স্বামী বাউলানন্দজী স্থানীয় উপজাতিদেরকে ধর্মান্তরকরণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সব শ্রেনীর মানুষদেরকে এক ছত্রছায়ায় নিয়ে এসেছিলেন এবং নিজে নেতৃত্ব দিয়ে নিজামের লোকেদের সাথে লড়াই করেছিলেন। সেই সময় তাঁর আশ্রমটাই যেন প্রতিরক্ষা বাহিনীর হেব কোয়ার্টারে পরিণত হয়েছিল।
এই অবস্থায় ভারত সরকার (বৃটিশ অধীনস্থ)-এর পুলিশ এবং মিলিটারিরা উভয়পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করতে ওখানে পৌঁছেছিল। কিন্তু তারাও নিরীহ অসহায় জনজাতি দের উপর অত্যাচার শুরু করে দিল। এতো বিষম বিপদ! স্বামীজী হায়দ্রাবাদে গিয়ে ওখানকার মিলিটারি মেজর জেনারেলের সাথে দেখা করলেন। মেজর জেনারেল চৌধূরী বাঙালি ছিলেন_তিনি সমস্ত ব্যাপারটা বুঝলেন এবং অন্যান্য বড় বড় মিলিটারি অফিসারদের ঐ অঞ্চলে পাঠানো হোল অবস্থা সামাল দেবার জন্য। স্বামীজী ঐ অফিসারদের সঙ্গে করে নিয়ে উপজাতিদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে _ তাদের মন থেকে ভয় দূর করলেন এবং এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনলেন।
এইসময় স্থানীয় জনজাতিদের অনেকে এবং পেরেন্টাপল্লীর বাইরের শিক্ষিতদের মধ্যেও বহুজন স্বামীজীর শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিল। তিনি এত শত কাজের মধ্যেও তাঁর দীক্ষিতদের আধ্যাত্মিক উন্নতির ব্যাপারে খুবই যত্নশীল ছিলেন। সকলকে নিয়ে তিনি আশ্রমে সকাল সন্ধ্যায় প্রার্থনা বা উপাসনা করতেন। আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে ভক্তজনের মনের জটিলতা দূর করার ব্যাপারে উনি সদা-উদযোগী ছিলেন। তাছাড়াও তিনি সকলকেই সাধন-ভজন করার ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিতেন। নির্জন-নিরিবিলি স্থানে ধ্যান করার ধারণা —-ঐ জনজাতির মধ্যে স্বামীজীই প্রথম তৈরি করেছিলেন। স্বামীজীর শিষ্য-ভক্তরা ঐভাবে সাধন করার কিছু কিছু ফলও পেতে থাকলো। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই ওনার সান্নিধ্যে আসা মানুষজন স্বামী বাউলানন্দজীকে শুধুমাত্র নেতা হিসাবে নয়,একজন প্রকৃত আধ্যাত্মিক গুরু হিসাবেও মেনে নিয়েছিল।।(ক্রমশঃ)
======= ======°============
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ _Spiritaul Enquiry_ ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :–আমরা আপনার কাছে জেনেছি যে, মানুষ যত অধ্যাত্মমুখী হবে তত মানবজাতি সার্বিক কল্যাণের পথে এগােবে। তার জন্য আমাদের আহার-বিহার ও কাণ্ডজ্ঞানের উপর দৃষ্টি রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যে, স্বভাবের উৎকর্ষতা আসা সম্ভব কোন ধর্মশিক্ষক বা মহান আচার্যদের মাধ্যমেই—যাদের আমরাবলি গুরু। আমাদের এই বিশ্বাস কি যথার্থ ?
মীমাংসা :– তােমাদের এই মহৎ বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে যথার্থ।
জিজ্ঞাসা :–তাহলে আমাদের ‘গুরু’ সম্বন্ধে কিছু বলুন।
মীমাংসা :– আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে বিচার করলে ‘শিক্ষক’ বা ‘আচার্য’র মত শব্দগুলাে ‘গুরু’ শব্দটির বিকল্প হতে পারে না। গুরুত্ব বিচার করলে শব্দগুলি তুলনীয়ও নয়, শিক্ষক বা আচার্যের চেয়ে গুরুর স্থান অনেক উঁচুতে। শিক্ষক তার ছাত্রকে শিক্ষাদান করেন। সেই দান সঠিকভাবে গ্রহণ হােল কি হােল না এগুলাে ছেড়ে দেওয়া হয় ছাত্রের উপর। কিছু কিছু ছাত্র পাঠগ্রহণে অসমর্থ এবং এই জন্যই তারা অনিচ্ছুক। কারুর আবার সামর্থ্য আছে, ইচ্ছা নেই। অনেকের সামর্থ্য ও ইচ্ছা থাকলেও, ধারাবাহিকতা মেনে চলতে পারে না। দেখা যাচ্ছে এরা কেউই শিক্ষক বা আচার্যের দ্বারা উপকৃত হয় না। অপারগতার দায় ছাত্রদের নিজেরদেই বহন করতে হয়। একমাত্র যারা সমর্থ, ইচ্ছুক ও নিষ্ঠাবান, তারাই শিক্ষকের কাছে উপকৃত হয়। এছাড়া, ছাত্ররা শুধুমাত্র শিক্ষকের মুখে শুনে বা লেখা পড়ে পাঠ নেয়, কে কতটা নিল সেটা নির্ভর করে তার নেওয়ার ক্ষমতার উপর ।
