গুরু মহারাজের সাথে_স্বামী বাউলানন্দজীর সাক্ষাৎ-এর যে কথাগুলো এতোদিন ধরে বলা হয়েছে_ সেই একই কথা গুরু মহারাজ অন্যত্র অন্যভাবে বর্ণনা করেছিলেন। উনি বলেছিলেন_”আমার সাথে যখন বাউলানন্দজীর দেখা হচ্ছে_তখন দেখলাম আমি যেন একটা বাচ্ছা শিশু, হামাগুড়ি দিয়ে একটা ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি।আরো দেখলাম আমার চারপাশে অসংখ্য মোটা মোটা বই_যেন পাঁচিল তুলে দিয়েছে!বই-এর পাঁচিলের ওপারে গুরুদেব _স্বামী বাউলানন্দজী বসে রয়েছেন এবং আমাকে তাঁর কাছে যাবার জন্য আহ্বান করছেন!
সেই আহ্বান শুনে আমি প্রাণপন তাঁর কাছে যাবার চেষ্টা করতে থাকলাম কিন্তু ঐ মোটা মোটা গ্রন্থগুলি ঠেলে আমি যেতে পারছিলাম না।(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :—বহু শাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থ আমরা পাঠ করেছি। এগুলাে পড়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া হয়েছে। নতুন কোন গ্রন্থ পড়তে গিয়ে দেখেছি পূর্বের ধারণাগুলি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, ধারণা, মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির দোলায় দুলেছি বহুদিন। কিন্তু আপনার সাথে আলোচনার মাধ্যমে যে ধারণা তৈরী হচ্ছে, তা যেন আগের থেকে অনেক দৃঢ়, স্পষ্ট, প্রাঞ্জল ও যথার্থ বলে মনে হচ্ছে। এই ধরণের বিশ্লেষণ শাস্ত্রগ্রন্থে নেই বলেই কি এসব হচ্ছে, না অন্য কোন কারণ আছে ?
উত্তর :—শাস্ত্র মানে লিখিত শব্দ যার অধিকাংশই রচিত হয়েছে মহাপুরুষদের অনুগামী বা শিষ্যদের দ্বারা। সিদ্ধ মহাপুরুষরা খুব কমই কিছু লিখে গেছেন। শাস্ত্র মানে মানবজাতির প্রতি কিছু নির্দেশ বা সূত্র—ঈশ্বর, জগৎ ও মানুষ সংক্রান্ত।
লিখিত রচনার পিছনে ছিল মহাপুরুষদের উচ্চারণ । সেই উচ্চারণের মূলে ছিল তাঁদের স্তব্ধতা। স্তব্ধতাকে ধরে ছিল বিচার। বিচারের ভিত ছিল অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাকে লালন করেছিল আধ্যাত্মিকতা। তারও আধার ছিল অনুভূতি। এবং সেই অনুভূতির উৎসে ছিলেন ঈশ্বর। সুতরাং শাস্ত্র হচ্ছে তত্ত্বের সপ্তম রূপান্তর । শাস্ত্রকে তুলনা করা যায় স্থূল জগতের সাথে । স্থূলের আগে রয়েছে সূক্ষ্ম, তারও আগে কারণ এবং কারণের আগে মহাকারণ। ঈশ্বর সর্বত্রই সর্বভাবে ও রূপে প্রকাশিত। কিন্তু যত সূক্ষ্মতর হবে জগৎ তত্ত্বের স্পষ্টতা তত প্রত্যক্ষ হবে।
একইভাবে স্থূল জগতের অভিজ্ঞতাকে আমাদের স্থূল পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। যেমন শাস্ত্র পড়তে গেলে চোখের ব্যবহার দরকার। আর তার সাথে প্রয়ােজন শব্দ ও শব্দার্থ সম্বন্ধে জ্ঞান। শব্দগুলি কতটা এবং কিভাবে প্রতিঘাত করছে পাঠকের অন্তরে, সেটা নির্ভর করছে তার সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলি কতটা ভাব গ্রহণ করতে সমর্থ তার ওপর। সুতরাং বুদ্ধির নির্মলতা ও চেতনার উর্ধ্বগামীতার ওপর নির্ভর করছে শাস্ত্রপাঠের যথার্থ রসগ্রহণ করতে পারার ক্ষমতা বা অক্ষমতা।
