স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামীজীর বিষ পানের পর থেকে অনেকদিন ধরে শরীর খারাপ থাকার পর কেশরী সিং এবং রামাইয়ার চেষ্টায় তিনি আবার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরে পেয়েছিলেন। প্রত্যেক মেঘখন্ডে মেঘ দ্বারা সৃষ্ট অন্ধকার দূর করার মতো বিদ্যুৎ থাকে। ঠিক তেমনি সমস্ত রকম সমস্যার মধ্যে সমাধানের লক্ষণ লুকিয়ে থাকে। স্বামীজীর দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার মধ্যেও এইরকমই একটা উজ্জ্বল আভাস ছিল । বড়নামচন্দ্রপূরমের কেশরী সিং-এর পরিবার এবং রাজমন্দ্রির ভেঙ্কট রামাইয়ার পরিবার তাদের গুরুকে সেবা করার সুযোগ পেয়েছিল এবং তারা তাঁর কৃপাধন্য হয়েছিল। ওই পরিবারের সন্তানদের অতি শৈশবে এরকম একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তির সঙ্গ লাভ করার ভাগ্য হয়েছিল। ঐ বয়সেই তারা গুরুর কৃপা লাভ করেছিল।
গুরুও একদল অনুরাগী ভক্ত পেলেন । এদের আধ্যাত্মিক উন্নতির দায়-দায়িত্ব তাঁর‌ই। অদ্ভুত ঈশ্বরের কার্যাবলী!
আরোগ্য লাভ করে এবং স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরে পেয়ে স্বামীজী স্মৃতিচারণ করতে করতে অতীতে ভ্রমণকালীন অভিজ্ঞতার কথা ভক্তদের বলেছিলেন । আলোচনাকালে মাঝে মাঝে অনেক তীর্থস্থানের কিছু কিছু রীতিনীতির তিনি তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ।
তীর্থস্থানগুলি সাধারণত কোনো না কোনো পবিত্র নদীর তীরে অবস্থিত। যে সমস্ত লোক ঐ সকল স্থান পরিদর্শন করে তারা ঐ পবিত্র নদীতে স্নান করাকে শরীর ও মনের বিশোধক এবং পবিত্র বলে মনে করে । তাদের বিশ্বাস কোনো পুরুষ বা স্ত্রীলোক পবিত্র গঙ্গায় স্নান করলে তার অতীতের সমস্ত পাপ বিনাশপ্রাপ্ত হয় । গঙ্গা বিষ্ণুর পা হতে উৎপন্ন হয় ও শিবের মাথায় আশ্রয় পায় এবং পরে শিবের মাথা থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করে_ এরূপ কথা পুরাণে বর্ণিত রয়েছে।প্রত্যেক নদীর‌ই তেমনই একটা করে পৌরাণিক কাহিনী আছে এবং লোকে এই কাহিনী বিশ্বাস করে থাকে। যখন কোনো তীর্থযাত্রী গঙ্গায় স্নান করে, তখন সে ভাবে_ সে এমন নদীর জলে দাঁড়িয়ে আছে যার অপর প্রান্ত বিষ্ণুর পা স্পর্শ করে রয়েছে! তীর্থযাত্রীরা গভীর বিশ্বাস নিয়ে সেখানে যায়।
কিন্তু অধিকাংশ স্থানে মধ্যস্থতা করে পান্ডারা এবং তারাই স্নানের সময় তীর্থযাত্রীদের সংকল্প করায়। তারা পাত্র করে জল তুলে তীর্থযাত্রীদের মাথায় ঢালে । স্বামীজি এই রীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন । পান্ডারা স্বার্থপরের দল ! তারা শুধু টাকাপয়সা আদায় করে! তোতাপাখির মতো তারা যা উচ্চারণ করে, তাতে তাদের নিজেদেরই বিশ্বাস নাই। তারা যে তীর্থ যাত্রীদের চেয়ে অধিকতর পবিত্র_ তা কখনই বলা যায় না । বস্তুত তামসিক মন নিয়ে তীর্থযাত্রীদের মাথায় জল ঢেলে তারা তীর্থযাত্রীদের বিরাট ক্ষতি করছে। নদী এবং তার মহত্ত্ব সম্বন্ধে তীর্থযাত্রীদের মনে যে ধারণা থাকে_ তমোগুণ অর্পণ করে তারা তা কলুষিত করে । সংকল্প করায় তীর্থযাত্রীদের পুন্যস্নান রূপ কর্ম__ কাম্য-কর্মে পরিণত হয়ে যাচ্ছে! এই কাম্য-কর্ম জীবকে জন্ম মৃত্যুর কবলে ফেলে । ভক্তরা জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন হতে রেহাই পেতে চায় কিন্তু পান্ডাদের সাহায্যে যখন তারা কর্ম করে (যদিও তা সৎকর্ম )_সেই কর্ম তাদেরকে হাতে পায়ে বেঁধে ফেলে, জন্ম-মৃত্যুরূপ বন্ধনের বাইরে যেতে দেয় না।
