স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো।স্বামীজি যখন ভদ্রাচলম-এ ছিলেন সেই সময় বেশকিছু ঘটনা ঘটেছিল। তার মধ্যে একটি এখানে আলোচনা করা যাক্। একদিন সকালে স্বামীজি স্নান সেরে মন্দিরে বসে আছেন এমন সময় এক ব্রাহ্মণ যুবক সেখানে এসে, তাঁকে মা জগদম্বার মন্দির সংলগ্ন ধর্মশালায় প্রসাদ খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করলেন । স্বামীজি ‘জগদম্বা ধর্মশালা’-য় যখন গেলেন, তখন দেখলেন যে অন্যান্য নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণেরা হলঘরে প্রসাদ খাচ্ছে। স্বামীজী ঘরে ঢুকছেন দেখে_ সেই ব্রাহ্মন যুবক (যে স্বামীজী কে নিমন্ত্রণ করেছিলো) একটা পাতায় বিভিন্ন রকম খাবার নিয়ে স্বামীজির কাছে হাজির হোল এবং স্বামীজীর হাতে খাবারের পাত্র দিয়ে_ স্বামীজীকে অনুরোধ করলো, নদীর ধারে গিয়ে এই খাবারটি খেয়ে নিতে! স্বামীজি এই কথায় বিস্মিত হয়ে তা করতে অস্বীকার করলেন! তখন সেই যুবক কারণ দেখালো যে, সেখানে তাকে জল দেওয়ার মতো কোন পাত্র আর অবশিষ্ট ছিল না_ যেগুলি ছিল সেগুলি বাকি ব্রাহ্মণদের দেওয়া হয়ে গেছে ! এই কথা শুনে স্বামীজী মা জগদম্বার মন্দিরের দিকে তাকালেন! যুবক স্বামীজীর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকিয়ে একটি তামার পাত্র দেখতে পেলো! ফলে যুবক সঙ্গে সঙ্গে স্বামীজীকে সেই পাত্রে জল দিলো এবং স্বামীজি সেখানে বসে প্রসাদ খেয়ে ওই জলের পাত্রটি ধর্মশালায় ফেরত দিয়ে মন্দিরে ফিরে গেলেন।
এই ঘটনার পরে স্বামীজি অনেকদিন‌ই ভদ্রাচলমে ছিলেন কিন্তু তিনি কোনদিনই আর কারো বাড়িতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে বা কোনো মন্দিরের ধর্মশালায় _অন্ন গ্রহণ করতে যাননি। প্রতিদিন তিনি মন্দিরে ধ্যান করতেন এবং মা জগদম্বার চিন্তায় সর্বদা বিভোর থাকতেন । খাবারের সময় হলে ওই ব্রাহ্মণ যুবকটি একটি প্যাকেটে করে খাবার নিয়ে এসে স্বামীজীর নিকট আসতো এবং ভক্তিভরে স্বামীজীকে তা নিবেদন কোরতো। স্বামীজী যতক্ষণ আহার গ্রহণ করতেন, ততক্ষণ সে ভক্তিভাবে স্বামীজীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। আবার স্বামীজীর খাওয়া শেষ হলে সে সেখান থেকে চলে যেতো। এই যুবকটির নাম ছিল রাম শাস্ত্রী সে ছিল শিব মন্দিরের পূজারী।
পরবর্তীকালে স্বামীজি তাঁর ভক্তদের কাছে এই ঘটনা স্মরণ করে রাম শাস্ত্রীর উল্লেখ করে__ কিভাবে নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের, এমনকি নিমন্ত্রিত দরিদ্র নারায়ন দেরকে খাবার পরিবেশন করা উচিত__সেকথা বলেছিলেন ! লোকে সাধারণতঃ কোন বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়িতে বা প্রতিষ্ঠানে অনেক লোকের খাবারের আয়োজন করে । খুব কম লোকই আছে যারা নিঃস্বার্থভাবে লোককে খাওয়ায়! কোনো কোনো ব্যক্তি ঈশ্বরের কৃপায় কিছু অর্থ বা সম্পত্তি লাভ করলে বা তাদের বাসনা পূরণের আশায় _মানুষকে খাওয়ায় !:অনেকে যশলাভের আশাতেও খাওয়ায় ! তারা বিরাট আড়ম্বর করে রান্নার আয়োজন করে _ কিন্তু শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে নিমন্ত্রিতদের খাওয়ানোর ধৈর্য সবার থাকে না।
ভক্তি-শ্রদ্ধাহীন অন্নদানকে স্বামীজি খুবই নিন্দা করতেন! উনি বলতেন _”নিমন্ত্রিতদের নারায়ন ভাবা উচিত! নিমন্ত্রিতরা যদি দরিদ্র হয় _ তাহলে তাদেরকে আরও বিশেষ মনোযোগ সহকারে এবং ভক্তিভাবে খাওয়ানো উচিত! নারায়ন অথবা দরিদ্র নারায়ন যাইহোক না কেন, তারা আমাদের নিমন্ত্রণ পেয়ে তবেই আসে! তারা আমাদের উপর সেবা চাপিয়ে দেয় না ! বস্তুতঃ তারা আমাদেরকে অন্নদান দ্বারা তাদের সেবা করার সুযোগ দেয় এবং আমাদের ব্রত উদযাপন করতে সাহায্য করে ! যদি তারা না আসে তাহলে তাদেরকে সেবা করার সুযোগ আমরা পাইনা এবং আমরা বিফলমনোরথ হই । সুতরাং তাদের প্রতি আমাদের পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া উচিত এবং ভক্তিভরে তাদেরকে সেবা করা উচিত “!