এছাড়াও বিচার করতে হবে যে, মহাপুরুষদের উদ্দেশ্য সবসময় একই থেকেছে, কিন্তু যুগপ্রয়ােজনে তাদের ইচ্ছা ও পদ্ধতির বিভিন্নতা থেকেছে। সুতরাং শাস্ত্রের সমস্ত বক্তব্য তােমার প্রকৃতি, ভাষা ও সমকালীন অবস্থার যথার্থ প্রতিফলন নাও হতে পারে।
জিজ্ঞাসা :—এখন আমরা বিভ্রান্ত ও ভীত হচ্ছি। শাস্ত্রের মাধ্যমে ঈশ্বর, জীবন ও নিজের সম্বন্ধে সম্যক ধারণা হওয়া কি সম্ভব, না অসম্ভব ?
উত্তর :—সাধারণতঃ অসম্ভব। যে কারণগুলাে উল্লেখ করলাম তা ছাড়াও আরও কিছু কারণ আছে।
জিজ্ঞাসা :–সে কারণগুলাে কি ?
উত্তর :–আপ্তবাক্য উচ্চারণের অনেক পরে তা রচনা হয়। যারা সরাসরি শোনেন তারা স্মৃতিতে কিছুটা রেখে দেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তাে অনেক পরে স্মৃতি ঘেঁটে লিখে রাখেন যতটা মনে থাকে। অন্য অনেকে স্মৃতি থেকে সেই ভাব প্রচার করেন। এই প্রচার যারা শােনেন তাদের মধ্যে কেউ হয়তাে কলম ধরেন। সিদ্ধ মহাপুরুষের মূল ভাবাদর্শ ততদিনে হয়তাে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। আগেই বলেছি, মহাপুরুষেরা নিজেরা সাধারণতঃ লিখে রাখেন না কিছুই। মনে রাখতে হবে যে তাঁদের যুগে প্রযুক্তিগত সুযােগ-সুবিধে ছিল না, যা আজ আছে। যার ফলে তাঁদের বাণী ও উপদেশ যন্ত্রের সাহায্যে ধরে রাখা সম্ভব হত না।
আবার দেখ, পৃথিবীতে বহু ভাষা, ধ্বনি, ব্যাকরণ ও শব্দের নানা বৈচিত্র্য। মহাপুরুষদের বাণী বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। পরে সেই সূত্র থেকে আবার অন্যেরা ভাষ্য লিখেছেন। সেই ভাষ্যগুলিও শাস্ত্র হয়ে গেছে।
এখন যােগাযােগ ব্যবস্থা যদিও অনেক উন্নত, তাতেও সমস্যার খুব একটা সমাধান হয়নি। বক্তারা অনেক ক্ষেত্রে একটা ভাষণের মধ্যেই পরস্পর বিরােধী কথা বলেন। অনেকে আবার বিপদে পড়লে নিজেই নিজের বক্তব্যকে পরে অস্বীকার করেন। এটাই জাগতিক রীতি হয়ে গেছে আজকাল। এরা সবাই জাগতিক ব্যাপার নিয়েই কথা বলেন যেগুলো সম্বন্ধে অনেকেই মােটামুটি অবহিত। সুতরাং লক্ষ্য কর, তুমি ভাষণ হয়তাে শুনেছ, ভাষণের সময় হয়তাে উপস্থিত ছিলে অথবা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেই শােনা আর দেখাটা তােমার ঘরে বসেই হয়েছে এবং যে বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে সেটাও অভিনব নয় তােমার কাছে—তবুও তােমার এবং অন্য শ্রোতাদের মনে সেই বিষয়টি নিয়ে যে সঠিক এবং একইরকম ধারণা হবেই এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।
সুতরাং বুঝতেই পারছে যে, শাস্ত্রে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যায়, আবার অনেক কিছু প্রক্ষিপ্ত হয় এবং মূল ভাবপুঞ্জ বিকৃত হয়, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে। এক শব্দেরই যেমন বিভিন্ন রকম অর্থ হতে পারে। সেই অর্থগুলি আবার পরস্পর বিরােধীও হতে পারে। সেই অর্থগুলিও অনর্থ ঘটায় ।
সুতরাং যা লেখা হয়েছে মহাপুরুষদের জীবনাবসানের বহু পরে, সেই শাস্ত্র পড়ে তার দ্বারা ঈশ্বর, আধ্যাত্মিকতা, জীবন ও নিজের সম্বন্ধে যথার্থ ধারণা হওয়া অসম্ভব।
জিজ্ঞাসা :—শাস্ত্রপাঠের কি তবে কোন উপযােগিতাই নেই ?
