গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের সাথে স্বামী বাউলানন্দজীর সাক্ষাৎ-এর কথা এখানে বলা হচ্ছিল। প্রথম দিনের সাক্ষাতেই বাউলানন্দজী ভারতীয় ঋষি পরম্পরার সমস্ত শিক্ষা গুরু মহারাজের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলেন। যে শিক্ষা সারাজীবন ধরে গুরু মহারাজকে _যে কোন জিজ্ঞাসার উত্তর জুগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।
গুরু মহারাজ সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন_”আমার শরীরে যখন হুঁশ ফিরে এল তখন দেখলাম ঐ বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বিছানায় টানটান করে শুয়ে রয়েছেন এদিকে তখন পূর্ব দিগন্তে লালিমা দেখা দিয়েছে এবং ভোরের পাখিরা কিচিরমিচির করতে শুরু করে দিয়েছে। আমি পুনরায় ওনাকে গুরুজ্ঞানে প্রনাম করতেই উনি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ মুদ্রা হাত রাখলেন।
আবার আমার শরীরটায় একটা আবেশ সৃষ্টি হোল এবং আমার চেতনা হু হু করে ঊর্ধমুখী হয়ে গেল ফলে বাহ্যজ্ঞান থাকলো না। এরপর যখন আবার আমার শরীরে চেতনা এল_তখন দেখলাম আমি রায়নার শ্মশানে বসে আছি_সকালের আলো বেশ ভালোই ফুটে গেছে! আমি তাড়াতাড়ি করে ক্যাম্পে ফিরে গেলাম এবং রুরাল ইলেকট্রিফিকেশনের যে কাজ ওখানে চলছিল_সেই কাজে চলে গেলাম। কিন্তু যেখানেই যাই আর যা-ই করি না কেন_আমার মাথাটা সারাদিনই একটা ভারী মতো বোধ হচ্ছিল এবং শরীরে ও মনে একটা অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি বিরাজ করছিল।(ক্রমশঃ)
____________০________০_________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< *স্বামী বাউলানন্দ* >>
জিজ্ঞাসা :—সংযােগ ও সম্পর্কের মাধ্যমে ঠিক কিভাবে পরিবর্তন সাধিত হয় ? এবং প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ সংযােগ ও সম্পর্কের রূপরেখা কী ?
উত্তর :– সংযােগ মানে স্পর্শ । আলােচ্য বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই স্পর্শ মানে একজন দেবেন, অন্যজন গ্রহণ করবেন। যাঁরা কাণ্ডজ্ঞানের অনুকূল নন এবং যাদের সৃজনশীল শক্তির বিকাশ নেই , তারা এই স্পর্শের দ্বারা শক্তিপ্রাপ্ত হন। যাঁদের সৃজনশীল শক্তি ক্রিয়াশীল এবং যাঁরা কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেকের অনুকূলে নিজেদের চালিত করেন, তারা স্পর্শ দ্বারা এই শক্তি প্রদান করার অধিকারী।
উভয় ব্যক্তিরই উদ্দেশ্য প্রগতি, আনন্দ ও নিরাপত্তা, কিন্তু তাদের উপায় বা পন্থা ভিন্ন। একজনের মধ্যে থেকে বিক্ষিপ্ত শক্তি নির্গত হবে ও অপরজনের মধ্যে থেকে সাম্যের শক্তি প্রবাহিত হবে। শক্তি মানেই ক্রিয়াশীলতা ও গতি। স্পর্শ বা সংযােগের দ্বারা অপরের ওপর নিজ ভাবধারা কাজ করতে আরম্ভ করবে। সুতরাং শক্তি প্রবাহের কাজই হল রূপান্তর । অসাম্যের শক্তির চেয়ে সাম্যের শক্তি অধিক বলবান। তাই শক্তির আদান-প্রদানে সাম্যের যে শক্তি, তারই সফল হবার সম্ভাবনা বেশি।
