স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আশ্রমের লোকজনদের ভালোভাবে খাওয়ানো হওয়ার পর স্বামীজী মনস্থ করলেন _তিনি ভদ্রাচলমে ফিরে যাবেন । নির্ধারিত দিনে দুপুর একটায় লঞ্চ ছাড়ার কথা । ওখানে রেলসেতুর ধারে এক কুটিরে যে সন্ন্যাসী থাকতেন _সেই সন্ন্যাসীর নিকট বিদায় নেওয়ার জন্য স্বামীজী দু-এক ঘণ্টা আগে সেখানে গেলেন। তিনি সন্ন্যাসীর সঙ্গে কথা বলছেন _এমন সময় যে লোকটি সেদিন যজ্ঞের ভাত চুরি করেছিল, সে মদ খেয়ে সেখানে হাজির হলো এবং স্বামীজী ও সন্ন্যাসীটিকে গালি দিতে লাগলো। তাঁরা একটু অপ্রস্তুত হলেন ঠিকই কিন্তু নিজেদেরকে সংযত করলেন। কুঁড়েঘরের সন্ন্যাসীটি এই বিশ্রী পরিস্থিতি উপেক্ষা করার জন্য সেখান থেকে স্বামীজীকে চলে যাওয়ার অনুরোধ করলেন । ঠিক সেই সময়ে কুবুরের (অন্ধ্রপ্রদেশের একটি জায়গার নাম ) দিক থেকে একটি ট্রেন এসে গোদাবরী স্টেশনে থামলো। দুজন দীর্ঘকায় সন্ন্যাসী ঐ ট্রেন থেকে নেমে সোজা কুটিরের সন্ন্যাসীর কাছে এলেন। সেই লোকটি তখনও স্বামীজীকে গালি দিচ্ছিল‌, আগন্তুকদের দেখে তার ক্রোধ আরো বেড়ে গেলো _ সে তাদেরকেও কয়েকটা খারাপ কথা বললো ! তাকে সামলানোই দায় হয়ে যাচ্ছিলো! কিন্তু তার এইরূপ আচরণে আগন্তুক সন্ন্যাসীদের মেজাজ বিগড়ে গেলো, তারা তৎক্ষণাৎ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাকে উত্তম মধ্যম প্রহার করলো। লোকটি মাটিতে পড়ে গেল।
আগন্তুক সন্ন্যাসীরা কুটিরের সন্ন্যাসীর নিকট কিছু বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা তার সাথে কথা বলতে লাগলেন। ওই লোকটি মার খেয়ে উঠে চলে যেতে যেতে এই বলে শাসিয়ে গেলো যে, সে তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে এসে আগন্তুক সন্ন্যাসীদ্বয়কে খুন করবে! কুটিরের সন্ন্যাসীর সাথে কাজকর্ম মিটিয়ে আগন্তুক সন্ন্যাসীদ্বয় পরের ট্রেনেই চলে গেলেন ।
ওই দিনের ঘটনায় কুটিরের স্বামীজি একটু বিস্ময়াভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন _কারণ তাঁরা মনে মনে চাইছিলেন যে, ওই মদ্যপ ব্যক্তিটির একটু শাস্তি হোক ! সেটা ঈশ্বরের ইচ্ছায় অন্যভাবে হয়ে গেল।(ক্রমশঃ)
:……………………………………
*স্বামী বাউলানন্দজীর অধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………
আধ্যাত্মিক গুরু হলেন অসাধারণ মানবীয় সত্তা। তাঁর সাধনা, তপশ্চর্যা এবং অভ্যাসের বলে তিনি এই জন্মে বা পূর্ব জন্মে বা পূর্ব পূর্ব জন্মে ত্রিঅভিমানিক শরীরের ঊর্ধ্বে উঠেছেন। তিনি ব্ৰহ্মকে উপলব্ধি করে ব্রহ্মজ্ঞ হয়েছেন । মানবের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য তিনি জগতে অবস্থান করতে থাকবেন। তিনি শিষ্যের মধ্যে আধ্যাত্মিক বীজ অনুপ্রবেশ করান। শিষ্যের পূর্ণতা লাভ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর চিন্তন, অনুভূতি তাকে পরিপুষ্ট করতে থাকে। যতদিন পর্যন্ত না শিষ্য পূর্ণতা লাভ করে গুরুর পর্যায়ে না পৌঁছায় ততদিন শিষ্যকে এভাবে পালন করতে থাকেন। এর পর গুরু শিষ্যের আর কোন ভেদ থাকে না। নামমাত্র তাঁরা ভিন্ন শরীরে থাকেন। কার্যত তাঁরা এক ।
