স্বামী বাউলানন্দজী ছিলেন একজন বিশ্ব নাগরিক। তাঁর চিন্তা ভাবনা, তাঁর বক্তব্য ও রচনাসমূহের কোনটাই একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকতো না_তা স্থানের গন্ডি_দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে কখন যেন আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতো। জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির জনগণ_যারা পরমানু অস্ত্রের বলি হয়েছিল তাদের জন্য দুঃখপ্রকাশ করতে গিয়ে তিনি চোখের জল ফেলতেন, তেমনি তিনি তৎকালীন সময়ে নির্যাতিত উপজাতি সমূহ যেমন_কঙ্গোর লামাম্বা বা আমেরিকার কালো মানুষদের জন্যও তাঁর হৃদয়ের কষ্টের কথা উপস্থিত জনেদের কাছে ব্যক্ত করতেন। যেখানেই কোন সাধারণ মানুষের প্রতি নির্যাতনের ঘটনা ঘটতো_তিনি সেটার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোতে কসুর করেননি। তাঁর মধ্যে পূর্ণ জ্ঞান, পূর্ণ প্রেমের বিকাশ যেমন ছিল, তেমনি তাঁর মধ্যে ছিল ঈশ্বরীয় শক্তির প্রকাশ।
মানুষ হিসাবে বিচার করলেও স্বামী বাউলানন্দজী বহু গুণসম্পন্ন ছিলেন। তিনি একাধারে যেমন ছিলেন আধ্যাত্মিক পুরুষ_তাছাড়াও তিনি ছিলেন সুলেখক, সুবক্তা,দক্ষ সংগঠক আরো অনেক কিছু। স্বামী বাউলানন্দজী অশিক্ষিত উপজাতিদের সঙ্গে এবং মিলিটারি কম্যান্ডার অথবা সমগ্র স্টেটের যিনি গভর্ণর__সকলের সাথে সমানভাবে আলোচনায় বসা এবং তাদের সকলকে motivate করে কোন কল্যানমূলক কাজ করিয়ে নিতে পারতেন। তৎকালীন শিক্ষিত মানুষেরা এমনকি মিলিটারি অফিসারেরাও তাঁর কথার মধ্যে জীবনে এগিয়ে চলার পথে নতুন দিশা খুঁজে পেতেন। স্বামীজী অক্লেশে ধনীর ঘরে দীর্ঘদিন ধরে রাজকীয়ভাবে থাকা বা খাওয়া করতে পারতেন, আবার দরিদ্রদের সাথে অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে, ছেঁড়া চাটাইয়ে বা পাথরের উপরে শুয়েই বহুদিন কাটিয়ে দিতে পারতেন। চরম শীতে অনেক সময়ই খালি গায়ে তাঁকে কাটাতে দেখা গেছে, আবার চরম গ্রীষ্মকালে হয়তো তিনি সিল্কের পোষাক পড়ে সারাদিন কাটিয়ে দিতেন।।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquairy ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :—আচার-অনুষ্ঠানের উৎস কি ?
মীমাংসা :–মানবিক অবক্ষয়।
জিজ্ঞাসা :–এই অবক্ষয় শুরু হয় কিভাবে ?
মীমাংসা :– যখন মানুষের সমাজে অতি-সংগ্রহের ঝোঁক বাড়ে এবং মানুষ নির্বিচারে জনসংখ্যা বাড়িয়ে চলে তখন এটা শুরু হয়। এই প্রবণতাকে সামলাতেই রাজনীতির জন্ম হয়েছে।
জিজ্ঞাসা :—আজও যে আচার-অনুষ্ঠানের ধারা অব্যাহত রয়েছে, এর কারণ কি ?
মীমাংসা :—এর কারণ প্রথাগত ধর্ম আন্দোলন।
জিজ্ঞাসা :—প্রথাগত ধর্ম আন্দোলন বা কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অনেক আগেই মানবিক অবক্ষয় শুরু হয়ে গেছে। তবু আজও যে অনাবশ্যক আচার-অনুষ্ঠান মানুষের জীবনকে শাসন করে চলেছে, এর জন্য কি প্রথাগত ধর্ম-আলােচনাকে দায়ী করা যায় ?
মীমাংসা :—অবক্ষয়ের জন্যই আচার-অনুষ্ঠান প্রবল হয়ে ওঠে, এ কথা সত্য, কিন্তু প্রথাগত ধর্ম আন্দোলনগুলির উপর একটা দায়িত্ব ও কর্তব্য ন্যস্ত ছিল এবং তা হােল মানব সমাজকে সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে তাকে সভ্যতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নীতি, কল্যাণ ও মূল্যবােধের আধার তৈরী করা উচিত ছিল ধর্মের । কিন্তু ধর্ম এই কাজে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ‘ধর্ম’ হয়ে উঠেছে স্বার্থপর, আর আচার-অনুষ্ঠানের সাথে স্বার্থপরতার সম্পর্কটা যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ। যেহেতু ধর্ম আন্দোলন ঈশ্বরের নামে বা কোন বিখ্যাত মহাপুরুষের নাম নিয়ে প্রচার হয়, ‘আচারিক’ ও ‘উদার’ এই দু-ধরণের মানুষই প্রথাগত ধর্মের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেছে। যে সমস্ত স্বার্থপর মানুষ লৌকিক আচারে বিশ্বাসী, তারা বহু গ্রন্থ লিখেছে ও আরও নতুন নতুন, আচার-অনুষ্ঠানের নাম ও প্রক্রিয়া সংযােজন করেছে। এগুলােও তারা করেছে ধর্ম ও মহাপুরুষদের নাম নিয়ে, যারা আচারে আস্থাশীল নয়, তাদের নিজেদের দলে টানবার উদ্দেশ্যে । এর পরিণতিতে আজ সংখ্যাগরিষ্ঠের মনে একটা ভুল ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, ধর্ম মানে পালনীয় আচার-অনুষ্ঠানের ফিরিস্তি। তাই, এ কথা মানতেই হবে যে, আজও যে গোঁড়ামি, সংস্কার, অবাস্তব রীতি-রেওয়াজের এত প্রাবল্য, এর কারণ, প্রথাগত ধর্ম-আন্দোলন।
জিজ্ঞাসা :–আমাদের মনে হয় যে, যদিও আচার-এর পিছনে রয়েছে স্বার্থবুদ্ধি, তবু আচারিক ক্রিয়াকাণ্ডের ফল যদি ঈশ্বরকে নিবেদন করা হয়, তবে সে কর্মে আর স্বার্থের কলুষ থাকে না। আমাদের ধারণা কি ঠিক ?
