গুরু মহারাজ এবং স্বামী বাউলানন্দের সাক্ষাৎ-এর একটা অন্য ঘটনা গুরু মহারাজ বলেছিলেন। দুটোই সাক্ষাৎ-এর ঘটনা কিন্তু যেন মনে হবে আলাদা আলাদা ঘটনা! মহাপুরুষ দের ব্যাপার-স্যাপারই তো একটু আলাদা ধরনের_তাই আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ঐসব ভালো বুঝতে পারি না! সাধারণ মানুষের সেইগুলি “লীলা” বলে এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া আর অন্য কোন উপায় থাকে না!
যাইহোক, মূল ঘটনাটায় ফিরে যাই! গুরু মহারাজ বলেছিলেন তাঁর এইরূপ একটা দর্শন হয়েছিল যে, উনি যেন একটা হামাগুড়ি দেওয়া শিশু_এবং তাঁর চারিদিকে মোটা মোটা বই-এর পাঁচিল তোলা ! তার ওপারে ওনার গুরুদেব স্বামী বাউলানন্দজী বসে_আর ওনার মধ্যে প্রচন্ড প্রচেষ্টা সেই বই-এর পাহাড় সরিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছানোর!
এইরকম একটা অবস্থায় হঠাৎ করে ওনার মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর জিদ চেপে গেল__যে করেই হোক ওনাকে গুরুর কাছে পৌঁছাতেই হবে! উনি বলছিলেন_” আমি তখন আমার সেই ছোট্ট শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রাণপনে ঐ মোটা মোটা বইগুলি ছোট ছোট দুহাতে সড়াতে শুরু করলাম ! যত ঐ বইগুলো সড়তে লাগলো_ ততই আমার শক্তি যেন বেড়ে বেড়ে যেতে লাগলো এবং যে সমস্ত বই-এ আমার স্পর্শ্য লাগছিল_সেই সব পুস্তকের জ্ঞান আমার মধ্যে প্রবেশ করে গেল। তারপর দেখলাম বইগুলো একটু সড়ে যেতেই _সরাসরি একটা রাস্তা বেড়িয়ে গেল এবং আমি সেইটা ধরে একেবারে গুরুদেব স্বামী বাউলানন্দজীর কোলে গিয়ে উঠে বসলাম।
ওনার কোলে বসে থাকতে থাকতেই আমার শরীর এতো ভারী হোতে শুরু করলো যে, উনি আমাকে কোল থেকে নামিয়ে দিতে বাধ্য হোলেন। তখন আমি দেখলাম আমি অনেক বড় এবং বাউলানন্দজী যেন একটা শিশু ! তখন আমি ওনাকে কোলে তুলে নিলাম।”(ক্রমশঃ)
_________০_________০___________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– প্রচলিত একটা মতবাদ আছে যে, বিবাহ এবং প্রজনন মানুষের অবশ্য কর্ত্তব্য। কারণ তাতে মনুষ্য প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়। নাহলে এই সৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিপুর্বের আলােচনায় আমরা শুনেছি যে স্থূল শক্তিকে ক্ষয় না করে রূপান্তর করা উচিত। নাহলে সূক্ষ্মশক্তি জাগ্রত হবার আগেই হয়ত বার্ধক্য চলে আসবে। বিষয়টি আমাদের আরও ভাল করে বােঝা দরকার।
মীমাংসা :– এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। আজ যারা মানুষ তারা আগে ছিল পশু। বহুদিন তারা সে অবস্থায় ছিল। পশু অবস্থার আগে তারা ছিল বনস্পতি, সেও বহুকাল। আজ যারা পশু তারা বনস্পতি অবস্থা থেকে উঠে এসেছে এবং স্বাভাবিক গতিতে মনুষ্য জন্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । এবং আজ যারা বনস্পতি তারা বহুকাল অশরীরী সত্তায় আকাশে অপেক্ষা করেছে শরীর নেবার জন্য।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মানুষের উচিত প্রজাতির বৃদ্ধির দিকে মন দেওয়া নাহলে সৃষ্টির গতি ব্যাহত হবে। এটা দুভাবে করা যায় । ১) বারবার শরীর নিয়ে এবং ২) মনুষ্যেতর প্রাণীদের জন্য মনুষ্য হয়ে জন্ম নেওয়ার পথ সুগম করে দিয়ে।
প্রথমটির দ্বারা সৃষ্টির গতি ব্যাহত হয় এবং দ্বিতীয়টির দ্বারা গতি বজায় থাকে।
জিজ্ঞাসা :—মৃত্যুর পরেও শরীর নেবার তাগিদ কেন থাকে ?