গল্পে আছে ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভের জন্য শুকদেবকে রাজা জনকের কাছে পাঠানো হয়েছিল । রাজা প্রথমেই শুকদেবের নিকট দক্ষিণা চাইলেন। তিনি বললেন “তুমি যদি এখন দক্ষিণা না দাও তাহলে তোমার এই দক্ষিণা দেওয়ার এবং আমার এই দক্ষিণা গ্রহণ করার সুযােগ হবে না। ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্তি হলেই তুমি দেখবে গুরু-শিষ্য এক এবং অভেদ। তখন দাতা ও গ্রহীতা থাকবে না।”
বুঝতে পারলে ?–স্বামীজী জিজ্ঞাসা করলেন। এটা কেমন করে হয় ব্যাখ্যা করছি :-
যখনই আমরা আধ্যাত্মিক গুরু সম্বন্ধে বলি তখনই আমাদের মনে সেই সমস্ত ব্যক্তির কথা আসে যাঁরা পূর্ণতলাভ করেছেন। যাঁদের ঈশ্বর দর্শন হয়েছে, যাঁরা অপরকে ঈশ্বর দর্শন করাতে সক্ষম হন—তাঁরা আধ্যাত্মিক শক্তিতে ভরপুর।
যখন এই সমস্ত ব্যক্তি কাউকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করেন তখন শিষ্যের মধ্যে তাঁদের শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটান। শিষ্যের মধ্যে যে প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তি সুপ্ত অবস্থায় থাকে তা গুরু-শক্তি পেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তা গুরু-শক্তিতে রূপান্তরিত হয় । প্রেম, জ্ঞান ও শক্তি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সমমনােভাবাপন্ন হওয়ায় শিষ্যের শক্তি গুরুশক্তিকে আকর্ষণ করে শােষণ করে এবং তার শক্তি বলিষ্ঠ হতে থাকে। গুরুর কৃপায় শিষ্য উচ্চ ধাপে উন্নীত হয় এবং গুরুর সম পর্যায়ে আসে। শিষ্যের অগ্রগতির জন্য গুরুর দায়িত্ব আছে। গুরুর প্রতি শিষ্যের পূর্ণ বিশ্বাস এবং নিঃশর্ত সমর্পণ প্রয়ােজন ।
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি গুরু ও শিষ্যের মধ্যে কোন ভেদ নেই। তাহলে একে অপরকে কেমন করে ত্যাগ করবে ? পরিস্থিতির চাপে পড়ে একে অপর হতে পৃথক হয়ে পড়লেও তাঁরা একই। একে অপরের উপর রুষ্ট হলেও তাঁরা এক-ই। তাঁদের এই সম্পর্ক অতি উৎকৃষ্ট এবং মধুর। তাঁদের এই সম্পর্কের সঙ্গে শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কের তুলনা করা যায় না।
পরমাত্মা হলেন প্রথম গুরু। পরমাত্মা যখন স্থূল শরীর নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন, তখন তাঁকে অবতার বলা হয় । এই অবতারকে তাঁর কাজের প্রােগ্রামকে রূপ দেওয়ার জন্য কয়েকজন পাৰ্যদ সাহায্যের নিমিত্ত জগতে আসেন। এঁরা হলেন ঈশ্বর কোটী । এঁরা সকলেই অসাধারণ আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। মানবের মানসিক উন্নতির জন্য এঁরা বিভিন্ন স্থানে কর্ম করতে থাকেন। ভিন্ন শরীর হলেও এবং দূরে বাস করলেও তাঁরা সকলে এক এবং অভেদ। তাঁরা সর্বেসর্বার নিকট হতে শক্তি নিয়ে তাঁদের শিষ্যের মধ্যে এই শক্তি ছড়িয়ে দেন। তাঁদের উপদেশ একই। সব কাজেই তাঁরা এক ৷ পরমাত্মা এবং গুরু একই। গুরু ও শিক্ষকের মধ্যে যেমন পার্থক্য তেমনি শিষ্য ও ছাত্রের মধ্যে পার্থক্য। … [ক্রমশঃ]