গুরুর ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। গুরুর মধ্যে থেকে প্রেম ও শক্তির প্রবাহ শিষ্যকে প্রেমিক ও শক্তিমান করে তােলে। তিনি যখন মৌন থাকেন, তখনও তার শরীর থেকে তার অনুভূতি, সদিচ্ছা ও সৎ সংকল্প প্রবাহিত হতে থাকে শিষ্যদের মধ্যে। শিষ্যের গ্রহণ করার ক্ষমতাও তিনি বাড়িয়ে দেন নিজের শক্তি দিয়ে । শিষ্যের আধার গঠন করে দেওয়া সম্পূর্ণ গুরুর দায়িত্ব। শিষ্যের উন্নতি ও উৎকর্ষতার ভার সম্পূর্ণভাবেই গুরুর উপর ন্যস্ত। তাই ‘গুরু’ শব্দটিই অত্যন্ত পবিত্র । শিক্ষকের মধ্যে থেকে যে জ্ঞান নির্গত হয়, ছাত্ররা তার কিছুটা হয়ত গ্রহণ করে, বাকীটা হারিয়ে যায়। ছাত্রের গ্রহণ ক্ষমতা শিক্ষক তৈরী করে দেন না, কিন্তু গুরুকৃপার মধ্যে সেই সম্ভাবনা সব সময়ই বিদ্যমান। গুরু এবং শিক্ষকের মধ্যে এটাই সবচেয়ে উল্লেখ যােগ্য পার্থক্য।
জিজ্ঞাসা :– এখন পৃথিবীতে সেরকম ধরণের গুরুরা কি আছেন ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, অবশ্যই আছেন। এই পৃথিবী কখনােই গুরুশূন্য হয় না। গুরুরা নিজের শরীরে থাকেন বলেই শিক্ষকেরা আধ্যাত্মিক নীতি-শিক্ষা দান করে থাকেন এবং ছাত্ররাও সেই শিক্ষা নেওয়ার জন্য উৎসাহিত ও উদ্যোগী হয়।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ‘শিষ্য’ ও ‘ছাত্র’ শব্দ দুটির মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই।
মীমাংসা :– না, দুটো শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা। শিষ্যরা জানে তারা কোন শক্তির দ্বারা শিষ্য হয়ে উঠেছে, ছাত্রদের কিন্তু সে ধারণা নেই। ছাত্ররা যখন তাদের বর্ধিত গ্রহণ ক্ষমতার রহস্য জানতে পারে, তখনই তারা শিষ্য হয়ে উঠবে, তার আগে নয়।
জিজ্ঞাসা :– গুরু এবং শিষ্যের মধ্যে পার্থক্য কি ?
মীমাংসা :– দুটো পৃথক শরীর মাত্র, এছাড়া কোন পার্থক্য নেই।
জিজ্ঞাসা :–কি রকম ?
মীমাংসা :– প্রথমে গুরুর শক্তি শিষ্যের মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে এবং সেই শক্তির সাহায্যে শিষ্যের গ্রহণ ক্ষমতাও বাড়ে। ব্যক্তির মধ্যে যে নিজস্ব শক্তি আছে, সেই শক্তি গুরুর সাহায্যে উর্ধ্বমুখী হয়। ধীরে ধীরে তার আস্বাদন ও প্রবণতা গুরুর সাথে তাকে অভিন্ন করে তোলে। তখন গুরু ও শিষ্যের মধ্যে যে পার্থক্য বা দুরত্ব, তা অন্তর্হিত হয়। তখন দুজনেই এক, শরীরেই শুধু পৃথক।
জিজ্ঞাসা :–পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস আছে যে, আধ্যাত্মিক পথে এগােতে গেলে প্রথমেই দীক্ষা নিতে হবে। দীক্ষার তাৎপর্য সম্বন্ধে আপনার কাছে বিশদভাবে জানতে চাই।
মীমাংসা :– এই আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়–’দীক্ষা’ শব্দটির তাৎপর্য হল আধ্যাত্মিক আধার গঠন। যেটা নির্ভর করে গুরুর উপর। আধ্যাত্মিক নির্দেশ বা শিক্ষা কতটা গ্রহণ হােল বা মেনে চলা হােল সেটা নির্ভর করে ছাত্রের যােগ্যতার উপর । আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও আধ্যাত্মিক নির্দেশ এ দুটি আলাদা। নির্দেশ পালনের সামর্থ্য আসে দীক্ষার মাধ্যমে।
জিজ্ঞাসা :– আমাদের ধারণা যে, আগ্রহ থাকলে আমরা আধ্যাত্মিক শিক্ষক খুঁজে নিয়ে তার কাছে নির্দেশ পেতে পারি, কিন্তু নিজেদের চেষ্টায় গুরুকে খুঁজে নিয়ে দীক্ষা পাওয়া বােধহয় সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কি করণীয় ?
মীমাংসা :– এ কথা সত্য যে, শিক্ষকদের খুঁজে বের করা সম্ভব, কিন্তু গুরুকে নিজের চেষ্টায় খুঁজে পাওয়া যায় না। সে চেষ্টা করার প্রয়ােজনও নেই, কারণ তিনিই তােমাকে খুঁজে নেবেন। মহাপ্রকৃতির উদ্দেশ্য সফল করার জন্যই এটাও গুরুর দায়িত্ব।
জিজ্ঞাসা :–একজন শিক্ষক যেহেতু তার বাক্য ও লেখনীর মাধ্যমে শিক্ষা দান করেন, তাই তাকে চেনা সহজ। কিন্তু গুরু, যিনি নিজের অনুভূতি ও ইচ্ছার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চার করেন, তাকে কি করে চেনা সম্ভব ?
