স্বামী বাউলানন্দজী সম্বন্ধে কিছু কথা বলা হচ্ছিল। আগের দিন আমরা আলোচনা করেছিলাম যে উনি মা জগদম্বার দর্শন পেয়ে এবং তাঁর কোন অলক্ষ্য ইঙ্গিত লাভ করে উনি নিশ্চিত হন যে_পেরেন্টাপল্লী-ই তাঁর জন্য নির্দিষ্ট সাধনস্থল!
এরপর স্বামীজী সঙ্গে সঙ্গেই যে কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন_তা কিন্তু নয়! উনি চলে গিয়েছিলেন পপি পাহাড়ের উপরের দিকে গভীর জঙ্গলে এবং সকল মানুষের অগোচরে থেকে পাক্কা এক বছর ধরে গভীর সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। ঐখানে উনি হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের সাথে প্রেমপূর্ণ ভাবে মিলে মিশে থাকার কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। তারপর একদিন তাঁর আরাধ্য এবং ইষ্ট দক্ষিনেশ্বরের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ওনার সামনে আবির্ভূত হলেন! ওনার এতদিনের আকাঙ্ক্ষা এবার পূর্ণ হোল! উনি পাহাড় থেকে নেমে এসে এরপর থেকে তপোবনে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। খুব সম্ভবত ঐ সময়েই তাঁর সাধনজীবনের চূড়ান্ত অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। কারণ পাহাড়ের দূর্গম অঞ্চল থেকে নেমে আসার পর অনেকদিন পর্যন্ত উনি কারো সাথে কোন কথা বলতে পারতেন না_সদাসর্বদা আত্মমগ্ন হয়ে থাকতেন। সবাই ধরে নিয়েছিল হয়তো এইভাবেই ওনার শরীরপাত হয়ে যাবে। কিন্তু সেইসময় ভগবান বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ স্থানীয় হতদরিদ্র আদিবাসীদের বেশ ধরে এসে ওনাকে তাদের অবস্থার উন্নতি করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে নির্দেশ দেন।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*** *অধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :—আপনার বক্তব্য অনুযায়ী প্রলয় অবশ্যম্ভাবী এবং প্রলয়ের দরুণ যে দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা ভােগের সম্ভাবনা, সেটা দুর্ঘটনাজনিত বিপর্যয় এবং ইচ্ছে থাকলে তা এড়ানাে যায়। গতি যদি উর্ধ্বমুখী হয় তবে প্রলয়কালে জগতে শান্তি, আনন্দ ও নিরাপত্তা থাকবে। কিন্তু গতি যদি হয় বহির্মুখী তবে প্রলয়কালে কেবল অশান্তি, দারিদ্র ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করবে। বর্তমানে জগতের গতি বহির্মুখী। এই গতিকে উর্ধ্বমুখী করতে হবে। প্রগতির সংজ্ঞা পাল্টাতে হবে। মনুষ্যত্ব হবে মানুষের ধর্ম । তারজন্য মানুষকে হতে হবে নিঃস্বার্থ । নিজের কাণ্ডজ্ঞানের ব্যাপারে তাকে যত্নশীল হতে হবে এবং যাদের চেতনা উধ্বমুখী তাঁদের সান্নিধ্যে আসতে হবে ।
এছাড়াও আপনার মতে, যারা উন্নত অধিকারী তাঁদের উচিত শরীরের মােহ কাটিয়ে ওঠা, যাতে তাঁদের পুনর্বার শরীরধারণ করতে না হয়। মনুষ্যেতর যে সমস্ত সূক্ষ্ম-অস্তিত্ব পশু-শরীর অতিক্রম করে অপেক্ষা করছে, তাদের পথ তবে সুগম হয় ।
কিন্তু এই অবস্থাটি চিন্তা করতে গিয়ে আশঙ্কা হচ্ছে যে, সত্যিই কি তাতে জগতের দুঃখ কমবে ? এই অসংখ্য সূক্ষ্ম অস্তিত্ব যদি মানবশরীর গ্রহণ করে তবে তাে ভয়টা আরও বেশি! এত মানুষকে ঠাঁই দেবার জায়গা আছে কি পৃথিবীতে ? সেই উপযােগী জমি, খাদ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ আছে কি ?
