গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ একটা কথা প্রায়ই বলতেন – ” জীবের স্বাভাবিক ধর্ম-ই হলো ‘আহার-নিদ্রা-মৈথুনঞ্চ-ভয়ম্’ ।” হটাৎ এই কথাটা মনে পড়ার পিছনে কারণটা হোল_আমার এক ডাক্তার বন্ধু সেদিন বলছিল_”কোভিড_১৯ কিন্তু গোটা বিশ্বের মানুষকে বিশ্রীভাবে ভয় পাইয়ে দিয়েছে_যেটার হয়তো তেমন কোন প্রয়োজন‌ই ছিল না! বিশেষতঃ ভারতীয় সাধু সমাজ কেন বিদেশী ব্যবসাদারদের তৈরি করা ভয়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো না! তাঁরা কেন সাধারণ মানুষকে মাভৈঃ মন্ত্র শোনালেন না!”
এই নিয়ে আলোচনা চলতে চলতেই আমার গুরু মহারাজের কথাগুলো মনে পড়ে গেল! তাই সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনাটাকে একটু দীর্ঘায়িত করা যাক্ ! গুরু মহারাজ ঐ কথাগুলি যেমন বলেছেন তেমনি উনি আরো বলেছিলেন – “আহার,নিদ্রা, মৈথুন এবং ভয়__ সাধারণ জীবের ধর্ম হোলেও ‘মানুষে’-র কিন্তু এটি স্বাভাবিক ধর্ম হতে পারে না, কারণ ‘মানুষ’ অন্যান্য জীব অপেক্ষা উন্নত” ! সত্যিই তো ! আর পাঁচটা সাধারণ জীবের থেকে উন্নত জীব মানুষ – বিবর্তনের শেষ ধাপের জীব মানুষ – সুতরাং মানুষ কেন নিম্মতর জীবের ন্যায় জৈবধর্মে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করবে ? যে সমস্ত মানুষ এইগুলির কাছে হেরে বসে আছে – তারা অনুন্নত মানুষ, তারা সবে সবে পশু অবস্থা থেকে মানুষ অবস্থায় এসেছে – এটা অস্বীকার করার উপায় নাই । অপরপক্ষে যে সমস্ত মানুষেরা ঐ জৈববৃত্তিগুলি থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করছে – মনুষ্য সমাজে তারা অনেকটাই উন্নত এবং যারা এই জৈববৃত্তিসমূহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়েছে – তারাই ঠিক ঠিক মনুষ্য পদবাচ্য ! এঁদেরকে যথার্থ “মানুষ” হিসাবে আখ্যা দেওয়া যায় – কারণ এদের মধ্যে কোনরূপ পশুসুলভ বৃত্তি আর কাজ করে না – এনারা সম্পূর্ণভাবে মানবীয় গুণে পরিপূর্ণ ! তার মানে হচ্ছে – এই মানবসমূহের মধ্যে হিংসা, দ্বেষ, লোভ, মোহ, মদগর্বীতা, মারামারি করার প্রবণতা, অপরকে হেয় করার প্রবণতা, অপরের কাছ থেকে কোন কিছু কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা – এগুলি আর কিছুই থাকবে না ৷ অপরপক্ষে এদের মধ্যে দেখা যাবে – ক্ষমা, দয়া, করুণা, প্রেম, ভালোবাসা সহযোগিতা, সহমর্মিতা, অহিংসা – ইত্যাদি ৷
যে কোনো মানুষ অপর কোনো ব্যক্তির চালচলন, কথাবার্তা, আচার-ব্যবহার কিছুক্ষণ দেখলেই ধরতে পারবে যে, কোন মানুষটি জন্ম-জন্মান্তরের Senior, আর কোন মানুষগুলি junior অর্থাৎ পশুসমাজ থেকে বিবর্তনে সদ্য সদ্য মানুষ শরীর লাভ করেছে। স্বামী বাউলানন্দজীর লেখা থেকে আমরা এইগুলি এখন আরো ভালোভাবে জানতে পারছি! তবে শুধু জন্মান্তরে Senior হলেই হবে না – সে যে যথেষ্ট উন্নত অবস্থার ব্যক্তি তার একমাত্র প্রমান হবে_ঐ ব্যক্তি কতটা আধ্যাত্মিক_তার উপর! ‘আধ্যাত্মিক’- অর্থে যিনি জাগতিক মায়া-মোহের জগৎ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ নিবৃত্ত রেখে অগ্রগতির ধারাকে অব্যাহত রাখতে পারেন।
“আহার-নিদ্রা-মৈথুনঞ্চ-ভয়ম্” – এই চারটি জৈবিক প্রবৃত্তির প্রথমটি হলো “আহার” । গুরু মহারাজ একবার বলেছিলেন – ” কোন মানুষের আহার্যের ধরন, পরিমাণ এবং ওই ব্যক্তির খাবারের ভঙ্গিমা দেখলেই মানুষটির চেতনার Level বোঝা যায় ৷” কথায় বলে না – “রাক্ষসের মতো গোগ্রাসে গিলছে !” শরীর সর্বস্ব মানুষেরা আহারের বাছ-বিচার করে না – যা পায় তাই গোগ্রাসে খায় ! গোগ্রাসে খায় অর্থাৎ খুব একটা চিবিয়ে বা মুখে খাবার কিছুক্ষণ রেখে গেলে না – মুখে খাবার ঢোকানোর পরেই “কোঁৎ” করে গিলে নেয় ! খাবারের মধ্যে ঝাল, উগ্র, টক, বাসি – ইত্যাদি খাবার বেশি পছন্দ করে ৷ এই ধরনের মানুষগুলির Brain-cell ততটা ক্রিয়াশীল হয় না বলে এরা Brain-work অপেক্ষা Physical work বেশি করতে চায় – ছোটবেলা থেকে এরা এই ধরনের জীবনযাপনেই অভ্যস্ত হয়ে যায় ৷
অপরপক্ষে উন্নত মানুষেরা Brain-work বেশি করে, Physical work -এ ততটা পটু হয় না এরা ! ফলে এদের আহার্য গ্রহণও অল্প হয় ! প্রকৃতপক্ষে Physical work বেশি না করলে অধিক খাদ্য গ্রহণের প্রয়োজনও হয় না । বেশিরভাগ যোগী-কে দেখা যায় একবেলা আহার করেন, তাও অতি অল্প কিছু ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – মানুষ যে সমস্ত খাদ্য গ্রহণ করে তার সবটা শরীর গ্রহণ করতে পারে না, বেশিরভাগটাই অপাচ্য অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে যায় । সেগুলিকে শরীর পাচ্য করার খুবই চেষ্টা করেছে — কিন্তু শরীরের রক্তে মেশার উপযুক্ত পাচকরস তখনও তৈরি হয়নি – এই অবস্থায় পুনরায় নতুন খাদ্য গ্রহণের ফলে এদেরকে ক্ষুদ্রান্ত হয়ে বৃহদন্তে চলে আসতে এবং অবশেষে বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হতে হয়েছে । এইভাবে বেশি খাদ্যগ্রহণ মানে শরীরের অভ্যন্তরস্থ যন্ত্র গুলিকে অকারণ কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয় ! … [ক্রমশঃ]