স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। রাজমন্দ্রিতে কয়েক মাস থাকার পর স্বামী বাউলানন্দজী পেরেন্টাপল্লী ফিরে এলেন। বসবাসের উপযোগী করার জন্য গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় তিনি পুনরায় তার আগের কুটিরটি সংস্কার করলেন এবং নতুনভাবে কিছুটা নির্মাণ‌ও করলেন। আশ্রমের সম্মুখভাগ বর্ষার সময় যাতে ঝর্ণার জলের ধাক্কায় ভেঙে না যায়_ সে জন্য জায়গাটি পাথর দিয়ে বাঁধানোর ব্যবস্থা করলেন । আশ্রমে প্রবেশ করার জন্য কয়েকটা পাথরের সিঁড়িও তৈরি করা হোলো।
আশ্রম দেবতার অর্থাৎ শিবলিঙ্গের চারিদিকে পাথর দিয়ে চৌকো করে বাঁধিয়ে, তা বালি দিয়ে পূরণ করে দেওয়া হোল । আশ্রমে তখন দুটি খুব বড় বড় কাঁঠাল গাছ ছিল । প্রকান্ড গুঁড়িযুক্ত এই গাছগুলি ছিল খুবই পুরোনো । এদের সুবিস্তৃত শাখা-প্রশাখাতেই কেবলমাত্র ফল ধরতো না_ এদের গুঁড়িতেও প্রচুর ফল ধরতো।
সেখানে অনেক আগাছা ও জড়ানো লতাপাতা ছিল । অনেকগুলি গর্ত‌ও ছিল_ যেখানে সাপেরা বাস কোরতো । কিন্তু স্বামীজি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না । ওই স্থানে অনেক সাপ ছিল, তারা অবাধে ঘুরে ফিরে বেড়াতো কিন্তু তারা স্বামীজীর চলাফেরায় কোনোদিন কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি কোরতো না।
মন্দির এবং ঝর্ণার মধ্যবর্তী স্থানে স্বামীজী গোলাপ, হিবিস্কাস এবং অন্যান্য ফুলের গাছ লাগিয়েছিলেন । এগুলি খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠেছিল _ফলে আশ্রমদেবতার পূজার জন্য এই গাছগুলি প্রচুর পরিমাণে ফুল যোগাতো। একটা ছোট্ট মাটির প্রদীপে তেল এবং পলতে দিয়ে জ্বেলে উনি মূর্তির সামনে রেখে দিতেন । মূর্তিকে অভিষেক করার জন্য চন্দন ঘষতেন । তিনি নিজের কপালে এবং বুকে চন্দন লেপন করতেন। একটা ছোট্ট মাটির পাত্রে চাল এবং ডাল একসঙ্গে রেঁধে মন্দিরের দেবতাকে ভোগ দিয়ে নিজে খেতেন, এটাই ছিল তাঁর সারাদিনের আহার।
ওই সময় ভারত সরকার ‘সারদা অ্যাক্ট’- নামে একটি আইন জারি করেন । এই আইন বলে 14 বছরের নিচে মেয়েদের বিবাহ দেওয়া নিষিদ্ধ হোয়েছিলো । অধিকাংশ গোঁড়া পরিবার এই আইন মানতে রাজি ছিল না । এই আইনের আওতা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য লোকে ফরাসি সরকারের অধীন “ইয়ানাম” গ্রামে অথবা নিজাম রাজ্যের অধীনে থাকা পাশাপাশি গ্রামগুলিতে চলে যেতে লাগলো। নিজাম রাজ্যের অধীন পেরেন্টাপল্লী ছিল সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্রাম! ফলে অনেক পরিবার সেই সময় এই গ্রামে এসে গাছের নিচে কমবয়সী কুমারীদের বিবাহ দিতে লাগলো।
ঐসব কাজে এই গ্রামে এলে__ ওই বহিরাগত পরিবারগুলি আশ্রম দেখতেও আসতো । তারা ওখানে নিজেরা খাওয়া-দাওয়া কোরতো। মাঝে মাঝে তারা পেরেন্টাপল্লীর সমস্ত লোকজনদেরকেও পেঠভরে খাওয়াতো । এতে হৈ-হট্টগোল হোতো খুব এবং এর ফলে আশ্রমের শান্তি এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হোতো।।