উত্তর :–না, তা আছে।
জিজ্ঞাসা :—কি ভাবে ?
উত্তর :—শাস্ত্র পড়ে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের সমকালীন ও তার পূর্বকালীন একটা সামাজিক চিত্র তুমি পাবে ।
জিজ্ঞাসা :– কিন্তু সে সব সম্বন্ধে ধারণা করে আমাদের লাভ কি ?
উত্তর :—কেন নেই ? অনেক দিক দিয়েই এতে তােমার সুবিধে হওয়া উচিত।
জিজ্ঞাসা :—কিভাবে ?
উত্তর :–বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা এবং মানবজাতির সার্বিক যে অবস্থান, সেগুলাে পূর্ব অবস্থারই পরিণতি –এটা বােধ হয়। তুমি বর্তমান যুগে জীবিত রয়েছ। পৃথিবী, সমাজ ও মানুষের সাথে তােমার যােগাযােগ ও আদান-প্ৰদান চলছে। সমকালীনকে ভাল করে বুঝতে ও জানতে হবে তােমায়, যাতে তুমি আরও সুচারুভাবে এই আদান প্রদান ও যােগাযােগ চালিয়ে যেতে পারে। বর্তমানকে বুঝলে তুমি ভবিষ্যত যে ইতিহাস, তারও একটা সঠিক ইঙ্গিত পাবে।
জিজ্ঞাসা :–শাস্ত্র পড়ে সমাজ, মানুষ ও ইতিহাস সম্বন্ধে কিভাবে জানা যায় ?
উত্তর :– বর্তমান অবস্থা পূর্বাবস্থার উত্তরসূরি এবং তুমি নিজে বর্তমানে অবস্থিত। এই ধারাবাহিকতা যেমন তােমার মধ্যেও রয়েছে, সেরকম শাস্ত্রের মধ্যেও আছে। বিশেষ করে সে সময়ের রাজনীতি, সমাজ ও ধর্ম সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।
জিজ্ঞাসা :—কিন্তু শুধুমাত্র অধ্যাত্ম-চর্চা না হয়ে কিভাবে শাস্ত্র এই তিনের ঐতিহাসিক দলিল হয়ে উঠল ?
