গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা হচ্ছিলো । ওনার মুখে শোনা, আমার কাছে যে পয়েন্টগুলি নোট করা ছিল – সেগুলির মধ্যে প্রায় সবগুলিরই বর্ণনা হয়েই গেলো,– আর যা দু-একটার কথা লেখা বাকি আছে সেগুলি এখন বলার চেষ্টা করা যাক্ । এর বাইরেও যদি কোন ভক্তের কিছু জানা থাকে – সেগুলি তুলে ধরলে আমরা সবাই উপকৃত হবো ।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন তাঁর হাত হোলো ‘সেবার হাত’! ওনার হাতের মুঠোগুলো দেখলে মনে হোতো _বোধহয় অতটা বড় নয়, কিন্তু উনি একমুঠো কোনো কিছু যদি কারুকে দিতেন তাহলে সে দু’হাত পেতে নিলেও তা ভরে গিয়ে উপছে পড়তো ! উনি নিজেই বলতেন – “আমি যখন কাউকে কিছুই দিই তখন আমার মনটা এতো খারাপ হয়ে যায় – কারণ প্রতি মুহূর্তেই মনে হয় আমার হাতের মুঠো-টা বোধ’য় খুব ছোটো, যদি এটা আরও বড় হোতো তাহলে আরও বেশি বেশি করে দিতে পারতাম !”
আমরা শুনেছিলাম গুরুমহারাজের বাহু মহাবীর বজরঙ্গবলী হনুমানের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল । গুরুমহারাজের বাহুতেও অমিত বল ছিল । যতদিন উনি Rural electrification-এ কাজ করেছেন – সেই সময়কালীন যে অঞ্চলে ওনার কাজ হোতো, সেই অঞ্চলের বহু মানুষ এখনও বেঁচে রয়েছে যারা বলে এক একটা ইলেকট্রিক পোল্ (বা পোস্ট) যা তিন-চারজন বা আরও বেশি লোক নানারকম কসরৎ করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বয়ে নিয়ে যেতো – গুরুমহারাজ (স্বামী পরমানন্দ) একা একাই কাঁধে করে ওই এক-একটা পোল্ বয়ে নিয়ে গিয়ে মাঠের নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিয়ে আসতেন ! আমি একবার দেখেছিলাম বনগ্রামের মাঠে একটা বড় জেনারেটর মেশিন (যা ছিল অত্যন্ত ভারী) যেটিকে চার-পাঁচ জন মানুষ ঠেলাঠেলি করেও একটা ভ্যানে চাপাতে পারছিল না – গুরু মহারাজ দূর থেকে এটা দেখে, এক হাতে চায়ের গ্লাসটা ধরে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছে গেলেন । তারপর হাতের গ্লাসটা কোন একজনকে ধরতে দিয়ে – হাতের গেরুয়া পাঞ্জাবির হাতটা একটু গুটিয়ে নিয়ে নিজেই হাত লাগালেন । বললেন – “আমি একাই একটা দিক ধরছি তোরা সবাই মিলে উল্টো দিকটা ধরে ঠেলতে থাক্, দেখবি ওটা ভ্যানের উপর উঠে যাবে (তলায় কাঠের স্লিপার দেওয়াই ছিল)৷” যারা ওখানে ঠেলাঠেলির কাজ করছিল – সবাই হাঁ – হাঁ – করে উঠলো ! বললো – “গুরুদেব ! আপনি এই তেল-কালিমাখা মেশিনে হাত দেবেন না ! আপনার হাতে কালো কালি লেগে যাবে !” গুরুমহারাজ বললেন – “ধর্-তো ! আগে জেনারেটরটাকে তো ভ্যানের উপরে তোল্ তারপর ওসব ভাববি । আমার গায়ের চামড়ায় কোন রং বা তেল-কালি আটকে থাকতে পারে না ! লাগলেও শুকনো ন্যাকড়া দিয়ে মুছেলেই একদম পরিষ্কার হয়ে যায় ৷” বাকিরা একটু-আধটু সাহায্য করলেও সেদিন গুরুমহারাজ অক্লেশে এক চান্সেই ঐ অত বড় জেনারেটর-টিকে ভ্যানে তুলে দিয়েছিলেন ।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ওনার হাত দুটো যাঁর কাছ থেকে নেওয়া – সে একসময় গুরুমহারাজের প্রচুর সেবা করেছিল, অর্থাৎ চারযুগে যে ক’জন ভগবানের শ্রেষ্ঠ সেবক ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন – উনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন ! এই সেবকের জয়গান ত্রিলোকে বন্দিত হয় – শুধুমাত্র পৃথিবীতেই নয় !
আমাকে আজিমগঞ্জের সৌমেন বলেছিল – গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন ওনার হাতের তালু বা পাঞ্জা ছিল ওনার পূর্ব পূর্ব জন্মের মায়েদের হাত ! যে মায়েরা তাঁদের ভগবানরূপী শিশুপুত্রকে স্নেহ-ভালোবাসা-করুণায় আপ্লুত করে তাঁর সেবা করতো ! গুরুমহারাজও ছিলেন সকলের কাছে সেইরকমই স্নেহময়ী জননী ।৷ … [ক্রমশঃ]