দুই ব্যক্তির মধ্যে যখন সংযােগ হয়, তখন দুটি শরীর যেন দুটি মাধ্যম—যার মধ্যে দিয়ে শক্তির গতি প্রবাহিত হয় এবং ব্যক্তির সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলিকে প্রভাবিত করে। একের শক্তি অপর পাত্রে অবতরণ করে। আধার অনুযায়ী ব্যক্তির মধ্যে আংশিক বা পূর্ণ-শক্তির গ্রহণ হয়। স্থান, কাল ও পরিস্থিতি পাত্রের এই গ্রহণযােগ্যতা নির্ধারণ করে। কিন্তু আধারভেদের মূলে কাজ করে পাত্রের উৎকর্ষতা, প্রগতি, আনন্দ ও নিরাপত্তার জন্য নিজের আন্তরিকতা। এইগুলি অবশ্য বীজরূপে সমস্ত ব্যক্তির মধ্যেই বর্তমান।
অবতরিত শক্তি সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করার জন্য যখন স্থান, কাল ও পরিস্থিতি অনুকূল নয় , তখন ঐ শক্তি আংশিকভাবে আত্মস্থ হয় ব্যক্তির মধ্যে কারণ মূলে সকলেই চায় চেতনাকে উর্ধমুখী করতে। বাকী শক্তিটুকুও ব্যক্তির মধ্যে একইভাবে প্রবাহিত হতে থাকে যতক্ষণ না সেটি ব্যক্তির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ধারণ হচ্ছে। এইভাবে শক্তিগ্রহণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতরূপে শরীর, মন, ইন্দ্রিয় ও সৃজনমুখী-শক্তির পরিবর্তন হতে থাকে ব্যক্তির মধ্যে। এইভাবেই সংযােগের মাধ্যমে ব্যক্তি-স্বভাবের পরিবর্তন হয়ে থাকে।
সম্পর্ক—এই সংযােগ বা স্পর্শের প্রবাহকে নিরবিচ্ছিন্ন চলতে দেওয়াই হল সম্পর্ক। সম্পর্কের মাধ্যমে শক্তি গ্রহণের গতিকে অপ্রতিহত রাখা যায় এবং এতে আরও দ্রুত মানুষের স্বভাবে পরিবর্তন আসে ৷
যখন শক্তি প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর শরীরদ্বয় একে অপরের নিকট থাকে, তখন তাকে প্রত্যক্ষ সংযােগ বলা হয় ।
যখন তারা একে অপরের থেকে দূরে থাকে তখন তাকে অপ্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযােগ বলা হয়।
জিজ্ঞাসা :–দুর্বল ব্যক্তির মধ্যে থেকে যে বিক্ষিপ্ত শক্তি নির্গত হয়ে অন্যের মধ্যে প্রবেশ করে, তার কি পরিণতি হয় ?
উত্তর :—সেই বিক্ষিপ্ত শক্তি যদি এমন কারুর মধ্যে প্রবেশ করে, যার মধ্যে সাম্য আছে তবে শক্তির সেই অসাম্যতা সাম্যে রূপান্তরিত হয় আর যদি গ্রহণকারী নিজেই বিক্ষিপ্ত হন, তবে তার অসাম্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে ।
জিজ্ঞাসা :—অনেক ধরণের সাধনার কথা আমরা বইতে পড়ে থাকি। যেমন ‘যােগ’, ‘আসন’, ‘মুদ্রা’, ‘নামােচ্চারণ, প্রার্থনা, মনঃসংযম, ধ্যান, ইত্যাদি। এগুলাে মানুষের জীবনে কতটা প্রাসঙ্গিক ?
