স্বামী বাউলানন্দজীর বাল্যকালের ভ্রমণ জীবনের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিল। একদল ভ্রাম্যমাণ সন্ন্যাসীর সাথে ভ্রমণকারী স্বামীজীর যখন গুটিবসন্ত হয়েছিল_ তখন সন্ন্যাসীরা তাঁকে ত্যাগ করে গেলেও মা জগদম্বা তাঁকে ত্যাগ করেননি বরং তিনি তাঁর লীলা সহচরীদের পাঠিয়ে স্বামীজীর সেবা-শুশ্রূষা করিয়েছিলেন । তাছাড়া একটি গ্রামবাসীর সহায়তায় এবং তার সেবায় স্বামীজি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেছিলেন । এই অভিজ্ঞতা বালক স্বামীজীকে__ জগদম্বার রহস্যময় লীলা সম্বন্ধে ভাবিয়ে তুলেছিল । তাঁর এই বিশ্বাস হয়েছিলো যে তিনি ✓রী মা জগদম্বার দৃষ্টিগোচরে রয়েছেন এবং তিনি যখন যেখানেই থাকুন না কেন __মা জগদম্বার পর্যাপ্ত পরিমাণে কৃপা এবং দয়া তিনি পাবেন । এই বিশ্বাসের ফলে তিনি অস্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বল পেলেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সেই গ্রামবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে _ তিনি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একাকী আবার পথে নামলেন।
একদিন সন্ধ্যাবেলায় ঘুরতে ঘুরতে স্বামীজি তাঁর জন্মভূমিতে গিয়ে পৌঁছে গেলেন। সেখানে একটা পুকুরে স্নান করে তিনি তাঁদের নিজ বাড়িতে প্রবেশ করলেন‌। বাড়ির সকলে তাঁকে দেখে খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠলো । তারা তাঁকে স্বাগত জানালো কিন্তু অবাক ব্যাপার এই যে বাড়ির মেয়েরা তার শরীরে বসন্তের দাগ আছে কিনা তা নিরীক্ষণ করতে লাগলো! স্বামীজী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন _”তোমরা আমার শরীরে কি দেখছো? কি ঘটেছে আমার?” তখন বাড়ির মায়েরা কিছুদিন আগে যে ঘটনাটি ঘটেছিলো তার বর্ণনা দিতে লাগলো __তারা বললো যে, স্বামীজি চলে যাবার পর বাড়ির সকলে শোকাতুর হয়ে পড়েছিলো। তারা পাশাপাশি গ্রামগুলিতে এবং যে সমস্ত গ্রামে তাদের আত্মীয়-স্বজন আছে _সেই সমস্ত জায়গায় বালকের খোঁজ করেছিলো, কিন্তু কোথাও তার কোন সন্ধান পায়নি। এর ফলে তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলো। তাঁর সম্বন্ধে জানার জন্য তখন তারা তাদের গ্রাম্য দেবীর মন্দিরে বাড়ির ছেলের খবর পাবার জন্য মানত করেছিলো। ধূপ জ্বেলে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে বাড়ির ছেলের সম্বন্ধে কিছু বলার জন্য দেবীর নিকট প্রার্থনা জানাতে থাকলে _ দেবী তাদের উপর প্রসন্ন হলেন। পুরোহিতের উপর ভর করে দেবী বলেছিলেন _”বালক নিরাপদে আছে! সে এখন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে একটি মাটির ঘরে শুয়ে আছে ‘আমি’ তাকে দেখাশোনা করছি, সে দ্রুত আরোগ্য লাভ করবে এবং অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসবে।”
