স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামীজী সন্ধ্যার পূর্বেই ওয়াভিগুভেমে পৌছুলেন। গ্রামটি অনেক বড় এবং সেই গ্রামে অনেক বড় বড় বাড়ি ছিল। এইসব বাড়িতে কাঠের ব্যবসায়ীরা বাস করতো। তাছাড়াও সেই সব বড় বাড়িতে মধ্যবিত্তরা এবং ছোট বাড়িতে নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা বাস করতো। গ্রামের শেষ প্রান্তে অনেক দূরে একটি শিবালয় আছে ।রাত্রে সেই মন্দিরে থাকতে স্বামীজীর ইচ্ছা হোল।
মন্দিরের চারপাশে উঠোন, ছোট্ট ফটক দিয়ে স্বামীজী ভেতরে ঢুকলেন। মন্দিরে কোন পূজারী ছিল না, কোন পূজা নিবেদনাদির কাজকর্ম সেখানে হয়না বলেই মনে হোল। গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ ছিল। একজন বৃদ্ধা মহিলা মন্ডপের বন্ধ দরজা পুজার সাজসরঞ্জাম রেখে প্রদীপ জ্বালানোর ব্যবস্থা করছিলেন। ঐ রকম একটা অবস্থায় স্বামীজি সেখানে গিয়ে পৌঁছেছিলেন।
সেখানে কিছুক্ষণ কাটানোর পর স্বামীজি ওই মন্দিরে তাঁর থাকার মতো উপযুক্ত পরিবেশ দেখতে পেলেন না। কিন্তু এসেই যখন পড়েছেন, সেই রাত্রে সেখান থেকে পরের দিন সকালে পাশের গ্রাম শ্রীরামগিরিতে চলে যাবেন বলে ঠিক করলেন। ওই গ্রামে শ্রীরামেরও একটি বিখ্যাত মন্দির ছিল।
পরের দিন খুব সকালে স্বামীজী নদীতে স্নান করে ওই স্থান ছেড়ে চলে যাবার জন্য উদ্যোগী হলেন, এমন সময় মন্দিরে থাকা সেই বৃদ্ধা দুপুরে তার কাছে খাবার জন্য স্বামীজীকে অনুরোধ করলেন। অনুরোধে এতটাই জোর ছিল যে, দুপুরে তিনি ওখানেই খাবেন __স্বামীজীকে এরূপ কথা দিতে বলা হোল। স্বামীজী সেই অনুরোধে ‘না’ বলতে পারলেন না ! দুপুরে তার কাছে খাবেন বলে কথা দিলেন ।
ইত্যবসরে আগের দিন সন্ধ্যায় শবরীর বালুচরে দেখা সেই কেশরী সিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে স্বামীজীর খুব ইচ্ছা হোল। সিংজীও স্বামীজীর জন্য আশা করে বসেছিলেন। স্বামীজী আসামাত্র তিনি তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। তার বাড়ির আশেপাশের কয়েকজন বন্ধুর সাথে স্বামীজীর পরিচয় করিয়ে দিলেন। বেশ কিছুটা সময় ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গে ভালো ভাবেই কাটলো ।অন্য গ্রামে যাওয়ার আগে দুপুরে তাদের বাড়িতে খাওয়ার জন্য শ্রী সিং স্বামীজীকে অনুরোধ করলেন । স্বামীজী তখন তাকে মন্দিরের বৃদ্ধা মায়ের ইচ্ছার কথা এবং তাকে কথা দেওয়ার কথা__ জানালেন! মন্দিরে গিয়ে স্বামীজী বৃদ্ধার নিকট দুপুরের খাবার খেলেন।
ভোজন পর্ব সেরে স্বামীজীর সেখান থেকে চলে যাবার ইচ্ছা হোল। দুপুরে বিশ্রাম নেওয়া তাঁর অভ্যাস ছিল না। তথাপি এখন তিনি একটু বিশ্রাম নেওয়ার দরকার বোধ করলেন। তিনি নিজেকে আর সংযত রাখতে না পেরে শুয়ে পড়লেন । দুপুর দুটো বেজে গেলো_ তবু তাঁর উঠতে ইচ্ছা হচ্ছে না_ আবার তিনি ঘুমোতেও পারছেন না! শুধু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছেন, কথা বলতে পারছেন না, কিছু করতেও পারছেন না! সন্ধ্যা হয়ে গেলো যখন, তখনও তিনি উঠতে পারছেন না ! কিন্তু তিনি পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। তাঁর ওঠবার অক্ষমতা দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন_ তাঁর হোলটা কি ? তাঁর সন্দেহ হলো তাঁকে কিছু একটা করা হয়েছে ! বৃদ্ধা মহিলার নিকট অন্ন গ্রহণ করা তার অন্যায় হয়েছে _এরূপ অনুশোচনা করতে করতে শুয়ে শুয়ে তিনি সময় অতিবাহিত করতে লাগলেন।