উত্তর :—এই সমস্ত অভ্যাস বা অনুশীলনের সাথে পূর্বশর্ত হিসেবে কিছু মৌলিক শিক্ষা-গ্রহণের উল্লেখ থাকে, সেই সম্বন্ধেও নিশ্চয়ই বইতে পড়ে থাকবে। যেমন সততা, ধৈর্য, অপরের ক্ষতি না করা, স্থৈর্য, ব্রহ্মচর্য, ইত্যাদি।
সাধনার প্রসঙ্গে এই সমস্ত সদগুণের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে, মানব সভ্যতায় এই সদ্গুণগুলির অভাব খুবই প্রকট। সুতরাং ধরে নেওয়া যায় যে, এই সমস্ত গুণগুলির বিকাশের অন্য কোন পন্থা আছে। সেই পন্থা হােল নিজের সূক্ষ্ম বৃত্তিকে পরিপূর্ণ ক্রিয়াশীল করে তােলা, অন্ততঃ নিজের কাণ্ডজ্ঞানের অনুকুলে স্বভাবকে পরিচালিত করা। এটি অপরিহার্য সমস্ত সদ্গুণ অর্থাৎ সততা, ধৈর্য ইত্যাদি বিকাশের জন্য। এগুলি বিকাশের পরই সাধনার প্রশ্ন আসে। ভালাে করে বিচার করে দেখলে তােমার বিভ্রান্তিটা এখানে স্পষ্ট হবে । সাধনার কথা ভাবতে গিয়ে, সেগুলির যে মৌলিক পূর্বশর্ত সেগুলাে আমরা এড়িয়ে যাই। না এভাবে এগােলে কখনই আধ্যাত্মিক ধারণা স্পষ্ট হয় না ।
জিজ্ঞাসা :—তাহলে আমরা আপনাকে অনুরােধ করব, আপনি সেইভাবে বলুন যেভাবে আমাদের এগােনাে উচিত ?
উত্তর :—ব্যক্তি অহং জীবকে নিজস্বতা প্রদান করে। জীব হােল বিশ্বমন ও বিশ্বঅহং-এর সীমায়িত বৈশিষ্ট্যের রূপ। আমাদের ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়ের সূক্ষ্মভাব, তার সূক্ষতর, সূক্ষ্মতম প্রকাশ এবং আধ্যাত্মিকতা ব্যক্তিকে মানবিক নিজস্বতা দেয়। এবং তা ছাড়াও মানুষের চেতনায় কাজ করে সৃজনের এক শক্তি।
ব্যক্তির অহং সবসময়ই তার পূর্ব সংস্কারের সাথে যুক্ত। ব্যক্তির সৃজনশক্তি এবং সেই শক্তির সাথে যুক্ত যে আত্মতুষ্টি ও শ্লাঘা, তা নিয়ন্ত্রিত হয় অহং দ্বারা। অহং যেহেতু পূর্ব সংস্কার প্রসূত এবং সেই সংস্কার যেহেতু পশুভাব দ্বারা প্রভাবিত, তাই সেই অহং সাধারণভাবে উন্নত সদগুণের বিরােধী, যেমন সততা, ধৈর্য, ব্রহ্মচর্য, সমদর্শিতা, ইত্যাদি। আগেই বলেছি এই সমস্ত গুণ বিকশিত করতে হলে সূক্ষ্ম শক্তির পরিপূর্ণ ক্রিয়াশীলতার প্রয়ােজন এবং দরকার কাণ্ডজ্ঞানের সাথে নিজের জীবনযাত্রার আনুকূল্য। এই