সেই থেকে বাড়ির সকলে অধীর আগ্রহে বালকের আগমনের অপেক্ষা করছিলো। স্বামীজী বাড়ি ফিরে আসায় তারা দেবীর আদেশের সত্যতার প্রমাণ পেলো এবং তাই তারা বালকের শরীরে বসন্তের দাগ দেখার চেষ্টা করছিলো। এই কথা শুনে স্বামীজি সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন! তৎক্ষণাৎ তার একটা কথা মনে পড়ে গেল_ তাদের দলের জ্যেষ্ঠ সন্ন্যাসীরা যখন পুরান পড়তেন, তখন তিনি শুনেছিলেন যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একবার সামন্তক মনির সন্ধানে বনে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের জাম্বুবানের গুহার মুখে রেখে গুহার ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন এবং গুহার ভিতর বহু দূর যাওয়ার পর জাম্বুবানের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল । তার সঙ্গে ভগবানের আঠারো দিন ধরে যুদ্ধ হয়েছিল । এদিকে গুহার মুখে অপেক্ষমান লোকেরা শ্রীকৃষ্ণ ফিরছেন না দেখে ভাবলো_ শ্রীকৃষ্ণ হয়তো মারা গেছে! তারা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের সৎকারের জন্য সবরকম ব্যবস্থা করতে লাগলো। কিন্তু মাতা রূক্মিনী দেবী ওই লোকগুলির কথায় প্রভাবিত হোলেন না। তিনি মনেপ্রাণে জানতেন যে তার স্বামী অজেয়_ তিনি একদিন না একদিন ঠিকই ফিরবেন। মাতা রূক্মিনী গ্রাম্য দেবীর মন্দিরে গিয়ে পুজো দিলেন এবং মানত করলেন। গ্রাম্য দেবী প্রসন্ন হয়ে জানালেন যে, তাঁর স্বামী শুধুমাত্র “মনি” নিয়েই ফিরবেন না __সঙ্গে করে “কান্তা মনি”-ও আনবেন! শীঘ্রই এই ঘোষণা সত্যি হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণ সামন্তক মনি এবং নববধূ জাম্ববতীকে নিয়ে ফিরে এসেছিলেন । সেই কথা চিন্তা করে বালক স্বামীজি এই জগৎ-প্রপঞ্চের রহস্য সম্বন্ধে জেনে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি নিশ্চিত হোলেন যে, এরূপ দৈববাণী সর্বকালেই হয়ে থাকে এবং এটা সত্য। তিনি আরো বুঝতে পারলেন যে, ✓রী মায়ের কৃপা সর্বব্যাপী ও সর্বকালীন ! তিনি যে কেবলমাত্র কাউকে আশ্রয় দেন তাই নয় _তার আত্মীয় স্বজনদের নিরাপত্তার সম্বন্ধে খবর‌ও দেন! কি অদ্ভুত এই প্রপঞ্চ!
তখন থেকেই সেই বালকের মনে একটাই চিন্তার উদয় হলো_ এই মা জগদম্বা কে ? কি করলে তাঁর লীলা বুঝতে পারা যায়? এই জগদম্বার কি করে দর্শন পাওয়া যায়? কি করে তাঁকে উপলব্ধি করা যায় ?__কেবল এই একটা চিন্তাই তার হোতে থাকলো __ তিনি এটা অনুভব করলেন যে, বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকলে ✓রী মা জগদম্বার দর্শন পাওয়া যাবে না! বিস্তারিত এই পৃথিবীতে যেখানে পূর্ণমাত্রায় বিশ্বমায়ের প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়__ সেখানেই তার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে! এই ভেবে তিনি বাড়ির সকলের অলক্ষ্যে পুনরায় গৃহত্যাগ করলেন।।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
[ স্বামী বাউলানন্দজী বিরচিত “আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা” বা “Spiritual Enquiry” আগের সংখ্যায় শেষ হয়ে গেছে। পরের দিন থেকে তাঁর জীবনের ঘটনার সাথে সাথে স্বামী বাউলানন্দজী বিরচিত “Message To Humanity”_র বাংলা অনুবাদ, মা পূর্বে চরৈবেতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল_সেগুলি ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে।]