ওই গ্রামের দূরের মাঠে একটা ধ্বজা স্তম্ভ ছিল। লোকের বিশ্বাস ছিল যে ওই স্তম্ভের নিচে গুপ্তধন অর্থাৎ মাটির নিচে লুকোনো সোনা এবং রুপা আছে। গ্রামের কয়েকজন লোভাতুর বয়স্ক ব্যক্তির ওই গুপ্তধন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু ওই ধনরত্ন নেওয়ার ব্যাপারে তাদের ভয়ও ছিল_ কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এই সব ধনরত্নের সঙ্গে দেবদেবী জড়িত থাকেন। দেবদেবীকে প্রসন্ন করে ধন সংগ্রহ করার জন্য তারা একজন জাদুকরীর সাহায্য গ্রহণ করেছিল। মন্দিরের ওই বৃদ্ধা মহিলাটি সেই সূত্রেই ওই মন্দিরে স্থান পেয়েছিলেন। মহিলাটি সেই গ্রামে পৌঁছে স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করেছিলেন_ ‘নিশ্চিত সেখানে গুপ্তধন আছে, কিন্তু ওই ধন পেতে গেলে দেবীকে প্রসন্ন করতে হবে এবং নরবলি দিতে হবে ।যারা তাঁকে এনেছিলেন _তারা বলির একটা লোক জোগাড় করার জন্য তাঁর নিকট কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছিল। বৃদ্ধাও নরবলির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন । তাঁর আশা ছিল শীঘ্রই যে কোনো একজন এসে তার ফাঁদে পা দেবে ! অপ্রত্যাশিতভাবে স্বামীজীর আগমন তাঁর নিকট একটা বিরাট সুযোগ বলে মনে হয়েছিল।।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~°~~~~~~~~~~~
*আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা*
~~~~~~~~~~~~~~
_স্বামী বাউলানন্দ_
জিজ্ঞাসা:—–ঈশ্বর কি এবং তার লীলাই বা কি?
মীমাংসা:– সর্বেসর্বা বা ঈশ্বর হলেন তিনি যাঁর কোন নাম, রূপ ও গুণ নাই। তিনি হলেন সর্বশক্তিমান, সর্বদর্শী এবং সর্বত্র বিরাজমান। তিনি নিত্য । সর্বেসর্বা(ঈশ্বর) বিশ্বমন রূপে প্রকাশিত হয়েছেন।বিশ্বমন ‘শক্তি’ ছাড়া আর কিছুই নয় । এই প্রকাশের ফলে সর্বেসর্বায় কোনরূপ পরিবর্তন হয় নাই।
এইরূপ প্রকাশ পদ্ধতিতে ‘বিশ্ব-অহং’-এর সৃষ্টি হয়। বিশ্বমন ‘বিশ্ব-অহং’-এর সাথে মিশে বিশ্ব জীব সৃষ্টি করে। মূলতঃ জীব এবং সর্বেসর্বার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। (জীবের) এই সৃষ্টির ফলে সর্বেসর্বা কিছুই হারাচ্ছেন না এবং তাঁর পূর্ণতার কোনরূপ হানি হচ্ছে না।
একই পদ্ধতিতে বিশ্বমন অসংখ্য অশরীরী সত্তায় প্রকাশিত হয়েছে। এইরূপ প্রকাশের ফলে বিশ্বসত্তার কোন হানি হয়না । এইরূপে গঠিত অশরীরী মন অশরীরী অহং-এর সাথে মিশে অশরীরী সত্তায় পরিণত হয়। সমগ্র বিশ্ব এই অশরীরী সত্তায় পূর্ণ।