প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা হয়েছিল শক্তির সাহায্যে রূপান্তরের কথা। এই শক্তির উৎস খাদ্য হতে পারে, সংযােগ বা সম্পর্ক হতে পারে। সূক্ষ্মশক্তির পূর্ণ বিকাশের সাথে সাথে পাশবিক বৃত্তিগুলি ধীরে ধীবে মানবিক প্রবণতায় রূপান্তরিত হয়। মানবতায় প্রতিষ্ঠিত হলেই মানুষ যােগ, ধ্যান, আসন, মুদ্রা ইত্যাদি অভ্যাসের জন্য অধিকারী হয়ে ওঠে। যতদিন ব্যক্তি-অহং পাশবিক বৃত্তিগুলির দ্বারা প্রবলভাবে অধিকৃত থাকবে, ততদিন ব্যক্তির সামর্থ্য নেই নিজের প্রবণতাগুলাের ভাল বা মন্দ নির্ণয় করার।
অহং-ই ব্যক্তির ইন্দ্রিয়জ ও গুণজ প্রবণতাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যক্তি নয়। ব্যক্তির নিজস্ব বিচারবৃত্তি থাকে, যা অহং প্রসূত নয়, যা বিবেক প্রসূত। কিন্তু সেগুলো সত্ত্বেও সে অসহায় । অসহায়ভাবে সে অহং-এর শাসনকে অনুসরণ করে । কাণ্ডজ্ঞান থাকলেও তার দ্বারা নিজেকে চালিত করতে সে অসমর্থ। তাই আগে তাকে তার কাণ্ডজ্ঞান সম্বন্ধে সচেতন হতে হবে। মানবিকতার মূল শর্তগুলি পূরণ করতে হবে। তার জন্য প্রয়ােজন যথার্থ জীবনযাপন, সংযােগ ও সম্পর্ক। তার পরে শুরু হয় সাধনা।
জিজ্ঞাসা :—এই কাণ্ডজ্ঞান সচেতনতা কী মন্দিরে প্রার্থনা বা পূজা দ্বারা সম্ভব নয় ?
উত্তর :– সম্ভব ।
জিজ্ঞাসা :—কিভাবে সম্ভব, যেখানে শক্তিসঞ্চার ছাড়া ওটা হবে না বলছিলেন ?
উত্তর—সাধারণ অর্থে অধিকাংশ মানুষই যতক্ষণ মন্দিরে থাকে একটা শ্রদ্ধা ও ভক্তিভাব নিয়ে থাকে। তাদের তখনকার ব্যবহারে, আচরণে এক মনােযােগ বা নিবিষ্টতা দেখা যায়। এই গুণগুলি স্থানটির নিজস্ব ভাবকে পুষ্ট করে। যে কোন উপাসনাস্থলে জড়িয়ে থাকে তার ইতিহাসের স্মৃতি এবং কোন উন্নত সাধক বা মহাপুরুষের ভাবরাশি । মানুষের অন্তরে শক্তি অবতরণের এ এক অনুকুল ও উন্নত ক্ষেত্র। যাঁরা ভক্তিভরে প্রার্থনা বা পূজা করেন, তাদের মধ্যে অতীতের সেই ভাব সঞ্চারিত হয় ! সেই অর্থে শক্তিসঞ্চার হয়।
জিজ্ঞাসা :—পৃথিবীর সমস্ত উপাসনালয় বা মন্দিরের সাথেই কী অতীতের কোন মহাপুরুষ বা সাধনের যােগসূত্র আছে ?
উত্তর :– হ্যাঁ, অবশ্যই আছে।
জিজ্ঞাসা :—তাঁরা কারা ?