স্বামীজী অনুভব করলেন যে, তিনি রুটিনমাফিক কর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। তাঁর জীবনের লক্ষ্য যে “ঈশ্বর উপলব্ধি”_ তা ব্যাহত হচ্ছে! তিনি ওই সব হৈ-হট্টগোল এর বাইরে এমনকি নিকটবর্তী গ্রামের লোকদের সংস্পর্শ থেকেও দূরে থাকতে চাইলেন। এরূপ মনস্থ করে কঠোর তপস্যার জন্য উপযুক্ত স্থান খোঁজার চেষ্টায় তিনি ঝরনার ধার ধরে পাহাড়ে উঠতে লাগলেন চার পাঁচ মাইল ওঠার পর পাহাড়ের তিনি চূড়ায় পৌঁছালেন। পাহাড়ের উপরে স্থান প্রায় সমতল ওই স্থান লম্বা লম্বা গাছে ঢাকা । এদের অধিকাংশ বুনো গাছ। সেখানে কয়েকটামাত্র আম এবং কাঁঠাল গাছ ছিল ঝর্ণার ধারে কয়েকটা কলাগাছ‌ও ছিল ।
স্বামীজি ঝর্ণাধারা ধরে ঝরনার উৎস সন্ধানে বের হলেন তিনি লক্ষ্য করলেন যে, জল পাহাড়-চূয়ে নির্গত হোচ্ছে এবং তা একত্রিত হয়ে ঐ ঝর্নাটার রূপ নিয়েছে । নিচে প্রবাহিত হওয়ার সময় আরও পাহাড় চুয়ানো জলের সঙ্গে মিশে এটি প্রশস্ত এবং খরস্রোতা হয়ে যাচ্ছে । ওই পাহাড় থেকে অবিরাম জল চুয়াচ্ছে । তাই এই ঝর্ণা চিরজীবী । ঝর্ণার জল স্বচ্ছ এবং খুব ঠান্ডা ! নিচে প্রবাহিত হওয়ার সময় গাছের পচা ঝড়াপাতা বয়ে নিয়ে চলেছে !
স্বামীজি একটা বড় গাছের নিচে স্থান নির্বাচন করলেন । গ্রামবাসীদের সহায়তায় বাঁশ দিয়ে একটি কুটির নির্মাণ করে তাতে পাতার ছাউনি দিলেন । কুটিরের মুখে দেওয়ার জন্য বাঁশের একটা ‘আগোল’ তৈরি করা হোলো । কুটিরের মধ্যে খানিকটা জায়গা ধূনির জন্য রাখলেন‌ এবং শুকনো পাতা জড়ো করে আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা করলেন । এই আগুন প্রয়োজনমতো আলো এবং উষ্ণতা জোগাতো। পৃথিবীতে আগুন হোলো সূর্য দেবতার প্রতীক। সেজন্য তিনি ধুনির এই আগুনের নাম দিলেন ভাস্কর ! ভাস্করের পাশে আসন বিছিয়ে তিনি ধ্যান করতেন ।৷
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ঈশ্বরের সাকার রূপ দর্শনের জন্য যখন তাদের আকাঙ্খা প্রবল হয় তখন তারা তাঁর দর্শন পায়। ঈশ্বর ঐ সমস্ত লােকের ইষ্টের সাকার রূপ নিয়ে তাদের সামনে আবির্ভূত হ’ন। যে বাসনা নিয়ে তারা তপস্যা করেছিল তাই প্রার্থনারূপে ঈশ্বরের নিকট প্রকাশিত হয়। এর ফলে তারা ঈশ্বরের কৃপা পায় এবং তাদের ইচ্ছা পূর্ণ হয়। ঈপ্সিত বস্তু লাভের জন্য যে অতিরিক্ত শক্তি দরকার তা তারা লাভ করে। কঠোর তপস্যা করার ফলে তারা সর্বাধিক পরিমাণে সুখ এবং নিরাপত্তা ভােগ করে। খুব শক্তিশালী হওয়ায় তারা যা চায় তাই পায়। ভাল কাজের ফল যতদিন থাকে ততদিন তারা এই স্বর্গীয় সুখ ভােগ করে। ঐ ফল শেষ হলে তারা আবার সাধারণ মানুষ হয়ে যায়। ভাল-মন্দ এবং পাপ-পুণ্য-এর ফল নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকে। একদিন না একদিন এদের ফল শেষ হয়। এগুলি চিরস্থায়ী নয়।
