গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের সাথে শংকরানন্দের প্রথম যোগাযোগের কথা ওনার মুখ থেকেই শুনেছিলাম । গুরুমহারাজ যে সময় পূর্ব বর্ধমানের মাঝেরগ্রাম অঞ্চলে একটা প্রাইভেট কোম্পানি (সিমেক্স ইন্জিনিয়ারিং)-র হয়ে রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশনের কাজ করছিলেন, সেইসময়েই ওনার সাথে যুবক রবীনের আলাপ হয়েছিল ৷ সমসাময়িক সময়েই অন্ধপ্রদেশের দেবেন্দ্রনাথ, কলকাতার সম্বিত সেন (ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সময়কার কেশব সেনের পরিবারের উত্তরসূরী), দিল্লির সুব্রত নিয়োগী প্রমুখরা গুরুমহারাজ অর্থাৎ যুবক রবীনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন । ওনাদের সাথেই শংকরানন্দও সেইসময় পূর্ব বর্ধমানের মাঝেরগ্রাম বা মধ্যমগ্রামে ব্রহ্মবোধানন্দ মহারাজ (শম্ভু মহারাজ)-এর রামকৃষ্ণ আশ্রমে যাওয়া-আসা করতেন । গুরুমহারাজও তাঁর কাজের অবসরে মাঝে মাঝেই ওই আশ্রমের আসতেন এবং তৃষাণ মহারাজ এবং পুতুল মা (রামকৃষ্ণপ্রাণা মাতা)-ও ওই আশ্রমের সাথেই সেইসময় যুক্ত ছিলেন । ফলে ঐসময়েই মাঝেরগ্রামের শম্ভু মহারাজের আশ্রমকে কেন্দ্র করে একটা পরমানন্দ-দল গঠন হয়েই গিয়েছিল । কারণ, রায়না বা চক্ষণজাদি-শম্ভুপুর এলাকার ভক্তদের দু-চারজনও তখন মাঝেরগ্রামে আসা-যাওয়া করতো !
ঐ সময় যুবক রবীনকে এই দলটি ঠিকমতো ধরতে পারছিল না – একবার মনে হচ্ছিলো এই ছেলেটি অবশ্যই একজন মহাপুরুষ, আবার মনে হচ্ছিলো হয়তো কিছুটা সাধন-ভজন রয়েছে তাই অনেক কথা বলতে পারে ! কিন্তু “এই যে সেই “– সেটার বোধ হচ্ছিলো না । আর হবেই বা কি করে – অধরা নিজে না ধরা দিলে কেই বা তারে ধরতে পারে!!
যাইহোক, যখন যুবক রবীন “স্বামী পরমানন্দ” হয়ে উঠলেন, তখন এনারা সবাই পরমানন্দ চরণে নিজেদেরকে সমর্পণ করে তাঁকেই গুরু বলে মেনে নিয়েছিলেন ৷ বাহ্যিকভাবে স্থূল শরীরের বয়সের বিচারে গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের চাইতে শংকরানন্দ মহারাজ কুড়ি বছরের বড় ছিলেন । তার মানে হচ্ছে, যখন শংকরানন্দ মহারাজের সাথে গুরুমহারাজের দেখা হচ্ছে _তখন গুরুমহারাজের বয়স যদি কুড়ি বছর হয়, তাহলে শংকরানন্দ মহারাজের বয়স ছিল চল্লিশ বছর । শংকরানন্দ মহারাজ ২০/২১ বছর বয়সেই তৎকালীন [অর্থাৎ আজ থেকে (২০২০) ৬৬/৬৭ বছর আগে] সময় শিবপুর বি.ই কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন । কিন্তু সংসার ধর্মে তীব্র বৈরাগ্য থাকার কারণে ছাত্রাবস্থাতেই উনি সংসার ত্যাগ করেছিলেন ! তবে তার আগে তাঁর সঙ্গে তাঁর পিতার খুবই বাদানুবাদ হয় এবং ওনার পিতা ওনাকে গৃহ ছেড়ে চলে যেতে বলেন ! তিনি আরও বলে দেন যে, তাঁর গৃহের দরজা ঐ ছেলের জন্য সেদিনের পর থেকে বন্ধ হয়ে গেল !