উত্তর :—তাঁরা অধিকাংশই প্রাচীনকালের ঋষি, তপস্বী ইত্যাদি।
জিজ্ঞাসা :—এ কী একধরণের বংশের পূর্বপুরুদের পূজা নয় ? বলা যেতে পারে এ এক প্রাচীন রীতি যা আজও অনগ্রসর সমাজে বিদ্যমান।
উত্তর :—তা বলা হয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু আসলে অনগ্রসর বা অগ্রসর কোন সমাজেই একে পূর্বপূরুষের পূজা বলে অভিহিত করাটা সঠিক হবে না। আসলে পূর্বপুরুষের মাধ্যমে এ ঈশ্বরেরই আরাধনা। যদিও তর্কের খাতিরে একে পূর্বপুরুষের পূজা বলা হয়, তবে সমগ্র মানবজাতিই পূর্বপুরুষদের পূজা করে। কারণ সমস্ত মন্দিরে বা ধর্মস্থানে ঈশ্বর-উপাসনার সাথে প্রাচীন কালের কোন পরম্পরা বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তির জীবন ও কর্মের যােগ বা সম্পর্ক আছে। সমস্ত ধর্মের প্রার্থনা বা প্রাচীন গীত শুনলে তুমি এই কথারই প্রমাণ পাবে। … [ক্রমশঃ]
গুরু মহারাজ সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন_”আমার শরীরে যখন হুঁশ ফিরে এল তখন দেখলাম ঐ বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বিছানায় টানটান করে শুয়ে রয়েছেন এদিকে তখন পূর্ব দিগন্তে লালিমা দেখা দিয়েছে এবং ভোরের পাখিরা কিচিরমিচির করতে শুরু করে দিয়েছে। আমি পুনরায় ওনাকে গুরুজ্ঞানে প্রনাম করতেই উনি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ মুদ্রা হাত রাখলেন।
আবার আমার শরীরটায় একটা আবেশ সৃষ্টি হোল এবং আমার চেতনা হু হু করে ঊর্ধমুখী হয়ে গেল ফলে বাহ্যজ্ঞান থাকলো না। এরপর যখন আবার আমার শরীরে চেতনা এল_তখন দেখলাম আমি রায়নার শ্মশানে বসে আছি_সকালের আলো বেশ ভালোই ফুটে গেছে! আমি তাড়াতাড়ি করে ক্যাম্পে ফিরে গেলাম এবং রুরাল ইলেকট্রিফিকেশনের যে কাজ ওখানে চলছিল_সেই কাজে চলে গেলাম। কিন্তু যেখানেই যাই আর যা-ই করি না কেন_আমার মাথাটা সারাদিনই একটা ভারী মতো বোধ হচ্ছিল এবং শরীরে ও মনে একটা অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি বিরাজ করছিল।(ক্রমশঃ)
____________০________০_________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< *স্বামী বাউলানন্দ* >>
জিজ্ঞাসা :—সংযােগ ও সম্পর্কের মাধ্যমে ঠিক কিভাবে পরিবর্তন সাধিত হয় ? এবং প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ সংযােগ ও সম্পর্কের রূপরেখা কী ?
উত্তর :– সংযােগ মানে স্পর্শ । আলােচ্য বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই স্পর্শ মানে একজন দেবেন, অন্যজন গ্রহণ করবেন। যাঁরা কাণ্ডজ্ঞানের অনুকূল নন এবং যাদের সৃজনশীল শক্তির বিকাশ নেই , তারা এই স্পর্শের দ্বারা শক্তিপ্রাপ্ত হন। যাঁদের সৃজনশীল শক্তি ক্রিয়াশীল এবং যাঁরা কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেকের অনুকূলে নিজেদের চালিত করেন, তারা স্পর্শ দ্বারা এই শক্তি প্রদান করার অধিকারী।