উত্তর :–সমাজ, রাজনীতি ও ধর্ম পরস্পর নির্ভরশীল । এককভাবে ও সম্মিলিতভাবে এই তিনই আবার আধ্যাত্মিকতার ওপর নির্ভরশীল। অধ্যাত্মনীতি থেকে এসেছে সমাজনীতি, সমাজ থেকে রাজনীতি। এবং সমাজ ও রাজনীতির যৌথ প্রভাবে পৃথিবীতে ধর্ম আন্দোলন গড়ে উঠেছে। আধ্যাত্মিক মানুষদের সাহায্য নিয়েই সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরী হয়েছে। আর সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে তারা আবার ধর্ম আন্দোলন করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই পুরো পরস্পর নির্ভর প্রভাবগুলির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত শাস্ত্রে পাওয়া যাবে।
জিজ্ঞাসা :– আমরা এতদিন জানতাম যে রাজনীতির ওপর ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার কোন প্রভাব পড়ে না। এই সংশয় নিরসন হলে ভাল হয়।
উত্তর :– একটা গাছের সাথে তুলনা করতে পারো। প্রথমে থাকে বাকল। তারপর পাতা হয়। তারপর তৈরী হয় গাছের সার অংশ। শেষে অসার অংশ। শিকড় হল আধ্যাত্মিকতা । পাতাগুলো হল সমাজ। গাছের সার-অংশ হল রাজনীতি আর অসার-অংশ হল আনুষ্ঠানিক ধর্ম-আন্দোলন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে গাছের বাকল সবচেয়ে স্পর্শকাতর, সার-অংশ আর একটু শক্ত-সমর্থ আর অসার অংশ সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু অসার-অংশ নষ্ট হয়ে গেলেও গাছ বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু সার-অংশ রােগগ্রস্ত যদি হয় এবং যদি অসার-অংশ সুস্থ থাকে তাহলে গাছ অল্প কিছুদিন বাঁচবে। কিন্তু বাকল বা ছাল যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে বাঁচার কোন সম্ভাবনাই নেই । নিশ্চিত মৃত্যু।
সুতরাং গাছের জন্ম-বৃদ্ধি এবং অস্তিত্ব বাকল বা ছালের ওপর মূলতঃ নির্ভরশীল। রাজনীতি ও ধর্মও এককভাবে ও যৌথভাবে আধ্যাত্মিকতার ওপর নির্ভরশীল। অধ্যাত্ম দ্বারা তারা পালিত ও পুষ্ট হয়।
জিজ্ঞাসা :– আমরা জানতে চাই যে, ঈশ্বর, জগৎ ও ব্যক্তি সম্বন্ধে যথার্থ ধারণা তাহলে কিভাবে তৈরী হবে ?
উত্তর :– সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যথার্থ ধারণা হওয়া সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :–যদি আর একটু বিশদ করে বলেন, উপকৃত হবো।
উত্তর :—স্থূল শরীরে রক্তের সাহায্যে আমাদের শরীরের পরিপােষণ হয়। পুষ্টিকর ও স্বাভাবিক আহার গ্রহণ করলে রক্তে তা শক্তিরূপে রূপান্তরিত হয়। শরীরে যথেষ্ট শক্তি তৈরী হলে, খাদ্যের গুণ তখন আরও সূক্ষ্ম সৃজনশক্তিতে পরিণত হতে শুরু করবে। এক কথায়, স্থূল শক্তি যত সূক্ষ্মতর হয়ে উঠবে ততই ধারণা করার সামর্থ্য বাড়বে।
সাধারণতঃ মানুষ এই সূক্ষ্ম সৃজনশক্তির সম্ভাবনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়না। তারা মনে করে এই শক্তি দিয়ে একমাত্র প্রজননের কাজই হতে পারে। যৌনতা ও আসুরিক বৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যই মানুষ একে ব্যবহার করে । শক্তির গুণগত রূপান্তরের সময় মানুষ নিজেকে দেয় না। তাই, সার্বিকভাবে মানবজাতির মধ্যে এই সূক্ষ্ম সৃজনশক্তির বিকাশ দেখা যায় না।
জিজ্ঞাসা :–এর প্রতিকার কিভাবে সম্ভব ?
