গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা হচ্ছিল ! সেইগুলি সবই পূর্ব পূর্ব কোনো না কোনো দেবদেবীর বা মহাপুরুষদের অঙ্গের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল – এটা উনি নিজের শ্রীমুখে বলেছেন – তাই আমরা জানতে পেরেছিলাম এবং এখন আপনাদের সাথে তা শেয়ার করছি !
গুরু মহারাজের ঠোঁট বা ওষ্ঠ দুটি-ই ছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের ঠোঁটের সঙ্গে সাদৃশ্য যুক্ত ! মা জগদম্বা যেন মহাপ্রভুর ঠোঁটদুটি স্বামী পরমানন্দকে দিয়ে সাজিয়েছিলেন ! কেন – মহাপ্রভুর ঠোঁট-ই বা কেন ? তার কারণ মহাপ্রভুর সারাজীবনে ওই ঠোঁট দুটি দিয়ে শুধু কৃষ্ণ নাম-ই জপ করে গেছিলেন ৷ ভাবস্থ অবস্থাতেও মহাপ্রভুর ঠোঁট নড়তো – অন্তরে যে কৃষ্ণনামের প্রবাহ চলছে তা বোঝা যেতো । কিন্তু কি আশ্চর্য্য ! – স্বামী পরমানন্দ শরীরে এবার বীরভাব ! যুগপ্রয়োজনে মহাপ্রভুর ছিল প্রকৃত বৈষ্ণবভাব – তাই তিনি আপনি নেচে জগৎ নাচালেন, আপনি গেয়ে জগতকে হরি গুণগান গাইতে বাধ্য করলেন ! এমনভাবে উনি এই বঙ্গদেশকে মাতিয়ে দিয়েছিলেন যে, পরবর্তীকালের লোকে বলতো – “কানু বিনা গীত নাই”! সত্যি সত্যিই চৈতন্যপরবর্তী যুগে কিছু মঙ্গলকাব্য ছাড়া বেশিরভাগ সাহিত্য-কাব্যসহ যে কোনো সংস্কৃতিতে শুধু রাধাকৃষ্ণের কথাই থাকতো !
গুরুমহারাজের ঠোঁটের দিকে আলাদা করে আমাদের কখনো তেমনভাবে বিশেষ নজর দিয়ে দেখা হয়নি । ওনার সমগ্র মুখমন্ডলের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আমাদের সময় যেন কোথা দিয়ে অতিবাহিত হয়ে যেতো ! আরো একটা বিষয়, সময়কে একেবারে থামিয়ে দিতো – তা হলো গুরু মহারাজের ওষ্ঠ সঞ্চালনে সৃষ্ট তাঁর কথা ! ভগবৎকথা – হরিকথা – কথাসরিৎসাগর ! মহাপ্রভুর সদাসর্বদা হরিনাম জপ, আর আমাদের হৃদয়ের প্রভু স্বামী পরমানন্দের ছিল সদাসর্বদা হরিকথার প্রবাহ, উদ্গীত ব্রহ্মবাক্যের নাদ-ধ্বনি !
যাইহোক, এখন যখন এই ব্যাপারে আলাদা করে চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছি – তখন স্মৃতির সরণি বেয়ে সেই সময়কার সিটিং-গুলিতে পৌঁছে গিয়ে চেষ্টা করছি – গুরু মহারাজের সেই বিশেষ ঠোঁট-দুটির কথা ভাবতে ! মনে পড়ছে ওনার অদ্ভুত ওষ্ঠ সঞ্চালনের কথা ! মনে পড়ছে একদিন একজন বোবার (বনগ্রামে-ই ভূমিজপাড়ার একজন ব্যক্তি, যে পরে আশ্রমেই কাজকর্ম করত) সাথে গুরুমহারাজের ওষ্ঠ সঞ্চালনের মাধ্যমে অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলার দৃশ্য ! ওই বোবা লোকটি যে ‘আঁউ-আঁউ’ করে কত কথা গুরুমহারাজকে বলেছিল এবং গুরুমহারাজ শুধুমাত্র ঠোঁটের নাড়াচাড়া, মুখভঙ্গি ওহস্ত-সঞ্চালনের মধ্য দিয়ে ওই ব্যক্তির সমস্ত কথার উত্তর দিচ্ছিলেন – সেটা যারা সেদিন না দেখেছিল তাদেরকে ব্যপারটা ঠিকমতো বোঝানোই যাবে না !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন_ ওনার নাকের গঠন ছিল শ্রীরাধিকার মতো । রাধিকার নাকের বিশেষত্ব ছিল এই যে, বৃন্দাবনের কুঞ্জবনে লীলাচ্ছলে যখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বনের গভীরে চলে গিয়ে লুকিয়ে পড়তেন – তখন সমস্ত গোপীরা তাঁকে খুঁজে না পেলেও শ্রীমতি রাধিকা ঠিকই তাঁকে খুঁজে পেতেন ! কারণ শ্রীরাধিকার নাকে সবসময়ই ভগবানের অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের গায়ের গন্ধ লেগে থাকতো ! তাই তিনি ওই গন্ধ অনুসরণ করে ঠিক পৌঁছে যেতেন সেই গোপন জায়গায় ! তাছাড়া শ্রীরাধিকার নাসা দিয়ে যে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রবাহ হতো – তাতেও সেই কৃষ্ণনাম‌-ই উচ্চারিত হোতো !
গুরুমহারাজের নাকের বিশেষত্বের কথা যদি বলতে হয় তাহলে একদিনের ঘটনা বলি ! কোন এক ভক্ত মা গুরু মহারাজের জন্য কিছু একটা রান্না করে নিয়ে এসেছিল ! তারপর সেই মা-টিই গুরুমহারাজকে বললো – ” খেয়ে বলুনতো_ জিনিসটা কি এবং কি কি দিয়ে রান্না করা হয়েছে ?” গুরুমহারাজ প্রথমে খাবারটা একবার নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে শুঁকলেন তারপর এক আঙ্গুলের ডগায় একটু খাবারের অংশ নিয়ে জিভে ঠেকিয়েই বলতে শুরু করে দিলেন খাবারটির উপাদানগুলি কি কি ছিল, এমনকি কি কি মশলা প্রয়োগ করা হয়েছিল – তাও বলে দিলেন! গুরুমহারাজের কাছেই আমরা প্রথম শুনেছিলাম যে, যেখানে রূপ-তন্মাত্রা বা দৃষ্টি fail করে সেখানে গন্ধ-তন্মাত্রা বা নাসিকাকে ব্যবহার করতে হয় । উনি নিজেই বলেছিলেন – ” আমার ঘরে একটা টিকটিকি মরে গন্ধ ছড়াচ্ছিল – তপি (পবিত্রপ্রাণা) খুঁজে পেল না ৷ আমি গন্ধ-তন্মাত্রা অনুসরণ করে ঠিক ওটাকে খুঁজে বের করলাম।” … [ক্রমশঃ]