উভয় ব্যক্তিরই উদ্দেশ্য প্রগতি, আনন্দ ও নিরাপত্তা, কিন্তু তাদের উপায় বা পন্থা ভিন্ন। একজনের মধ্যে থেকে বিক্ষিপ্ত শক্তি নির্গত হবে ও অপরজনের মধ্যে থেকে সাম্যের শক্তি প্রবাহিত হবে। শক্তি মানেই ক্রিয়াশীলতা ও গতি। স্পর্শ বা সংযােগের দ্বারা অপরের ওপর নিজ ভাবধারা কাজ করতে আরম্ভ করবে। সুতরাং শক্তি প্রবাহের কাজই হল রূপান্তর । অসাম্যের শক্তির চেয়ে সাম্যের শক্তি অধিক বলবান। তাই শক্তির আদান-প্রদানে সাম্যের যে শক্তি, তারই সফল হবার সম্ভাবনা বেশি।
দুই ব্যক্তির মধ্যে যখন সংযােগ হয়, তখন দুটি শরীর যেন দুটি মাধ্যম—যার মধ্যে দিয়ে শক্তির গতি প্রবাহিত হয় এবং ব্যক্তির সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলিকে প্রভাবিত করে। একের শক্তি অপর পাত্রে অবতরণ করে। আধার অনুযায়ী ব্যক্তির মধ্যে আংশিক বা পূর্ণ-শক্তির গ্রহণ হয়। স্থান, কাল ও পরিস্থিতি পাত্রের এই গ্রহণযােগ্যতা নির্ধারণ করে। কিন্তু আধারভেদের মূলে কাজ করে পাত্রের উৎকর্ষতা, প্রগতি, আনন্দ ও নিরাপত্তার জন্য নিজের আন্তরিকতা। এইগুলি অবশ্য বীজরূপে সমস্ত ব্যক্তির মধ্যেই বর্তমান।
অবতরিত শক্তি সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করার জন্য যখন স্থান, কাল ও পরিস্থিতি অনুকূল নয় , তখন ঐ শক্তি আংশিকভাবে আত্মস্থ হয় ব্যক্তির মধ্যে কারণ মূলে সকলেই চায় চেতনাকে উর্ধমুখী করতে। বাকী শক্তিটুকুও ব্যক্তির মধ্যে একইভাবে প্রবাহিত হতে থাকে যতক্ষণ না সেটি ব্যক্তির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ধারণ হচ্ছে। এইভাবে শক্তিগ্রহণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতরূপে শরীর, মন, ইন্দ্রিয় ও সৃজনমুখী-শক্তির পরিবর্তন হতে থাকে ব্যক্তির মধ্যে। এইভাবেই সংযােগের মাধ্যমে ব্যক্তি-স্বভাবের পরিবর্তন হয়ে থাকে।
সম্পর্ক—এই সংযােগ বা স্পর্শের প্রবাহকে নিরবিচ্ছিন্ন চলতে দেওয়াই হল সম্পর্ক। সম্পর্কের মাধ্যমে শক্তি গ্রহণের গতিকে অপ্রতিহত রাখা যায় এবং এতে আরও দ্রুত মানুষের স্বভাবে পরিবর্তন আসে ৷
যখন শক্তি প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর শরীরদ্বয় একে অপরের নিকট থাকে, তখন তাকে প্রত্যক্ষ সংযােগ বলা হয় ।
যখন তারা একে অপরের থেকে দূরে থাকে তখন তাকে অপ্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযােগ বলা হয়।
জিজ্ঞাসা :–দুর্বল ব্যক্তির মধ্যে থেকে যে বিক্ষিপ্ত শক্তি নির্গত হয়ে অন্যের মধ্যে প্রবেশ করে, তার কি পরিণতি হয় ?
উত্তর :—সেই বিক্ষিপ্ত শক্তি যদি এমন কারুর মধ্যে প্রবেশ করে, যার মধ্যে সাম্য আছে তবে শক্তির সেই অসাম্যতা সাম্যে রূপান্তরিত হয় আর যদি গ্রহণকারী নিজেই বিক্ষিপ্ত হন, তবে তার অসাম্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে ।
জিজ্ঞাসা :—অনেক ধরণের সাধনার কথা আমরা বইতে পড়ে থাকি। যেমন ‘যােগ’, ‘আসন’, ‘মুদ্রা’, ‘নামােচ্চারণ, প্রার্থনা, মনঃসংযম, ধ্যান, ইত্যাদি। এগুলাে মানুষের জীবনে কতটা প্রাসঙ্গিক ?