মীমাংসা :—অতৃপ্ত বাসনার জন্য ।
জিজ্ঞাসা :–এই অতৃপ্তি কেন ?
মীমাংসা :—জগতের প্রতি আসক্তির জন্য ।
জিজ্ঞাসা :—কিসের জন্য এই আসক্তি ?
মীমাংস :—এই আসক্তির কারণ মানুষের অমানবিক আচরণ ও অভ্যাস।
জিজ্ঞাসা :—তারই বা কারণ কি ?
মীমাংসা :– সূক্ষ্মশক্তির মান এবং পরিমাণ, দুটোরই ক্ষয় হলে এই অবস্থাই হয়।
জিজ্ঞাসা :—ক্ষয় কেন হয় ?
মীমাংস :—মানুষ ও পশুর মধ্যে একটাই পার্থক্য, মানুষের কাণ্ডজ্ঞান থাকা উচিত। সেই কাণ্ডজ্ঞানের প্রতি উদাসীন হলেই এই পরিণতি হয়। বেশিরভাগ মানুষই অমানুষের মত আচরণ করছে। তাই বার বার তাকে জন্ম নিতে হচ্ছে। তাই এখন যে মানুষ প্রজাতির বৃদ্ধি দেখছ, সেটা হচ্ছে ঐভাবেই। অর্থাৎ অতৃপ্ত মানুষই ফিরে ফিরে আসছে। প্রাণী জগতকে কোন সুযােগই দিচ্ছে না। এটা কখনই স্বাভাবিক গতি বলা যাবে না।
জিজ্ঞাসা :–অনেকের মতে মানুষ হবার পরেও একজনকে বহুবার জন্ম নিতে হবে ঈশ্বর-সাক্ষাৎকার করার জন্য এবং তার জন্য তাকে অনেক ভাল কাজ করতে হবে, ভাল পথে চলতে হবে। বলা হয়, কয়েক লক্ষ মানুষ জন্মই দরকার। কিন্তু আপনি এটাকে অস্বাভাবিক বলছেন। যদি একটু বুঝিয়ে বলেন, ভাল হয়।
মীমাংসা :–এই রকম আরও প্রচলিত মতবাদ আছে। যেমন লৌকিক জগতের ইন্দ্রিয়জ তৃপ্তিই শ্রেয়, ঈশ্বর সাক্ষাৎকারের জন্য প্রচেষ্টা গৌণ। অথবা পূর্বজন্মে যে বিষয়ে ভােগ হয়ে গেছে, বর্তমান জন্মে সেই বিষয়ের প্রতি আর কোন স্পৃহা থাকবে না। যারা বলছেন যে ভাল কর্ম করলেই পূর্ণ তৃপ্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, তারাই বলছেন যে মনুষ্য জন্মই পাপ—শুধু কষ্ট ভােগ করা। কথাগুলাে পরস্পরবিরােধী।
একদিকে এরা বলছেন যে মনুষ্য জন্ম মানেই পাপ আবার অন্যদিকে তারাই বলছেন যে, মনুষ্য প্রজাতির ধারাবাহিকতা চালিয়ে যাওয়া দরকার। অর্থাৎ পাপ বা কষ্টকেই প্রশ্রয় দিয়ে যাও। এই সমস্ত ধারণা যাঁরা পোষণ করেন, তারা সুবিধাবাদী। নিজেদের পশুবৃত্তির অজুহাত খোঁজেন।
এদের উচিত সমীক্ষা করা। বাঁচা এবং বৃদ্ধিই যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তবে বিবাহ করে আর সন্তানের জন্ম দিয়েই তাে পূর্ণ তৃপ্তি এসে যেত! যে সন্তান চাইছে, তার হচ্ছে না। আবার যে আর চাইছে না, তার বেশি হয়ে যাচ্ছে। বিচার করা দরকার যে এর পেছনে নিশ্চয়ই আরও সূক্ষ্ম কোন কারণ আছে। যদি সূক্ষ্মতে মনুষ্যশরীর নেবার ইচ্ছে না থাকে, তবে আমাদের সন্তান হওয়া অসম্ভব। আমাদের শরীর যখনই উপযুক্ত ক্ষেত্র হয়ে ওঠে তখনই সৃষ্টির এই অশরীরী ইচ্ছাগুলো প্রকটিত হওয়ার সুযােগ পায়। আর তখন আমরা পিতা-মাতা হই।