মীমাংসা :– একজন শিক্ষককে যেভাবে চেনা যায়, ঠিক সেইভাবে নিজের দীক্ষাগুরুকে চেনা যায় না ঠিকই কিন্তু তােমার গুরু যদি তুমি নাও চেনাে, তুমি (পূর্বজন্মে ) দীক্ষিত কিনা সেটা জানার ক্ষমতা তােমার অবশ্যই আছে।
জিজ্ঞাসা :– কিভাবে সেটা সম্ভব ?
মীমাংসা :– পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা ঈশ্বর সম্বন্ধে শ্রদ্ধাশীল। জগতে সৃষ্ট সমস্ত কিছুর প্রতি তাদের ভালবাসা আছে—মানবজাতির প্রতিও, যেহেতু তারা মনে করে যে, সবই ঈশ্বরের প্রকাশ। সেই একই কারণে জীবের দুঃখ-কষ্ট দেখলে তাদের মন ব্যথিত হয়, সেই কষ্ট লাঘবের জন্য তারা কিছু করতে পারুক বা নাই পারুক। এরা (পূর্ব জন্মে) দীক্ষিত, এদের গুরু আছে।
এমন মানুষও আছে ঈশ্বর সম্বন্ধে যাদের কোন শ্রদ্ধা নেই। জগতের প্রতি তাদের ভালবাসা আংশিক ও বাসনাপ্রসূত। অপরের দুঃখ-কষ্ট দেখে তারা ব্যথিত হয় না। এরা কোন শিক্ষকের কাছে হয়তাে আধ্যাত্মিক নির্দেশ পেয়েছে কিন্তু গুরু পায়নি।
আবার একদল আছে, যাদের ঈশ্বর সম্বন্ধে শ্রদ্ধাও নেই, অশ্রদ্ধাও নেই এবং ঈশ্বর সম্বন্ধে কোন ব্যাপারেই এদের কোন আগ্রহ নেই। গুরুর নির্দেশ বা আচার্যের শিক্ষা, কোনটাই পায়নি এরা। একটু আত্মসমীক্ষা করলেই তুমি বুঝতে পারবে যে, এই তিন শ্রেণীর মধ্যে কোনটাতে তুমি পড়াে।
জিজ্ঞাসা :– আমাদের ধারণা যে আমরা প্রথম শ্রেণীতে পড়ি, অর্থাৎ আমরা দীক্ষিত। কিন্তু শুধু সেইটুকু জেনেই সন্তুষ্ট হতে পারছি না। যিনি আমাদের দীক্ষা দিয়েছেন, তাকে জানার কোন উপায় আছে কি, তার জন্য আমরা অত্যন্ত আগ্রহী ও ব্যাকুল।
মীমাংসা :– অবশ্যই, তুমি জানতে পারাে কে তােমার গুরু আর সরাসরি ও স্পষ্টভাবে তা জানার ক্ষমতা তােমার আছে।
জিজ্ঞাসা :– কিভাবে ?
মীমাংসা :– সাধারণভাবে সব মানুষেরই জীবনে কোন সংকল্প থাকে। ঠিক হােক্ ভুল হােক্, তারা একটা নির্দিষ্ট গতিতে সেই উদ্দেশ্যকে সাধন করার চেষ্টা করে। তারা মনে মনে ঠিক করে নেয়, ‘আমি এইভাবে চলবাে, এইভাবে ভাববাে, এইভাবে কাজ করবাে—যাতে করে আমার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি’। কিন্তু কেউই ধারাবাহিকভাবে তাদের কাজ-কর্মে, আচরণে ও ব্যবহারে সঙ্গতি রাখতে পারে না। অন্য কেউ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে তবেই তারা নিজেদের বিচ্যুতি সম্বন্ধে জানতে পারে। জানতে পারলেও, সে ব্যাপারে সচেতন হতে ওদের অনেক সময় লেগে যায়, কয়েক মাস বা কয়েক বছরও কেটে যেতে পারে। কেউ কেউ নিজে থেকেই বুঝতে পারে, অন্য কাউকে দেখিয়ে দিতে হয় না। তবু তাদের বিচ্যুতি বুঝতে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ লেগে | যেতে পারে। কেউ হয়তাে কয়েক সেকেণ্ড বা কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজের চেষ্টায় নিজের ভুলটুকু বুঝতে পারে ।
এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর যারা, অর্থাৎ অপরে দেখিয়ে দিলে যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে, তাদের নিজেদের সংশােধনের প্রবৃত্তি বা প্রবণতা থাকে না। দ্বিতীয় শ্রেণীর লােকেরা নিজেদের সঠিক পথে চালিত করার ইচ্ছা রাখে, কিন্তু চেষ্টার ঘাটতি দেখা যায়। চেষ্টা ও ব্যর্থতার জের চলতে থাকে বহুদিন।
তৃতীয় শ্রেণীর লােকদের বিবেক জাগ্রত। তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নিজেদের ত্রুটি সংশােধন করার জন্য তৎপর হয় এবং অচিরেই তারা সফল হয়।
প্রথম শ্রেণীর লােকেরা কোনদিন আধ্যাত্মিক শিক্ষা পায়নি, দীক্ষাগুরুও লাভ হয়নি। দ্বিতীয় শ্রেণীর লােকেরা আধ্যাত্মিক শিক্ষা পেয়েছে, কিন্তু গুরুলাভ হয়নি। গুরুকৃপা নেই বলেই ইচ্ছা থাকলেও তারা নিজেদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারে না। তৃতীয় শ্রেণীর লােকেরা দীক্ষিত। তাই তারা খুব সহজেই নিজেদের সামান্য বিচ্যুতি সনাক্ত করতে পারে ও সফল ভাবে নিজেদের ত্রুটি সংশােধন করতে পারে ।
দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষের অবচেতন মনে আধ্যাত্মিক শিক্ষার স্মৃতি অলক্ষ্যে কাজ করে চলে, তাই তারা দেরীতে হলেও নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু গুরুশক্তির অভাবে তাদের মধ্যে প্রচেষ্টা ও নিষ্ঠার অভাব দেখা যায়। তৃতীয় শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দৃঢ় চরিত্র ও জাগ্রত বিবেকের পিছনে কাজ করছে যেমন আধ্যাত্মিক শিক্ষার স্মৃতি, তেমনি গুরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তি ।
এইভাবে প্রতি মুহুর্তে আত্ম-সমীক্ষা করে যাবে ৷ যখনই বিচ্যুতি হবে, দেখবে, কে যেন অন্তর থেকে তােমাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। প্রায় বিস্মৃত কোন বাণী বা কারুর নাম বা রূপ তােমার চিত্তপটে ভেসে আসছে এবং তােমাকে সঠিক পথে চলার জন্য অনুপ্রাণিত করছেন। নিশ্চিত জেনো, তিনিই তােমার ‘গুরু’ ।
জিজ্ঞাসা :– এই ধরণের অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায়শই হয়। কিন্তু সেই সময়ে স্মৃতিপটে যার বা যাদের নাম, রূপ বা বাণী ভেসে ওঠে, তারা কেউই আর ইহজগতে নেই, এককালে ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কী করা উচিত ?
মীমাংসা :– এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই, এটা খুবই স্বাভাবিক। তাঁকেই তােমার গুরু হিসেবে স্বীকার করাে, মনে কোন দ্বিধা রেখাে না।
জিজ্ঞাসা :– কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যে, ব্যক্তি গতভাবে গুরুর কাছে দীক্ষা নেওয়া উচিত, তবেই দীক্ষার ফল পাওয়া যায়। আপনার ব্যাখ্যার সাথে এই বিশ্বাসের সামঞ্জস্য করবাে কি করে ?
মীমাংসা :– তােমাদের বিশ্বাসে কোন ভুল নেই এবং এ বিশ্বাসের সাথে উক্ত ব্যাখ্যা অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। তােমার মধ্যে বিশেষ বিশেষ সময়ে যে কোন নাম-রূপ বা মহাবাক্যের স্মৃতি জেগে ওঠে এবং তােমার বিচ্যুতিকে সংযত করার প্রয়াস পায়—এতে প্রমাণিত হয় যে, কোন এক কালে তুমি কোন গুরুর সান্নিধ্য ও দীক্ষালাভ করেছিলে । নাহলে, কিভাবে এই বিবেকের বৃত্তি গুলাে আসে ? বিচ্যুতি কখনােই সজ্ঞানে হয় না। আবার বিবেকের নির্দেশও আসে তােমার প্রচেষ্টা ছাড়াই। সুতরাং তােমার বিবেক ও বিচারের অন্তস্তলে মহাপুরুষেরা সূক্ষ্ম বিরাজ করছেন। সেই বিবেকের কেন্দ্রেই তােমার গুরু বর্তমান।
জিজ্ঞাসা :– আমাদের ধারণা, সম্মিলিত নীতিশিক্ষাই আমাদের ন্যায়-অন্যায় সম্বন্ধে সচেতন করে, পূর্বজন্মে কোন গুরুর দীক্ষাশক্তির দ্বারা নয়, বিশেষ করে যে গুরুকে আমরা এই জন্মে দেখিনি।
মীমাংসা :– তােমাদের এই বিচারকে আরও গভীরে নিয়ে যাও। আবেগ ও অনুভূতি অনিয়ন্ত্রিত হলে প্রত্যয় শিথিল হয়। বিচ্যুতির প্রধান কারণ ইন্দ্রিয়াসক্তি। তােমার ইচ্ছা ও বিচারের উপর যদি তােমার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকতাে, তাহলে বিচ্যুতির মুহূর্তে নিজেকে শাসন করতে পারলে না কেন? কারণ মােহ তােমার বিবেকের শক্তিকে সাময়িকভাবে সুপ্ত করে দেয়। পরে তােমার চিত্তে গুরুরূপী বিবেকের বৃত্তি জাগে এবং তখন তুমি নিজের ভুল বুঝতে পারাে। এতেই প্রমাণ হয় যে, গুরু ব্যক্তিগতভাবে তােমাকে দীক্ষা ও নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোন এক কালে –কোন এক জন্মে । কেউ অবিবেকী, কারুর বিবেক সজাগ—এই তারতম্যের কারণ কি ? সুতরাং তােমার বিশ্বাস ভুল নয়, গুরুর কাছে ব্যক্তিগতভাবে দীক্ষা না নিলে আধ্যাত্মিক উন্নতি হওয়া অসম্ভব। কিন্তু তােমাদের বিবেকের ভূমিকা বিচার করলে বােঝা যায় যে, পূর্ব পূর্ব জন্মে তােমাদের দীক্ষা হয়ে গেছে, এমন এক সময়ে যখন গুরু নিজ শরীরে ছিলেন। … [ক্রমশঃ]