উত্তর :—এই সমস্ত অভ্যাস বা অনুশীলনের সাথে পূর্বশর্ত হিসেবে কিছু মৌলিক শিক্ষা-গ্রহণের উল্লেখ থাকে, সেই সম্বন্ধেও নিশ্চয়ই বইতে পড়ে থাকবে। যেমন সততা, ধৈর্য, অপরের ক্ষতি না করা, স্থৈর্য, ব্রহ্মচর্য, ইত্যাদি।
সাধনার প্রসঙ্গে এই সমস্ত সদগুণের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে, মানব সভ্যতায় এই সদ্গুণগুলির অভাব খুবই প্রকট। সুতরাং ধরে নেওয়া যায় যে, এই সমস্ত গুণগুলির বিকাশের অন্য কোন পন্থা আছে। সেই পন্থা হােল নিজের সূক্ষ্ম বৃত্তিকে পরিপূর্ণ ক্রিয়াশীল করে তােলা, অন্ততঃ নিজের কাণ্ডজ্ঞানের অনুকুলে স্বভাবকে পরিচালিত করা। এটি অপরিহার্য সমস্ত সদ্গুণ অর্থাৎ সততা, ধৈর্য ইত্যাদি বিকাশের জন্য। এগুলি বিকাশের পরই সাধনার প্রশ্ন আসে। ভালাে করে বিচার করে দেখলে তােমার বিভ্রান্তিটা এখানে স্পষ্ট হবে । সাধনার কথা ভাবতে গিয়ে, সেগুলির যে মৌলিক পূর্বশর্ত সেগুলাে আমরা এড়িয়ে যাই। না এভাবে এগােলে কখনই আধ্যাত্মিক ধারণা স্পষ্ট হয় না ।
জিজ্ঞাসা :—তাহলে আমরা আপনাকে অনুরােধ করব, আপনি সেইভাবে বলুন যেভাবে আমাদের এগােনাে উচিত ?
উত্তর :—ব্যক্তি অহং জীবকে নিজস্বতা প্রদান করে। জীব হােল বিশ্বমন ও বিশ্বঅহং-এর সীমায়িত বৈশিষ্ট্যের রূপ। আমাদের ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়ের সূক্ষ্মভাব, তার সূক্ষতর, সূক্ষ্মতম প্রকাশ এবং আধ্যাত্মিকতা ব্যক্তিকে মানবিক নিজস্বতা দেয়। এবং তা ছাড়াও মানুষের চেতনায় কাজ করে সৃজনের এক শক্তি।
ব্যক্তির অহং সবসময়ই তার পূর্ব সংস্কারের সাথে যুক্ত। ব্যক্তির সৃজনশক্তি এবং সেই শক্তির সাথে যুক্ত যে আত্মতুষ্টি ও শ্লাঘা, তা নিয়ন্ত্রিত হয় অহং দ্বারা। অহং যেহেতু পূর্ব সংস্কার প্রসূত এবং সেই সংস্কার যেহেতু পশুভাব দ্বারা প্রভাবিত, তাই সেই অহং সাধারণভাবে উন্নত সদগুণের বিরােধী, যেমন সততা, ধৈর্য, ব্রহ্মচর্য, সমদর্শিতা, ইত্যাদি। আগেই বলেছি এই সমস্ত গুণ বিকশিত করতে হলে সূক্ষ্ম শক্তির পরিপূর্ণ ক্রিয়াশীলতার প্রয়ােজন এবং দরকার কাণ্ডজ্ঞানের সাথে নিজের জীবনযাত্রার আনুকূল্য। এই প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা হয়েছিল শক্তির সাহায্যে রূপান্তরের কথা। এই শক্তির উৎস খাদ্য হতে পারে, সংযােগ বা সম্পর্ক হতে পারে। সূক্ষ্মশক্তির পূর্ণ বিকাশের সাথে সাথে পাশবিক বৃত্তিগুলি ধীরে ধীবে মানবিক প্রবণতায় রূপান্তরিত হয়। মানবতায় প্রতিষ্ঠিত হলেই মানুষ যােগ, ধ্যান, আসন, মুদ্রা ইত্যাদি অভ্যাসের জন্য অধিকারী হয়ে ওঠে। যতদিন ব্যক্তি-অহং পাশবিক বৃত্তিগুলির দ্বারা প্রবলভাবে অধিকৃত থাকবে, ততদিন ব্যক্তির সামর্থ্য নেই নিজের প্রবণতাগুলাের ভাল বা মন্দ নির্ণয় করার।
অহং-ই ব্যক্তির ইন্দ্রিয়জ ও গুণজ প্রবণতাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যক্তি নয়। ব্যক্তির নিজস্ব বিচারবৃত্তি থাকে, যা অহং প্রসূত নয়, যা বিবেক প্রসূত। কিন্তু সেগুলো সত্ত্বেও সে অসহায় । অসহায়ভাবে সে অহং-এর শাসনকে অনুসরণ করে । কাণ্ডজ্ঞান থাকলেও তার দ্বারা নিজেকে চালিত করতে সে অসমর্থ। তাই আগে তাকে তার কাণ্ডজ্ঞান সম্বন্ধে সচেতন হতে হবে। মানবিকতার মূল শর্তগুলি পূরণ করতে হবে। তার জন্য প্রয়ােজন যথার্থ জীবনযাপন, সংযােগ ও সম্পর্ক। তার পরে শুরু হয় সাধনা।
জিজ্ঞাসা :—এই কাণ্ডজ্ঞান সচেতনতা কী মন্দিরে প্রার্থনা বা পূজা দ্বারা সম্ভব নয় ?