এই প্রক্রিয়া কিসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় ? শরীর নেবার ইচ্ছে যাদের আছে, তারা কী অবস্থায় থাকে ? নির্বাচন কী ভাবে হয় ? সেই নির্বাচন কি তারা নিজেরাই করে না অন্য কোন ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় ? এই প্রশ্নগুলাে সম্বন্ধে মানুষের সজাগ হওয়া উচিত। নাহলে মনুষ্য প্রজাতির অস্তিত্ব এবং বৃদ্ধির রহস্য অস্পষ্ট থেকে যাবে।
জিজ্ঞাসা :– এই সচেতনতা হলে তাদের কি সুবিধে হবে ?
মীমাংসা :—মনুষ্য প্রজাতির বৃদ্ধির দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবার আগে তারা বিবেকের সাহায্যে নিজেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও কর্তব্য নিরূপণ করতে পারবে। বিষয়টির ওপর মনােনিবেশ করলে তাদের সৃষ্টির শক্তি সৃজন শক্তিতে রূপান্তরিত হবে। সূক্ষ্ম বৃত্তি যত জাগ্রত হবে, বিচার করার দৃষ্টি তত প্রাঞ্জল হবে—অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির জগত প্রসারিত হবে। সৃষ্টির রহস্য যখন উন্মােচিত হবে তখন ভবিষ্যৎ মা-বাবা হিসেবে সেই প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা সম্বন্ধেও তারা সচেতন হবে।
জিজ্ঞাসা :–এ সম্বন্ধে প্রকৃত ধারণা কি হওয়া উচিত?
মীমাংসা :– উত্তরণের জন্য বারবার শরীর নেবার প্রয়ােজন মনুষ্যেতর প্রাণীদের–মানুষের নয় । বনস্পতি থেকে মনুষ্য শরীর পর্যন্ত বহুবার জন্ম নিতে হয় এবং সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু একবার মনুষ্যশরীর প্রাপ্ত হলে আবার শরীর নেবার কোন প্রয়ােজন নেই। কারণ মানুষের শরীরের গঠন এবং স্বভাবের বৈশিষ্ট্য এমনই যে, স্বাভাবিকভাবেই তা মহতের ইচ্ছার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। পূর্ণতার প্রয়াস স্থূলে না মিটলে, বাকীটা সূক্ষ্মতেই হয়ে যাবে। সুতরাং বারবার মানুষ হয়ে জন্মানাের যে প্রচলিত ধারণা আছে, তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। মনুষ্য প্রজাতির সৃষ্টির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দায়িত্ব ব্যক্তিবিশেষের নয় ।
তা সত্ত্বেও যে মানুষ বারবার শরীর ধারণ করছে, তার কারণ সে অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে, পূর্বের পশুবৃত্তিগুলি তাদের মধ্যে বেশি সক্রিয় । জীবনচক্রের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাদের অবহিত হওয়া উচিত ।
জিজ্ঞাসা :—কী সেই উদ্দেশ্য ?
মীমাংসা :– যাত্রার পথকে সুগম করা—প্রাণীকুল যাতে বিনা বাধায় মানুষ-শরীর প্রাপ্ত হতে পারে এবং মনুষ্যকুল যেন আবার শরীর নেবার বাসনা না করে।
জিজ্ঞাসা :—এখন বুঝতে পারছি যে একমাত্র এইভাবেই সৃষ্টির ধারা রক্ষা করা সম্ভব। অবশ্যই মানুষের একটা দায়িত্ব আছে সামগ্রিকভাবে এবং বিবাহ বা দাম্পত্যজীবন সেই দায়িত্বেরই একটা অঙ্গ। তাই তাে ?
