়ী কর্ম করতে সক্ষম। করে তোলে। এই ভাবে অতি সূক্ষ্ম অবস্থায় তারা মানব সত্তায় পরিণত হয়। এই অবস্থায় তারা সুখী এবং নিরাপদ হওয়ার জন্য নিজেদের অগ্রগতির জন্য সচেষ্ট হয়। এই অবস্থায় ওগুলি অতি সূক্ষ্ম থেকে আধ্যাত্মিক চেতনাযুক্ত হয় এবং ঐ চেতনাগুলি স্ব স্ব অহংযুক্ত হয়। এইগুলি নিয়ে তারা মানব শরীর ধারণ করে অবস্থান করে। … [ক্রমশঃ]