উত্তর :– সম্ভব ।
জিজ্ঞাসা :—কিভাবে সম্ভব, যেখানে শক্তিসঞ্চার ছাড়া ওটা হবে না বলছিলেন ?
উত্তর—সাধারণ অর্থে অধিকাংশ মানুষই যতক্ষণ মন্দিরে থাকে একটা শ্রদ্ধা ও ভক্তিভাব নিয়ে থাকে। তাদের তখনকার ব্যবহারে, আচরণে এক মনােযােগ বা নিবিষ্টতা দেখা যায়। এই গুণগুলি স্থানটির নিজস্ব ভাবকে পুষ্ট করে। যে কোন উপাসনাস্থলে জড়িয়ে থাকে তার ইতিহাসের স্মৃতি এবং কোন উন্নত সাধক বা মহাপুরুষের ভাবরাশি । মানুষের অন্তরে শক্তি অবতরণের এ এক অনুকুল ও উন্নত ক্ষেত্র। যাঁরা ভক্তিভরে প্রার্থনা বা পূজা করেন, তাদের মধ্যে অতীতের সেই ভাব সঞ্চারিত হয় ! সেই অর্থে শক্তিসঞ্চার হয়।
জিজ্ঞাসা :—পৃথিবীর সমস্ত উপাসনালয় বা মন্দিরের সাথেই কী অতীতের কোন মহাপুরুষ বা সাধনের যােগসূত্র আছে ?
উত্তর :– হ্যাঁ, অবশ্যই আছে।
জিজ্ঞাসা :—তাঁরা কারা ?
উত্তর :—তাঁরা অধিকাংশই প্রাচীনকালের ঋষি, তপস্বী ইত্যাদি।
জিজ্ঞাসা :—এ কী একধরণের বংশের পূর্বপুরুদের পূজা নয় ? বলা যেতে পারে এ এক প্রাচীন রীতি যা আজও অনগ্রসর সমাজে বিদ্যমান।
উত্তর :—তা বলা হয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু আসলে অনগ্রসর বা অগ্রসর কোন সমাজেই একে পূর্বপূরুষের পূজা বলে অভিহিত করাটা সঠিক হবে না। আসলে পূর্বপুরুষের মাধ্যমে এ ঈশ্বরেরই আরাধনা। যদিও তর্কের খাতিরে একে পূর্বপুরুষের পূজা বলা হয়, তবে সমগ্র মানবজাতিই পূর্বপুরুষদের পূজা করে। কারণ সমস্ত মন্দিরে বা ধর্মস্থানে ঈশ্বর-উপাসনার সাথে প্রাচীন কালের কোন পরম্পরা বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তির জীবন ও কর্মের যােগ বা সম্পর্ক আছে। সমস্ত ধর্মের প্রার্থনা বা প্রাচীন গীত শুনলে তুমি এই কথারই প্রমাণ পাবে। … [ক্রমশঃ]
