স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। মানুষজন বেশি বেশি আসা যাওয়া শুরু করায় স্বামীজীর সাধনার ব্যাঘাত হচ্ছিলো_তাই তিনি পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় একটা কুটির নির্মাণ করে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন।
নিচে থেকে পাহাড়ের উপরে যাওয়ার সময় স্বামীজি কুমড়োর খোলে ভরে চোলাম্[(cholam),ময়দা জাতীয় জিনিস] গুঁড়ো নিয়ে যেতেন । সামান্য পরিমাণে এই গুঁড়োর সঙ্গে জল মিশিয়ে বলের মতো তৈরি করতেন, আর এই বলের আকারে চোলাম্ তিনি বুনো গাছের পাতা দিয়ে মোড়াতেন এবং সেগুলি সেঁকে রুটি করার জন্য ধুনির পাশে রেখে দিতেন । এই চোলাম রুটিই ছিল তাঁর সারাদিনের খাবার ।
কোনো কোনো দিন তিনি ধ্যানে আত্মহারা হয়ে যেতেন _সেদিন রুটি খুব বেশি সেঁকা হয়ে যেতো অথবা একেবারে পুড়ে যেতো, সেদিন তাঁর আর খাওয়াই হোতো না!
স্বামীজি ধ্যান অথবা প্রার্থনা বা ভজন করে সারাদিন কাটিয়ে দিতেন। একতারা বাজিয়ে তিনি জোর গলায় গান গাইতেন। কখনো কখনো ভক্তিমূলক গান গাইতে গাইতে তন্ময় হয়ে বনের বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতেন।
তাঁর কুটিরটি একটি বড় গাছের নিচে অবস্থিত ছিল এবং সমগ্র স্থানটি গাছে গাছে ঢাকা ছিল। সেজন্য সূর্যকিরণ সেখানে প্রায় প্রবেশ করতেই পারতো না । ফলে ঐ স্থানের মাটি ছিল স্যাঁতসেতে । এই স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থেকে স্বামীজীর সারা গায়ে চুলকানি দেখা দিল। এমন চুলকানি যে, চুলকালে রক্ত বের হোতো! তিনি এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিলেন না,ফলে তিনি সেখান থেকে কিছু দূরে গিয়ে সূর্যের আলোয় দেখলেন__ তাঁর শরীরের প্রতিটি রোমকূপে এক ধরনের পোকা হয়েছে ! তাঁর স্মরণে এলো যে এই ধরনের পোকা গরুর গায়ে হয় । এর প্রতিবিধান তাঁর জানা ছিল না । কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন যে, এই কষ্ট থেকে তাঁকে রেহাই পেতেই হবে । তিনি চারি দিকে তাকালেন দূরে এক জায়গায় নীলাভ রেখার ন্যায় গোদাবরী দেখা যাচ্ছিলো। তাঁর সেখানে যেতে খুবই ইচ্ছা হোল । পাহাড় থেকে গাছের ডাল ধরে সোজা তিনি গোদাবরীতে নেমে গেলেন। জলের ধারে এসে দেখলেন কিছু গাছের ডাল জলে পড়েছে, সেই ডালগুলি ধরে বেশ কিছুক্ষণ তিনি নদীর জলে গা ডুবিয়ে থাকলেন। জল থেকে উঠে দেখলেন_ বেশ কিছু পোকা চলে গেছে, তিনি পুনরায় জলে নামলেন এবং সমস্ত পোকা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি জলে শরীর ডুবিয়েই রাখলেন । যখন দেখলেন তাঁর শরীরের প্রতিটা লোমকূপের সমস্ত পোকা চলে গেছে, তখন তিনি যেভাবে পাহাড় থেকে নেমে ছিলেন_ তেমনভাবেই পাহাড়ের উপরে তাঁর নিজের কুটিয়ায় ফিরে গেলেন। এতে তাঁর কোনো অসুবিধাই হোলো না!