এমনিতেই সব দেশের নেতারা এখন জনসংখ্যা কমানাের চেষ্টা করছেন। বহু গােষ্ঠী ও জাতিদ্বন্দ্বে ভরে গেছে পৃথিবী। যাদের ব্যবহার্য সামগ্রী উদ্বৃত্ত হয় তারা তা অভাবীদের দেয় না, বরং নষ্ট করে। বিপুল জনসংখ্যা যে পৃথিবীর একটা বড় সমস্যা সেটা সবাই মানেন। এমতাবস্থায় আপনি যে আধ্যাত্মিক নীতির পরামর্শ দিচ্ছেন, তা কি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে না ?
মীমাংসা :– তােমার এই সংশয়ের পেছনে কোন আধ্যাত্মিক ভিত্তি নেই, যা আছে তা হল একধরণের যুক্তির অভ্যেস ও স্থূল পরিসংখ্যান ।
জিজ্ঞাসা :–দেখুন, যাকে আমরা সংশয় বলছি, অধিকাংশ চিন্তাশীল মানুষের কাছে সেটা এখন ভয়। নেতারা বলছেন যে, এই অবস্থা চললে এই শতাব্দীর শেষে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে । আর ততদিনে পৃথিবীর উর্বরতা নিঃশেষ হবে–পরিমাণ এবং গুণ দুটোই তলানিতে ঠেকবে।
বহু অঞ্চলের সমাজপতিরা জনসংখ্যা কমানাের জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। দেখা যাচ্ছে যে বিচ্ছিন্নভাবে কোন কোন অঞ্চলে জনসংখ্যার হ্রাস হচ্ছে । সামগ্রিকভাবে জনসংখ্যা কিন্তু বেড়েই চলেছে। যে গােষ্ঠীতে কমছে, তারা বলছেন যে, এভাবে কমতে থাকলে তাদের গােষ্ঠী অবলুপ্তির পথে এগােবে। সমস্যাটা তাই এখন জটিল আকার ধারণ করছে। এ ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ আপনি নিরসন করুন।
মীমাংসা :– ‘জনসংখ্যা’ শব্দটিকে সীমায়িত অর্থে ব্যবহার করা হয়। শুধু যারা শরীরে আছে তারাই গণনায় আসে। এমন অনেকে আছে যারা শরীর ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু পুনর্বার শরীর নেবার বাসনা এখনও যায়নি। তারা সূক্ষ্ম জগতে অপেক্ষা করছে স্থূল জগতে নতুন ক্ষেত্রের জন্য। এরা গণনায় আসে না। অথবা মনুষ্যেতর প্রাণী-জগৎ থেকে উঠে আসা যে সমস্ত অশরীরী সত্তা সূক্ষ্ম অপেক্ষা করছে প্রথমবার মানবশরীর প্রাপ্ত হবার জন্য, তারাও গণনায় আসে না।
সুতরাং জনসংখ্যা সম্বন্ধে তােমার চিন্তাধারা স্থূল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। কোন বিষয়ের ওপর বিচার করার আগে সেই বিষয়টি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ না হােক, আংশিক ধারণা থাকা দরকার। কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাদের ভীতিকেই তুমি শুধু গুরুত্ব দিয়েছ। জনসংখ্যা কমানাের সমস্ত প্রয়াস সফল হয়নি বরং বিপরীত ফল প্রসব করেছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টির ক্ষেত্রে তিনটে প্রশ্ন বিবেচ্য, বর্তমান জগতে জনসংখ্যা কত ? কোথা থেকে আসছে এই জনসংখ্যা ? এবং কোথায় যাবে এরা ?
