স্বামী বাউলানন্দজীর আশ্রম সম্পর্কে আঃ বেঙ্কট রাও যা লিখেছিলেন তা নিম্নরূপ:–“মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে উৎপন্ন হয়ে গোদাবরী নদী দাক্ষিনাত্যের মালভূমি অতিক্রম করেছে এবং পরে পূর্বঘাট পর্বতমালার মাঝ দিয়ে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। গোদাবরীর উভয় তীর বরাবর পূর্ব পূর্বঘাট পর্বতমালার অংশকেই ‘পপি হিলস্’- বলা হয়,একে বাইসন পাহাড় ও বলে!
পপি পাহাড়ের যেখানটিতে গোদাবরী গিরিখাতে ঢুকেছে_ঠিক সেইখানটিতে পেরেন্টাপল্লী গ্রামটি অবস্থিত। অপর একটি ছোট সংকীর্ণ নদী পার্বত্য ভূমি অতিক্রম করে নিম্নভূমিতে পতিত হবার সময়_দুই ভাগে ভাগ হয়ে একটা ছোট পাহাড়কে বেষ্টন করে আবার মিলিত হয়ে কিছুটা দূরে গোদাবরীতে মিশেছে। এই ছোট সংকীর্ণ নদীবেষ্টিত পাহাড়ের উপরে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় বৃক্ষরাজির দ্বারা সৃষ্ট ঘন বনানীর বিশাল বিশাল বৃক্ষাদির নিচে “শ্রীরামকৃষ্ণ মুনিবাতম্”_নামে এক তপোবন আশ্রম গড়ে উঠেছে। এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা হোলেন স্বামী বাউলানন্দজী মহারাজ। ইনি স্থানীয় লোকসমাজে ‘পেরেন্টাপল্লীর স্বামীজী’ বা ‘সাধূজী’ নামে খ্যাত ছিলেন।(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– ইতিমধ্যেই আলোচিত হয়েছে এমন দু-একটা বিষয় নিয়ে আমাদের মনে এখনও সংশয় আছে। গৃহী এবং সন্ন্যাসীদের মধ্যে যে মূল পার্থক্য, সেটা আমরা স্পষ্টভাবে জানতে চাই।
মীমাংসা :– মনুষ্যেতর প্রাণীদের মূল কাজ প্রজনন, এছাড়া ওদের মধ্যে সামান্যই চেতনার প্রতিফলন থাকে। কয়েক লক্ষ জন্মান্তরের পর তারা প্রথম মানুষের শরীর পায়। তখনই তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম শক্তির বিকাশ ও আধ্যাত্মিক শক্তির সম্ভাবনা তৈরী হয়। নতুন মানুষ-শরীর পাওয়ার পর পূর্বের অভ্যাসগুলো প্রবলভাবে তার সংস্কারে কাজ করে। অতিমাত্রায় ভােগস্পৃহা কাজ করার জন্য তারা স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থপর ও লােভী হয়। বিবাহ করে তারা গৃহী-জীবনযাপন করে __বাসনার তাড়নাতেই। পৃথিবীতে নিজেদের সন্তানদের নিয়ে আসাই তাদের মূল লক্ষ্য, যদিও তার মূল উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তারা অচেতন। এরা গৃহী এবং সংসারাসক্ত। কালের অমােঘ নিয়মে এরা নিজেদের এই অবস্থা থেকে