উত্তর : –প্রথমতঃ সৃজনশক্তির সম্ভাবনার সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা হওয়া প্রয়ােজন । শক্তিকে আগে শরীর গঠনের কাজে ব্যবহার করতে হবে । শরীর গঠিত হলে সূক্ষ্ম শরীর গঠনে সেই শক্তিকে রূপান্তরিত করতে হবে। প্রথমে এই প্রচেষ্টা করতে হবে সচেতনভাবে। পরে এই ক্রিয়া ও রূপান্তর স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে যাবে। আর তখন শাস্ত্র পাঠ করেও ঈশ্বর, জগৎ ও ব্যক্তি সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করা যাবে। … [ক্রমশঃ]
সেই আহ্বান শুনে আমি প্রাণপন তাঁর কাছে যাবার চেষ্টা করতে থাকলাম কিন্তু ঐ মোটা মোটা গ্রন্থগুলি ঠেলে আমি যেতে পারছিলাম না।(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :—বহু শাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থ আমরা পাঠ করেছি। এগুলাে পড়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া হয়েছে। নতুন কোন গ্রন্থ পড়তে গিয়ে দেখেছি পূর্বের ধারণাগুলি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, ধারণা, মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির দোলায় দুলেছি বহুদিন। কিন্তু আপনার সাথে আলোচনার মাধ্যমে যে ধারণা তৈরী হচ্ছে, তা যেন আগের থেকে অনেক দৃঢ়, স্পষ্ট, প্রাঞ্জল ও যথার্থ বলে মনে হচ্ছে। এই ধরণের বিশ্লেষণ শাস্ত্রগ্রন্থে নেই বলেই কি এসব হচ্ছে, না অন্য কোন কারণ আছে ?
উত্তর :—শাস্ত্র মানে লিখিত শব্দ যার অধিকাংশই রচিত হয়েছে মহাপুরুষদের অনুগামী বা শিষ্যদের দ্বারা। সিদ্ধ মহাপুরুষরা খুব কমই কিছু লিখে গেছেন। শাস্ত্র মানে মানবজাতির প্রতি কিছু নির্দেশ বা সূত্র—ঈশ্বর, জগৎ ও মানুষ সংক্রান্ত।
লিখিত রচনার পিছনে ছিল মহাপুরুষদের উচ্চারণ । সেই উচ্চারণের মূলে ছিল তাঁদের স্তব্ধতা। স্তব্ধতাকে ধরে ছিল বিচার। বিচারের ভিত ছিল অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাকে লালন করেছিল আধ্যাত্মিকতা। তারও আধার ছিল অনুভূতি। এবং সেই অনুভূতির উৎসে ছিলেন ঈশ্বর। সুতরাং শাস্ত্র হচ্ছে তত্ত্বের সপ্তম রূপান্তর । শাস্ত্রকে তুলনা করা যায় স্থূল জগতের সাথে । স্থূলের আগে রয়েছে সূক্ষ্ম, তারও আগে কারণ এবং কারণের আগে মহাকারণ। ঈশ্বর সর্বত্রই সর্বভাবে ও রূপে প্রকাশিত। কিন্তু যত সূক্ষ্মতর হবে জগৎ তত্ত্বের স্পষ্টতা তত প্রত্যক্ষ হবে।
একইভাবে স্থূল জগতের অভিজ্ঞতাকে আমাদের স্থূল পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। যেমন শাস্ত্র পড়তে গেলে চোখের ব্যবহার দরকার। আর তার সাথে প্রয়ােজন শব্দ ও শব্দার্থ সম্বন্ধে জ্ঞান। শব্দগুলি কতটা এবং কিভাবে প্রতিঘাত করছে পাঠকের অন্তরে, সেটা নির্ভর করছে তার সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলি কতটা ভাব গ্রহণ করতে সমর্থ তার ওপর। সুতরাং বুদ্ধির নির্মলতা ও চেতনার উর্ধ্বগামীতার ওপর নির্ভর করছে শাস্ত্রপাঠের যথার্থ রসগ্রহণ করতে পারার ক্ষমতা বা অক্ষমতা।
এছাড়াও বিচার করতে হবে যে, মহাপুরুষদের উদ্দেশ্য সবসময় একই থেকেছে, কিন্তু যুগপ্রয়ােজনে তাদের ইচ্ছা ও পদ্ধতির বিভিন্নতা থেকেছে। সুতরাং শাস্ত্রের সমস্ত বক্তব্য তােমার প্রকৃতি, ভাষা ও সমকালীন অবস্থার যথার্থ প্রতিফলন নাও হতে পারে।
জিজ্ঞাসা :—এখন আমরা বিভ্রান্ত ও ভীত হচ্ছি। শাস্ত্রের মাধ্যমে ঈশ্বর, জীবন ও নিজের সম্বন্ধে সম্যক ধারণা হওয়া কি সম্ভব, না অসম্ভব ?
