স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা আগের দিন দেখেছিলাম _ওয়াডিগুডেমের এক শিবমন্দিরে অসুস্থ অবস্থায় স্বামীজী পড়েছিলেন এবং শিব পার্বতী প্রকট হয়ে তাঁকে রক্ষা করেছিলেন । তাছাড়া দৈব নির্দেশে _ তাঁর মুক্তি পাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য একদল লোককে গভীর রাত্রে ওই মন্দিরে এনেছিলেন! কিন্তু মন্দিরে থাকা জাদুকরী ঐ বৃদ্ধা রমণী তাদেরকে জল দেওয়ার ছুতোয় জলের সঙ্গে কোন বিষ-জাতীয় পদার্থ মিশিয়ে দেওয়ায় তাদের মধ্যে দুজন অসুস্থ হয়ে বমি করতে শুরু করেছিল । এই অবস্থায় ঐ দুজন বমণকারীর মধ্যে একজন দুর্বল হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং তাই দেখে তাদের দলের অন্যরা বিলাপ করতে লাগলো । স্বামী বাউলানন্দজী ততক্ষণে শরীরে অনেকটাই জোর পেয়েছেন _তিনি ছুটে গিয়ে বৃদ্ধার কাছে যে বিষাক্ত জলের পাত্রটি ছিল, তা লাথি মেরে ফেলে দিলেন। অকস্মাৎ নবাগত লোকগুলির মধ্যে একজন স্বর্গীয় প্রত্যাদেশ পেয়ে (ভর হবার মতো অবস্থা) রাগে কটমট করে বৃদ্ধার দিকে চেয়ে রইল! সে সামনের সারিতেই দাঁড়িয়েছিল সেই বৃদ্ধা তার দিকে চেয়ে বিপদাশঙ্কা করে দৌড়ে মন্দিরের দিকে চলে গেলো। সেখানে গিয়ে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়লো আর ভাবতে লাগলো _ এ পর্যন্ত যা কিছু সে করলো, তা নবাগতদের আগমনে সব ভেস্তে গেল ! তার সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে গেলো! তার সহযোগীরাও আসতে দেরি করল ! এই অপ্রত্যাশিত আগন্তুকরা অশুভ গ্রহ শনির মতো আবির্ভূত হলো এবং সবকিছু বরবাদ করে দিলো! সে তার চরেদের ‘অযোগ্য- পাজি- লোভীর দল’ _ বলে গালাগালি দিতে লাগলো। যাকে বলি দেবে বলে ঠিক করেছিল(স্বামীজী) সে-ও তো রক্ষা পেয়ে গেল! কেবল তাই নয় _এখন তো সে ভীতি-প্রদর্শনকারীদের সম্মুখীন হোল ! রাগে , অভিমানে,ঘৃনায় ভয়ে সে অর্ধমৃত অবস্থায় ওখানেই পড়ে রইলো।
যে যুবক ভাগবৎ,নরসীমার ভর অবস্থায় বৃদ্ধার দিকে কটমট করে চেয়েছিল _সে এখন ভীষণ মূর্তি ধারণ করলো! সে দৃঢ় ভাবে বলল _” আপনি রক্ত চান!” _ এই বলে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁ পায়ে ভর দিয়ে ডান পা তুললো এবং নিজেকে “বীর নরসীমা” বলে ঘোষণা করে বেগে ধাবিত হয়ে বৃদ্ধাকে ডান পা দিয়ে পদদলিত করতে চাইলো! তার পা বৃদ্ধার মুখে স্পর্শ করতে আর এক ইঞ্চি মতো আছে _ এমন সময় স্বামীজি ছুটে গিয়ে দুহাত দিয়ে তার পা ধরে ফেলেন! তিনি বৃদ্ধাকে বললেন সরে যেতে! স্বামীজীর হস্তক্ষেপের ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নরসিংহ দেব শান্ত হোলো।
এই ঘটনা ঘটায় স্বামীজী অবাক হয়ে যেতে লাগলেন। এই ভ্রাম্যমাণ গায়কেরা(ভাগবৎ) নেলোর থেকে এসেছিল। ওয়াডিগুডেম থেকে নেলোর শত শত মাইল দূরে _কোথায় নেলোর আর কোথায় ওয়াডিগুডেম!! ভাগবতেরা এখানে এলো ই বা কেনো? আর এত গভীর রাত্রে _যেখানে একটা গভীর চক্রান্ত চলছে _সেখানেই আসতে হোল? সমস্ত ব্যাপারটাই যেন একটা অলৌকিক ঘটনা!! তবে খুব বেশি করে যা তাঁকে অবাক করে দিলো __তা হোল “নরসিমা স্বামী”-র প্রকাশ! স্বামীজী সাহায্যের জন্য প্রার্থনা জানান নাই অন্ততঃ তিনি বা ঐ ভাগবতগণ __কেউই তাকে আহ্বান করেন নাই! তাহলে কেন এরকম ঘটনা ঘটলো ? স্বামীজী কিছুক্ষণ অন্তর্মূখী হোতেই –তার উত্তর পেলেন!