মীমাংসা :—হ্যাঁ, ঠিক কথা। মানুষ বিবাহিত জীবনের পদ্ধতি সম্বন্ধে অনেক কিছু জানে কিন্তু তার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অজ্ঞ।
জিজ্ঞাসা :—সেই উদ্দেশ্যকে সার্থক করতে দাম্পত্য জীবনে কিরকম ধরণের জীবনচর্যা হওয়া উচিত ?
মীমাংসা :—গৃহী হােক বা না হােক, মানুষের মন সবসময় উদ্দেশ্যমুখী থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। সেই উদ্দেশ্যকে ভিত্তি করে আচরণ করবে। উদ্দেশ্যহীন আচরণ মানেই অমানবিক বৃত্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া।
জিজ্ঞাসা :—মানবিক উদ্দেশ্যের জন্য যে মানবিক আচরণ, সেটা কেমন হবে ?
মীমাংসা :—জীবনের উদ্দেশ্য এবং কর্তব্য—দুটো সম্বন্ধেই সজাগ হয়ে সেই অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। যে কোন ব্যক্তির একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে, শরীরকেন্দ্রিকতাকে অতিক্রম করা। যতদিন সে মােহগ্রস্ত, ততদিন সে আসক্ত। উদ্দেশ্যমুখী হলেই এই মােহ সদিচ্ছায় পরিবর্তিত হবে এবং তখন সে সমাজের একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে স্থান পাবে।
জিজ্ঞাসা :—কিন্তু তারা তখন কিভাবে প্রাণীকুলকে মনুষ্যশরীর পেতে সাহায্য করবে ?
মীমাংসা :—সূক্ষ্ম ও স্থূলের সংযােগে জন্ম হয়। মানুষের বিবেক ও সূক্ষ্মশক্তি যত উন্নত হবে, তার প্রভাব পড়বে তার স্থূল শক্তিপাতে। পরিণামে দেখা যাবে যে, সন্তান পূর্ব জন্মে পশু হয়ে থাকলেও তার অমানবিক বৃত্তিগুলো খুব দ্রুত মানবিক উৎকর্ষতার দিকে মােড় নিচ্ছে। এটাই ভাল দাম্পত্যজীবনের অবদান । … [ক্রমশঃ]
যাইহোক, মূল ঘটনাটায় ফিরে যাই! গুরু মহারাজ বলেছিলেন তাঁর এইরূপ একটা দর্শন হয়েছিল যে, উনি যেন একটা হামাগুড়ি দেওয়া শিশু_এবং তাঁর চারিদিকে মোটা মোটা বই-এর পাঁচিল তোলা ! তার ওপারে ওনার গুরুদেব স্বামী বাউলানন্দজী বসে_আর ওনার মধ্যে প্রচন্ড প্রচেষ্টা সেই বই-এর পাহাড় সরিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছানোর!