উত্তর :—সাধারণতঃ অসম্ভব। যে কারণগুলাে উল্লেখ করলাম তা ছাড়াও আরও কিছু কারণ আছে।
জিজ্ঞাসা :–সে কারণগুলাে কি ?
উত্তর :–আপ্তবাক্য উচ্চারণের অনেক পরে তা রচনা হয়। যারা সরাসরি শোনেন তারা স্মৃতিতে কিছুটা রেখে দেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তাে অনেক পরে স্মৃতি ঘেঁটে লিখে রাখেন যতটা মনে থাকে। অন্য অনেকে স্মৃতি থেকে সেই ভাব প্রচার করেন। এই প্রচার যারা শােনেন তাদের মধ্যে কেউ হয়তাে কলম ধরেন। সিদ্ধ মহাপুরুষের মূল ভাবাদর্শ ততদিনে হয়তাে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। আগেই বলেছি, মহাপুরুষেরা নিজেরা সাধারণতঃ লিখে রাখেন না কিছুই। মনে রাখতে হবে যে তাঁদের যুগে প্রযুক্তিগত সুযােগ-সুবিধে ছিল না, যা আজ আছে। যার ফলে তাঁদের বাণী ও উপদেশ যন্ত্রের সাহায্যে ধরে রাখা সম্ভব হত না।
আবার দেখ, পৃথিবীতে বহু ভাষা, ধ্বনি, ব্যাকরণ ও শব্দের নানা বৈচিত্র্য। মহাপুরুষদের বাণী বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। পরে সেই সূত্র থেকে আবার অন্যেরা ভাষ্য লিখেছেন। সেই ভাষ্যগুলিও শাস্ত্র হয়ে গেছে।
এখন যােগাযােগ ব্যবস্থা যদিও অনেক উন্নত, তাতেও সমস্যার খুব একটা সমাধান হয়নি। বক্তারা অনেক ক্ষেত্রে একটা ভাষণের মধ্যেই পরস্পর বিরােধী কথা বলেন। অনেকে আবার বিপদে পড়লে নিজেই নিজের বক্তব্যকে পরে অস্বীকার করেন। এটাই জাগতিক রীতি হয়ে গেছে আজকাল। এরা সবাই জাগতিক ব্যাপার নিয়েই কথা বলেন যেগুলো সম্বন্ধে অনেকেই মােটামুটি অবহিত। সুতরাং লক্ষ্য কর, তুমি ভাষণ হয়তাে শুনেছ, ভাষণের সময় হয়তাে উপস্থিত ছিলে অথবা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেই শােনা আর দেখাটা তােমার ঘরে বসেই হয়েছে এবং যে বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে সেটাও অভিনব নয় তােমার কাছে—তবুও তােমার এবং অন্য শ্রোতাদের মনে সেই বিষয়টি নিয়ে যে সঠিক এবং একইরকম ধারণা হবেই এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।
সুতরাং বুঝতেই পারছে যে, শাস্ত্রে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যায়, আবার অনেক কিছু প্রক্ষিপ্ত হয় এবং মূল ভাবপুঞ্জ বিকৃত হয়, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে। এক শব্দেরই যেমন বিভিন্ন রকম অর্থ হতে পারে। সেই অর্থগুলি আবার পরস্পর বিরােধীও হতে পারে। সেই অর্থগুলিও অনর্থ ঘটায় ।
সুতরাং যা লেখা হয়েছে মহাপুরুষদের জীবনাবসানের বহু পরে, সেই শাস্ত্র পড়ে তার দ্বারা ঈশ্বর, আধ্যাত্মিকতা, জীবন ও নিজের সম্বন্ধে যথার্থ ধারণা হওয়া অসম্ভব।
জিজ্ঞাসা :—শাস্ত্রপাঠের কি তবে কোন উপযােগিতাই নেই ?