নরসীমা হোসেন সকলের “রক্ষাকারী দেবতা”! যখনই কেউ বিপদে পড়ে, তখনই সবাই বিপদভঞ্জন নরসীমাকে ডাকে_এবং তিনি আবির্ভূত হন। তবে এমনও দেখা গেছে__ না ডাকলেও কোনো বিপদগ্রস্থকে রক্ষা করতে নরসীমা আবির্ভূত হ’ন! স্বামীজি কৃতজ্ঞতা পূর্ণ চিত্তে ওই দেবতাকে প্রনাম করলেন !
ভাগবতেরাও হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল!আর যে লোকটি বমণ করতে করতে ধরাশায়ী হয়েছিল সে কিন্তু তখনো উঠতে পারলো না ! গোলমাল শুনে নিকটবর্তী বাড়ির লোকেরা মন্দিরের সামনে জমায়েত হোল। কিন্তু কেউই মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকতে সাহস করছিলো না! গ্রামবাসীরা জানতো যে, ওই গ্রামেরই কয়েক জন ধনী ব্যক্তি _কোন দুরভিসন্ধি নিয়ে ওই মন্দিরে বৃদ্ধা-জাদুকরী কে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছে এবং তারা এও জানতো যে, ওই বৃদ্ধা যাদুকরী!! ধনী লোকেদের অতিথি হিসেবেই ঐ মন্দিরে মহিলাটি রয়েছে!!
যে যুবকটি(ভর হ‌ওয়া)-কে স্বামীজী ধরেছিলেন, সেই যুবকটি কে সঙ্গে করে স্বামীজী মন্দিরের বাইরে এলেন! ধরাশায়ী ভাগবৎ অচৈতন্য অবস্থায় আরো অনেকক্ষণ পড়ে র‍ইলো। অনেকক্ষণ ধরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে, মন্দিরের পাশাপাশি বাস করা
আরো অনেক প্রতিবেশী মন্দিরের সামনে জমায়েত হোয়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন স্বামী তার অঙ্গ বস্ত্র ছুঁড়ে ছিলেন এবং স্বামীজীকে তা পড়তে বললেন । স্বামীজি লক্ষ্য করলেন যে তাঁর পড়নে কৌপীনটাও নাই ! ঐ ভদ্রলোকটির নাম ছিল “নরশায়া”। তিনি স্বামীজী এবং আরো কয়েকজনকে তাঁর বাড়ি নিয়ে গিয়ে অবশিষ্ট রাত্রিটুকুতে শোবার মতো জায়গা করে দিয়েছিলেন।(ক্রমশঃ)
===========©=======
প্রথম আশ্রম দর্শন
[মিঃ তুলসী সুবারাও-এর সঙ্গে লেখক অর্থাৎ এ. ভেঙ্কট রাও এবং আরো কয়েকজন পেরেন্টাপল্লী আশ্রমে গিয়ে স্বামী বাউলানন্দজীকে বেশকিছু আধ্যাত্মিক-বিষয়ক জিজ্ঞাসা করলে তিনি সেই সম্বন্ধে দীর্ঘ আলােচনা শুরু করলেন। ব্রহ্মচর্য প্রসঙ্গে আলােচনার পর তিনি একটু হাসলেন। তাঁর কথায় শ্রোতাদের যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল তা দূরীভূত হয়ে গেল। এমত সময়ে ভদ্ৰাচলম হতে আগত এক ভদ্রলােককে কেন্দ্র করে পুনরায় তিনি (স্বামীজী) আলােচনা শুরু করলেন।] বিশাখাপত্তনম থেকে আগত আগন্তুকদের একজনকে উনি জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি রামতীর্থের বই পড়েছেন?” ভদ্রলােক বললেন -‘না। ‘ রামতীর্থের একখানা বই সুব্বারাও-এর নিকট ছিল। স্বামীজী সেটা নিয়ে তাকে পড়তে বললেন এবং আরও বললেন – রামতীর্থের বই একসেট কিনে ওটা সুব্বারাওকে ফেরত দিতে। এরপর স্বামীজী আলােচনা শুরু করলেন। “মহান ব্যক্তিরা কোন জিনিস অনুভব করলে তা গভীরভাবে চিন্তা করেন। ঐ চিন্তা শব্দে রূপ নেয় এবং শব্দ অক্ষরে রূপ নেয়। সেই অক্ষর বই-এ স্থান