পরবর্তীকালে পেরেন্টাপল্লীতে যখন দরিদ্রনারায়ন সেবার ব্যবস্থা হয়েছিল তখন তাদের সেবার ব্যাপারটায় স্বামী বাউলানন্দজী বিশেষ যত্ন নিয়েছিলেন।।
===============©========
*MESSAGE TO HUMANITY*
~ _Swami Baulananda_
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পুনরায়, মনুষ্য জাতির মধ্যে যাদের কাণ্ডজ্ঞান ঠিকমত বিকশিত হয় নাই তারা সতেজ বা সুস্থ (fresh human) মানব। পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেবার কিছুটা যােগ্যতা এদের আছে। কাণ্ডজ্ঞানের উন্নয়ন এবং সূক্ষ্ম চেতনার কাজ শুরু হওয়া — এই দুই সময়ের মধ্যস্থলে নিজ জাতির দলে বাস করতে এবং সমৃদ্ধিশালী হওয়ার পক্ষে তারা একেবারে অযােগ্য এবং অক্ষম হয়ে পড়ে। কিন্তু যখনই সূক্ষ্ম চেতনার ঠিকমত কাজ শুরু হয় তখন তারা বেশ যােগ্যতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সমগ্র বিশ্বের মানব, অমানব এবং অচলনশীল সত্তার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয়। তাদের সকলের সঙ্গে একত্ব হওয়া, অটল সচেতনতা, আপাতপ্রতীয়মান জাগতিক অনৈক্যের মাঝে পূর্ব ঐক্যের উপর ইহা প্রতিষ্ঠিত। সকল রকমের সত্তার সংগ্রামী এবং কলহপ্রিয় স্বভাব তাদের অভিব্যক্তির মধ্যে প্রকাশ পায়। এটা প্রায়ই ঘটে যখন তারা আহার করে, পান করে, ঘুমাতে বা বিশ্রাম নিতে যায়। এই ঘুম বা বিশ্রাম খাদ্য হজম বা পরিপাকের অন্যতম প্রয়োজনীয় অঙ্গ।
অাহার, পান এবং নিদ্রা ছাড়া অন্য সমস্ত কারণে যোগ্যতা (adaptability). বন্ধুত্বপূর্ণভাবের প্রয়োগ অমানবীয় জীবের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ হতে দেখা যায়। এটা যুক্তিযুক্ত কারণ তারা এবং তাদের শরীর সুখী এবং নিরাপদ হওয়ার স্বাভাবিক গতিতে কাজ করার জন্য গঠিত। কিন্তু গঠনের দিক থেকে সুযোগ সুবিধা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যােগ্যতা, বন্ধুত্বপূর্ণভাবে বাস করা এবং সমৃদ্ধিশালী হওয়া প্রভৃতি গুণযুক্ত শরীরের কথা বিবেচনা করলে মানুষের কলহপ্রিয় এবং সংগ্রামী হওয়ার কোন যুক্তি নাই। যতক্ষণ পর্যন্ত না মানব অমানবীয় জীব এবং নিজেদের মধ্যে পৃথকীকরণের মনোভাব সম্বন্ধে সচেতন হচ্ছে ততক্ষণ সাধারণ ঘটনায় বিশেষ করে আহার, পান এবং বিশ্রামে – এই নীতি প্রয়োগ করা মানবের পক্ষে অসম্ভব। তারা যে জিনিস দিয়ে অমানবীয় জীব এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করছে তা হল উন্নত মানের মানবীয় সচেতনতা অর্থাৎ কাণ্ডজ্ঞান বা কোন চেতনা। যে চেতন মানুষ হয়ে কি করা যায় এবং বলা যায়, কি করা যায় না এবং কি বলা যায় না — এই সংকেত মানুষকে দেয়, কথায় কাজে প্রতি পদক্ষেপে এই সচেতনতা তাদেরকে অমানবীয় জীব এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য ঠিকমত উপলব্ধি করতে সাহায্য করে ; তাদের