স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। ভদ্রাচলম শিবমন্দিরে থাকাকালীন রামুলু নামে এক যুবকের সাধন-ভজন করে বেশ উন্নত একটা অবস্থা লাভ হয়েছিল। সে যে কোনো মানুষকে দেখেই তার সম্পর্কে সব কথা বলে দিতে পারতো। স্বামীজী বুঝতে পারলেন এটা রামুলুর বেশ উন্নত অবস্থা! কিন্তু জনগণের স্বার্থে তাকে সংযত থাকতে বললেন। তিনি বললেন_”চোখ বন্ধ করে মনকে সংযত করো এবং তারপর মনকে ঈশ্বরমুখী করে তোল। সমাজে অনেক পাতকী মানুষ থাকতে পারে_কিন্তু তাই বলে সমাজকে সংশোধন করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমার এই শক্তি যদি ঈশ্বরমুখী করে তোল_তাহলে তোমার উর্ধ্বগতি হবে। এখন যেটা হচ্ছে_ওইটা সিদ্ধাই, সিদ্ধাই মানুষের উর্ধ্বগতির পক্ষে সহায়ক নয়।অত‌এব তা বর্জন করাই উচিত! সাধনকালে এইরকম ক্ষমতা লাভ হলে সাধকের তা গ্রহণ করা উচিত নয়।”
স্বামীজীর উপদেশ শুনেও রামুলু নিজেকে সংযত করতে পারলো না। সুতরাং স্বামীজী তাকে মতিগেডার গুহায় গিয়ে কিছুকাল থাকতে বললেন। স্বামীজীর কথায় রামুলু ঐ স্থান ছেড়ে মতিগেডার গুহায় চলে গেল।
এরপর স্বামীজী কুনাভরম চলে এলেন। সেখানে পোষ্ট‌অফিসের সামনে একটা রামমন্দিরে অবস্থান করতে লাগলেন। রাস্তার ধারে অবস্থিত এই মন্দিরটি ছিল খুবই ছোট। তাছাড়া সেখানে জন-কোলাহল‌ও ছিল খুব বেশি। একদিন স্বামীজী ওখানে শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন । তিনি জেগেই ছিলেন, ঘরের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হটাৎ তিনি স্পষ্ট দেখলেন_ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ স্থুল শরীরে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। স্বামীজী তাঁকে প্রনাম জানানোর পর, শ্রীরামকৃষ্ণদেব ওনাকে ঐ গ্রামকে কিভাবে প্রতিক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল করে পুনর্গঠন করা যায়_ তার নির্দেশ দিলেন। তিনি বলেছিলেন_”গ্রামবাসীদের উচিত নিজেদের জমি কৃষ্ণ করে প্রয়োজনীয় ফসল উৎপাদন করা।
গ্রামের মানুষকে খাদ্যে স্বনির্ভর হোতে হবে। তাহলেই তারা উৎপন্ন ফসলের বিনিময়ে তাদের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে পারবে।
জল এবং জমি প্রকৃতির দান। এগুলো কারোরই একার নয়।এগুলোর উপর কোরোর মালিকানা দাবি করা উচিত নয়। নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রত্যেকের‌ই জল এবং জমি পাওয়া উচিত। সমাজের সব সদস্যরাই প্রকৃতিদত্ত যে কোনো জিনিসের‌ই অধিকারী”।(ক্রমশঃ)
==========©============
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পরমাত্মন, শ্রীগুরুজী(স্বামী বাউলানন্দ) বললেন :– “জীবনে ধর্মকে যােজনা করতে হোলে প্রাথমিক আবশ্যক তিনটি বিষয়—স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষা। তারপর দরকার আরও তিনটি বিষয়ের,—সত্য, সুন্দরতা অকপটতা। সুন্দরতা হােলো মনের। স্পষ্টতই প্রথমােক্ত তিনটি বিষয় উপলব্ধি করাবার গুরুদায়িত্ব সমাজের উপর আর দ্বিতীয় পর্যায়ের তিনটির যােজনা করার ভার ব্যক্তির উপর ।”
শিক্ষা-প্রসঙ্গে তিনি বলেন :– “শিক্ষার উদ্দেশ্য হােলো জ্ঞান আহরণ। জীবনের যাত্রা পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বে এবং মনুষ্যত্ব থেকে দেবত্বে উত্তরণের দিকে। তার মধ্যেই মানুষ লাভ করে মহত্ব। কিন্তু বৰ্ত্তমান শিক্ষা কেবল একটা উপাধি-ভূষণের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গভীর জ্ঞান মানুষকে করে নম্র আর বিনয়ী, হাল্কা শিক্ষা আনে নানা জটিলতা।
আজ তুমি যে শিক্ষা লাভ করতে চাইছে, তা চাইছো কেন? কি উদ্দেশ্য? – উদ্দেশ্য এটাই যে তুমি অন্য সবার চাইতে কিছুটা ভালভাবে বাঁচতে চাইছো। কিন্তু বাবা, কখনো এ কথাটা মনে জাগে কি, কিসের জন্য তুমি বাঁচতে চাইছো? জীবনধারণের উদ্দেশ্যটা কি ?
M. A., C. A., B. E., D.Lit. ইত্যাদি উপাধিগুলাে তাে পেশা বা জীবিকার চরিত্রই ঘােষণা করে বেশী। বাবা, যাঁরা মহান হয়েছেন তাঁরা কে কবে অমন ডিগ্রীর পিছনে ছুটেছেন? বুদ্ধ, যীশু, রামকৃষ্ণ কিংবা রবীন্দ্রনাথকেই দেখনা।” আজকাল শিক্ষায়তনগুলােতে কি ধরণের শিক্ষা দেওয়া হয়? দেওয়া হয় প্রয়ােজন-ভিত্তিক শিক্ষা। বৃটিশরা ভৌগােলিক তথ্যের প্রতি বিশেষ জোর দিয়েছিল এবং এম্. এ. ক্লাশেও তা পড়ান হোতো। কেন এমন জোর দিয়েছিল? – তা না হ’লে জগৎ-জোড়া সাম্রাজ্য চালাবে কি করে?
আজকের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে শুধুই বাহ্যাড়ম্বর। একটা গল্প বলি শােন। এক বাড়ীতে অতিথি এসেছে। রান্নাঘরের দিক থেকে দুম্ দাম, ঘটর ঘটর, ঠন্ ঠন্, টুং টাং আওয়াজ আসতে লাগলো। অভ্যাগত ব্যক্তি ভাবলো ‘অনেক কিছু রান্না হচ্ছে’ আর ভুরিভােজের অপেক্ষা করতে লাগলো। খেতে বসে দেখে ‘ হা কপাল! শুধু মুড়ি আর বেগুনপােড়া! এতাে কিছুর পর এই!’ লােকটা ভাবতে লাগলো ‘ ব্যাপার কি?’ একটু বাদেই বুঝতে পারলো ‘কোন এক অ-রাঁধুনীর হাতে রান্নার ভার দেওয়া হয়েছিল। বেচারা এছাড়া কি-ই বা করতে পারতাে!’ আমাদের স্কুল-কলেজগুলােতেও ঐ একই হাল। অপটু শিক্ষকের উপর ভার পড়েছে শিক্ষা দেবার। তিনি কি আর করবেন? তার কাছে শেখাবার যে কিছুই নেই। আমদানী করা যন্ত্রপাতিতে Laboratory ঠাসা, কেবল নাড়াচাড়া–টাং টুং, ঠুং ঠাং শব্দই সার! [ক্রমশঃ]