লাভ করে। যখন আমরা হাতে কোন বই নিই তখন আমরা অক্ষরগুলি দেখি। সেই অক্ষরের মাধ্যমে শব্দকে দেখি। শব্দের মাধ্যমে অক্ষরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাবনা এবং অনুভূতিকে পাই। এবং পরি শেষে বৃহৎ মনকে আয়ত্ত করি। এইরূপে বই-এর মাধ্যমে লেখকের সংস্পর্শে আসি এবং তার উপস্থিতি অনুভব করি। রামতীর্থের বই পড়ে আপনি ঐ অদ্ভুত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসবেন। কিছুকাল বইটার আনন্দ ভােগ করে অপরকে সেটা পড়তে দেবেন। তাদেরকেও রামতীর্থের উপস্থিতি আনন্দের সঙ্গে ভােগ করতে দিন।
অবশ্য যে বই আমরা দিই তা ফেরত নাও আসতে পারে। এলে কিছু মনে করবেন না। রামতীর্থের কথা ছড়িয়ে পড়ুক।” কৃষ্ণরাও (আগন্তুকদের মধ্যে একজন) বললেন, ‘স্বামীজী, আমি বইটা পড়ে নিশ্চিত ফেরৎ দেব।’ ঐ রাত্রে স্বামীজী আবার বললেন “আপনারা সরকারী কর্মচারী — সরকারের প্রতিনিধি। জনগণকে রক্ষা করা এবং তাদের তত্ত্বাবধান সরকারের দায়িত্ব। সরকার তার কর্মচারীদের মাধ্যমে তার কাজ করছে। জনগণের নিরাপত্তা এবং মঙ্গলের জন্য আপনারা এই কর্তব্য করছেন। আপনারা এই কর্তব্য করুন কর্তব্যের খাতিরে নয়, ঈশ্বরের স্বার্থে।
কে ঈশ্বর? জনগণই ঈশ্বর। আপনারা যে কাজ করছেন তা জনগণের মঙ্গলের জন্য। সুতরাং আপনারা প্রত্যেকে আপনাদের কর্ম লক্ষ্য করুন – কতটুকু জনগণের সেবা করছেন, আপনাদের ভুলত্রুটির জন্য কতটা তাদের আশ্বস্ত করছেন। জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করার সময় অবশ্যই লক্ষ্য করতে হবে আপনাদের কর্মপদ্ধতি যেন পীড়াদায়ক না হয় ৷ সাধারণতঃ কর্মচারীরা ভদ্রতার খাতিরে গরীবদের দেখে ৷ তাদেরকে মদ্যপায়ী বলে নিন্দা করে এবং বলে এরা কোন কাজের নয়। সমস্যাটা অবশ্যই দেখতে হবে। ঐ নাম (দীনদুঃখী) তাদেরকে কে দিয়েছে? প্রবল শক্তির সংঘাতকে প্রতিরােধ করতে না পেরে তারা গরীব হয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপঃ– আপনারা কি চিন্তা করতে পারেন কোন লোকের ধুতি আছে অথচ কৌপিন পরে বাইরে বের হয়েছে? চিন্তা করতে পারেন ভাত থাকলে কেউ ফ্যান খায়? ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু যদি তাদের না মেটে তাহলে তারা চুরি করে। এই সমস্ত বিষয় বিবেচনা করুন। প্রত্যেক লােক বিশেষ স্বভাবের বশবর্তী। কখন দুর্ঘটনায় পড়ে কখন বা পরিস্থিতির চাপে পড়ে তার সেই স্বভাব বজায় রাখতে পারে না। ঐ ধরনের লােকের খুব বেশী যত্ন নেওয়া উচিত।
কোন পরিস্থিতিতেই মানুষ ঘৃণাই নয়। তাকে ঘৃণা করা উচিত নয়। সেও ঈশ্বরের একটা রূপ ৷ আপনাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার ঈশ্বরের ঐ বিশেষ রূপ কেন নিম্ন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। আপনাদের মনোভাবকে অবশ্যই উন্নত করতে হবে। পরে এই অঞ্চলের দরিদ্রনারায়ণদের সেবা করার সুযােগ পাবেন। ইত্যবসরে আপনাদের মধ্যে যোগ্যতা গড়ে তুলুন।”(ক্রমশঃ)