উত্তীর্ণ হয় উন্নত ও দায়িত্বশীল মানুষের সংস্পর্শে এসে, এটাই প্রত্যাশিত। যারা দায়িত্বশীল গৃহী এবং তুলনায় বিবর্তিত, তারা তাদের গার্হস্থ্য জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সচেতন। পশুসংস্কার থেকে মানবসংস্কারে উত্তীর্ণ করে দেওয়ার পথ সুগম করে দেওয়াই সেই উদ্দেশ্য। এছাড়াও মোহাচ্ছন্ন গৃহীদের মােহমুক্ত করাও তাদের দায়িত্ব। এই পুরোটাই প্রথম মানব-শরীরেই হওয়া সম্ভব, সেই সম্ভাবনা নিয়েই শরীর, মন ও সংস্কারের গঠন হয়।
তাহলে আমরা দেখছি যে, গৃহীদের মধ্যে দুটো ভাগ আছে, একদল স্বার্থপর ও মোহগ্রস্ত এবং অপর দলটি অপেক্ষাকৃত নিঃস্বার্থ ও দায়িত্বশীল। এই দু-শ্রেণী ছাড়াও আছেন সন্ন্যাসীরা, যাঁরা নিঃস্বার্থ ও নিষ্কাম । তাঁরা জীবন, মানুষ ও প্রকৃতির উদ্দেশ্য জানেন এবং সমস্ত বৈশিষ্টের মধ্যে একক মূল তত্ত্বকেও অনুভব করেন।অতএব, সাধারণ নিয়মে প্রথম মানবশরীর পেয়ে কিছুদিন প্রবল ভােগাসক্তি থাকবে, পরে সেটা কেটে গিয়ে সমাজে তারা দায়িত্বশীল গৃহীর ভূমিকা পালন করবে, শেষে তারা সন্ন্যাসজীবন-যাপন করবে, পুরােটাই এক জন্মে হওয়া সম্ভব এবং উচিতও।
জিজ্ঞাসা :— এই বিশ্লেষণ বুঝতে অসুবিধা হােল না, কিন্তু পৃথিবীতে যে নিয়ম পালন করা হয় এবং জীবন সম্বন্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠের যে ধারণা, তার সাথে একেবারেই মেলে না।
মীমাংসা :– ঠিকই বলেছ। কিন্তু প্রকৃতিতে বিশ্বপ্রাণের যে উদ্দেশ্য, তাকে সার্থক করতে গেলে এটাই এক মাত্র পথ ।
জিজ্ঞাসা :— গার্হস্থ্য জীবন নিয়ে আর একটা প্রচলিত ধারণা হল যে, সন্তান না হলে মুক্তি নেই। বিবাহ না হলে তাে সন্তানের প্রশ্নই নেই । একটা গোটা জীবন সন্তানের অপেক্ষাতেই কাটিয়ে দেওয়া নাকি উচিত। না হলে আবার পরের জন্মে সে দায়িত্ব পূরণ করতে তাদের ফিরতে হবে। অর্থাৎ বহুকাল ধরে তাদের স্বার্থপর জীবনযাপন করতে হবে। এরকম ধরণের বহু প্রচলিত যুক্তি আছে যার জন্য আমাদের স্বার্থপর গৃহস্থ জীবনযাপন করতে হচ্ছে একাধিকবার মানবশরীর পাওয়ার পরেও । আপনার সিদ্ধান্তের সাথে এই জীবনদর্শনকে মেলাবাে কি করে ?
মীমাংসা :– এই ভ্রান্ত ধারণা তৈরী হয়েছে ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলির মদতে, সাম্প্রদায়িক স্বার্থে।
জিজ্ঞাসা :— কি স্বার্থ ?
মীমাংসা :– জনসংখ্যা যাতে বাড়ে।
জিজ্ঞাসা :– জনসংখ্যা বাড়লে ধর্ম-আন্দোলনের সুবিধা কি?