নেতাদের বিচারে যথেষ্ট ভ্রান্তি আছে । একদিকে তারা বলেন, মানুষই এই গ্রহে শ্রেষ্ঠ জীব, কারণ সে চিন্তাশীল । চিন্তাশক্তি ক্রিয়াশক্তির চেয়ে অধিক প্রভাবশালী। কারণ ক্রিয়ার আগে আসে চিন্তা। একমাত্র মানুষই পারে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে। তার মধ্যেই অসীম কল্যাণ, শুভশক্তি ও ঈশ্বরত্ব’র সম্ভাবনা বিদ্যমান। অথচ এরাই মানুষের জন্মকে আটকানাের চেষ্টা করতে চাইছেন। এটা পরস্পর বিরােধী।
জিজ্ঞাসা :—ওরা আটকানাের কথা বলছেন না, সংখ্যা কমানাের কথা বলছেন ।
মীমাংসা :– হ্যাঁ, তারা তাই বলেন। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যে পদ্ধতি তারা গ্রহণ করেছেন, সেটাকে আটকানােই বলা উচিত, সংখ্যা কমানো নয়।
জিজ্ঞাসা :—এই কথাটিকে যদি আরও বিশদভাবে বুঝিয়ে বলেন ?
মীমাংসা :—একটু আগেই যে তিনটি প্রশ্ন আমি উত্থাপন করেছি, নেতাদের উচিত আগে সেই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। যথার্থ উত্তর খুঁজলে তাঁদের মধ্যে এই পরস্পর-বিরােধিতা কাজ করতাে না এবং জনসংখ্যা-নিয়ন্ত্রণের জন্য ভুল পন্থা তাঁরা অবলম্বন করতেন না।
সঠিক বিচার পদ্ধতি কী হওয়া উচিত, বুঝিয়ে বলছি। মানুষের শরীর চিন্তা করে না, করে অন্য কিছু। শরীর ধারণ করার আগে থেকেই সেই ‘অন্য কিছু’র অস্তিত্ব আছে মহাবিশ্বে। অর্থাৎ চিন্তা-দেহাতীত। দেহপ্রাপ্ত হলে সেই চিন্তা সক্রিয় হবার ক্ষেত্র পায় ।
এই ধারণাটুকু আগে তৈরী হওয়া উচিৎ। অর্থাৎ, আমরা চাই বা না চাই, চিন্তার স্রোত সবসময়ই প্রবাহিত হয়ে চলেছে। আমরা তাকে ব্যাহত করতে পারি না। পৃথিবীর বুকে মানুষের সংখ্যা কমানাের যে পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে, সেটা শরীর-কেন্দ্রিক। অর্থাৎ শরীরের সংখ্যা কমানাের চেষ্টা হচ্ছে।
এই পদ্ধতি তখনই সফল হতে পারে যখন পৃথিবীর সকল মানুষ একসাথে একই সময়ে একে প্রয়ােগ করবেন। বাস্তবদৃষ্টি দিয়ে বিচার করলে সেটা সম্ভব নয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই সম্ভব, তবে তার পরিণতি কখনই শুভ হতে পারে না। কারণ আমরা শুধু কিছু দেহাতীত চিন্তাশক্তির স্থূল সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রবণতাকেই সাময়িকভাবে রােধ করতে পারি। চিন্তনসত্তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে যেহেতু আমাদের হাতে কোন পরিসংখ্যান নেই, তাই তাদের সংখ্যা কমানাের কোন পদ্ধতিও জানা নেই।
যারা আজ শরীরে আছে, ভবিষ্যতে তাদের মৃত্যু হবে। তার মানে কি তারা চিন্তা করাও বন্ধ করে দেবে ? না। সেটা তারা করতে পারবে না। শরীর নেবার আগেও তারা চিন্তার মধ্যে ছিল। শরীর ছাড়ার পরেও থাকবে। শরীর থাকাকালীন শুধু তাদের চিন্তাগুলি ক্রিয়াতে রূপান্তরিত হােত। অতএব তারাও সূক্ষ্ম অবস্থায় থাকবে এবং তাদের শরীর নেবার বাসনা থাকলে আমাদের কিছুই করার নেই।
কেন তারা চিন্তা করে চলেছে ? তাদের চিন্তা থামছে না কেন? এই প্রশ্নগুলাে বিবেচ্য। … [ক্রমশ:]