মীমাংসা :– বিষয়টি জটিল। বিষয়টির পাঁচটা দিক আছে ? প্রথমতঃ, তুমি নিজে ( যে আচার পালন করছে ), দ্বিতীয়তঃ, তােমার স্বার্থপরতা, তৃতীয়তঃ যে আচারটি তুমি পালন করছাে, চতুর্থতঃ, তার ফল এবং পঞ্চমতঃ, ঈশ্বর। যে যুক্তিতে তুমি বলছ যে আচারিক কর্ম ঈশ্বরকে নিবেদন করতে হবে, সেই যুক্তি অনুযায়ী কর্মের হােতা তুমি। কর্তা ও কর্ম এক্ষেত্রে একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্য। ঈশ্বরকে কর্মফল অর্পণ করলে সেই কর্মের অহংপ্রসূত বন্ধন কেটে যায় বটে, কিন্তু তার ফল তােমায় ছাড়বে না, যেহেতু সেই কর্মের পিছনে তােমার স্বার্থ ছিল। অর্থাৎ প্রারব্ধ তােমাকে ভােগ করতে হবেই, শুধু এক্ষেত্রে তুমি নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারবে এই ভেবে যে, তাঁরই কর্ম, তিনিই করিয়েছেন আর এখন তিনিই ভােগ করাচ্ছেন।
জিজ্ঞাসা :—বিষয়টিকে যদি আপনি অন্যান্য দিক থেকে আরও বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করেন, তবে বুঝতে সুবিধে হয়।
মীমাংসা :–কোন অনুষ্ঠান বা আচার পালন করার সময় তুমি কী বলো ? “আমি, শ্রী অমুক চন্দ্র অমুক, শ্রী তমুক চন্দ্র তমুকের সন্তান, এই ঠিকানায় বসবাস করি, এই বছরের এই তারিখে, এই বিশেষ আচারটুকু পালন করছি, হে ঈশ্বর, সম্মান বা স্বর্গ বা মুক্তি ইত্যাদি পাওয়ার জন্য এবং এর ফলটুকু আমি তােমাকে অর্পণ করছি।” কথাগুলি উচ্চারণের সাথে সাথে নিশ্চয়ই তার ভাবটিও সঙ্গতিপূর্ণ হবে। অনেক ক্ষেত্রেই সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, তার, নদী, সমুদ্র ইত্যাদিকে সাক্ষী মানা হয়, পুরাে প্রক্রিয়াটাতে মহাবিশ্বের স্বাক্ষর দেবার জন্য। এর দ্বারা কর্মফল আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে। কারণ, কর্মের মূল ভাবটি হােল স্বার্থপরতা।
জিজ্ঞাসা :—ধরে নিন যদি আচারটা এমনই হয় যেটা আমি নিজের কোন স্বার্থসিদ্ধির জন্য পালন করছি না বরং জগতের সকলের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করে পালন করছি এবং সেই ক্রিয়াকাণ্ড যদি ঈশ্বরকে নিবেদন করি, তখন সেই কর্মের ফল কি আমার উপর বর্তাবে ?
মীমাংসা :— বর্তমানে এমন কোন আচার বা বৈধী অনুষ্ঠান নেই যার দ্বারা জগতের উর্ধ্বমুখী গতি হতে পারে। উর্ধ্বমুখী গতি ছাড়া জগতের কল্যাণ সম্ভব নয় ।
জিজ্ঞাসা :– আমরা আপনার কাছে জানতে আগ্রহী যে, এমন কী আচার বা প্রক্রিয়া আছে যার দ্বারা সামগ্রিকভাবে জগতের উর্ধ্বগতি সম্ভব ?
মীমাংসা :— আচার বা অনুষ্ঠানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে যে ‘আমরা সকলে মিলে করছি’ (অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতি) এবং ‘আমরা সকলের জন্য করছি’ ( অর্থাৎ সমগ্র জগতের জন্য )। প্রত্যেকের অধিকার থাকবে সেই অনুষ্ঠানে যােগ দেবার । অংশগ্রহণকারী সকলের ভাবটাও যেন ব্যক্তিগত না হয়ে সামগ্রিক হয়। এখানে ‘আমি’, ‘আমার বংশ পরিচয়’, স্থান, কাল, পাত্র বা কোন্ দেবতাকে যদি সাক্ষী করা হয়—তবে বিষয়গুলি যেন নিতান্তই গৌণ বলে বিবেচনা করা হয়। এই কর্মের ফল ঈশ্বরকে অর্পণ করার কোন প্রয়ােজন নেই, যেহেতু এই ধরণের কর্মের ফল স্বতঃই ঈশ্বরের অভিপ্রায়, এতে কোন স্বার্থবুদ্ধি নেই কারণ এতে নিহিত আছে মহাবিশ্ব-চেতনার সার্বিক উদ্দেশ্য ।
জিজ্ঞাসা :– পশুবলি বা রক্তপাতের দ্বারা কি এই ধরণের আচারপালন সম্ভব ?