এই অবস্থায় ভারত সরকার (বৃটিশ অধীনস্থ)-এর পুলিশ এবং মিলিটারিরা উভয়পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করতে ওখানে পৌঁছেছিল। কিন্তু তারাও নিরীহ অসহায় জনজাতি দের উপর অত্যাচার শুরু করে দিল। এতো বিষম বিপদ! স্বামীজী হায়দ্রাবাদে গিয়ে ওখানকার মিলিটারি মেজর জেনারেলের সাথে দেখা করলেন। মেজর জেনারেল চৌধূরী বাঙালি ছিলেন_তিনি সমস্ত ব্যাপারটা বুঝলেন এবং অন্যান্য বড় বড় মিলিটারি অফিসারদের ঐ অঞ্চলে পাঠানো হোল অবস্থা সামাল দেবার জন্য। স্বামীজী ঐ অফিসারদের সঙ্গে করে নিয়ে উপজাতিদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে _ তাদের মন থেকে ভয় দূর করলেন এবং এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনলেন।
এইসময় স্থানীয় জনজাতিদের অনেকে এবং পেরেন্টাপল্লীর বাইরের শিক্ষিতদের মধ্যেও বহুজন স্বামীজীর শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিল। তিনি এত শত কাজের মধ্যেও তাঁর দীক্ষিতদের আধ্যাত্মিক উন্নতির ব্যাপারে খুবই যত্নশীল ছিলেন। সকলকে নিয়ে তিনি আশ্রমে সকাল সন্ধ্যায় প্রার্থনা বা উপাসনা করতেন। আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে ভক্তজনের মনের জটিলতা দূর করার ব্যাপারে উনি সদা-উদযোগী ছিলেন। তাছাড়াও তিনি সকলকেই সাধন-ভজন করার ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিতেন। নির্জন-নিরিবিলি স্থানে ধ্যান করার ধারণা —-ঐ জনজাতির মধ্যে স্বামীজীই প্রথম তৈরি করেছিলেন। স্বামীজীর শিষ্য-ভক্তরা ঐভাবে সাধন করার কিছু কিছু ফলও পেতে থাকলো। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই ওনার সান্নিধ্যে আসা মানুষজন স্বামী বাউলানন্দজীকে শুধুমাত্র নেতা হিসাবে নয়,একজন প্রকৃত আধ্যাত্মিক গুরু হিসাবেও মেনে নিয়েছিল।।(ক্রমশঃ)
======= ======°============
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ _Spiritaul Enquiry_ ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :–আমরা আপনার কাছে জেনেছি যে, মানুষ যত অধ্যাত্মমুখী হবে তত মানবজাতি সার্বিক কল্যাণের পথে এগােবে। তার জন্য আমাদের আহার-বিহার ও কাণ্ডজ্ঞানের উপর দৃষ্টি রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যে, স্বভাবের উৎকর্ষতা আসা সম্ভব কোন ধর্মশিক্ষক বা মহান আচার্যদের মাধ্যমেই—যাদের আমরাবলি গুরু। আমাদের এই বিশ্বাস কি যথার্থ ?
মীমাংসা :– তােমাদের এই মহৎ বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে যথার্থ।
জিজ্ঞাসা :–তাহলে আমাদের ‘গুরু’ সম্বন্ধে কিছু বলুন।
মীমাংসা :– আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে বিচার করলে ‘শিক্ষক’ বা ‘আচার্য’র মত শব্দগুলাে ‘গুরু’ শব্দটির বিকল্প হতে পারে না। গুরুত্ব বিচার করলে শব্দগুলি তুলনীয়ও নয়, শিক্ষক বা আচার্যের চেয়ে গুরুর স্থান অনেক উঁচুতে। শিক্ষক তার ছাত্রকে শিক্ষাদান করেন। সেই দান সঠিকভাবে গ্রহণ হােল কি হােল না এগুলাে ছেড়ে দেওয়া হয় ছাত্রের উপর। কিছু কিছু ছাত্র পাঠগ্রহণে অসমর্থ এবং এই জন্যই তারা অনিচ্ছুক। কারুর আবার সামর্থ্য আছে, ইচ্ছা নেই। অনেকের সামর্থ্য ও ইচ্ছা থাকলেও, ধারাবাহিকতা মেনে চলতে পারে না। দেখা যাচ্ছে এরা কেউই শিক্ষক বা আচার্যের দ্বারা উপকৃত হয় না। অপারগতার দায় ছাত্রদের নিজেরদেই বহন করতে হয়। একমাত্র যারা সমর্থ, ইচ্ছুক ও নিষ্ঠাবান, তারাই শিক্ষকের কাছে উপকৃত হয়। এছাড়া, ছাত্ররা শুধুমাত্র শিক্ষকের মুখে শুনে বা লেখা পড়ে পাঠ নেয়, কে কতটা নিল সেটা নির্ভর করে তার নেওয়ার ক্ষমতার উপর ।