ঠিক একই প্রকারের বাড়িতে এবং মন্দিরে পূজা দেওয়ার আগে সংকল্প করানোর ব্যাপারেও স্বামীজীর আপত্তি ছিল । প্রার্থনা কোন ব্যক্তি বিশেষের জন্য হওয়া উচিত নয়_ এটি সকলের স্বার্থে হওয়া উচিত ।এর ফল‌ও সকলের জন্য । প্রশান্তি এমন কোনো বস্তু নয়, যা কোনো ব্যক্তিবিশেষে একচেটিয়া ভোগ করবে! যেখানে অনেক জীব বাস করে, সেই পরিবেশের মধ্যে এটা দেখা যায় এবং জীব সকল তাদের নিজ নিজ যোগ্যতা এবং অগ্রগতি অনুযায়ী তা ভোগ করে । সার্বজনীন ভাবনা প্রার্থনার ভিত্তিস্বরূপ হয়ে উঠুক__ এটাই স্বামীজি জোর দিয়ে বলতে চেয়েছিলেন।
বিপরীতভাবে আমরা বলে থাকি _”এই পূজা আমার”! এর দ্বারা এটাই বোঝায় যে, ব্যক্তিগত সুবিধা লাভের জন্য কোন ব্যক্তি পূজো দিচ্ছে। এটি কাম্য কর্ম ! এটি _ ব্যক্তিকে বন্ধনে বেঁধে ফেলে, মুক্তির পথ দেখায় না।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~©~~~~~~~~~
।।স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা।।
===========®===========
স্বামীজি আবার আলোচনা শুরু করলেন । বললেন – ” সর্বেসর্বা(ঈশ্বর) নিজেই বিশ্ব-সত্তা রূপে প্রকাশিত হয়েছেন। বিশ্বসত্তা আবার বিভিন্ন জীবরূপে প্রকাশিত হয়েছে। যে সমস্ত জীব শরীর ধারণ করেছে তাদের ব্যক্তি-অহং ক্রিয়াশীল হোল এবং এইভাবে ব্যক্তি জীব স্বাতন্ত্র্যতা লাভ করলো। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বের সমস্ত জীবই হল ঈশ্বরের সন্তান। মানবসকল‌ও ঈশ্বরের সন্তান। উদ্ভিদ এবং প্রাণীও ঈশ্বরের সন্তান। সকল সন্তান সুখে থাকলে পিতামাতা সুখী হন। শত সন্তানের মধ্যে একজনও দুঃখ পেলে তাঁরা দুঃখ পান।
পশুদের মধ্যে বড় এবং শক্তিশালী পশুটি তার শিকারের জীবকে হত্যা করে নিজের উদর পূর্তি করে, পরে ভুক্তাবশিষ্ট অপরকে খেতে দেয়। আগামী দিনের জন্য কিছু সঞ্চয় করে না। সমস্ত পশু অনায়াসে প্রতি দিনকার খাবার পেয়ে যায়। পাখীদের ক্ষেত্রেও একই। নিজেদের উদরপূর্তি হলেই তারা খুশী। পরের দিনের জন্য ভাবনা চিন্তা করে না। পাখীর জীবনযাত্রাকে মানব ঈর্ষার চোখে দেখে।
মানবের বুদ্ধি আছে, ভালমন্দ বিচারের ক্ষমতা আছে; আর সেই সঙ্গে সে তার প্রগতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। সুতরাং তাদের অবস্থা পশুপক্ষী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
মানব নিজের এবং সন্তানসন্ততির জন্য খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়ােজনীয় জিনিস সংগ্রহ করে। | এই খাদ্য এবং প্রয়ােজনীয় জিনিস সেই দিনেই সে নিঃশেষ করে ফেলে না। ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে রাখে। এই সংগ্রহ করার যােগ্যতা অনুযায়ী তারা বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হল। অপরকে বঞ্চিত করে তারা নিজেদের জন্য অধিকতর খাদ্য সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত রইল। সুতরাং মানবজীবনেই আমরা দুঃখ কষ্ট দেখতে পাচ্ছি ৷ পশুপক্ষীদের মধ্যে এই দুঃখ কষ্ট নাই।
ভাগ্যক্রমে তােমরা বিচারশক্তি পেয়েছো । তােমাদের মধ্যে কারও কারও সমস্যার সমাধান করার যথেষ্ট যােগ্যতা আছে এবং সেই সঙ্গে শক্তি আছে । যদি তােমরা সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করো তাহলে তােমরা সর্বেসর্বার খুব ঘনিষ্ট এবং প্রিয় হবে।
এই জগতে অনেক লােক আছে যারা ভালো কাজ করে _শুধু মাত্র নাম যশ পাবার আশায়। ভালো কাজ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তােমরা যদি নিঃস্বার্থভাবে, নাম যশের আকাঙ্ক্ষা না করে ভালো কাজ করো তাহলে অদ্ভুত ফল পাবে।
ক্ষুধার্তকে পেট ভরে খেতে দিলে সে খুব সন্তুষ্ট হয়। তার এই সন্তুষ্টির যে কম্পাঙ্ক তা দাতাকে প্রভাবিত করে। সে নিজেও ভীষণ সন্তুষ্টি লাভ করে। ভালো কাজ যা করবে তা প্রাণভরে করবে। কোন ক্ষুধার্তকে খেতে দিয়ে তুমি ভেবাে না যে তুমি তার ক্ষুধা নিবারণ করলে । বরঞ্চ তুমি ভাববে যে ক্ষুধার্ত ব্যক্তি তােমাকে সেবা করার সুযােগ দিয়ে তােমাকে ধন্য করেছে।” … [ক্রমশঃ]