মীমাংসা :– না সেটা সম্ভব নয়, প্রাণীহত্যা পুরােপুরি অধ্যাত্ম বিরােধী।
জিজ্ঞাসা :—আমরা জানি যে, স্থান-কাল-পাত্র, পরিবেশ ও জীবনচর্যা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের পশুবলির ব্যবস্থা আছে, হাঁস, মুরগী, ভেড়া, শুয়াের, গরু, ষাঁড়, ঘােড়া, উট –এমনকি নরবলিও হয় । আমাদের বলা হয় যে, বলি প্রাপ্ত পশুর স্বর্গলাভ হয় এবং যিনি সেই আচার-অনুষ্ঠানের হােতা, তারও মনস্কামনা পূর্ণ হয় । ওরা আরও বলেন যে এই সমস্ত ক্রিয়াকলাপের কিছু নির্দিষ্ট বিধি, পদ্ধতি ও প্রণালী আছে, যেগুলাে নিষ্ঠার সাথে পালন করলে একধরণের গুপ্ত শক্তির সঞ্চার হয়। সেই শক্তিতেই বলিতে বধ হওয়া প্রাণীটি সরাসরি স্বর্গে যায় এবৎ ঐ কর্মের মূল যে সংকল্প, সেটাও সিদ্ধ হয়।
মীমাংসা :– আগেই বলা হয়েছে যে, এরকম ধরনের আচার-অনুষ্ঠান অত্যন্ত ঘৃণিত এবং চরম অমানবিকতার পরিচয় বহন করে। ওঁদের মতে ওসব নিয়ম ও বিধিবদ্ধ আচার-অনুষ্ঠান পালন করা প্রয়ােজন কারণ তাদের নিজেদের কিছু বাসনা চরিতার্থ করার প্রয়ােজন আছে। সেই বাসনাগুলাে স্থূল ও জাগতিক এবং ঐ বলি প্রদত্ত প্রাণীগুলাের জন্যেও তাদের বাসনা আছে ; পশুগুলো যেন নির্বিঘ্নে স্বর্গলাভ করে। নিজেদের জন্য তাে বটেই, অপরের জন্যেও বাসনা করার অধিকার তারা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সমস্যা হচ্ছে, ঐ পশুগুলাে কিন্তু অপরের হাতে ঐভাবে নিহত হবার বাসনা রাখে না কিংবা স্বর্গে যাবার ব্যাপারেও তাদের কোন ব্যাকুল আগ্রহ এখনও নেই। বিষয়টিকে এই দিক দিয়ে ভেবে দেখতে হবে।
বিচার করে দেখ, কোন্ চাওয়াটা বড় ? স্বর্গে যেতে চাওয়াটা বড় না জাগতিক কিছু প্রত্যাশাটা বড় ? পণ্ডিতেরাও নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, স্বর্গলাভ অনেক বড় লাভ । তাহলে সেই স্বর্গ নিজেদের জন্য না চেয়ে অপরের জন্য চাইতে যাচ্ছেন কেন ? নিজেদের চেয়েও তারা কি ঐ পশুগুলােকে বেশী ভালবাসেন? না। যারা অপরকে হত্যা করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করেন, তাদের মধ্যে সেরকম ধরনের কোন মহানুভবতা থাকতে পারে না। তারা যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, এ ধরণের অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বলিতে নিহত পশুগুলাের স্বর্গপ্রাপ্তি হয়, তাহলে তারা নিজেরা স্বর্গবাস কামনা করে নিজেদেরই শরীরটাকে আগে বধ করতে পারেন বা অন্য কাউকে দিয়ে কাজটা করাতে পারেন। কিন্তু সেটা তারা করেন না। কেন ? কারণ জাগতিক ভােগের প্রতি তাদের আসক্তি আছে। আসক্তি থাকে কেন? কারণ স্বার্থপরতা। স্বার্থপরতা মানবোচিত বৃত্তি নয়। যারা এই সমস্ত আচার-বিচারে মত্ত তারা আসলে পূর্বের মনুষ্যেতর অভ্যাসগুলিরই অনুসরণ করে চলেছে।
জিজ্ঞাসা :—তবে কি আমাদের ধরে নিতে হবে যে,.পশুগুলাের স্বর্গপ্রাপ্তি হওয়া দূরে থাক, যারা অনুষ্ঠান করছেন তাদেরও মনের ইচ্ছা পূরণ হবে না ?
মীমাংসা :– না, হবে না। যা অসম্ভব, তা কখনই হতে পারে না।
জিজ্ঞাসা :—কিন্তু কোন কোন মানুষের মধ্যে কিছু শক্তি বা ক্ষমতা দেখা যায়। তারা বলেন যে, এক বা একাধিক আচারপালন করেই তারা ঐসব শক্তির অধিকারী হয়েছেন। এর কি কোন ব্যাখ্যা আছে ?