উত্তর :–না, তা আছে।
জিজ্ঞাসা :—কি ভাবে ?
উত্তর :—শাস্ত্র পড়ে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের সমকালীন ও তার পূর্বকালীন একটা সামাজিক চিত্র তুমি পাবে ।
জিজ্ঞাসা :– কিন্তু সে সব সম্বন্ধে ধারণা করে আমাদের লাভ কি ?
উত্তর :—কেন নেই ? অনেক দিক দিয়েই এতে তােমার সুবিধে হওয়া উচিত।
জিজ্ঞাসা :—কিভাবে ?
উত্তর :–বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা এবং মানবজাতির সার্বিক যে অবস্থান, সেগুলাে পূর্ব অবস্থারই পরিণতি –এটা বােধ হয়। তুমি বর্তমান যুগে জীবিত রয়েছ। পৃথিবী, সমাজ ও মানুষের সাথে তােমার যােগাযােগ ও আদান-প্ৰদান চলছে। সমকালীনকে ভাল করে বুঝতে ও জানতে হবে তােমায়, যাতে তুমি আরও সুচারুভাবে এই আদান প্রদান ও যােগাযােগ চালিয়ে যেতে পারে। বর্তমানকে বুঝলে তুমি ভবিষ্যত যে ইতিহাস, তারও একটা সঠিক ইঙ্গিত পাবে।
জিজ্ঞাসা :–শাস্ত্র পড়ে সমাজ, মানুষ ও ইতিহাস সম্বন্ধে কিভাবে জানা যায় ?
উত্তর :– বর্তমান অবস্থা পূর্বাবস্থার উত্তরসূরি এবং তুমি নিজে বর্তমানে অবস্থিত। এই ধারাবাহিকতা যেমন তােমার মধ্যেও রয়েছে, সেরকম শাস্ত্রের মধ্যেও আছে। বিশেষ করে সে সময়ের রাজনীতি, সমাজ ও ধর্ম সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।
জিজ্ঞাসা :—কিন্তু শুধুমাত্র অধ্যাত্ম-চর্চা না হয়ে কিভাবে শাস্ত্র এই তিনের ঐতিহাসিক দলিল হয়ে উঠল ?