তাঁর কুটির হতে ঠিক কয়েক গজ দূরে ভূমি ঢালু হয়ে ঝর্না পর্যন্ত গিয়েছে_ বনের সমস্ত পশু জলপান করার জন্য ওই ঢালু স্থানে আসতো । প্রত্যেকদিন মধ্যরাত্রে পশুরা দলবেঁধে আসতো।একটা বাঘ এবং চিতা ও আসতো । তারা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে জল পান করে চলে যেতো। এই রকম প্রতিদিনই ঘটতো এবং স্বামীজি তাঁর কুটিয়ার ‘আগল’ বন্ধ করে নিজের আস্তানা থেকে সব লক্ষ্য করতেন। পশুরা তাকে কোনরূপ বিরক্ত করতো না । তথাপি তাঁর মনে ভয়ের উদ্রেক হোত। যেকোনো বন্যজন্তু খেলার ছলে ভয়ে অথবা রক্তের লালসায় কুটিরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার শরীর নষ্ট করে দিতে পারে বা কুটিরটি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে !
তিনি তাঁর ভয়ের কথা খুব গভীরভাবে চিন্তা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, যে ঈশ্বর তাঁর মধ্যে আছেন, সেই ঈশ্বর‌ই পশুর মধ্যেও রয়েছেন। সুতরাং তারাও মানুষের মতোই ভালো। ভয়ের উদ্রেক না হোলে তারাও তাঁর বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে না। তিনি বুঝতে পারলেন যে পশুদের উপস্থিতিতে ভীত হওয়ার কোন যুক্তি নাই । তথাপি ভয় তাঁর গেল না! তিনি ভয়মুক্ত হতে চাইলেন । ওই স্থানে কোনো মানুষের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হ‌ওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ ঐ কুটিরের 4/5 মাইলের মধ্যে কোনো মানুষ বাস করে না ! অত‌এব তাঁর একমাত্র নির্ভর সর্বত্র-বিদ্যমান এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ! তিনি বিপদের সম্মুখীন হয়ে দেখতে চাইলেন__ সত্যসত্যই তিনি ঈশ্বর নির্ভরশীল কিনা এবং এই নির্ভরশীলতা প্রকৃতপক্ষে কাউকে বিপদ হতে মুক্ত করে কিনা ! এই সংকল্প অনুযায়ী তিনি এ বালু স্থানের নিকটে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে শুয়ে রইলেন‌। পুরোপুরি সজাগ থেকে তিনি লক্ষ্য করছিলেন পথিমধ্যে তাকে শুয়ে থাকতে দেখে জন্তুরা কি করে !
সেদিন রাতে জন্তুরা স্বভাবতঃ দলবেঁধে এসে তাদের পথে বাধা দেখতে পেলো। মাটি শুঁকে তারা কিছু একটা অনুভব কোরলো । বাধাস্বরূপ মানুষটির নিকট যেতে প্রথমটায় ইতঃস্তত কোরলো তারপর তাকে পাশ কাটিয়ে জলের নিকটে গেল । পিপাসা মিটিয়ে স্বামীজীকে কোনো বাধা না দিয়ে তারা ধীরে ধীরে চলেও গেল।।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~~®~~~~~~
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত একটা কুকুরও অভুক্ত থাকবে ততদিন আমি জন্ম নিব’। এই ভাবে তাঁর অনুপম নিঃস্বার্থ ভালবাসার জোয়ার বইতো। ঊর্ধ্ব প্রগতি হলে সত্তা আধ্যাত্মিক সত্তায় পরিণত হয়, ব্যক্তি অহং সমষ্টিতে মিশে যায়। ব্যষ্টি সমষ্টি এক হয়ে যায়। একেই বলে সর্বেসর্বা(ঈশ্বর)-র সঙ্গে এক হওয়া। ইহাই চরম প্রাপ্তি। ইহাই আমাদের লক্ষ্য। ইহা লাভ করতে হলে আমাদের চেতনায় যে সৃজনীশক্তি আছে তাকে সূক্ষ্ম শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। তখন ঐ শক্তির গুণগত বিকাশ ঘটবে। ফলে আমরা এই প্রগতি লাভ করব। মানুষকে ঈশ্বরের মূর্তি ভাববে, নিঃস্বার্থভাবে তাদের সেবা করবে। এইভাবে ঊর্ধ্ব প্রগতি লাভ সম্ভব।