মীমাংসা :–অর্জিত কোন গুণ বা ক্ষমতা একটা বিশেষ আচার সম্পন্ন করার ফল নয় বরং কিছু নিয়মিত অভ্যাস ও শৃঙ্খলার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। নিষ্ঠা বা অভ্যাসের একটি সম্ভাব্য পরিণতি –শরীরের অন্তঃস্থিত শক্তিকে অপচয় হতে না দেওয়া। সঞ্চিত শক্তি ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়ে আরও সূক্ষ্ম ও সূক্ষ্মতর হয়ে যায়। এবং তখন আমাদের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় আরও সংবেদনশীল ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এই শক্তির স্ফুরণ গুণগত বা মানগত নয় । সূক্ষ্ম জগতের স্পন্দন তাঁরা অন্তর্জগতে ও বর্হিজগতে পাবেন, এই ভাবেই তাদের মধ্যে কিছু শক্তি বা ক্ষমতার প্রকাশ দেখা যায় ।
যখন তাঁদের নিষ্ঠা কমে যাবে এবং অভ্যাস পালনে অনীহা আসবে তখনই সঞ্চিত শক্তি হ্রাস পাবে এবং তাদের মধ্যে তখন আর শক্তি বা ক্ষমতার চিহ্ন দেখা যাবে না। যদিও আচারগুলাে তখনও তারা পালন করে চলেছেন হয়ত, কিন্তু সেগুলাের সাথে তখন আর শক্তি সংরক্ষণ ও রূপান্তরের কোন যােগ নেই। তাই আচারসিদ্ধ মানুষের বিশেষ ক্ষমতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, বিধিবদ্ধ আচার-অনুষ্ঠানগুলি গৌণ, আসল কথা হল জীবনযাত্রা। আচার বা নিয়ম পালনে যে সিদ্ধি, তা স্থায়ী হয় না, কারণ শক্তির গুণগত রূপান্তর হয় না। কেন হয় না। কারণ স্বার্থবুদ্ধি নিয়ে সেই আচার পালন করা হয়। গুণগত রূপান্তর হলে সিদ্ধির প্রভাব থাকে চিরকাল ।
জিজ্ঞাসা :–প্রাণী হত্যা না করে ফুল-ফল বা অন্যান্য জিনিস নিবেদন করে যে আচারপালন করা হয়, সেগুলাের দ্বারা কি প্রত্যাশিত ফল লাভ করা যায় ?
মীমাংসা :—এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। ফল দেয় শক্তি, কোন বিধিবদ্ধ আচার নয় ।
জিজ্ঞাসা :—আপনি একটু আগে যে আদর্শ আচরণ ও প্রক্রিয়ার কথা বলেছিলেন, তার দ্বারা কি প্রত্যাশিত ফললাভ হয় ?
মীমাংসা :—যে আচার বা আচরণের পিছনে বাসনা আছে, তা অধ্যাত্ম কর্ম নয়। মানবতার জন্য বা জগৎ কল্যাণের জন্য যে উদ্যোগ ও অনুষ্ঠান করা হয়, একমাত্র সেটাই আধ্যাত্মিক কর্ম। ‘বাসনা’ ও ‘প্রয়ােজন’ এই দুটি শব্দের মধ্যে প্রভেদ আছে। কোন ব্যক্তি বা গােষ্ঠীর বাসনার প্রতিফলন আধ্যাত্মিক আচরণে হওয়ার কথা নয় । কারণ বাসনা মানেই তার পেছনে স্বার্থ আছে এবং এই স্বার্থকেই বকধার্মিকেরা কাজে লাগায় । কিন্তু ‘প্রয়ােজনের’ পিছনে স্বার্থ নেই। তাই আমার আলােচনায় যে আদর্শ আচরণের কথা বলা হয়েছে, তার দ্বারা প্রয়ােজনীয় ফল লাভ হবে ৷ কিন্তু ‘বাসনাকৃত’ ফল লাভ হবে না। এক্ষেত্রেও মূল বিষয়টি হচ্ছে শক্তির রূপান্তর, কিন্তু শুধু পরিমাণগত নয়, গুণগত বা মানগত। কারণ উদ্দেশ্য হােল মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ, আচারটুকু প্রতীকমাত্র ।
জিজ্ঞাসা :—বিষয়টা আমরা আরও ভালভাবে বুঝতে আগ্রহী।
মীমাংসা :—আধ্যাত্মিক আচার সবাইকে নিয়ে এবং সবার জন্য হয়, কাউকে বাদ দেওয়া হয় না। জাগতিক আচার শুধু নিজের জন্য, অন্যের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার একটা স্বার্থপর প্রয়াস মাত্র।
প্রতিটি অনুষ্ঠান বা আচারের পিছনে একটা ভাব থাকে এবং কোন আচার পালনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের সাথে সেই ভাবটি ওতপ্রােত। যে মুহুর্তে তুমি কোন নিঃস্বার্থ আচার পালনের সিদ্ধান্ত নিলে, সেই মুহূর্ত থেকেই তােমার মধ্যে একটি উদার ভাব সৃষ্টি হবে যেহেতু সেটা সকলের হয়ে এবং সকলকে নিয়ে সঙ্কল্পিত। তখন থেকেই তােমার চিন্তায় থাকবে মানবজাতির একতা, মানবজাতির সার্বিক প্রয়ােজন এবং সমস্ত প্রয়ােজনের মূলে নিহিত মঙ্গলবােধ। এই-ভাবে তােমার চিন্তাভাবনা, বুদ্ধি-বিবেচনা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির সীমানা বিস্তৃত হবে, ব্যাপ্তি আসবে। এতে তােমারই ভাল হবে। স্বভাব যত উৎকর্ষ হবে তত গুণগত রূপান্তর হবে শক্তির, পরিমাণগত রূপান্তর যথেষ্ট হােক বা না হােক। এইভাবে প্রয়ােজনীয় ফল পাওয়া সম্ভব যদি ভাবে নিঃস্বার্থপরতা থাকে। স্বার্থপর আচারই বল বা নিঃস্বার্থ অনুষ্ঠানই বল, ওগুলাে প্রতীক, মূল উদ্দেশ্য ও ভাবটাই আসল কথা। আচারের উদ্দেশ্যই হােল মানুষের মধ্যে একটা ভাব সৃষ্টি করা যাতে প্রাণশক্তির অপচয় না হয়। অপচয় বন্ধ হলেই, নির্দিষ্ট সময়ের পর শক্তির রূপান্তর ঘটবে। যদি স্বার্থসিদ্ধিই উদ্দেশ্য হয়, তবে রূপান্তরিত সূক্ষ্মশক্তি দিয়ে মানুষের দ্বারা কোন গঠনমূলক ভাল কাজ হবে না। আর ‘পরহিত’ যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে মানুষের স্বভাবে চরম উৎকর্ষতা ফুটে উঠবে এবং তার দ্বারা জগতে কিছু ভাল কাজ হবে। এই দ্বিতীয় রকমের আচার বা আচরণের প্রতি এই আলােচনায় সমর্থন জানানাে হয়েছে, কারণ সেগুলাে আধ্যাত্মিক পরম্পরার অনুসারী। … [ক্রমশঃ]