শংকরানন্দ মহারাজ পিতার কথা রেখেছিলেন – কিন্তু তিনি ওই কথা একবারই ভেঙেছিলেন(পুরো ঘটনাটা মহারাজের মুখেই শোনা) যখন মাঝেরগ্রামের শম্ভু মহারাজের আশ্রমে একটা দুর্ঘটনায় পুতুলমা পুড়ে গিয়েছিলেন এবং কোলকাতায় হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল! তখন তাঁর দেখভালের জন্য তৃষাণ মহারাজের কোলকাতায় কয়েকদিনের জন্য থাকা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ৷ সেই থাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে শংকরানন্দ মহারাজকে পিতা ঠাকুরের দেওয়া শর্ত ভাঙতে হয়েছিল ! সম্ভবত তৃষাণ মহারাজের সাথে গুরুমহারাজ বা যুবক রবীনও সেইসময় ওনাদের কলকাতার বাড়িতে পা দিয়ে থাকতে পারেন! যদিও এই কথাটি উনি বলেন নি_তবে গুরুজীর কাছে আমরা শুনেছিলাম যে,পুতুলমাকে কোলকাতায় নিয়ে যাওয়া এবং তাঁর শুশ্রূষা করা এসব কাজে গুরুমহারাজ গোড়া থেকেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন ।
আমাদের কথা হচ্ছিলো – যখন শংকরানন্দজীরা যুবক রবীনকে “গুরু” হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন সেই সময়কার কথা ! একদিন একান্তে গুরুমহারাজ শংকরানন্দ মহারাজকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – “আচ্ছা মহারাজ ! আমার সাথে সাক্ষাৎ হবার আগে আপনার এই যে প্রায় কুড়ি বছরের ভ্রাম্যমাণ জীবন (যেহেতু প্রায় কুড়ি বছর বয়সে শংকরানন্দের গৃহত্যাগ ঘটেছিল এবং প্রায় চল্লিশ বছরের কাছাকাছি বয়সে ওনার সাথে গুরুমহারাজের সাক্ষাৎ হয়েছিল।), এই সময়ে আপনার সাথে কে ছিল ?” মহারাজ অক্লেশে উত্তর দিয়েছিলেন – কেন – আমি তো একাই ছিলাম !” গুরুমহারাজ গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন – “না–না ! আমি ছিলাম আপনার সর্বক্ষণের সঙ্গী ! যখন আমার পরমানন্দ (রবীন)রূপ এই শরীরটা হয়-ই নি, তখনও সূক্ষ্ম জগৎ থেকে বা কারণ জগৎ থেকেও আমার দৃষ্টি আপনার উপর সবসময় ছিল ৷ ফলে কোনো সময়েই আপনি একা ছিলেন না !”
শংকরানন্দ মহারাজ যখন এই কথাগুলো বলছিলেন – তখন তাঁর দুচোখ দিয়ে ঝরে পড়ছিল জলের ধারা ! গুরুমহারাজের কৃপার কথা, করুণার কথা স্মরণ করতে গিয়ে বারবার ওনার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিলো । উনি কিছুক্ষণ নিজেকে সামলে নিয়ে আবার কথা বলছিলেন । গুরুমহারাজের সন্ন্যাসী মন্ডলের প্রথম সন্ন্যাসী স্বামী শংকরানন্দ মহারাজ ! গুরুমহারাজ যখন বনগ্রামে আসা প্রথম ত্যাগী ভক্তদের দলটিকে ব্রহ্মচর্য সংস্কার-দান করেছিলেন, সেই সময় শংকরানন্দ মহারাজের সন্ন্যাস সংস্কার হয়েছিল ।
সেই অর্থে পরমানন্দ সন্ন্যাসী মণ্ডলে শংকরানন্দ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ! আর এইজন্যেই পরমানন্দ মিশনের বেশিরভাগ শাখাতেই শংকরানন্দ মহারাজের অবাধ যাতায়াত যেমন ছিল, তেমনি গ্রহণযোগ্যতাও ছিল । উনি খেতে খুব ভালোবাসতেন এবং যেকোনো মানুষ অপেক্ষা অনেকটা বেশি পরিমাণে খেতে পারতেন – এইটার জোগাড় হলেই শংকরানন্দ স্বামী সন্তুষ্ট ! এরপর শুরু হতো ওনার ধর্মালোচনা । উনি বেশিরভাগ সময়েই স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে কথা বলতেন । গুরুমহারাজকে আলোচনা ঊর্ধ্বে রাখতেন ! বলতেন – “গুরুজীর কথাগুলো বলা যায়, কিন্তু তাঁকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যদি সঠিকভাবে বলতে না পেরে ওনাকে কোনোভাবে ছোট করে ফেলি – তাই ওনার সম্বন্ধে বিশেষ কোনো কথা বলতে চাই না ! আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ যেটুকু ঘটেছে,সেইটুকুই বলি!!” (ক্রমশঃ)