# *কথা প্রসঙ্গে* # — ( _অষ্টম খন্ডের_ পাণ্ডুলিপি থেকে নেওয়া)
[মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য ও রোগ-ব্যাধি সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে পরবর্তী অংশ]
… প্রথম বিশ্বের দেশগুলো বিশেষত: ইউরোপের কয়েকটি দেশে এখন এই কথাগুলো খুবই বুঝেছে ৷ ফলে খুব দ্রুত ওরা নিরামিষাশী হয়ে উঠছে। সেক্সের ব্যাপারেও ওরা এখন প্রচন্ড sincere হয়ে উঠেছে । কোনো পুরুষ বা কোনো নারী পরস্পরের সাথে মেলামেশা করার আগে current medical report-টা দেখে নিচ্ছে – H.I.V. report কার্ড দেখছে, তারপরে মেলামেশা করছে ! এখন আর ওসব দেশে আগের মত অবাধ মেলামেশা পাবে না ! ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের সমাজ জীবনে প্রাচীনকাল থেকে বিবাহপ্রথা চালু রয়েছে, যেখানে একটা স্বামীর একটাই স্ত্রী থাকে এবং উভয়ে সারাজীবন একটা সুন্দর বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাটিয়ে দেয় ! এই ব্যাপারটা প্রথম বিশ্বের যুবক-যুবতীরা আগে ভাবতেই পারতো না !
প্রকৃতপক্ষে সেক্স নিয়ে ওরা ছিনিমিনি খেলতে আরম্ভ করে দিয়েছিল ৷ ব্যস্ ! মহাপ্রকৃতি বা মা জগদম্বা দিয়ে দিলো একটা ‘ডোজ্’ – AlDS ! এক ‘ডোজে’ই – “আমাদের দেশে sex free”- বলা মানুষগুলো, এখন একেবারে ঠান্ডা মেরে গেছে ! এখন ওরাই আবার _’সারা জীবন একটা স্ত্রীকে নিয়ে জীবন কাটানোই জীবনে সুস্থ থাকার অন্যতম উপায়’- বলে প্রচার করছে !
এইভাবেই মানুষ কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ না বুঝে যখনই প্রকৃতির উপর আঘাত হানে, প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে – তখনই প্রকৃতি নিজে নিজেই তার প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করে ৷ এর ফলে মানুষের উপরে নেমে আসে নানান বিপর্যয় – প্রাকৃতিক বিভিন্ন প্রতিকূলতার সৃষ্টি হয় । ফলে কষ্ট পায় মানুষ, অন্যান্য জীবেরাও নানান অসুবিধা পড়ে– মারাও যায় ! কিন্তু এগুলো মহাপ্রকৃতি মানুষকে শিক্ষা দেবার জন্য‌ই করে – revenge নেবার জন্য নয় ৷ প্রকৃতির এই শাস্তি থেকে মানুষ যদি শিক্ষা গ্রহণ কোরে নিজেদেরকে শুধরে নেয় – তাহলে মানুষেরই মঙ্গল ! এই রকম বিপর্যয়ের ফলে যারা ভুগলো _শুধুমাত্র তারাই ভুগলো, পরের generation-কে আর ভুগতে হবে না ৷
প্রকৃতির উপর আঘাত কমাতে পারলে মহাপ্রকৃতিও আর অশান্ত হবে না । কিন্তু মুশকিলটা কি জানোতো – মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে চায় না । প্রকৃতির রুদ্র রূপ দেখে প্রথমটায় ভয় পায় ঠিকই – মনে মনে ভাবে, ‘এই দুর্বিপাক কেটে গেলেই এবার থেকে ঠিক পথে চলবো’ _ কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না ! তাই generation after generation মানুষ কষ্ট-ই পেয়ে আসছে –আনন্দ বা শান্তির স্বাদ আর পাচ্ছে না !