উত্তর :–সমাজ, রাজনীতি ও ধর্ম পরস্পর নির্ভরশীল । এককভাবে ও সম্মিলিতভাবে এই তিনই আবার আধ্যাত্মিকতার ওপর নির্ভরশীল। অধ্যাত্মনীতি থেকে এসেছে সমাজনীতি, সমাজ থেকে রাজনীতি। এবং সমাজ ও রাজনীতির যৌথ প্রভাবে পৃথিবীতে ধর্ম আন্দোলন গড়ে উঠেছে। আধ্যাত্মিক মানুষদের সাহায্য নিয়েই সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরী হয়েছে। আর সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে তারা আবার ধর্ম আন্দোলন করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই পুরো পরস্পর নির্ভর প্রভাবগুলির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত শাস্ত্রে পাওয়া যাবে।
জিজ্ঞাসা :– আমরা এতদিন জানতাম যে রাজনীতির ওপর ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার কোন প্রভাব পড়ে না। এই সংশয় নিরসন হলে ভাল হয়।
উত্তর :– একটা গাছের সাথে তুলনা করতে পারো। প্রথমে থাকে বাকল। তারপর পাতা হয়। তারপর তৈরী হয় গাছের সার অংশ। শেষে অসার অংশ। শিকড় হল আধ্যাত্মিকতা । পাতাগুলো হল সমাজ। গাছের সার-অংশ হল রাজনীতি আর অসার-অংশ হল আনুষ্ঠানিক ধর্ম-আন্দোলন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে গাছের বাকল সবচেয়ে স্পর্শকাতর, সার-অংশ আর একটু শক্ত-সমর্থ আর অসার অংশ সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু অসার-অংশ নষ্ট হয়ে গেলেও গাছ বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু সার-অংশ রােগগ্রস্ত যদি হয় এবং যদি অসার-অংশ সুস্থ থাকে তাহলে গাছ অল্প কিছুদিন বাঁচবে। কিন্তু বাকল বা ছাল যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে বাঁচার কোন সম্ভাবনাই নেই । নিশ্চিত মৃত্যু।
সুতরাং গাছের জন্ম-বৃদ্ধি এবং অস্তিত্ব বাকল বা ছালের ওপর মূলতঃ নির্ভরশীল। রাজনীতি ও ধর্মও এককভাবে ও যৌথভাবে আধ্যাত্মিকতার ওপর নির্ভরশীল। অধ্যাত্ম দ্বারা তারা পালিত ও পুষ্ট হয়।
জিজ্ঞাসা :– আমরা জানতে চাই যে, ঈশ্বর, জগৎ ও ব্যক্তি সম্বন্ধে যথার্থ ধারণা তাহলে কিভাবে তৈরী হবে ?
উত্তর :– সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যথার্থ ধারণা হওয়া সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :–যদি আর একটু বিশদ করে বলেন, উপকৃত হবো।
উত্তর :—স্থূল শরীরে রক্তের সাহায্যে আমাদের শরীরের পরিপােষণ হয়। পুষ্টিকর ও স্বাভাবিক আহার গ্রহণ করলে রক্তে তা শক্তিরূপে রূপান্তরিত হয়। শরীরে যথেষ্ট শক্তি তৈরী হলে, খাদ্যের গুণ তখন আরও সূক্ষ্ম সৃজনশক্তিতে পরিণত হতে শুরু করবে। এক কথায়, স্থূল শক্তি যত সূক্ষ্মতর হয়ে উঠবে ততই ধারণা করার সামর্থ্য বাড়বে।
সাধারণতঃ মানুষ এই সূক্ষ্ম সৃজনশক্তির সম্ভাবনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়না। তারা মনে করে এই শক্তি দিয়ে একমাত্র প্রজননের কাজই হতে পারে। যৌনতা ও আসুরিক বৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যই মানুষ একে ব্যবহার করে । শক্তির গুণগত রূপান্তরের সময় মানুষ নিজেকে দেয় না। তাই, সার্বিকভাবে মানবজাতির মধ্যে এই সূক্ষ্ম সৃজনশক্তির বিকাশ দেখা যায় না।
জিজ্ঞাসা :–এর প্রতিকার কিভাবে সম্ভব ?
উত্তর : –প্রথমতঃ সৃজনশক্তির সম্ভাবনার সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা হওয়া প্রয়ােজন । শক্তিকে আগে শরীর গঠনের কাজে ব্যবহার করতে হবে । শরীর গঠিত হলে সূক্ষ্ম শরীর গঠনে সেই শক্তিকে রূপান্তরিত করতে হবে। প্রথমে এই প্রচেষ্টা করতে হবে সচেতনভাবে। পরে এই ক্রিয়া ও রূপান্তর স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে যাবে। আর তখন শাস্ত্র পাঠ করেও ঈশ্বর, জগৎ ও ব্যক্তি সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করা যাবে। … [ক্রমশঃ]