অশরীরী সত্তার মধ্যে তার উৎস বিশ্বসত্তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এই প্রবণতার ফলেই তারা শরীর ধারণ করে। শরীর ধারণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে ব্যক্তি অহং জেগে ওঠে। তখন সত্ত্বা গুলি ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এই সত্তা গুলির ব্যক্তি-অহং নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। ব্যক্তিসত্তাগুলি ধারাবাহিকভাবে উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, পশু এবং মানবশরীর ধারণ করে। নিজেদের অহংকে রূপান্তরিত করে এবং নিজ প্রভাব হারিয়ে মনুষ্য শরীরের মধ্যে দিয়ে তাদের প্রগতি হয়।
যখন ব্যক্তি অহং তার প্রভাব হারিয়ে ফেলে, তখন সত্তার মধ্যে স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যায় এবং সত্ত্বা গুলি অশরীরী সত্তায় পরিবর্তিত হয়। জীবের যেহেতু সমষ্টির দিকে যাওয়ার প্রবণতা থাকে, সেহেতু তারা অশরীরী মন এবং অশরীরী অহং-এর মধ্যেও পৃথক থাকে।
অশরীরী মন বিশ্ব মনে মিশে যায় এবং অশরীরি অহং বিশ্বঅহং-এ মিশে যায়। যা বাকি থাকে তা হলো বিশ্ব সত্তা । অসংখ্য ব্যক্তি এবং ব্যক্তি অহং অবিরত বিশ্বসত্তায় মিশছে। কিন্তু বিশ্বসত্তা মাত্র একবারই সর্বেসর্বা ঈশ্বরে মিলিত হয়। সর্বেসর্বার প্রকাশের এই হল পদ্ধতি । এই সত্তা সমষ্টিতে পরিণত হয়। এ সমস্ত সর্বেসর্বার কৃপায় ঘটছে ।
এই হল ঈশ্বরের লীলা! বেদান্ত এবং অন্যান্য শাস্ত্রে বিস্তারিতভাবে এগুলি বর্ণনা করা হয়েছে।
‘ঈশ্বর’ শব্দটা সর্বেসর্বা শব্দে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশ্ব সত্তা, সর্বেসর্বার প্রকাশ ।সুতরাং ‘ঈশ্বর’ শব্দ, বিশ্বসত্তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে । আবার বিশ্বসত্তা, বিভিন্ন সত্তা রূপে প্রকাশিত হচ্ছে । সুতরাং সমস্ত জীবের প্রকাশই হোল ঈশ্বরের প্রকাশ ।(ক্রমশঃ)
মন্দিরের চারপাশে উঠোন, ছোট্ট ফটক দিয়ে স্বামীজী ভেতরে ঢুকলেন। মন্দিরে কোন পূজারী ছিল না, কোন পূজা নিবেদনাদির কাজকর্ম সেখানে হয়না বলেই মনে হোল। গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ ছিল। একজন বৃদ্ধা মহিলা মন্ডপের বন্ধ দরজা পুজার সাজসরঞ্জাম রেখে প্রদীপ জ্বালানোর ব্যবস্থা করছিলেন। ঐ রকম একটা অবস্থায় স্বামীজি সেখানে গিয়ে পৌঁছেছিলেন।
সেখানে কিছুক্ষণ কাটানোর পর স্বামীজি ওই মন্দিরে তাঁর থাকার মতো উপযুক্ত পরিবেশ দেখতে পেলেন না। কিন্তু এসেই যখন পড়েছেন, সেই রাত্রে সেখান থেকে পরের দিন সকালে পাশের গ্রাম শ্রীরামগিরিতে চলে যাবেন বলে ঠিক করলেন। ওই গ্রামে শ্রীরামেরও একটি বিখ্যাত মন্দির ছিল।
পরের দিন খুব সকালে স্বামীজী নদীতে স্নান করে ওই স্থান ছেড়ে চলে যাবার জন্য উদ্যোগী হলেন, এমন সময় মন্দিরে থাকা সেই বৃদ্ধা দুপুরে তার কাছে খাবার জন্য স্বামীজীকে অনুরোধ করলেন। অনুরোধে এতটাই জোর ছিল যে, দুপুরে তিনি ওখানেই খাবেন __স্বামীজীকে এরূপ কথা দিতে বলা হোল। স্বামীজী সেই অনুরোধে ‘না’ বলতে পারলেন না ! দুপুরে তার কাছে খাবেন বলে কথা দিলেন ।