মানুষ হিসাবে বিচার করলেও স্বামী বাউলানন্দজী বহু গুণসম্পন্ন ছিলেন। তিনি একাধারে যেমন ছিলেন আধ্যাত্মিক পুরুষ_তাছাড়াও তিনি ছিলেন সুলেখক, সুবক্তা,দক্ষ সংগঠক আরো অনেক কিছু। স্বামী বাউলানন্দজী অশিক্ষিত উপজাতিদের সঙ্গে এবং মিলিটারি কম্যান্ডার অথবা সমগ্র স্টেটের যিনি গভর্ণর__সকলের সাথে সমানভাবে আলোচনায় বসা এবং তাদের সকলকে motivate করে কোন কল্যানমূলক কাজ করিয়ে নিতে পারতেন। তৎকালীন শিক্ষিত মানুষেরা এমনকি মিলিটারি অফিসারেরাও তাঁর কথার মধ্যে জীবনে এগিয়ে চলার পথে নতুন দিশা খুঁজে পেতেন। স্বামীজী অক্লেশে ধনীর ঘরে দীর্ঘদিন ধরে রাজকীয়ভাবে থাকা বা খাওয়া করতে পারতেন, আবার দরিদ্রদের সাথে অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে, ছেঁড়া চাটাইয়ে বা পাথরের উপরে শুয়েই বহুদিন কাটিয়ে দিতে পারতেন। চরম শীতে অনেক সময়ই খালি গায়ে তাঁকে কাটাতে দেখা গেছে, আবার চরম গ্রীষ্মকালে হয়তো তিনি সিল্কের পোষাক পড়ে সারাদিন কাটিয়ে দিতেন।।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquairy ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :—আচার-অনুষ্ঠানের উৎস কি ?
মীমাংসা :–মানবিক অবক্ষয়।
জিজ্ঞাসা :–এই অবক্ষয় শুরু হয় কিভাবে ?
মীমাংসা :– যখন মানুষের সমাজে অতি-সংগ্রহের ঝোঁক বাড়ে এবং মানুষ নির্বিচারে জনসংখ্যা বাড়িয়ে চলে তখন এটা শুরু হয়। এই প্রবণতাকে সামলাতেই রাজনীতির জন্ম হয়েছে।
জিজ্ঞাসা :—আজও যে আচার-অনুষ্ঠানের ধারা অব্যাহত রয়েছে, এর কারণ কি ?
মীমাংসা :—এর কারণ প্রথাগত ধর্ম আন্দোলন।
জিজ্ঞাসা :—প্রথাগত ধর্ম আন্দোলন বা কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অনেক আগেই মানবিক অবক্ষয় শুরু হয়ে গেছে। তবু আজও যে অনাবশ্যক আচার-অনুষ্ঠান মানুষের জীবনকে শাসন করে চলেছে, এর জন্য কি প্রথাগত ধর্ম-আলােচনাকে দায়ী করা যায় ?
মীমাংসা :—অবক্ষয়ের জন্যই আচার-অনুষ্ঠান প্রবল হয়ে ওঠে, এ কথা সত্য, কিন্তু প্রথাগত ধর্ম আন্দোলনগুলির উপর একটা দায়িত্ব ও কর্তব্য ন্যস্ত ছিল এবং তা হােল মানব সমাজকে সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে তাকে সভ্যতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নীতি, কল্যাণ ও মূল্যবােধের আধার তৈরী করা উচিত ছিল ধর্মের । কিন্তু ধর্ম এই কাজে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ‘ধর্ম’ হয়ে উঠেছে স্বার্থপর, আর আচার-অনুষ্ঠানের সাথে স্বার্থপরতার সম্পর্কটা যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ। যেহেতু ধর্ম আন্দোলন ঈশ্বরের নামে বা কোন বিখ্যাত মহাপুরুষের নাম নিয়ে প্রচার হয়, ‘আচারিক’ ও ‘উদার’ এই দু-ধরণের মানুষই প্রথাগত ধর্মের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেছে। যে সমস্ত স্বার্থপর মানুষ লৌকিক আচারে বিশ্বাসী, তারা বহু গ্রন্থ লিখেছে ও আরও নতুন নতুন, আচার-অনুষ্ঠানের নাম ও প্রক্রিয়া সংযােজন করেছে। এগুলােও তারা করেছে ধর্ম ও মহাপুরুষদের নাম নিয়ে, যারা আচারে আস্থাশীল নয়, তাদের নিজেদের দলে টানবার উদ্দেশ্যে । এর পরিণতিতে আজ সংখ্যাগরিষ্ঠের মনে একটা ভুল ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, ধর্ম মানে পালনীয় আচার-অনুষ্ঠানের ফিরিস্তি। তাই, এ কথা মানতেই হবে যে, আজও যে গোঁড়ামি, সংস্কার, অবাস্তব রীতি-রেওয়াজের এত প্রাবল্য, এর কারণ, প্রথাগত ধর্ম-আন্দোলন।
জিজ্ঞাসা :–আমাদের মনে হয় যে, যদিও আচার-এর পিছনে রয়েছে স্বার্থবুদ্ধি, তবু আচারিক ক্রিয়াকাণ্ডের ফল যদি ঈশ্বরকে নিবেদন করা হয়, তবে সে কর্মে আর স্বার্থের কলুষ থাকে না। আমাদের ধারণা কি ঠিক ?