এইরকম একটা অবস্থায় হঠাৎ করে ওনার মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর জিদ চেপে গেল__যে করেই হোক ওনাকে গুরুর কাছে পৌঁছাতেই হবে! উনি বলছিলেন_” আমি তখন আমার সেই ছোট্ট শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রাণপনে ঐ মোটা মোটা বইগুলি ছোট ছোট দুহাতে সড়াতে শুরু করলাম ! যত ঐ বইগুলো সড়তে লাগলো_ ততই আমার শক্তি যেন বেড়ে বেড়ে যেতে লাগলো এবং যে সমস্ত বই-এ আমার স্পর্শ্য লাগছিল_সেই সব পুস্তকের জ্ঞান আমার মধ্যে প্রবেশ করে গেল। তারপর দেখলাম বইগুলো একটু সড়ে যেতেই _সরাসরি একটা রাস্তা বেড়িয়ে গেল এবং আমি সেইটা ধরে একেবারে গুরুদেব স্বামী বাউলানন্দজীর কোলে গিয়ে উঠে বসলাম।
ওনার কোলে বসে থাকতে থাকতেই আমার শরীর এতো ভারী হোতে শুরু করলো যে, উনি আমাকে কোল থেকে নামিয়ে দিতে বাধ্য হোলেন। তখন আমি দেখলাম আমি অনেক বড় এবং বাউলানন্দজী যেন একটা শিশু ! তখন আমি ওনাকে কোলে তুলে নিলাম।”(ক্রমশঃ)
_________০_________০___________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– প্রচলিত একটা মতবাদ আছে যে, বিবাহ এবং প্রজনন মানুষের অবশ্য কর্ত্তব্য। কারণ তাতে মনুষ্য প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়। নাহলে এই সৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিপুর্বের আলােচনায় আমরা শুনেছি যে স্থূল শক্তিকে ক্ষয় না করে রূপান্তর করা উচিত। নাহলে সূক্ষ্মশক্তি জাগ্রত হবার আগেই হয়ত বার্ধক্য চলে আসবে। বিষয়টি আমাদের আরও ভাল করে বােঝা দরকার।
মীমাংসা :– এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। আজ যারা মানুষ তারা আগে ছিল পশু। বহুদিন তারা সে অবস্থায় ছিল। পশু অবস্থার আগে তারা ছিল বনস্পতি, সেও বহুকাল। আজ যারা পশু তারা বনস্পতি অবস্থা থেকে উঠে এসেছে এবং স্বাভাবিক গতিতে মনুষ্য জন্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । এবং আজ যারা বনস্পতি তারা বহুকাল অশরীরী সত্তায় আকাশে অপেক্ষা করেছে শরীর নেবার জন্য।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মানুষের উচিত প্রজাতির বৃদ্ধির দিকে মন দেওয়া নাহলে সৃষ্টির গতি ব্যাহত হবে। এটা দুভাবে করা যায় । ১) বারবার শরীর নিয়ে এবং ২) মনুষ্যেতর প্রাণীদের জন্য মনুষ্য হয়ে জন্ম নেওয়ার পথ সুগম করে দিয়ে।
প্রথমটির দ্বারা সৃষ্টির গতি ব্যাহত হয় এবং দ্বিতীয়টির দ্বারা গতি বজায় থাকে।
জিজ্ঞাসা :—মৃত্যুর পরেও শরীর নেবার তাগিদ কেন থাকে ?
মীমাংসা :—অতৃপ্ত বাসনার জন্য ।
জিজ্ঞাসা :–এই অতৃপ্তি কেন ?
মীমাংসা :—জগতের প্রতি আসক্তির জন্য ।
জিজ্ঞাসা :—কিসের জন্য এই আসক্তি ?
মীমাংস :—এই আসক্তির কারণ মানুষের অমানবিক আচরণ ও অভ্যাস।
জিজ্ঞাসা :—তারই বা কারণ কি ?
মীমাংসা :– সূক্ষ্মশক্তির মান এবং পরিমাণ, দুটোরই ক্ষয় হলে এই অবস্থাই হয়।
জিজ্ঞাসা :—ক্ষয় কেন হয় ?