ইত্যবসরে আগের দিন সন্ধ্যায় শবরীর বালুচরে দেখা সেই কেশরী সিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে স্বামীজীর খুব ইচ্ছা হোল। সিংজীও স্বামীজীর জন্য আশা করে বসেছিলেন। স্বামীজী আসামাত্র তিনি তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। তার বাড়ির আশেপাশের কয়েকজন বন্ধুর সাথে স্বামীজীর পরিচয় করিয়ে দিলেন। বেশ কিছুটা সময় ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গে ভালো ভাবেই কাটলো ।অন্য গ্রামে যাওয়ার আগে দুপুরে তাদের বাড়িতে খাওয়ার জন্য শ্রী সিং স্বামীজীকে অনুরোধ করলেন । স্বামীজী তখন তাকে মন্দিরের বৃদ্ধা মায়ের ইচ্ছার কথা এবং তাকে কথা দেওয়ার কথা__ জানালেন! মন্দিরে গিয়ে স্বামীজী বৃদ্ধার নিকট দুপুরের খাবার খেলেন।
ভোজন পর্ব সেরে স্বামীজীর সেখান থেকে চলে যাবার ইচ্ছা হোল। দুপুরে বিশ্রাম নেওয়া তাঁর অভ্যাস ছিল না। তথাপি এখন তিনি একটু বিশ্রাম নেওয়ার দরকার বোধ করলেন। তিনি নিজেকে আর সংযত রাখতে না পেরে শুয়ে পড়লেন । দুপুর দুটো বেজে গেলো_ তবু তাঁর উঠতে ইচ্ছা হচ্ছে না_ আবার তিনি ঘুমোতেও পারছেন না! শুধু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছেন, কথা বলতে পারছেন না, কিছু করতেও পারছেন না! সন্ধ্যা হয়ে গেলো যখন, তখনও তিনি উঠতে পারছেন না ! কিন্তু তিনি পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। তাঁর ওঠবার অক্ষমতা দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন_ তাঁর হোলটা কি ? তাঁর সন্দেহ হলো তাঁকে কিছু একটা করা হয়েছে ! বৃদ্ধা মহিলার নিকট অন্ন গ্রহণ করা তার অন্যায় হয়েছে _এরূপ অনুশোচনা করতে করতে শুয়ে শুয়ে তিনি সময় অতিবাহিত করতে লাগলেন।
ওই গ্রামের দূরের মাঠে একটা ধ্বজা স্তম্ভ ছিল। লোকের বিশ্বাস ছিল যে ওই স্তম্ভের নিচে গুপ্তধন অর্থাৎ মাটির নিচে লুকোনো সোনা এবং রুপা আছে। গ্রামের কয়েকজন লোভাতুর বয়স্ক ব্যক্তির ওই গুপ্তধন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু ওই ধনরত্ন নেওয়ার ব্যাপারে তাদের ভয়ও ছিল_ কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এই সব ধনরত্নের সঙ্গে দেবদেবী জড়িত থাকেন। দেবদেবীকে প্রসন্ন করে ধন সংগ্রহ করার জন্য তারা একজন জাদুকরীর সাহায্য গ্রহণ করেছিল। মন্দিরের ওই বৃদ্ধা মহিলাটি সেই সূত্রেই ওই মন্দিরে স্থান পেয়েছিলেন। মহিলাটি সেই গ্রামে পৌঁছে স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করেছিলেন_ ‘নিশ্চিত সেখানে গুপ্তধন আছে, কিন্তু ওই ধন পেতে গেলে দেবীকে প্রসন্ন করতে হবে এবং নরবলি দিতে হবে ।যারা তাঁকে এনেছিলেন _তারা বলির একটা লোক জোগাড় করার জন্য তাঁর নিকট কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছিল। বৃদ্ধাও নরবলির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন । তাঁর আশা ছিল শীঘ্রই যে কোনো একজন এসে তার ফাঁদে পা দেবে ! অপ্রত্যাশিতভাবে স্বামীজীর আগমন তাঁর নিকট একটা বিরাট সুযোগ বলে মনে হয়েছিল।।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~°~~~~~~~~~~~
*আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা*
~~~~~~~~~~~~~~
_স্বামী বাউলানন্দ_
জিজ্ঞাসা:—–ঈশ্বর কি এবং তার লীলাই বা কি?
