স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব সশরীরে প্রকট হয়ে, বাউলানন্দজীকে গ্রামগুলিকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে গেলে কি কি করা উচিত_এই নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
….”মূলতঃ সমগ্র মানবজাতির উদ্ভব হয়েছে একটিমাত্র পরিবার থেকে। সৃষ্টির আদিতে মহাপ্লাবনের জল সরে গিয়ে ক্রমে ক্রমে যখন স্থলভাগ জেগে উঠলো_ তখন সেই আদি ও আদিম পরিবার পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান সুমেরুতে বসবাস করতো। আদি পিতামাতার সন্তানেরা এরপরে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল । সেই বিভিন্ন স্থান‌ই_ আজ জগত বা পৃথিবী বলে পরিচিত । যে সমস্ত অঞ্চলে তারা বসবাস করতে লাগলো _সেই সমস্ত স্থানের আবহাওয়া অনুযায়ী তাদের গায়ের রং এবং আকৃতি বিভিন্ন রকমের হতে লাগলো। সব মানুষই এক, তারা প্রত্যেকে একই পরিবার থেকে এসেছে __প্রত্যেকের এই চেতনা থাকা উচিত ! বিভিন্ন লোককে, বিভিন্ন জাতি বলা ভুল ! এক জাতির অন্য জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করা অন্যায় ! সমস্ত লোকের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব-ভাব জেগে ওঠা উচিত । সকলে একই বিশ্বের অধিবাসী বা নাগরিক । সুতরাং সমবেতভাবে সকলেই প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তির অংশীদার।”
শ্রীরামকৃষ্ণ অনর্গল বলে চলেছেন এবং স্বামীজী (বাউলানন্দ) খুব মনোযোগ সহকারে তা শুনতে লাগলেন ! কর্মব্যস্ত এবং লোকালয়ে অবস্থিত মন্দিরটিতে এই ঘটনা ঘটছিলো। লোকে দ্রুতগতিতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো_ কিন্তু কেউ জানতেও পারছিল না__ মন্দিরে কি ঘটনা ঘটছে! স্বামীজী চর্মচক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণের স্থুল শরীর দেখলেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণের কথা তিনি নিজের কানে শুনলেন।।
পরবর্তীকালে স্বামীজী এই সমস্ত ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভক্তদের কাছে সবকিছু আলোচনা করেছিলেন । ‘যিনি দর্শন দিলেন_তিনিই রামকৃষ্ণ কিনা’_ এই ভেবে আমরা কেউ কেউ অবাক হয়েছিলাম ! আমরা তখন ভাবছিলাম__ তিনি যদি রামকৃষ্ণ হয়েও থাকেন, তাহলে শ্রীরামকৃষ্ণ কি রাজনৈতিক বিষয়ে অনুরাগী ছিলেন? শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর জীবদ্দশায় কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন নাই! ওই সময় তিনি যা বলেছিলেন তা আধ্যাত্মিকতা ছাড়া আর কিছুই নয় !