মীমাংস :—মানুষ ও পশুর মধ্যে একটাই পার্থক্য, মানুষের কাণ্ডজ্ঞান থাকা উচিত। সেই কাণ্ডজ্ঞানের প্রতি উদাসীন হলেই এই পরিণতি হয়। বেশিরভাগ মানুষই অমানুষের মত আচরণ করছে। তাই বার বার তাকে জন্ম নিতে হচ্ছে। তাই এখন যে মানুষ প্রজাতির বৃদ্ধি দেখছ, সেটা হচ্ছে ঐভাবেই। অর্থাৎ অতৃপ্ত মানুষই ফিরে ফিরে আসছে। প্রাণী জগতকে কোন সুযােগই দিচ্ছে না। এটা কখনই স্বাভাবিক গতি বলা যাবে না।
জিজ্ঞাসা :–অনেকের মতে মানুষ হবার পরেও একজনকে বহুবার জন্ম নিতে হবে ঈশ্বর-সাক্ষাৎকার করার জন্য এবং তার জন্য তাকে অনেক ভাল কাজ করতে হবে, ভাল পথে চলতে হবে। বলা হয়, কয়েক লক্ষ মানুষ জন্মই দরকার। কিন্তু আপনি এটাকে অস্বাভাবিক বলছেন। যদি একটু বুঝিয়ে বলেন, ভাল হয়।
মীমাংসা :–এই রকম আরও প্রচলিত মতবাদ আছে। যেমন লৌকিক জগতের ইন্দ্রিয়জ তৃপ্তিই শ্রেয়, ঈশ্বর সাক্ষাৎকারের জন্য প্রচেষ্টা গৌণ। অথবা পূর্বজন্মে যে বিষয়ে ভােগ হয়ে গেছে, বর্তমান জন্মে সেই বিষয়ের প্রতি আর কোন স্পৃহা থাকবে না। যারা বলছেন যে ভাল কর্ম করলেই পূর্ণ তৃপ্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, তারাই বলছেন যে মনুষ্য জন্মই পাপ—শুধু কষ্ট ভােগ করা। কথাগুলাে পরস্পরবিরােধী।
একদিকে এরা বলছেন যে মনুষ্য জন্ম মানেই পাপ আবার অন্যদিকে তারাই বলছেন যে, মনুষ্য প্রজাতির ধারাবাহিকতা চালিয়ে যাওয়া দরকার। অর্থাৎ পাপ বা কষ্টকেই প্রশ্রয় দিয়ে যাও। এই সমস্ত ধারণা যাঁরা পোষণ করেন, তারা সুবিধাবাদী। নিজেদের পশুবৃত্তির অজুহাত খোঁজেন।
এদের উচিত সমীক্ষা করা। বাঁচা এবং বৃদ্ধিই যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তবে বিবাহ করে আর সন্তানের জন্ম দিয়েই তাে পূর্ণ তৃপ্তি এসে যেত! যে সন্তান চাইছে, তার হচ্ছে না। আবার যে আর চাইছে না, তার বেশি হয়ে যাচ্ছে। বিচার করা দরকার যে এর পেছনে নিশ্চয়ই আরও সূক্ষ্ম কোন কারণ আছে। যদি সূক্ষ্মতে মনুষ্যশরীর নেবার ইচ্ছে না থাকে, তবে আমাদের সন্তান হওয়া অসম্ভব। আমাদের শরীর যখনই উপযুক্ত ক্ষেত্র হয়ে ওঠে তখনই সৃষ্টির এই অশরীরী ইচ্ছাগুলো প্রকটিত হওয়ার সুযােগ পায়। আর তখন আমরা পিতা-মাতা হই।
এই প্রক্রিয়া কিসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় ? শরীর নেবার ইচ্ছে যাদের আছে, তারা কী অবস্থায় থাকে ? নির্বাচন কী ভাবে হয় ? সেই নির্বাচন কি তারা নিজেরাই করে না অন্য কোন ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় ? এই প্রশ্নগুলাে সম্বন্ধে মানুষের সজাগ হওয়া উচিত। নাহলে মনুষ্য প্রজাতির অস্তিত্ব এবং বৃদ্ধির রহস্য অস্পষ্ট থেকে যাবে।
জিজ্ঞাসা :– এই সচেতনতা হলে তাদের কি সুবিধে হবে ?
মীমাংসা :—মনুষ্য প্রজাতির বৃদ্ধির দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবার আগে তারা বিবেকের সাহায্যে নিজেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও কর্তব্য নিরূপণ করতে পারবে। বিষয়টির ওপর মনােনিবেশ করলে তাদের সৃষ্টির শক্তি সৃজন শক্তিতে রূপান্তরিত হবে। সূক্ষ্ম বৃত্তি যত জাগ্রত হবে, বিচার করার দৃষ্টি তত প্রাঞ্জল হবে—অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির জগত প্রসারিত হবে। সৃষ্টির রহস্য যখন উন্মােচিত হবে তখন ভবিষ্যৎ মা-বাবা হিসেবে সেই প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা সম্বন্ধেও তারা সচেতন হবে।
জিজ্ঞাসা :–এ সম্বন্ধে প্রকৃত ধারণা কি হওয়া উচিত?
