স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আগের দিনে আমরা স্বামীজীর পেরেন্টাপল্লীতে ঘটে যাওয়া একটি অলৌকিক ঘটনার কথা বলার সময় ওখানে উপস্থিত রেলওয়ে হিসাবরক্ষকের সমাধি হয়ে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেছিলাম। আজ তার পর থেকে….!
পরের দিন ঐ হিসাবরক্ষক আবার এলেন এবং স্বামীজীকে তার অতীতের অভিজ্ঞতার কথা বলতে লাগলেন ‌। অনেক বছর আগের কথা_ তখন তিনি হিসাবরক্ষক রূপে মাদ্রাজে কাজ করতেন। ওই সময় স্বামী প্রেমানন্দ (আর্য সমাজের) মাদ্রাজ পরিদর্শনে আসেন । ডঃ রাও(ঐ অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি)এক জনসভা ডেকেছিলেন এবং সেই জনসভায় তাকেও আহ্বান জানিয়েছিলেন। মহামান্য স্বামী প্রেমানন্দজীর ঠিক বিপরীত দিকে প্রথম সারির চেয়ারে ওই হিসাবরক্ষক বসেছিলেন।ডঃ রাও হাত ধরে স্বামীজীকে সভায় নিয়ে এসেছিলেন । সভায় আসার পর স্বামীজী চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ বসে ছিলেন এবং ডঃ রাও স্বামীজীকে যখন বললেন _”সমস্ত লোক এসে গেছে, হলঘর পরিপূর্ণ, সকলে আপনার কথা শুনতে উৎসুক!” তখন মহামান্য স্বামীজী চোখ খুলে তাদের দিকে তাকালেন _তার প্রথম নজর পড়লো ওই হিসাবরক্ষকের প্রতি! শ্রোতৃবৃন্দের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে তিনি আবার চোখ বন্ধ করলেন এবং বক্তৃতা শুরু করলেন। তাঁর বক্তৃতা শেষ হলে ডঃ রাও সহ আরো কয়েকজন মহামান্য ব্যক্তি- ঐ স্বামীজী সম্বন্ধে কিছু বললেন । তারপর সভা সমাপ্ত হোল । হলঘর থেকে স্বামীজীকে সঙ্গে করে তাঁর বসার জন্য নির্দিষ্ট ঘরে নিয়ে যাওয়া হোল। সমস্ত লোকজন স্বামীজীর পিছুপিছু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু হিসাবরক্ষক আর ওই হলঘর থেকে উঠতে পারলেন না তিনি বাকশূণ্য হয়ে অচৈতন্য অবস্থায় বসে রইলেন । স্বামীজি যে সমস্ত কথা বলেছিলেন তার একটিও তাঁর কর্ণগোচর হয় নাই । তাঁর বন্ধু তাঁকে নড়াবার চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। বঃ রাও এবং অন্যান্য সকলকে ডেকে পাঠানো হোলো, তাঁরা এসে হিসাবরক্ষককে ভালো করে নিরীক্ষণ করলেন এবং দেখলেন তিনি গভীর সমাধিতে নিমগ্ন ! সমাধি ভঙ্গের পর তাঁরা যত্নসহকারে তাঁকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন।
তাঁর এই সমাধি অবস্থা প্রায় আট মাস ধরে চলেছিল । তাঁকে অতি সযত্নে প্রতিদিনই একবার তরল খাদ্য দেওয়া হোত। আট মাস পরে তিনি চোখ চেয়েছিলেন ! তবু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে আরো কিছুদিন লেগে গিয়েছিল ।চাকরিতে অনুপস্থিত থাকার জন্য যাতে তাঁর চাকরি না যায়, সে জন্য ডঃ রাও রেল বিভাগে প্রতিপত্তি খাটিয়ে অনুরোধ করেছিলেন । সেইজন্য_ অনুপস্থিত থাকা অবস্থাতেও ওই হিসাবরক্ষক কিছু বেতন পেতেন । এরপর থেকে তিনি প্রায়ই সমাধিস্থ হোতেন এবং দুই তিন দিন ধরে এই অবস্থায় থাকতেন । পরে তিনি রাজমন্দ্রীতে বদলি হয়ে আসেন এবং সেখানে তিনি গত 10 বছর কাজ করে আসছেন । এই 10 বছরে তাঁর আর কোনদিন সমাধি হয় নাই । কেবল মাত্র গত রাত্রে তিনি আবার সমাধিস্থ হয়েছিলেন।
এরপর থেকে স্বামী বাউলানন্দ এই পরিবারের খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন । তাঁরা প্রায় প্রতিদিনই মিলিত হোতেন এবং একে অপরকে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন । কয়েক মাস পরে ওই হিসাবরক্ষক চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করে মাদ্রাজ চলে গিয়েছিলেন।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