এই সাকার দর্শন-লাভ আমাদের লক্ষ্য নয়। স্বর্গীয় সুখ-ভোগ করা এবং প্রবল ক্ষমতার অধিকারী হওয়াও আমাদের লক্ষ্য নয়। যে ব্যক্তি ঈশ্বরের সাকার রূপ দর্শন করেছে এবং এর ফলে স্বর্গীয় সুখ লাভ করেছে সে ব্যক্তি যদি নিঃস্বার্থপর হয় তাহলে সে এক দিনের জন্যও এই সুখ ভোগ করতে পারবে না। আবার যখন তুমি স্বর্গীয় সুখ ভােগ করছ। কল্পতরুর ছায়ায় রয়েছ। খুব সুন্দরী যুবতী খুব নরম শয্যায় তােমার সঙ্গিনী হয়েছে। তোমার কোন কিছুরই অভাব নাই। তখন তুমি অন্য সকলের সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবছ। তােমার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে এবং আত্মীয় স্বজন — যাদের সঙ্গে তােমার সম্পর্ক তাদের সঙ্গে তুলনা করে তুমি ভাবছ যে তুমি স্বর্গীয় সুখ ভােগ করছ। এই ভাবনা স্বার্থপর ব্যক্তির নমুনা।
অপর পক্ষে, যদি তােমার মধ্যে নিঃস্বার্থপরতা থাকে তাহলে তােমার চিন্তাধারা সম্পূর্ণ আলাদা হবে। যারা তােমার নিজের লােক তাদের দুঃখ-কষ্টে তােমার হৃদয় কাঁদবে। তুমি দেখছ তােমার স্ত্রী যে অতি প্রিয়, সে এখন পুত্র এবং পৌত্রের উপর নির্ভরশীল। এবং খুব দু:খ-কষ্ট পাচ্ছে। এই সঙ্কটময় অবস্থায় তােমার স্ত্রীকে দেখে তুমি অমৃত পান করে রম্ভা এবং উর্বশীর নাচ দেখে সময় কাটাতে পারবে? যখন তােমার ছেলে গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে, তখন তুমি কি ইন্দ্রের নন্দন কাননের পারিজাত বৃক্ষের শীতল ছায়ায় বসে সর্গীয় সমীরণ উপভােগ করতে পারবে? পারবে না । যদি তােমার মধ্যে কিছুমাত্র নিঃস্বার্থপরতা থাকে। যদি তুমি প্রকৃতই নিঃস্বার্থপর হও, তাহলে বলবে, ‘কেন আমি স্বর্গীয় সুখ চাইছি যখন আমার আত্মীয়-স্বজনেরা দু:খ-কষ্ট পাচ্ছে। আমি তাদের সঙ্গে কাজ করবো এবং তাদের সুখে স্বাচ্ছন্দে রাখব’। এই কথা বলে তুমি সমস্ত স্বর্গীয় সুখ উপেক্ষা করে আত্মীয়-স্বজনদের পাশে এসে দাঁড়াবে।
তােমার মধ্যে নিঃস্বার্থপরতাই হল তােমার শক্তি এবং চেতনার গুণগত প্রকাশ। শক্তির গুণগত বিকাশ অধিকতর হলে তুমি আরও উন্নত হবে। এবং তুমি কেবলমাত্র তােমার পরিবারের সকলের সঙ্গে উন্নত হবে তা নয়, অন্য সকলের সঙ্গেও যাদের তুমি জান বা জান না, তারা সকলেই তােমার আত্মীয় হয়ে যাবে। তুমি যত বেশী উন্নত হবে ততই তােমার দয়া এবং একত্বের অনুভূতি সমস্ত প্রাণী এবং উদ্ভিদ জাতির প্রতি প্রসারিত হবে। তােমার ভালবাসা প্রসারিত হওয়ায় সকলেই তােমার নিজের হয়ে যাবে। তোমার ভালবাসার শক্তি তাদের সকলের মধ্যে কাজ করবে এবং সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। অর্থাৎ সমগ্র জগৎ তােমার অধিকারে আসবে। তোমার নিঃস্বার্থপরতাকে প্রসারিত করেই তুমি নিজেকে সমষ্টিতে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। শরীর ছাড়ার পরও একই প্রবণতা নিয়ে তােমার অগ্রগতি হবে এবং তুমি সার্বজনীন সুখ এবং শান্তির জন্য চেষ্টা করতে থাকবে। (ক্রমশঃ)