যখন আমাদের গুণগত সূক্ষ্ম শক্তি উন্নত হবে এবং সূক্ষ্ম চেতনা যথাযথ ক্রিয়া করবে তখন যে ভালবাসা তুমি ব্যক্তি এবং বস্তুর উপর দেখাবে তা নিঃস্বার্থ হয়ে উঠবে। এই ভালবাসাই হবে নিখুঁত এবং যথার্থ ভালবাসা। ইহা সব সময় নিরাসক্ত এবং নিঃস্বার্থপর। যে সমস্ত লােক এবং বস্তুকে তুমি ভালবাসো তাদের প্রগতি কামনা করবে। এই ভালবাসার মধ্যে স্বার্থের বিন্দুমাত্র চিহ্ন থাকবে না। এমন কি তুমি কৃতজ্ঞতাও কামনা করবে না। অপরের দুঃখ-কষ্টকে নিজের দুঃখ-কষ্ট বলে মনে করবে। অপরের মঙ্গলের জন্য নিজের জ্ঞান, ভালবাসা এবং শক্তি কাজে লাগাবে। তুমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে যদি তােমার সাহায্য দুর্গত লােকের কাছে না পৌঁছায়। এই অবস্থায় নিঃস্বার্থ লােক কখনই নিজের মুক্তি বা মােক্ষের জন্য উদ্বিগ্ন হয় না। সমগ্র মানব জাতিকে নিরাপদ এবং সুখী দেখে তারা নিজের মােক্ষের কথা চিন্তা করবে।
মনে করো, তুমি পরিবারের কর্তা। বাড়ীতে তোমার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়ে আছে। কোনো উৎসব হচ্ছে। তোমার এক বন্ধু তােমাকে নতুন পােষাক-পরিচ্ছদ উপহার দিয়েছে। তোমার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়েদের নতুন পােষাক নাই। অর্থাভাবে তুমি তাদের নতুন কাপড়-জামা কিনে দিতে পারো নাই। এই পরিস্থিতিতে ঐ উৎসবে তুমি নতুন কাপড়-জামা পরতে পারবে না। যে সুখ তােমার প্রিয়জনেরা এবং স্নেহভাজনেরা পায় না, তা তুমি ভােগ করতে পারবে না। সেই রকম নিঃস্বার্থ প্রেমিকের প্রতিমূর্তি আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা__ বিশ্বের সকলে সুখী না হওয়া পর্যন্ত কোন সুখই চান না। মনুষ্যদেহ ধারণ করেই হােক বা শরীর ছাড়ার পরই হােক অবিরাম এই ভাবই পােষণ করতে থাকেন। তারা নিজের মুক্তি বা মােক্ষ কিছুই চান না। মানুষের ঊর্ধ্ব প্রগতি হােক — একমাত্র ইহাই তাঁদের আকাঙ্ক্ষা। তাঁদের আকাক্ষার মতোই হােক আমাদের আকাঙক্ষা।
প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই জ্ঞান, প্রেম এবং শক্তি বিদ্যমান। এমন কোনো মানুষ নাই যার মধ্যে এগুলি নাই। কারও মধ্যে দৈহিক শক্তি প্রবল, কিন্তু অন্যগুলি সুপ্ত। আবার কারও মধ্যে জ্ঞান প্রবল, অন্যগুলি সুপ্ত। প্রেম হল ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ। ঈশ্বর এবং ভক্তের সম্বন্ধই হোল প্রেমেই রূপ। প্রেমের দ্বারাই এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যাদের মধ্যে নিঃস্বার্থ প্রেম বলবান, তারা সকলকে নিঃস্বার্থ ভালবাসার চোখে দেখে। এই সকল ব্যক্তির ভালবাসা সকলের মধ্যে যে ভালবাসা আছে তাকে কার্যকরী এবং শক্তিশালী করে। এরূপ করার ফলে তাদের মধ্যে ভালবাসার ঘাটতি হয় না। একটা জ্বলন্ত বাতি দিয়ে আর একটা বাতি জ্বালানো হয়। অন্য বাতি জ্বালানাের জন্য প্রথম বাতিটির উজ্জ্বলতার ঘাটতি হয় না। সুতরাং আমরা যখন একে অপরের সংস্পর্শে আসি তখন অপরের মধ্যে আমাদের ভালবাসা প্রক্ষিপ্ত করা উচিত। তাহলে অপরের মধ্যে ভালবাসা প্রবল হবে। (ক্রমশঃ)