মীমাংসা:– সর্বেসর্বা বা ঈশ্বর হলেন তিনি যাঁর কোন নাম, রূপ ও গুণ নাই। তিনি হলেন সর্বশক্তিমান, সর্বদর্শী এবং সর্বত্র বিরাজমান। তিনি নিত্য । সর্বেসর্বা(ঈশ্বর) বিশ্বমন রূপে প্রকাশিত হয়েছেন।বিশ্বমন ‘শক্তি’ ছাড়া আর কিছুই নয় । এই প্রকাশের ফলে সর্বেসর্বায় কোনরূপ পরিবর্তন হয় নাই।
এইরূপ প্রকাশ পদ্ধতিতে ‘বিশ্ব-অহং’-এর সৃষ্টি হয়। বিশ্বমন ‘বিশ্ব-অহং’-এর সাথে মিশে বিশ্ব জীব সৃষ্টি করে। মূলতঃ জীব এবং সর্বেসর্বার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। (জীবের) এই সৃষ্টির ফলে সর্বেসর্বা কিছুই হারাচ্ছেন না এবং তাঁর পূর্ণতার কোনরূপ হানি হচ্ছে না।
একই পদ্ধতিতে বিশ্বমন অসংখ্য অশরীরী সত্তায় প্রকাশিত হয়েছে। এইরূপ প্রকাশের ফলে বিশ্বসত্তার কোন হানি হয়না । এইরূপে গঠিত অশরীরী মন অশরীরী অহং-এর সাথে মিশে অশরীরী সত্তায় পরিণত হয়। সমগ্র বিশ্ব এই অশরীরী সত্তায় পূর্ণ।
অশরীরী সত্তার মধ্যে তার উৎস বিশ্বসত্তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এই প্রবণতার ফলেই তারা শরীর ধারণ করে। শরীর ধারণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে ব্যক্তি অহং জেগে ওঠে। তখন সত্ত্বা গুলি ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এই সত্তা গুলির ব্যক্তি-অহং নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। ব্যক্তিসত্তাগুলি ধারাবাহিকভাবে উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, পশু এবং মানবশরীর ধারণ করে। নিজেদের অহংকে রূপান্তরিত করে এবং নিজ প্রভাব হারিয়ে মনুষ্য শরীরের মধ্যে দিয়ে তাদের প্রগতি হয়।
যখন ব্যক্তি অহং তার প্রভাব হারিয়ে ফেলে, তখন সত্তার মধ্যে স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যায় এবং সত্ত্বা গুলি অশরীরী সত্তায় পরিবর্তিত হয়। জীবের যেহেতু সমষ্টির দিকে যাওয়ার প্রবণতা থাকে, সেহেতু তারা অশরীরী মন এবং অশরীরী অহং-এর মধ্যেও পৃথক থাকে।
অশরীরী মন বিশ্ব মনে মিশে যায় এবং অশরীরি অহং বিশ্বঅহং-এ মিশে যায়। যা বাকি থাকে তা হলো বিশ্ব সত্তা । অসংখ্য ব্যক্তি এবং ব্যক্তি অহং অবিরত বিশ্বসত্তায় মিশছে। কিন্তু বিশ্বসত্তা মাত্র একবারই সর্বেসর্বা ঈশ্বরে মিলিত হয়। সর্বেসর্বার প্রকাশের এই হল পদ্ধতি । এই সত্তা সমষ্টিতে পরিণত হয়। এ সমস্ত সর্বেসর্বার কৃপায় ঘটছে ।
এই হল ঈশ্বরের লীলা! বেদান্ত এবং অন্যান্য শাস্ত্রে বিস্তারিতভাবে এগুলি বর্ণনা করা হয়েছে।
‘ঈশ্বর’ শব্দটা সর্বেসর্বা শব্দে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশ্ব সত্তা, সর্বেসর্বার প্রকাশ ।সুতরাং ‘ঈশ্বর’ শব্দ, বিশ্বসত্তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে । আবার বিশ্বসত্তা, বিভিন্ন সত্তা রূপে প্রকাশিত হচ্ছে । সুতরাং সমস্ত জীবের প্রকাশই হোল ঈশ্বরের প্রকাশ ।(ক্রমশঃ)