গুরুর ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। গুরুর মধ্যে থেকে প্রেম ও শক্তির প্রবাহ শিষ্যকে প্রেমিক ও শক্তিমান করে তােলে। তিনি যখন মৌন থাকেন, তখনও তার শরীর থেকে তার অনুভূতি, সদিচ্ছা ও সৎ সংকল্প প্রবাহিত হতে থাকে শিষ্যদের মধ্যে। শিষ্যের গ্রহণ করার ক্ষমতাও তিনি বাড়িয়ে দেন নিজের শক্তি দিয়ে । শিষ্যের আধার গঠন করে দেওয়া সম্পূর্ণ গুরুর দায়িত্ব। শিষ্যের উন্নতি ও উৎকর্ষতার ভার সম্পূর্ণভাবেই গুরুর উপর ন্যস্ত। তাই ‘গুরু’ শব্দটিই অত্যন্ত পবিত্র । শিক্ষকের মধ্যে থেকে যে জ্ঞান নির্গত হয়, ছাত্ররা তার কিছুটা হয়ত গ্রহণ করে, বাকীটা হারিয়ে যায়। ছাত্রের গ্রহণ ক্ষমতা শিক্ষক তৈরী করে দেন না, কিন্তু গুরুকৃপার মধ্যে সেই সম্ভাবনা সব সময়ই বিদ্যমান। গুরু এবং শিক্ষকের মধ্যে এটাই সবচেয়ে উল্লেখ যােগ্য পার্থক্য।
জিজ্ঞাসা :– এখন পৃথিবীতে সেরকম ধরণের গুরুরা কি আছেন ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, অবশ্যই আছেন। এই পৃথিবী কখনােই গুরুশূন্য হয় না। গুরুরা নিজের শরীরে থাকেন বলেই শিক্ষকেরা আধ্যাত্মিক নীতি-শিক্ষা দান করে থাকেন এবং ছাত্ররাও সেই শিক্ষা নেওয়ার জন্য উৎসাহিত ও উদ্যোগী হয়।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ‘শিষ্য’ ও ‘ছাত্র’ শব্দ দুটির মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই।
মীমাংসা :– না, দুটো শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা। শিষ্যরা জানে তারা কোন শক্তির দ্বারা শিষ্য হয়ে উঠেছে, ছাত্রদের কিন্তু সে ধারণা নেই। ছাত্ররা যখন তাদের বর্ধিত গ্রহণ ক্ষমতার রহস্য জানতে পারে, তখনই তারা শিষ্য হয়ে উঠবে, তার আগে নয়।
জিজ্ঞাসা :– গুরু এবং শিষ্যের মধ্যে পার্থক্য কি ?
মীমাংসা :– দুটো পৃথক শরীর মাত্র, এছাড়া কোন পার্থক্য নেই।
জিজ্ঞাসা :–কি রকম ?
মীমাংসা :– প্রথমে গুরুর শক্তি শিষ্যের মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে এবং সেই শক্তির সাহায্যে শিষ্যের গ্রহণ ক্ষমতাও বাড়ে। ব্যক্তির মধ্যে যে নিজস্ব শক্তি আছে, সেই শক্তি গুরুর সাহায্যে উর্ধ্বমুখী হয়। ধীরে ধীরে তার আস্বাদন ও প্রবণতা গুরুর সাথে তাকে অভিন্ন করে তোলে। তখন গুরু ও শিষ্যের মধ্যে যে পার্থক্য বা দুরত্ব, তা অন্তর্হিত হয়। তখন দুজনেই এক, শরীরেই শুধু পৃথক।
জিজ্ঞাসা :–পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস আছে যে, আধ্যাত্মিক পথে এগােতে গেলে প্রথমেই দীক্ষা নিতে হবে। দীক্ষার তাৎপর্য সম্বন্ধে আপনার কাছে বিশদভাবে জানতে চাই।
মীমাংসা :– এই আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়–’দীক্ষা’ শব্দটির তাৎপর্য হল আধ্যাত্মিক আধার গঠন। যেটা নির্ভর করে গুরুর উপর। আধ্যাত্মিক নির্দেশ বা শিক্ষা কতটা গ্রহণ হােল বা মেনে চলা হােল সেটা নির্ভর করে ছাত্রের যােগ্যতার উপর । আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও আধ্যাত্মিক নির্দেশ এ দুটি আলাদা। নির্দেশ পালনের সামর্থ্য আসে দীক্ষার মাধ্যমে।
জিজ্ঞাসা :– আমাদের ধারণা যে, আগ্রহ থাকলে আমরা আধ্যাত্মিক শিক্ষক খুঁজে নিয়ে তার কাছে নির্দেশ পেতে পারি, কিন্তু নিজেদের চেষ্টায় গুরুকে খুঁজে নিয়ে দীক্ষা পাওয়া বােধহয় সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কি করণীয় ?
মীমাংসা :– এ কথা সত্য যে, শিক্ষকদের খুঁজে বের করা সম্ভব, কিন্তু গুরুকে নিজের চেষ্টায় খুঁজে পাওয়া যায় না। সে চেষ্টা করার প্রয়ােজনও নেই, কারণ তিনিই তােমাকে খুঁজে নেবেন। মহাপ্রকৃতির উদ্দেশ্য সফল করার জন্যই এটাও গুরুর দায়িত্ব।
জিজ্ঞাসা :–একজন শিক্ষক যেহেতু তার বাক্য ও লেখনীর মাধ্যমে শিক্ষা দান করেন, তাই তাকে চেনা সহজ। কিন্তু গুরু, যিনি নিজের অনুভূতি ও ইচ্ছার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চার করেন, তাকে কি করে চেনা সম্ভব ?
