স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। ডুম্মাগুডেমে স্বামীজীর যে চৈতন্য-ভাবাবস্থা হয়েছিল_সেই ব্যাপারে আমাদের আলোচনা চলছিলো।
ঐদিনের ঘটনাটি গ্রামে একটা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলো! ঐ গ্রামে কয়েকজন খ্রিস্টান যুবক ছিলো, তারা স্বামীজীকে দেখার জন্য মন্দিরে ভিড় করতে লাগলো। আরো বহু যুবক, যারা খৃষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল_ তারাও এই ঘটনায় আকৃষ্ট হয়ে স্বামীজীকে দেখতে এলো এবং তাঁর বাণীর প্রতি অনুরাগ দেখাতে লাগলো । এই ঘটনা খ্রিস্টধর্ম-প্রচারকদের মনে সংশয় জাগিয়ে তুললো। তাঁরা শঙ্কিত হলেন যে, তাদের যুবকেরা হয়তো পুনরায় হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করবে । হিন্দুদের মধ্যেও সন্দেহ দেখা গেল এবং সমালোচনা শুরু হয়ে গেলো।
কিছু কিছু লোক খ্রীস্টান যুবকদের এই মন্দির প্রাঙ্গণে আসায় আপত্তি জানাতে থাকলো। তারা ভাবলো_ খ্রিস্টান যুবকরা মন্দির প্রাঙ্গণে এলে মন্দির এবং মন্দিরের দেবতা অপবিত্র হয়ে যাবে! তাদের ভয় হোলো_ বহু পয়সা খরচা করে হয়তো মন্দির শোধন করতে হবে! এই সমস্ত কথা নাইডুর কানে পৌঁছালো। এতে তাঁর মেজাজ গেল বিগড়ে! তিনি বললেন ইউরোপীয় ধর্মপ্রচারকেরা কোনো না কোনো উপায়ে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে ! পন্ডিতজী তাঁকে বলেছিলেন যে, শোভাযাত্রার দিন ভগবান পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন ! তিনি অর্থাৎ নাইডু নিজের চোখে সব কিছু দেখেছেন । স্বামীজি গভীর সমাধিতে নিমগ্ন হয়েছিলেন ! স্বামীজীর মধ্যে ঈশ্বরীয় শক্তির প্রকাশ এমন শক্তিশালীভাবে প্রকট হয়ে উঠেছিল যে, পন্ডিতজী অনেক চেষ্টা কোরেও স্বামীজীর একটা হাত তুলতে পারছিলেন না!
তিনি বুঝেছিলেন__যে স্বামীজীর মধ্যে ভগবানের প্রকাশ_ সেই স্বামীজি নিঃসন্দেহে খুবই শক্তিশালী! তিনি ভাবলেন স্বামীজীর কাজের সমালোচনা করে স্বামীজীকে অপমান করলে_ নিজের‌ই দুঃখকে ডেকে আনা হবে ! তাই তিনি খুব সংকটে পড়লেন__ একদিকে স্বামীজীর ভয়, অন্যদিকে গ্রামের বয়স্ক লোকেদের ভয়, আবার একদিকে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের ভয় ! তিনি দু-এক রাত্রি ঘুমাতেই পারলেন না ! শেষে তিনি এই ব্যাপারটা নিয়ে পুরুষোত্তম পন্ডিতের সঙ্গে পরামর্শ করতে গেলেন ।
পন্ডিতজী তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বললেন_” উদ্বিগ্ন হবেন না ! কোনো ভয় নাই, কারো কোনো ক্ষতি হবে না ! যে মহান এবং শুদ্ধ ব্যক্তি সেদিন আমাদেরকে শ্রীচৈতন্যের প্রকাশ দেখালেন__সে ব্যক্তি কখনোই ভুল করতে পারেন না ! এই সমস্ত ব্যক্তি যা করেন_ তা সমাজের মঙ্গলের জন্যই করেন! বস্তুতঃ স্বামীজীর উপস্থিতিতে গ্রামের মন্দির পবিত্র হয়েছে বলে ভাবা উচিত! তাঁকে কোনো জায়গায় সরানোর কোনো চিন্তা পড়ার দরকার নাই! মন্দিরের বেদী ঈশ্বরেরই বেদী_তিনি স্বমহিমায় সেখানেই বিরাজ করুন!”_ এই কথাগুলো নাইডুর মনে বেশ সাহস জোগালো ! তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে অন্য সকলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন ।