মীমাংসা :– উত্তরণের জন্য বারবার শরীর নেবার প্রয়ােজন মনুষ্যেতর প্রাণীদের–মানুষের নয় । বনস্পতি থেকে মনুষ্য শরীর পর্যন্ত বহুবার জন্ম নিতে হয় এবং সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু একবার মনুষ্যশরীর প্রাপ্ত হলে আবার শরীর নেবার কোন প্রয়ােজন নেই। কারণ মানুষের শরীরের গঠন এবং স্বভাবের বৈশিষ্ট্য এমনই যে, স্বাভাবিকভাবেই তা মহতের ইচ্ছার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। পূর্ণতার প্রয়াস স্থূলে না মিটলে, বাকীটা সূক্ষ্মতেই হয়ে যাবে। সুতরাং বারবার মানুষ হয়ে জন্মানাের যে প্রচলিত ধারণা আছে, তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। মনুষ্য প্রজাতির সৃষ্টির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দায়িত্ব ব্যক্তিবিশেষের নয় ।
তা সত্ত্বেও যে মানুষ বারবার শরীর ধারণ করছে, তার কারণ সে অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে, পূর্বের পশুবৃত্তিগুলি তাদের মধ্যে বেশি সক্রিয় । জীবনচক্রের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাদের অবহিত হওয়া উচিত ।
জিজ্ঞাসা :—কী সেই উদ্দেশ্য ?
মীমাংসা :– যাত্রার পথকে সুগম করা—প্রাণীকুল যাতে বিনা বাধায় মানুষ-শরীর প্রাপ্ত হতে পারে এবং মনুষ্যকুল যেন আবার শরীর নেবার বাসনা না করে।
জিজ্ঞাসা :—এখন বুঝতে পারছি যে একমাত্র এইভাবেই সৃষ্টির ধারা রক্ষা করা সম্ভব। অবশ্যই মানুষের একটা দায়িত্ব আছে সামগ্রিকভাবে এবং বিবাহ বা দাম্পত্যজীবন সেই দায়িত্বেরই একটা অঙ্গ। তাই তাে ?
মীমাংসা :—হ্যাঁ, ঠিক কথা। মানুষ বিবাহিত জীবনের পদ্ধতি সম্বন্ধে অনেক কিছু জানে কিন্তু তার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অজ্ঞ।
জিজ্ঞাসা :—সেই উদ্দেশ্যকে সার্থক করতে দাম্পত্য জীবনে কিরকম ধরণের জীবনচর্যা হওয়া উচিত ?
মীমাংসা :—গৃহী হােক বা না হােক, মানুষের মন সবসময় উদ্দেশ্যমুখী থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। সেই উদ্দেশ্যকে ভিত্তি করে আচরণ করবে। উদ্দেশ্যহীন আচরণ মানেই অমানবিক বৃত্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া।
জিজ্ঞাসা :—মানবিক উদ্দেশ্যের জন্য যে মানবিক আচরণ, সেটা কেমন হবে ?
মীমাংসা :—জীবনের উদ্দেশ্য এবং কর্তব্য—দুটো সম্বন্ধেই সজাগ হয়ে সেই অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। যে কোন ব্যক্তির একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে, শরীরকেন্দ্রিকতাকে অতিক্রম করা। যতদিন সে মােহগ্রস্ত, ততদিন সে আসক্ত। উদ্দেশ্যমুখী হলেই এই মােহ সদিচ্ছায় পরিবর্তিত হবে এবং তখন সে সমাজের একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে স্থান পাবে।
জিজ্ঞাসা :—কিন্তু তারা তখন কিভাবে প্রাণীকুলকে মনুষ্যশরীর পেতে সাহায্য করবে ?
মীমাংসা :—সূক্ষ্ম ও স্থূলের সংযােগে জন্ম হয়। মানুষের বিবেক ও সূক্ষ্মশক্তি যত উন্নত হবে, তার প্রভাব পড়বে তার স্থূল শক্তিপাতে। পরিণামে দেখা যাবে যে, সন্তান পূর্ব জন্মে পশু হয়ে থাকলেও তার অমানবিক বৃত্তিগুলো খুব দ্রুত মানবিক উৎকর্ষতার দিকে মােড় নিচ্ছে। এটাই ভাল দাম্পত্যজীবনের অবদান । … [ক্রমশঃ]