মীমাংসা :– একজন শিক্ষককে যেভাবে চেনা যায়, ঠিক সেইভাবে নিজের দীক্ষাগুরুকে চেনা যায় না ঠিকই কিন্তু তােমার গুরু যদি তুমি নাও চেনাে, তুমি (পূর্বজন্মে ) দীক্ষিত কিনা সেটা জানার ক্ষমতা তােমার অবশ্যই আছে।
জিজ্ঞাসা :– কিভাবে সেটা সম্ভব ?
মীমাংসা :– পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা ঈশ্বর সম্বন্ধে শ্রদ্ধাশীল। জগতে সৃষ্ট সমস্ত কিছুর প্রতি তাদের ভালবাসা আছে—মানবজাতির প্রতিও, যেহেতু তারা মনে করে যে, সবই ঈশ্বরের প্রকাশ। সেই একই কারণে জীবের দুঃখ-কষ্ট দেখলে তাদের মন ব্যথিত হয়, সেই কষ্ট লাঘবের জন্য তারা কিছু করতে পারুক বা নাই পারুক। এরা (পূর্ব জন্মে) দীক্ষিত, এদের গুরু আছে।
এমন মানুষও আছে ঈশ্বর সম্বন্ধে যাদের কোন শ্রদ্ধা নেই। জগতের প্রতি তাদের ভালবাসা আংশিক ও বাসনাপ্রসূত। অপরের দুঃখ-কষ্ট দেখে তারা ব্যথিত হয় না। এরা কোন শিক্ষকের কাছে হয়তাে আধ্যাত্মিক নির্দেশ পেয়েছে কিন্তু গুরু পায়নি।
আবার একদল আছে, যাদের ঈশ্বর সম্বন্ধে শ্রদ্ধাও নেই, অশ্রদ্ধাও নেই এবং ঈশ্বর সম্বন্ধে কোন ব্যাপারেই এদের কোন আগ্রহ নেই। গুরুর নির্দেশ বা আচার্যের শিক্ষা, কোনটাই পায়নি এরা। একটু আত্মসমীক্ষা করলেই তুমি বুঝতে পারবে যে, এই তিন শ্রেণীর মধ্যে কোনটাতে তুমি পড়াে।
জিজ্ঞাসা :– আমাদের ধারণা যে আমরা প্রথম শ্রেণীতে পড়ি, অর্থাৎ আমরা দীক্ষিত। কিন্তু শুধু সেইটুকু জেনেই সন্তুষ্ট হতে পারছি না। যিনি আমাদের দীক্ষা দিয়েছেন, তাকে জানার কোন উপায় আছে কি, তার জন্য আমরা অত্যন্ত আগ্রহী ও ব্যাকুল।
মীমাংসা :– অবশ্যই, তুমি জানতে পারাে কে তােমার গুরু আর সরাসরি ও স্পষ্টভাবে তা জানার ক্ষমতা তােমার আছে।
জিজ্ঞাসা :– কিভাবে ?
মীমাংসা :– সাধারণভাবে সব মানুষেরই জীবনে কোন সংকল্প থাকে। ঠিক হােক্ ভুল হােক্, তারা একটা নির্দিষ্ট গতিতে সেই উদ্দেশ্যকে সাধন করার চেষ্টা করে। তারা মনে মনে ঠিক করে নেয়, ‘আমি এইভাবে চলবাে, এইভাবে ভাববাে, এইভাবে কাজ করবাে—যাতে করে আমার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি’। কিন্তু কেউই ধারাবাহিকভাবে তাদের কাজ-কর্মে, আচরণে ও ব্যবহারে সঙ্গতি রাখতে পারে না। অন্য কেউ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে তবেই তারা নিজেদের বিচ্যুতি সম্বন্ধে জানতে পারে। জানতে পারলেও, সে ব্যাপারে সচেতন হতে ওদের অনেক সময় লেগে যায়, কয়েক মাস বা কয়েক বছরও কেটে যেতে পারে। কেউ কেউ নিজে থেকেই বুঝতে পারে, অন্য কাউকে দেখিয়ে দিতে হয় না। তবু তাদের বিচ্যুতি বুঝতে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ লেগে | যেতে পারে। কেউ হয়তাে কয়েক সেকেণ্ড বা কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজের চেষ্টায় নিজের ভুলটুকু বুঝতে পারে ।
এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর যারা, অর্থাৎ অপরে দেখিয়ে দিলে যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে, তাদের নিজেদের সংশােধনের প্রবৃত্তি বা প্রবণতা থাকে না। দ্বিতীয় শ্রেণীর লােকেরা নিজেদের সঠিক পথে চালিত করার ইচ্ছা রাখে, কিন্তু চেষ্টার ঘাটতি দেখা যায়। চেষ্টা ও ব্যর্থতার জের চলতে থাকে বহুদিন।
তৃতীয় শ্রেণীর লােকদের বিবেক জাগ্রত। তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নিজেদের ত্রুটি সংশােধন করার জন্য তৎপর হয় এবং অচিরেই তারা সফল হয়।
প্রথম শ্রেণীর লােকেরা কোনদিন আধ্যাত্মিক শিক্ষা পায়নি, দীক্ষাগুরুও লাভ হয়নি। দ্বিতীয় শ্রেণীর লােকেরা আধ্যাত্মিক শিক্ষা পেয়েছে, কিন্তু গুরুলাভ হয়নি। গুরুকৃপা নেই বলেই ইচ্ছা থাকলেও তারা নিজেদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারে না। তৃতীয় শ্রেণীর লােকেরা দীক্ষিত। তাই তারা খুব সহজেই নিজেদের সামান্য বিচ্যুতি সনাক্ত করতে পারে ও সফল ভাবে নিজেদের ত্রুটি সংশােধন করতে পারে ।
দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষের অবচেতন মনে আধ্যাত্মিক শিক্ষার স্মৃতি অলক্ষ্যে কাজ করে চলে, তাই তারা দেরীতে হলেও নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু গুরুশক্তির অভাবে তাদের মধ্যে প্রচেষ্টা ও নিষ্ঠার অভাব দেখা যায়। তৃতীয় শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দৃঢ় চরিত্র ও জাগ্রত বিবেকের পিছনে কাজ করছে যেমন আধ্যাত্মিক শিক্ষার স্মৃতি, তেমনি গুরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তি ।
এইভাবে প্রতি মুহুর্তে আত্ম-সমীক্ষা করে যাবে ৷ যখনই বিচ্যুতি হবে, দেখবে, কে যেন অন্তর থেকে তােমাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। প্রায় বিস্মৃত কোন বাণী বা কারুর নাম বা রূপ তােমার চিত্তপটে ভেসে আসছে এবং তােমাকে সঠিক পথে চলার জন্য অনুপ্রাণিত করছেন। নিশ্চিত জেনো, তিনিই তােমার ‘গুরু’ ।
জিজ্ঞাসা :– এই ধরণের অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায়শই হয়। কিন্তু সেই সময়ে স্মৃতিপটে যার বা যাদের নাম, রূপ বা বাণী ভেসে ওঠে, তারা কেউই আর ইহজগতে নেই, এককালে ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কী করা উচিত ?
মীমাংসা :– এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই, এটা খুবই স্বাভাবিক। তাঁকেই তােমার গুরু হিসেবে স্বীকার করাে, মনে কোন দ্বিধা রেখাে না।
জিজ্ঞাসা :– কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যে, ব্যক্তি গতভাবে গুরুর কাছে দীক্ষা নেওয়া উচিত, তবেই দীক্ষার ফল পাওয়া যায়। আপনার ব্যাখ্যার সাথে এই বিশ্বাসের সামঞ্জস্য করবাে কি করে ?
মীমাংসা :– তােমাদের বিশ্বাসে কোন ভুল নেই এবং এ বিশ্বাসের সাথে উক্ত ব্যাখ্যা অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। তােমার মধ্যে বিশেষ বিশেষ সময়ে যে কোন নাম-রূপ বা মহাবাক্যের স্মৃতি জেগে ওঠে এবং তােমার বিচ্যুতিকে সংযত করার প্রয়াস পায়—এতে প্রমাণিত হয় যে, কোন এক কালে তুমি কোন গুরুর সান্নিধ্য ও দীক্ষালাভ করেছিলে । নাহলে, কিভাবে এই বিবেকের বৃত্তি গুলাে আসে ? বিচ্যুতি কখনােই সজ্ঞানে হয় না। আবার বিবেকের নির্দেশও আসে তােমার প্রচেষ্টা ছাড়াই। সুতরাং তােমার বিবেক ও বিচারের অন্তস্তলে মহাপুরুষেরা সূক্ষ্ম বিরাজ করছেন। সেই বিবেকের কেন্দ্রেই তােমার গুরু বর্তমান।
জিজ্ঞাসা :– আমাদের ধারণা, সম্মিলিত নীতিশিক্ষাই আমাদের ন্যায়-অন্যায় সম্বন্ধে সচেতন করে, পূর্বজন্মে কোন গুরুর দীক্ষাশক্তির দ্বারা নয়, বিশেষ করে যে গুরুকে আমরা এই জন্মে দেখিনি।
মীমাংসা :– তােমাদের এই বিচারকে আরও গভীরে নিয়ে যাও। আবেগ ও অনুভূতি অনিয়ন্ত্রিত হলে প্রত্যয় শিথিল হয়। বিচ্যুতির প্রধান কারণ ইন্দ্রিয়াসক্তি। তােমার ইচ্ছা ও বিচারের উপর যদি তােমার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকতাে, তাহলে বিচ্যুতির মুহূর্তে নিজেকে শাসন করতে পারলে না কেন? কারণ মােহ তােমার বিবেকের শক্তিকে সাময়িকভাবে সুপ্ত করে দেয়। পরে তােমার চিত্তে গুরুরূপী বিবেকের বৃত্তি জাগে এবং তখন তুমি নিজের ভুল বুঝতে পারাে। এতেই প্রমাণ হয় যে, গুরু ব্যক্তিগতভাবে তােমাকে দীক্ষা ও নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোন এক কালে –কোন এক জন্মে । কেউ অবিবেকী, কারুর বিবেক সজাগ—এই তারতম্যের কারণ কি ? সুতরাং তােমার বিশ্বাস ভুল নয়, গুরুর কাছে ব্যক্তিগতভাবে দীক্ষা না নিলে আধ্যাত্মিক উন্নতি হওয়া অসম্ভব। কিন্তু তােমাদের বিবেকের ভূমিকা বিচার করলে বােঝা যায় যে, পূর্ব পূর্ব জন্মে তােমাদের দীক্ষা হয়ে গেছে, এমন এক সময়ে যখন গুরু নিজ শরীরে ছিলেন। … [ক্রমশঃ]