কষ্ট যা বলছিলাম_ এটাকে শাস্ত্রে বলা হয়েছে ‘ক্লেশ’। ভারতীয় ঋষিরা শাশ্ত্রাদিতে ত্রিবিধ ক্লেশের কথা উল্লেখ করেছেন ৷ এরমধ্যে আধিভৌতিক ক্লেশ হোলো দেহের ক্লেশ (আধি-ব্যাধি-উপাধি ইত্যাদি), আধিদৈবিক ক্লেশ হল মনের ক্লেশ (দুঃখ,বেদনা, অশান্তি) এবং তিন নম্বরটি হল আধ্যাত্মিক ক্লেশ ! এটি সাধনমার্গ অবলম্বনকারীদের ক্লেশ । সাধারণ মানুষ সাধারণত: আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক ক্লেশে-ই ক্লিষ্ট হয় – আধ্যাত্মিক জ্বালা বা ক্লেশ যে কি – তারা তা জানতেই পারে না ।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের জীবনে সেই জ্বালা প্রকাশ করে_ জীবকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য দেখিয়ে গিয়েছিলেন । সাধনকালে দক্ষিণেশ্বরে পঞ্চবটীতে, গঙ্গার ধারে মাটিতে মুখ ঘষে ঘষে কাতর হয়ে কাঁদতেন আর বলতেন, ” মা ! আরও একটা দিন চলে গেল তুই দেখা দিলি নে মা !” এই যে জ্বালা বা ক্লেশ – এটাই সাধকের আধ্যাত্মিক ক্লেশের এক ধরনের প্রকাশভঙ্গি ৷
দেহ এবং মনের কথা যেটা বলা হচ্ছিলো – সেখানে দেখা যায়, দেহে ব্যাধি প্রকট হবার অনেক আগেই ওই ব্যক্তির মনে রোগ প্রকট হয়েছিলো । আর মনের রোগ সৃষ্টি হবার বহু আগে ওই ব্যক্তির অবশ্যই প্রাণের সহজতা বিঘ্নিত হয়েছিলো । তাই, প্রকৃত অর্থে মানুষের সুস্থতার জন্য প্রধান প্রয়োজন “প্রাণের সহজতা” ! প্রাণের বিকার না ঘটলে মনের বিকার ঘটে না, আর মনে বিকার না থাকলে দেহের বিকার বা disharmony of body system ঘটতে পারে না । body তে disharmony না এলে দৈহিক কোন রোগের প্রকোপের কোনো প্রশ্নই ওঠে না ।
যদি কেউ তার প্রাণ-কে নিয়ন্ত্রন করতে পারেন – তবে foreign virus ঘটিত কোন রোগ তার শরীরে দেখা দিলেও তিনি নিজে নিজেই তার প্রতিরোধ করতে পারবেন – ঔষধের কোনো প্রয়োজন হবে না ।
এই যে কথাগুলো এতোক্ষণ বললাম – এটি প্রাচীন ঋষিদের শিক্ষা । তাঁদের কথা অভ্রান্ত এবং চিরকালীন সত্য ! স্বামী বিবেকানন্দের শরীর শেষের দিকে যখন নানান রোগে আক্রান্ত হোলো – তখন তিনি একদিন তাঁর শিষ্যদের কাছে ব্যক্ত করেছিলেন যে,– যদি তাঁকে এক বছরের জন্য কোন একান্ত নির্জনবাসে থাকার সুযোগ দেওয়া হয় – তাহলে তিনি তাঁর শরীরের যাবতীয় রোগ-ব্যাধি নিজে নিজেই সারিয়ে তুলতে সমর্থ হবেন ।
দ্যাখো, এগুলি প্রাচীনকালের ঋষিদের চিন্তা-ভাবনারই প্রতিফলন । স্বামীজি এই বিজ্ঞান ভালোমতোই জানতেন, তিনি নিজের শরীরের উপর এটা প্রয়োগও করতে পারতেন । কিন্তু এই ধরনের মহাপুরুষরা শুধুমাত্র মা জগদম্বার ইচ্ছায় শরীর ধারণ করেন – জীবকল্যাণের জন্য ! জগৎ থেকে আলাদা কিছু নেবার তিলমাত্র বাসনা তাঁদের থাকে না, – আর এখানে নেবার আছেটাই বা কি ! এইজন্য যেই মুহূর্তে তাঁদের এখানকার কাজ শেষ হয়ে যায় – সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা তাঁদের স্থূল শরীরটাকে জীর্ণবস্ত্রের মতো পরিত্যাগ করে – চিন্ময়লোকে, চিন্ময় অবস্থায় বিরাজ করেন ! অপেক্ষা করেন আবার কখন জীব কল্যানে বা জগৎ-কল্যানে শরীর ধারণ করতে হবে_সেই আহ্বানের!!!
[ষষ্ঠ,সপ্তম ও ৮-ম খন্ডের পান্ডুলিপি থেকে আরো দুই একটি লেখা মাঝে মাঝে মাঝেই দেওয়া হবে!]