মীমাংসা :— নিজেদের প্রভাববিস্তার করা আপন ধর্মমতে বিশ্বাসী লােকেদের সংখ্যা বাড়িয়ে। আগেই বলা হয়েছে যে, তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত প্রথম প্রাপ্ত মানবশরীরে ভোগস্পৃহা প্রবল থাকে, সেই স্পৃহাকেই আধার করে মনুষ্যেতর সংস্কার থেকে প্রথম মানুষজন্ম পাওয়ার সুযোগ তৈরী হয়। প্রকৃতিতে এর প্রয়ােজন আছে। নতুন যারা আসছে তারাই আবার অন্যান্য নতুন সংস্কারকে আসার সুযােগ করে দেবে__ তাদের জীবনের প্রথম পর্বে। পরবর্তীকালে স্থূল জগতের আসক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সে সূক্ষ্ম-চর্চায় মনােযোগী হবে। কিন্তু ধর্ম প্রতিষ্ঠানগুলি এই প্রয়ােজনটিকে সর্বজনীন বলে প্রচার করছে। অর্থাৎ সন্তান আনাই একমাত্র কাজ, প্রত্যকের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক। সে নবীন হোক বা বিবর্তিত অভিজ্ঞ গৃহস্থই হােক।
প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের এই যুক্তি মেনে নিলে কয়েকটা প্রশ্ন ওঠে। মনুষ্যেতর প্রাণীর যাতে মানুষের শরীর পায়, এ ব্যাপারে তারা কি ভাবছেন ? কিভাবে তারা উঠে আসবে মানুষের স্তরে ? তার প্রক্রিয়া কি ? সেই উৎক্রমণ কার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আজ যারা মানুষ, তারা আগে কি অবস্থায় ছিল? তাদের কে এই বর্তমান অবস্থায় উঠিয়ে নিয়ে এল ? গােষ্ঠী-নেতারা এই বিষয়গুলি এড়িয়ে যান। পরিণতিতে বিবর্তিত মানুষের মধ্যে কোন প্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তারা জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না, অনন্তকাল ধরে চলছে তাদের যাতায়াত, তৃষ্ণা মিটছে না। নতুন যারা আসছে তারাও এদের কাছ থেকে বাসনামুক্তির কোন প্রেরণা পাচ্ছে না। তারাও প্রায় পাশবিক স্তরেই থম্‌কে থাকছে। আবার দেখ, যারা পরিবার-পরিজন নিয়ে বহুদিন কাটিয়ে নিজেদের তৃষ্ণা মিটিয়ে ফেলেছে, তারাও এই প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের ওপর ভর করে বারবার ফিরে আসছে ঐ একই বৃত্তে। এই ভ্রান্ত ধারণা সভ্যতার পথে একটা বিরাট বাধা। যাদের মধ্যে এই ধারণা এখনও তৈরী হয়নি তাদেরও উর্ধ্বগতি স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে ।
জিজ্ঞাসা :— যারা এই ধারণার দাসত্ব করে না, তাদেরও কেন এর শিকার হতে হচ্ছে ?
মীমাংসা :– যারা এই ধারণা প্রচার করে তারা অধিকাংশই অভিজ্ঞ ও বিবর্তিত শ্রেণীর মানুষ। বহুবার পৃথিবীতে যাতায়াত করে তাদের কিছু বাড়তি ক্ষমতা এসে যায়, বিশেষ করে জাগতিক ক্ষেত্রে। মানবিকতার বিকাশ হয় না বলে তারা স্বার্থপরই থেকে যায় । তাই সমাজে তারা কিছু বাড়তি সুযােগ পায়। যে জন্য অন্যরা তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যারা অনভিজ্ঞ ও নবীন তারা এই লােকেদের সংস্পর্শে এসে স্বার্থপরতাকেই মর্যাদা দিতে শেখে।
জিজ্ঞাসা :– এ কথাটা আমরা মেনে নিতে পারলাম না। আমাদের চারপাশে বহু মানুষ নিয়মিত মন্দিরে গিয়ে পূজো ও প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করে, তারা বেশিরভাগই আপনার মতে বিবর্তিত ও অভিজ্ঞ। তারা যদি স্বার্থপরই হয়, তবে তারা এত মন্দিরে যাবে কেন ?
মীমাংসা :– ঠিকই। কিন্তু তারা স্বার্থচিন্তা করতেই মন্দিরে যায়, স্বার্থকেন্দ্রিক প্রার্থনাই তাদের অন্তরে উচ্চারিত হয় এবং ঈশ্বরের সাথে তাদের সম্পর্ক নিঃশর্ত নয়। প্রকৃত আরাধনা দু-একজনেরই হয়।
জিজ্ঞাসা :— তবে তারা ক্লাবে বা, থিয়েটারে না গিয়ে ধর্মস্থানে(মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি) যায় কেন?
মীমাংসা :– অসুবিধা কোথায় ? যে মন নিয়ে তারা ক্লাবে বা থিয়েটারে যায়, সেই একই মন নিয়ে তারা ধর্মস্থানে(মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি) যায়। তাদের কাছে ধর্মস্থান (মন্দির, মসজিদ, গির্জা) মানে আর একটা স্বার্থপূরণের জায়গা, এর বাইরে কোন সংজ্ঞা তারা জানে না বা জানতে চায় না। … [ক্রমশঃ]