মীমাংসা :– বিষয়টি জটিল। বিষয়টির পাঁচটা দিক আছে ? প্রথমতঃ, তুমি নিজে ( যে আচার পালন করছে ), দ্বিতীয়তঃ, তােমার স্বার্থপরতা, তৃতীয়তঃ যে আচারটি তুমি পালন করছাে, চতুর্থতঃ, তার ফল এবং পঞ্চমতঃ, ঈশ্বর। যে যুক্তিতে তুমি বলছ যে আচারিক কর্ম ঈশ্বরকে নিবেদন করতে হবে, সেই যুক্তি অনুযায়ী কর্মের হােতা তুমি। কর্তা ও কর্ম এক্ষেত্রে একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্য। ঈশ্বরকে কর্মফল অর্পণ করলে সেই কর্মের অহংপ্রসূত বন্ধন কেটে যায় বটে, কিন্তু তার ফল তােমায় ছাড়বে না, যেহেতু সেই কর্মের পিছনে তােমার স্বার্থ ছিল। অর্থাৎ প্রারব্ধ তােমাকে ভােগ করতে হবেই, শুধু এক্ষেত্রে তুমি নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারবে এই ভেবে যে, তাঁরই কর্ম, তিনিই করিয়েছেন আর এখন তিনিই ভােগ করাচ্ছেন।
জিজ্ঞাসা :—বিষয়টিকে যদি আপনি অন্যান্য দিক থেকে আরও বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করেন, তবে বুঝতে সুবিধে হয়।
মীমাংসা :–কোন অনুষ্ঠান বা আচার পালন করার সময় তুমি কী বলো ? “আমি, শ্রী অমুক চন্দ্র অমুক, শ্রী তমুক চন্দ্র তমুকের সন্তান, এই ঠিকানায় বসবাস করি, এই বছরের এই তারিখে, এই বিশেষ আচারটুকু পালন করছি, হে ঈশ্বর, সম্মান বা স্বর্গ বা মুক্তি ইত্যাদি পাওয়ার জন্য এবং এর ফলটুকু আমি তােমাকে অর্পণ করছি।” কথাগুলি উচ্চারণের সাথে সাথে নিশ্চয়ই তার ভাবটিও সঙ্গতিপূর্ণ হবে। অনেক ক্ষেত্রেই সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, তার, নদী, সমুদ্র ইত্যাদিকে সাক্ষী মানা হয়, পুরাে প্রক্রিয়াটাতে মহাবিশ্বের স্বাক্ষর দেবার জন্য। এর দ্বারা কর্মফল আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে। কারণ, কর্মের মূল ভাবটি হােল স্বার্থপরতা।
জিজ্ঞাসা :—ধরে নিন যদি আচারটা এমনই হয় যেটা আমি নিজের কোন স্বার্থসিদ্ধির জন্য পালন করছি না বরং জগতের সকলের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করে পালন করছি এবং সেই ক্রিয়াকাণ্ড যদি ঈশ্বরকে নিবেদন করি, তখন সেই কর্মের ফল কি আমার উপর বর্তাবে ?
মীমাংসা :— বর্তমানে এমন কোন আচার বা বৈধী অনুষ্ঠান নেই যার দ্বারা জগতের উর্ধ্বমুখী গতি হতে পারে। উর্ধ্বমুখী গতি ছাড়া জগতের কল্যাণ সম্ভব নয় ।
জিজ্ঞাসা :– আমরা আপনার কাছে জানতে আগ্রহী যে, এমন কী আচার বা প্রক্রিয়া আছে যার দ্বারা সামগ্রিকভাবে জগতের উর্ধ্বগতি সম্ভব ?
মীমাংসা :— আচার বা অনুষ্ঠানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে যে ‘আমরা সকলে মিলে করছি’ (অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতি) এবং ‘আমরা সকলের জন্য করছি’ ( অর্থাৎ সমগ্র জগতের জন্য )। প্রত্যেকের অধিকার থাকবে সেই অনুষ্ঠানে যােগ দেবার । অংশগ্রহণকারী সকলের ভাবটাও যেন ব্যক্তিগত না হয়ে সামগ্রিক হয়। এখানে ‘আমি’, ‘আমার বংশ পরিচয়’, স্থান, কাল, পাত্র বা কোন্ দেবতাকে যদি সাক্ষী করা হয়—তবে বিষয়গুলি যেন নিতান্তই গৌণ বলে বিবেচনা করা হয়। এই কর্মের ফল ঈশ্বরকে অর্পণ করার কোন প্রয়ােজন নেই, যেহেতু এই ধরণের কর্মের ফল স্বতঃই ঈশ্বরের অভিপ্রায়, এতে কোন স্বার্থবুদ্ধি নেই কারণ এতে নিহিত আছে মহাবিশ্ব-চেতনার সার্বিক উদ্দেশ্য ।
জিজ্ঞাসা :– পশুবলি বা রক্তপাতের দ্বারা কি এই ধরণের আচারপালন সম্ভব ?