এই ঘটনার কয়েক বৎসর পর পুরুষোত্তম পন্ডিত রাজমন্দ্রিতে স্বামীজীর সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি স্বামীজীকে সবিস্তারে ডুম্মাগুডেমে যা ঘটেছিলো_ তা স্মরণ করিয়েছিলেন_সব শুনে স্বামীজী চুপ করে রইলেন, কোনো কথা বললেন না।।(ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম যে সাতটি গুণ হল ঈশ্বর। বিশ্বসত্তাই ঐ ঈশ্বর বা সাতটি গুণ হয়েছেন। বিশ্বে সমস্ত জীব এবং বস্তুই হল ঈশ্বর। সর্বেসর্বা সব কিছুরই মধ্যে রয়েছেন। সমস্ত কিছুই সর্বেসর্বার প্রতীক। মানুষের মধ্যে ঈশ্বর পূর্ণভাবে প্রকাশিত। কেবলমাত্র মানুষের মধ্যেই নয়–এক বিন্দু জল, শস্যদানা, প্রস্তরখণ্ড, গাছ, অগ্নি প্রভৃতি যা কিছু আমরা দেখি তার মধ্যেই ঈশ্বর প্রকাশিত। অর্থাৎ সমস্ত বস্তু, শব্দ এবং বিশ্বপ্রকৃতিই হল ঈশ্বরের রূপ। ভক্তির গভীরতা অনুযায়ী মানুষ সমস্ত বস্তু বা অমানবীয় শরীরের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতে পায়। ব্যক্তির ভক্তির গভীরতা নির্ভর কবে গাঢ় বিশ্বাসের ওপর। সুতরাং বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেই আমরা মন্দির, মসজিদ বা গীর্জায় ঈশ্বরকে দেখি । এই সমস্ত উপাসনার স্থানে একটি নির্দিষ্ট স্থান ঈশ্বর বলে গণ্য হচ্ছে। সেই স্থানটা কোন মূর্তি বা আসন দ্বারা আবৃত। এগুলি যাই হােক না কেন তাঁরা সেই স্থান ঘিরে বিশেষ ভাবে রয়েছেন। ঐ ঘিরে থাকা স্থানে সর্বেসর্বা মূর্তি বা বস্তুরূপে প্রকাশিত হয়েছেন।
জগতে অনেক মন্দির, মসজিদ এবং গীর্জা রয়েছে। মন্দির, মসজিদ এবং গীর্জা নির্মিত হওয়ার পূর্বে ঐ স্থান শূন্য ছিল। সুতরাং শূন্য স্থানে ভক্তগণ তাদের ঈপ্সিত দেবতার নাম অনুযায়ী মন্দির আদি তৈরী করেছে। মূর্তিটি যে স্থান অধিকার করে রয়েছেন সেই স্থানের মধ্যে সর্বেসর্বা রয়েছেন। ভক্তগণের অধিকৃত স্থানেও সর্বেসর্বা রয়েছেন। দেবতা এবং ভক্তের মধ্যেও সর্বেসর্বা রয়েছেন। সমগ্রের অংশ হয়ে ভক্তগণ সর্বেসর্বার সঙ্গে একত্ব অনুভব করেন |
অনুরাগের সমস্ত ভাবই মূর্তির মধ্যে ঘনীভূত হয়। সুতরাং এ স্থানটি পরিপূর্ণ । যখন লোক ঐ মূর্তির সামনে প্রার্থনা জানায় তখন তারা ঐ পরিপূর্ণ স্থান হতে শক্তি পায় এবং তাদের ইচ্ছা পূরণ হয় । ঐ স্থানে কৃপা পর্যাপ্ত রয়েছে। মূল্য দিয়ে তােমার ইচ্ছা অনুযায়ী কৃপা তুমি নিতে পার। মূল্যটি কি যা দিয়ে তুমি কৃপা পাও ? তা হল একান্ত ভক্তি বা অনুরাগ । যত গভীরভাবে তুমি প্রার্থনা জানাবে ততই তুমি কৃপা পাবে। যেখানে কোন মূর্তি নেই সেই শূন্য স্থানেও প্রার্থনা জানালে একই ফল তুমি পাবে । প্রত্যেক ব্যক্তি নাম-রূপের মধ্য দিয়ে ঈশ্বর সম্বন্ধে এক বিশেষ ধারণা পােষণ করে। কোন বিশেষ স্থানে তার ধারণা অনুযায়ী উপাসনা শুরু করলে ঈশ্বর সেই নাম বা রূপ নিয়ে প্রকাশিত হন। মূর্তি যাই হােক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না। অনুরাগ বা ভক্তিই হল গুরুত্বপূর্ণ। ভক্তি বা অনুরাগ হলেই তার ফল আপনা আপনি ফলবে। এখন, কোন নামে আশ্রম দেবতাকে পূজা করা হয় তা জিজ্ঞাসা নিষ্প্রয়ােজন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ পছন্দমত এর নাম দিতে পারে। উপজাতিদের নিকট এই মন্দিরটি হল ইলেম্মা মাতার মন্দির। ‘ ইলেম্মা ’ শব্দের অর্থ হল সকলের মাতা। সুতরাং ইহা সার্বজনীন মাতা। কিছু কিছু লােকের নিকট এই মন্দির হল ঈশ্বরের মন্দির। কেউ কেউ এর মধ্যে রামকৃষ্ণকে দেখে।” …[ক্রমশঃ]