এবং তাদের শরীরের গঠনের অবস্থা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এই বোধ কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী তাদের প্রজনন চেতনার অযোগ্যতা উপলব্ধি করতে তাদেরকে সাহায্য করবে। তাদের অমানবীয় শরীরে কাজের ধরনের সঙ্গে অহং (ego) অনুযায়ী কাজ করার জন্য প্রজনন চেতনার যােগ্যতার সাদৃশ্য আছে। মানব শরীর হওয়া সত্বেও এটা হল তাদের অমানবীয় স্বভাবের ধারাবাহিকতা।
তাদের মানবীয় প্রবণতা যে কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী এই পরিস্থিতিতে মানব তা অবগত হবে। তাদের প্রজনন চেতনা যে তাদের অহং (ego) অনুযায়ী অমানবীয় প্রবণতাযুক্ত তা তারা অবগত হবে। অধিকন্তু তারা অবগত হবে যে তারা অহংকে পরিচালনা করবে, প্রজনন চেতনাকে নয়। এও অবগত হবে যে অহং চেতনাকে পরিচালনা করবে। এই চেতনাই তাদের গঠনের মধ্যে যে সুক্ষ্মচেতনা আছে তা বােধের দিকে তাদেরকে সরাসরি চালিত করে।
এই সূক্ষ্ম চেতনাগুলি তাদের অহংকে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়ে এবং তদ্দ্বারা প্রজনন চেতনার পরিচালন দ্বারা (যদি প্রজনন চেতনাগুলি মানবীয় প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যথেষ্ট সূক্ষ্ম শক্তির অধিকারী হয়ে যথাযথ ক্রিয়া করে) যে প্রজনন চেতনা সুখ এবং নিরাপত্তা অন্বেষণে মানবোচিতভাবে ক্রিয়া করতে গিয়ে অমানবোচিতভাবে ক্রিয়া করে সেই চেতনাকে এবং তাদের অহংকে সক্রিয় করে।
সূক্ষ্ম চেতনার উপস্থিতি সম্বন্ধে অনুভূতি, তাদের দৈহিক বা মানসিক ক্ষমতা এবং উদ্দেশ্য মানুষকে সুখ এবং নিরাপত্তা অন্বেষণে চেতনা ব্যবহার করতে যত্নবান হয়। সূক্ষ্ম চেতনাকে কাজে লাগানাের প্রবণতা, ঐ চেতনাগুলির উপযােগ প্রাপ্তির প্রবণতা, যথাযথ কাজ করার জন্য সূক্ষ্ম চেতনাগুলিকে শক্তিশালী করার প্রবণতা আপসে মানুষের এসে যায়। এই প্রবণতা শরীরের মধ্যে সৃষ্টিকারী শক্তির নিত্যতায় পরিণত হয়, যেহেতু সূক্ষ্ম শক্তিই হল পরিবর্তিত সৃষ্টিকারী শক্তি।
এইভাবে, যখন সূক্ষ্ম শক্তি পর্যাপ্ত পরিমাণে সৃষ্ট হয় এবং সূক্ষ্ম চেতনা মানুষের মধ্যে যথাযথ কার্য শুরু করে তখন এর ফলে স্বাভাবিক গতিতে নীতি, বাক্য এবং কার্য (যা তারা সুখ এবং নিরাপত্তা অন্বেষণে গ্রহণ করে) তাদের উন্নতমানের চেতনা, অহং এবং চেতনা, প্রজনন চেতনার সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এ হল তাদের ঊর্ধ্ব প্রগতি এবং সার্বজনীন প্রয়ােজনীয়তার সঙ্গে সুসমস্যপূর্ণ।
সুতরাং, যে কাণ্ডজ্ঞান মানুষকে অমানবীয় জীব হতে পৃথক করে সে সম্বন্ধে মানুষ সচেতন হোক।
মানুষ যত্নবান হয়ে কাণ্ডজ্ঞানের সামঞ্জস্য পূর্ণ কর্ম করুক এবং মানববাচিতভাবে ঊর্ধ্ব প্রগতি লাভ করুক।
[স্বামী বাউলানন্দের মূল গ্রন্থ ‘ Message to Humanity ‘ হইতে ব্রহ্মচারী কেশবানন্দ কর্তৃক অনুদিত হইল]