স্বামী বাউলানন্দজীকে এই সন্দেহের কথা বলা হোলে তিনি হেসেছিলেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে অনেক কথা বলতে লাগলেন। তিনি বললেন _”শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন অসীম শক্তিসম্পন্ন পুরুষ! যে রামকৃষ্ণ কালী মন্দিরে পুরোহিত ছিলেন, সেই রামকৃষ্ণ কিন্তু ছোট্ট একটি দুর্বল মানব-শরীরে সীমাবদ্ধ ছিলেন না ! যে চিন্তারাজি মানব জীবনের বিভিন্ন অজ্ঞানাচ্ছন্ন দিককে কাটিয়ে আলোয় উদ্ভাসিত করতে পারে, সেই চিন্তারাজির এক বিশাল ভাণ্ডার হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ । তাঁর গুরুত্ব অকল্পনীয় । কালী মন্দিরের পূজারীর শরীর নিয়ে তাঁর নির্দিষ্ট কাজ করে গেছেন এবং তার জন্য তিনি নির্দিষ্ট ফল‌ও পেয়েছেন ! তিনি ভক্তদের ক্ষমতা অনুযায়ী উপদেশ দিতেন । এক‌ই কথা প্রসঙ্গে _বিভিন্ন ভক্তদেরকে বিভিন্ন ধরনের উপদেশ দিতেন। তাঁর শরীরের সঙ্গে সঙ্গে রামকৃষ্ণদেব কিন্তু শেষ হয়ে যাননি _ তিনি শাশ্বত! প্রয়োজন হোলে সেই অরূপ,অখন্ড সত্তাই রূপধারণ করেন। তিনি মানুষকে উপদেশ দিয়েই চলেছেন!! প্রয়োজন অনুযায়ী যথাসময়ে যথোপযুক্ত লোকের নিকট তাঁর ভাব ব্যক্ত করেছেন! সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি শত শত বিবেকানন্দ তৈরি করতে পারেন । এই হোল শ্রীরামকৃষ্ণের সম্বন্ধে বিস্তারিত ছবি এবং মহত্ব!! আজ জাতির পুনর্গঠন এবং সার্বজনীন ভাতৃত্ববোধের প্রয়োজন এসেছে । সুতরাং এ বিষয়ে জনগণকে অনুপ্রাণিত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সাধনা __জীবন বহির্ভূত কিছু নয় ! সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্ত কার্যকলাপ __এর অন্তর্ভুক্ত ! একজন তপস্বী বা সাধক সমাজ থেকে সরে থাকতে পারেন না। সমাজের আধ্যাত্মিক অগ্রগতির জন্য তার প্রচেষ্টা অবশ্যই থাকবে! সেইজন্য রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দকে নির্দেশ দিয়েছিলেন । স্বামীজীর এই উত্তরে ওখানে উপস্থিত সকলেই খুশি হোলেন । তাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণের এই বিরাট বা ব্যাপক মূর্তি চিন্তা করে অবাক হোলেন ।
কুনাভরম ছেড়ে স্বামীজী পেরেন্টাপল্লী ফিরে গেলেন । সেখানে তিনি কয়েকদিন রয়ে গেলেন। কুটিরে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং রামকৃষ্ণের ফোটো স্থাপন করলেন এবং নিত্য-পূজা ও ধ্যান-জপে মগ্ন হয়ে রইলেন।।(ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
জানতো, মস্ত পিপের মত চেহারার এক রাজার ইচ্ছে হােলো নিজের চিত্র বানাবার। দেশের সব ঐ খ্যাতিমান চিত্রকরকে ডেকে পাঠান হোলো। রাজ-ইচ্ছা অনুসারে তারা অতি যত্নে আঁকতে শুরু করলাে বড় রকমের পারিশ্রমিক আর পুরস্কারের প্রত্যাশায়। সত্যিই সবাই তারা রাজার জীবন্ত চিত্র নিয়ে দরবারে হাজির হােলো। কিন্তু একি ! তা দেখেই রাজা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে আর বলে ‘একি রাজার চেহারা হয়েছে?’ পুরস্কার, পারিশ্রমিক দূরে থাক, চাবুক মেরে তাড়ালেন সবকটাকে । একজন রাজার মনের ভাবটি বুঝে ফেলেছে । সে ক’দিন বাদেই রাজসভায় এলো অন্য একখানি চিত্র নিয়ে। এক জীবন্ত ক্ষত্রিয়ের চেহারা সত্যই সে ফুটিয়ে তুলেছে কিন্তু তার মধ্যে জ্যান্ত রাজাকে খুঁজে পাওয়া ভার। রাজা বড় খুসী হলেন ঐ তেজদৃপ্ত শরীর দেখে। আশার চেয়ে অনেক বেশী অর্থ পেয়ে চিত্রকর ধন্য হােলো।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম। এই চার বর্ণের মধ্যে ক্ষত্রিয়ের ভূমিকাটিই সব চাইতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। অন্যরা তাে এই ক্ষত্রিয়েরই প্রশাসন ও সুরক্ষার ছত্রছায়ায় থাকে, সুতরাং যদি এই ক্ষত্রিয়ের মধ্যে একবার ভ্ৰষ্টাচার ঢোকে তবে শীঘ্রই তা অন্য বর্ণের মধ্যেও প্রবেশ করবে এবং পুরো সমাজটাই ভেঙে পড়বে। তাই দেখা যায় যে, রাজা যদি ঠিক থাকে তবে অন্য বর্ণে বিশৃংখলা বা ভ্ৰষ্টাচার দেখা দিলে সে তা রোধ করতে পারে। কিন্তু ক্ষত্রিয়ও যদি ভ্ৰষ্টাচারী হয়, তবে ? –তখন ভৃগু অবতীর্ণ হন নিঃক্ষত্রিয় করার জন্য ।
“আগে ছিল চার বর্ণ। এখনকার সমাজের দিকে তাকাও,–অগুণতি বর্ণ গজিয়ে উঠেছে। একজন ধনকুবের শিল্পপতি সাধারণ শেঠের সাথে কথাই বলে না। শেঠ যদি টাটা বিড়লাকে হাতজোর করে প্রণাম করে, প্রতিনমস্কার দূরের কথা, ফিরেও দেখে না। যারা চাকুরি করে তাদের মধ্যে আবার IAS. IFS-রা মুকুটমণি। অন্যদের তুচ্ছ জ্ঞান করে। কেউ BA, MA, পাশ করেছে তো অল্প শিক্ষিতদের সাথে সে মেলামেশাই করে না। এমনকি যেসব সুন্দরীরা Beauty Contest-এ অংশ নেয় তারা অন্য নারীদের নাক কুঁচকে বলে ‘ছুচো, বাঁদর’ আরও কত কি।
বর্তমানের যে বণিক-সংঘ –তা ইংরেজদের অনুকরণে, মোটেই ভারতীয় ধারায় নয় । পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে এলেই শুভ হয় নতুবা এসে পড়বে Disharmony আর Disharmony থেকেই উদ্ভুত হবে Disorder। আজ চলছে শুধু Chair আর Power- এর খেলা। যে ব্রাহ্মণ শিক্ষা এবং সংস্কৃতি দেখতো আর যে শূদ্র সেবা এবং উৎপাদনের খেয়াল রাখতো মােটামুটিভাবে তারা ঠিক রয়েছে। ভ্ৰষ্টাচার প্রবেশ করেছে অন্য দুই বর্ণে। ঐ দুয়ের উপর ন্যস্ত রয়েছে শাসন ও সুরক্ষার এবং বাণিজ্য ও অর্থের দায়িত্ব। ক্ষত্রিয় তার চরিত্র বিস্মৃত হবার ফলেই ভারতকে হাজার বছরের পরাধীনতা ভােগ করতে হয়েছে। এমন কোন অনৈতিক কাজই নেই যা আজকের বৈশ্য করতে না পারে । ‘‘কমুনিষ্টরা বলে exploitation, আমরা বলি গ্রহণ বা দোহন। একটি শিশুর জন্মই হয় প্রথমে পিতাকে এবং পরে মাতাকে দোহন করে । জন্মের পরেও সে মাতৃ দুগ্ধ গ্রহণ করে খায়। শুধু তাই নয়, সমাজকে দোহন করে সে শিক্ষা, সুরক্ষা এবং অন্যান্য সব কিছু পেতে থাকে আর বড় হতে থাকে। সুতরাং প্রত্যেক যুবকের একটা কর্তব্য থেকে যায় সমাজের প্রতি। যেমন গ্রহণ করেছে তেমন ফেরতও দেবার আছে সমাজকে। দেখ, আমি যা পেয়েছি তা এমনিভাবে দিয়ে যাচ্ছি।” (ক্রমশঃ)