আদর্শ সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্বামীজী বলেছিলেন :– “আমাদের আদর্শ ভুললে চলবে না ৷ আমাদের দৃষ্টিতে সেটা যেন সবসময় শুদ্ধ পবিত্র থাকে ৷ আদর্শ যত শুদ্ধ পবিত্র হবে ততই তোমার পথ পরিষ্কার হবে ৷ আমাদের আদর্শ কি ? আমাদের ধর্মই বা কি ? এ সম্বন্ধে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার । কেউ কেউ বলে, ‘কোনো বিশেষ সাধনায় সিদ্ধিলাভ তথা শক্তি অর্জনই আমাদের আদর্শ’৷ কেউ কেউ বলে, ‘ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব-বোধই আমাদের আদর্শ’।
কোন বিশেষ শক্তির জন্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ এবং ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব-বোধ – এ দুটোই নির্ভর করে প্রগতির উপর। বাহ্যিক প্রগতির (Outward progress) দ্বারা কোন বিষয়ে সিদ্ধি লাভ করা বা শক্তিলাভ সম্ভব। কিন্তু ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব-বােধ একমাত্র ঊর্ধ্ব প্রগতির দ্বারাই সম্ভব। ব্যক্তির শক্তির গুণগত রূপান্তর হলে বা দেহস্থ শুক্র শক্তিশালী হয়ে ওজতে রূপান্তরিত হলে এর দ্বারা ক্রমােন্নতি সম্ভব। ঐ ব্যক্তি নিজেকে সমষ্টিতে উন্নীত করে ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব-বােধ করে।
যদি ব্যক্তির সূক্ষ্ম চেতনা গুণগত শক্তি নিয়ে ক্রিয়া করে তাহলে স্বার্থপরতা নি:স্বার্থপরতায় রূপান্তরিত হয়। যখন সে ঊর্ধ্ব প্রগতির পরাকাষ্ঠায় পৌঁছায় তখন সে সমষ্টিতে উন্নীত হয়, তার উৎস এবং অধিষ্ঠানের সঙ্গে এক হয়ে যায় – সমষ্টিতে মিশে যায়। সে নিজেই সমষ্টিসত্তা হয়ে যায়।
স্বার্থপর লােকও সিদ্ধিলাভের আদর্শ পােষণ করে। তার লক্ষ্যও পূরণ হয়। আর ঐ সিদ্ধি বাহ্যিক প্রগতির মাধ্যমে লাভ হয়। বাহ্যিক প্রগতির পরাকাষ্ঠায় উন্নীত হলে সিদ্ধিলাভ সম্ভব। যাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব বােধ জাগে নাই তারা পার্থিব বস্তুর প্রতি আসক্ত হয়। কখন কখন একই বিষয়ে আসক্ত দুই ব্যক্তির মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, একজন জয়লাভ করে, অপরজন পরাস্ত হয়। যােগ্যতার মাপকাঠিতে বিজেতা এবং বিজিত-এর মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। একজন অপরজন অপেক্ষা নিকৃষ্ট নয়। জয়-পরাজয় স্থান, কাল এবং পরিবেশের উপর নির্ভর করে । যারা পরিবেশের চাপে পরাস্ত হয় তারা এই পরাজয়কে মেনে নিতে পারে না। যে পরিবেশে তারা পরাস্ত হয়েছে সেই পরিবেশ সম্বন্ধে তারা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করে দেখে। তাদের পরাজয় আক্ষমতা বা দূর্বল চেতনার জন্য ঘটে না। শক্তিশালী চেতনাসম্পন্ন হলেই তারা ঈপ্সিত বিষয়ের প্রতি আসক্ত হতে পারে। তারা ভালভাবেই বুঝতে পারে যে দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ঈশ্বরের অনিচ্ছা বা অপ্রসন্নতার জন্য তাদের পরাজয় ঘটেছে। আমরা যে বিষয়ের প্রতি আসক্ত আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা লাভ করেছে। ঐ বস্তু পেতে হলে প্রতিদ্বন্দ্বিকে পরাস্ত করতে হবে। এর জন্য ঈশ্বরকে প্রসন্ন করতে হবে। তাঁর অপ্রন্নতার জন্যই আমরা পূর্বে জয় লাভ করতে পারি নাই।
ইতিহাসে এর নজির পাই। ধ্রুব বিষ্ণুর দর্শন পেয়েছিল। রাবণ, হিরণ্যকশিপু ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পেয়েছিল। যে বস্তু তারা পূর্বে পায় নাই – তা পাওয়ার জন্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বির উপর প্রতিশােধ নেওয়ার জন্য তারা আরও শক্তি অর্জন করার চেষ্টা করে। এই প্রবল, বাসনা নিয়ে তারা তপস্যা করে। তাদের ইন্দ্রিয় বেশ সবল এবং তারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সবকিছু করছে পারে। তাদের পছন্দ মত তারা নাম এবং রূপেতে মনােসংযোগ করে। (ক্রমশঃ)