মীমাংসা :– না সেটা সম্ভব নয়, প্রাণীহত্যা পুরােপুরি অধ্যাত্ম বিরােধী।
জিজ্ঞাসা :—আমরা জানি যে, স্থান-কাল-পাত্র, পরিবেশ ও জীবনচর্যা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের পশুবলির ব্যবস্থা আছে, হাঁস, মুরগী, ভেড়া, শুয়াের, গরু, ষাঁড়, ঘােড়া, উট –এমনকি নরবলিও হয় । আমাদের বলা হয় যে, বলি প্রাপ্ত পশুর স্বর্গলাভ হয় এবং যিনি সেই আচার-অনুষ্ঠানের হােতা, তারও মনস্কামনা পূর্ণ হয় । ওরা আরও বলেন যে এই সমস্ত ক্রিয়াকলাপের কিছু নির্দিষ্ট বিধি, পদ্ধতি ও প্রণালী আছে, যেগুলাে নিষ্ঠার সাথে পালন করলে একধরণের গুপ্ত শক্তির সঞ্চার হয়। সেই শক্তিতেই বলিতে বধ হওয়া প্রাণীটি সরাসরি স্বর্গে যায় এবৎ ঐ কর্মের মূল যে সংকল্প, সেটাও সিদ্ধ হয়।
মীমাংসা :– আগেই বলা হয়েছে যে, এরকম ধরনের আচার-অনুষ্ঠান অত্যন্ত ঘৃণিত এবং চরম অমানবিকতার পরিচয় বহন করে। ওঁদের মতে ওসব নিয়ম ও বিধিবদ্ধ আচার-অনুষ্ঠান পালন করা প্রয়ােজন কারণ তাদের নিজেদের কিছু বাসনা চরিতার্থ করার প্রয়ােজন আছে। সেই বাসনাগুলাে স্থূল ও জাগতিক এবং ঐ বলি প্রদত্ত প্রাণীগুলাের জন্যেও তাদের বাসনা আছে ; পশুগুলো যেন নির্বিঘ্নে স্বর্গলাভ করে। নিজেদের জন্য তাে বটেই, অপরের জন্যেও বাসনা করার অধিকার তারা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সমস্যা হচ্ছে, ঐ পশুগুলাে কিন্তু অপরের হাতে ঐভাবে নিহত হবার বাসনা রাখে না কিংবা স্বর্গে যাবার ব্যাপারেও তাদের কোন ব্যাকুল আগ্রহ এখনও নেই। বিষয়টিকে এই দিক দিয়ে ভেবে দেখতে হবে।
বিচার করে দেখ, কোন্ চাওয়াটা বড় ? স্বর্গে যেতে চাওয়াটা বড় না জাগতিক কিছু প্রত্যাশাটা বড় ? পণ্ডিতেরাও নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, স্বর্গলাভ অনেক বড় লাভ । তাহলে সেই স্বর্গ নিজেদের জন্য না চেয়ে অপরের জন্য চাইতে যাচ্ছেন কেন ? নিজেদের চেয়েও তারা কি ঐ পশুগুলােকে বেশী ভালবাসেন? না। যারা অপরকে হত্যা করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করেন, তাদের মধ্যে সেরকম ধরনের কোন মহানুভবতা থাকতে পারে না। তারা যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, এ ধরণের অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বলিতে নিহত পশুগুলাের স্বর্গপ্রাপ্তি হয়, তাহলে তারা নিজেরা স্বর্গবাস কামনা করে নিজেদেরই শরীরটাকে আগে বধ করতে পারেন বা অন্য কাউকে দিয়ে কাজটা করাতে পারেন। কিন্তু সেটা তারা করেন না। কেন ? কারণ জাগতিক ভােগের প্রতি তাদের আসক্তি আছে। আসক্তি থাকে কেন? কারণ স্বার্থপরতা। স্বার্থপরতা মানবোচিত বৃত্তি নয়। যারা এই সমস্ত আচার-বিচারে মত্ত তারা আসলে পূর্বের মনুষ্যেতর অভ্যাসগুলিরই অনুসরণ করে চলেছে।
জিজ্ঞাসা :—তবে কি আমাদের ধরে নিতে হবে যে,.পশুগুলাের স্বর্গপ্রাপ্তি হওয়া দূরে থাক, যারা অনুষ্ঠান করছেন তাদেরও মনের ইচ্ছা পূরণ হবে না ?
মীমাংসা :– না, হবে না। যা অসম্ভব, তা কখনই হতে পারে না।
জিজ্ঞাসা :—কিন্তু কোন কোন মানুষের মধ্যে কিছু শক্তি বা ক্ষমতা দেখা যায়। তারা বলেন যে, এক বা একাধিক আচারপালন করেই তারা ঐসব শক্তির অধিকারী হয়েছেন। এর কি কোন ব্যাখ্যা আছে ?
মীমাংসা :–অর্জিত কোন গুণ বা ক্ষমতা একটা বিশেষ আচার সম্পন্ন করার ফল নয় বরং কিছু নিয়মিত অভ্যাস ও শৃঙ্খলার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। নিষ্ঠা বা অভ্যাসের একটি সম্ভাব্য পরিণতি –শরীরের অন্তঃস্থিত শক্তিকে অপচয় হতে না দেওয়া। সঞ্চিত শক্তি ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়ে আরও সূক্ষ্ম ও সূক্ষ্মতর হয়ে যায়। এবং তখন আমাদের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় আরও সংবেদনশীল ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এই শক্তির স্ফুরণ গুণগত বা মানগত নয় । সূক্ষ্ম জগতের স্পন্দন তাঁরা অন্তর্জগতে ও বর্হিজগতে পাবেন, এই ভাবেই তাদের মধ্যে কিছু শক্তি বা ক্ষমতার প্রকাশ দেখা যায় ।
যখন তাঁদের নিষ্ঠা কমে যাবে এবং অভ্যাস পালনে অনীহা আসবে তখনই সঞ্চিত শক্তি হ্রাস পাবে এবং তাদের মধ্যে তখন আর শক্তি বা ক্ষমতার চিহ্ন দেখা যাবে না। যদিও আচারগুলাে তখনও তারা পালন করে চলেছেন হয়ত, কিন্তু সেগুলাের সাথে তখন আর শক্তি সংরক্ষণ ও রূপান্তরের কোন যােগ নেই। তাই আচারসিদ্ধ মানুষের বিশেষ ক্ষমতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, বিধিবদ্ধ আচার-অনুষ্ঠানগুলি গৌণ, আসল কথা হল জীবনযাত্রা। আচার বা নিয়ম পালনে যে সিদ্ধি, তা স্থায়ী হয় না, কারণ শক্তির গুণগত রূপান্তর হয় না। কেন হয় না। কারণ স্বার্থবুদ্ধি নিয়ে সেই আচার পালন করা হয়। গুণগত রূপান্তর হলে সিদ্ধির প্রভাব থাকে চিরকাল ।
জিজ্ঞাসা :–প্রাণী হত্যা না করে ফুল-ফল বা অন্যান্য জিনিস নিবেদন করে যে আচারপালন করা হয়, সেগুলাের দ্বারা কি প্রত্যাশিত ফল লাভ করা যায় ?
মীমাংসা :—এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। ফল দেয় শক্তি, কোন বিধিবদ্ধ আচার নয় ।
জিজ্ঞাসা :—আপনি একটু আগে যে আদর্শ আচরণ ও প্রক্রিয়ার কথা বলেছিলেন, তার দ্বারা কি প্রত্যাশিত ফললাভ হয় ?
মীমাংসা :—যে আচার বা আচরণের পিছনে বাসনা আছে, তা অধ্যাত্ম কর্ম নয়। মানবতার জন্য বা জগৎ কল্যাণের জন্য যে উদ্যোগ ও অনুষ্ঠান করা হয়, একমাত্র সেটাই আধ্যাত্মিক কর্ম। ‘বাসনা’ ও ‘প্রয়ােজন’ এই দুটি শব্দের মধ্যে প্রভেদ আছে। কোন ব্যক্তি বা গােষ্ঠীর বাসনার প্রতিফলন আধ্যাত্মিক আচরণে হওয়ার কথা নয় । কারণ বাসনা মানেই তার পেছনে স্বার্থ আছে এবং এই স্বার্থকেই বকধার্মিকেরা কাজে লাগায় । কিন্তু ‘প্রয়ােজনের’ পিছনে স্বার্থ নেই। তাই আমার আলােচনায় যে আদর্শ আচরণের কথা বলা হয়েছে, তার দ্বারা প্রয়ােজনীয় ফল লাভ হবে ৷ কিন্তু ‘বাসনাকৃত’ ফল লাভ হবে না। এক্ষেত্রেও মূল বিষয়টি হচ্ছে শক্তির রূপান্তর, কিন্তু শুধু পরিমাণগত নয়, গুণগত বা মানগত। কারণ উদ্দেশ্য হােল মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ, আচারটুকু প্রতীকমাত্র ।
জিজ্ঞাসা :—বিষয়টা আমরা আরও ভালভাবে বুঝতে আগ্রহী।
মীমাংসা :—আধ্যাত্মিক আচার সবাইকে নিয়ে এবং সবার জন্য হয়, কাউকে বাদ দেওয়া হয় না। জাগতিক আচার শুধু নিজের জন্য, অন্যের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার একটা স্বার্থপর প্রয়াস মাত্র।
প্রতিটি অনুষ্ঠান বা আচারের পিছনে একটা ভাব থাকে এবং কোন আচার পালনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের সাথে সেই ভাবটি ওতপ্রােত। যে মুহুর্তে তুমি কোন নিঃস্বার্থ আচার পালনের সিদ্ধান্ত নিলে, সেই মুহূর্ত থেকেই তােমার মধ্যে একটি উদার ভাব সৃষ্টি হবে যেহেতু সেটা সকলের হয়ে এবং সকলকে নিয়ে সঙ্কল্পিত। তখন থেকেই তােমার চিন্তায় থাকবে মানবজাতির একতা, মানবজাতির সার্বিক প্রয়ােজন এবং সমস্ত প্রয়ােজনের মূলে নিহিত মঙ্গলবােধ। এই-ভাবে তােমার চিন্তাভাবনা, বুদ্ধি-বিবেচনা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির সীমানা বিস্তৃত হবে, ব্যাপ্তি আসবে। এতে তােমারই ভাল হবে। স্বভাব যত উৎকর্ষ হবে তত গুণগত রূপান্তর হবে শক্তির, পরিমাণগত রূপান্তর যথেষ্ট হােক বা না হােক। এইভাবে প্রয়ােজনীয় ফল পাওয়া সম্ভব যদি ভাবে নিঃস্বার্থপরতা থাকে। স্বার্থপর আচারই বল বা নিঃস্বার্থ অনুষ্ঠানই বল, ওগুলাে প্রতীক, মূল উদ্দেশ্য ও ভাবটাই আসল কথা। আচারের উদ্দেশ্যই হােল মানুষের মধ্যে একটা ভাব সৃষ্টি করা যাতে প্রাণশক্তির অপচয় না হয়। অপচয় বন্ধ হলেই, নির্দিষ্ট সময়ের পর শক্তির রূপান্তর ঘটবে। যদি স্বার্থসিদ্ধিই উদ্দেশ্য হয়, তবে রূপান্তরিত সূক্ষ্মশক্তি দিয়ে মানুষের দ্বারা কোন গঠনমূলক ভাল কাজ হবে না। আর ‘পরহিত’ যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে মানুষের স্বভাবে চরম উৎকর্ষতা ফুটে উঠবে এবং তার দ্বারা জগতে কিছু ভাল কাজ হবে। এই দ্বিতীয় রকমের আচার বা আচরণের প্রতি এই আলােচনায় সমর্থন জানানাে হয়েছে, কারণ সেগুলাে আধ্যাত্মিক পরম্পরার অনুসারী। … [ক্রমশঃ]
