স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামীজি পেরেন্টাপল্লীতে পাহাড়ের মাথায় সাধন ভজন করার সময় একদিন তাঁর_ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামীজীর একসাথে দর্শন হয়েছিল। ঠাকুর খুব প্রসন্ন অবস্থায় হাসি হাসি মুখে ছিলেন। তিনি স্বামী বাউলনন্দজীকে ইশারা করে বললেন তাঁকে অনুসরণ করতে । পিছন ফিরে শ্রীরামকৃষ্ণ এগিয়ে চললেন তাঁর পশ্চাতে স্বামী বিবেকানন্দ এবং সবশেষে স্বামী বাউলানন্দজী হাঁটতে লাগলেন।
তাঁরা খুব দ্রুত যাচ্ছিলেন কিন্তু তাঁদের পা মাটিতে পরছিল না ! তাঁরা যেন মাটি থেকে 1 ফুট উপর দিয়ে হাঁটছিলেন! তাঁরা এগিয়ে চলেছেন_ মনে হচ্ছিল যেন উড়ে যাচ্ছেন! তাঁদের পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র এক গজ ! এক স্থানে তাঁরা বিস্তীর্ণ বালুকা রাশি দেখতে পেলেন। বালির উপর অনেক সন্ন্যাসী কয়েকটা দল বেঁধে জায়গায় জায়গায় বসে ছিলেন । বাউলানন্দজীর মনে হোলো __ওই স্থানটি হয়তো প্রয়োগ হতে পারে! তাঁরা তিনজন-ই (শ্রী রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ ও স্বামী বাউলানন্দ) বালির উপর বসে পড়লেন। সন্ন্যাসীদের দলের মধ্যে কেউ কেউ ধূমপান‌ও করছিলেন । তাঁরা এই তিনজনকে‌ও ধূমপান‌ করার জন্য ছিলিম এগিয়ে দিচ্ছিলেন। ওনারা তাদেরকে অতিক্রম করে চলে গেলেন। তারপর তাঁরা আবার হাঁটতে আরম্ভ করলেন । বালি পার হয়ে কিছুদূর গিয়ে তাঁরা থামলেন ।
স্বামী বিবেকানন্দ কিছুটা পাশে সরে দাঁড়ালেন ! শ্রীরামকৃষ্ণ পিছন ফিরলেন । স্বামী বাউলানন্দজী, শ্রীরামকৃষ্ণের নখ এবং দাঁতের দিকে তাকালেন, সেগুলি সব সোনার মত দেখাচ্ছিল।
বিবেকানন্দ দয়াদ্র চিত্তে স্বামী বাউলানন্দের দিকে তাকালেন এবং অনুনয় করার ভঙ্গিতে শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে মুখ ফেরালেন! তারপর স্বামী বিবেকানন্দ নিকটে এসে বাউলানন্দজীকে স্পর্শ করে বললেন_”এর গাল কত ভিতরে ঢুকে গেছে!” শ্রীরামকৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ বাউলানন্দজীর নিকটে এসে তাঁর উভয় গাল জিভ দিয়ে স্পর্শ করে বললেন__” সব ঠিক আছে, সব ঠিক আছে!” রামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দ এরপরই অদৃশ্য হয়ে গেলেন !
স্বামীজী ফিরে কুটীরের দিকে গেলেন । তখন সকাল পাঁচটা । স্নান সেরে স্বামীজী পাহাড়ের নীচে আশ্রমের কুটীরে ঢুকলেন অসাধারণ আনন্দ এবং অদ্ভুত সন্তোষ অনুভব করলেন । চরম আনন্দ এবং চরম সন্তোষ!!
পাহাড়ের উপরে যাওয়ার কথা আর উনি ভাবলেন না । উপলব্ধির কথাগুলি পুনঃ পুনঃ বিচার করে বারংবার আনন্দ আস্বাদন করতে লাগলেন।। (ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………
সন্ন্যাসীর ভূমিকা কি বা ঠিক কেমন, এই প্রসঙ্গে *স্বামী বাউলানন্দ* ____” সন্ন্যাসীরা হলেন সমাজের পথপ্রদর্শক ৷ মানুষের প্রগতির চরম শিখরে হলেন তাঁরাই ৷ ব্রহ্মচর্য পালন করে শেষ ধাপ সন্ন্যাসে এসে তাঁরা পৌঁছেছেন ৷ এই অনাসক্ত জীবন অবশ্যই অন্য সকলের চেয়ে অধিকতর প্রগতি লাভ করেছে ৷ যাঁরা ক্রমান্বয়ে উন্নত হোতে হোতে ঊর্ধ্বপ্রগতি লাভ করেছেন, তাঁরা হলেন নিম্ন প্রগতিশীল লোকের নিকট আদর্শস্বরূপ ৷ তাঁরাই নিম্ন প্রগতিশীল লোকের পথ সুগম করে দেন ৷ এদের প্রগতির জন্য তাঁরাই দায়িত্ব নেন ৷ এইভাবে সন্ন্যাসীরা একদিক থেকে হলেন গৃহস্থ এবং ব্রহ্মচারীদের রক্ষক ৷”
২)___উপস্থিত ভক্তদের সন্মুখে দেশে রাম রাজত্ব স্থাপনের আলোচনা প্রসঙ্গে *স্বামী বাউলানন্দ* বললেন :– ” রামরাজ্য স্থাপন করতে হলে তিনটি জিনিস বিশেষ প্রয়ােজন: (১) দেশে উর্বর জমি থাকবে, (২) জনগণের কোনরূপ দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। এবং (৩) জনদরদী এবং সকল প্রজার প্রতি সমমনােভাবাপন্ন সরকার।
স্থূল স্বাধীনতা শরীরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং সূক্ষ্ম স্বাধীনতা মনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ৷ আমরা স্থূল স্বাধীনতা পেয়েছি। রামচন্দ্র ত্রেতা যুগে রামরাজত্ব স্থাপন করেছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপর যুগে ঐ ধারা বজায় রেখেছিলেন। মানুষ যখন মনুষ্যত্বকে ভুলে ইন্দ্রিয়সুখের বশবর্তী হয় তখন তার দুঃখ আসে। এই এই দুঃখকে অতিক্রম করতে হলে মানুষের চিন্তাধারা, বাক্য এবং কাজ মানবােচিত হওয়া দরকার। জনগণের মধ্যে ঐক্য থাকা প্রয়ােজন। জনগণ এবং সরকারের মধ্যে সম্পর্ক মধুর হওয়া দরকার। একমাত্র তখনই উৎপন্ন দ্রব্য সকলের ঘরে পৌঁছাবে। এখন দেখা যাক, জনগণের মধ্যে ঐক্যের অন্তরায় কোথায়। জনগণের মধ্যে বিবাদ দেখা যায় দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে — (১) ঈশ্বর, (২) খাদ্য। এই দুটি জিনিসের উপর মানুষের জন্মগত অধিকার। প্রত্যেকেরই খাদ্যের প্রয়ােজন। খাদ্য ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। সকলের একই ধরণের খাদ্যের প্রয়ােজন হয় না। আবার সকলে একই রকম খাদ্য পেতেও সক্ষম হয় না। খাদ্যের মান জীবিকার উপর নির্ভর করে। আবহাওয়া এবং পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন ধরণের খাদ্যেরও প্রয়ােজন হয়ে পড়ে।
ঈশ্বর।৷ সব কিছুই ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এমন কোন বস্তু নেই যার ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। মানুষের অস্তিত্ব ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল। এমন কি আমাদের প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যাপারেও ঈশ্বরের কৃপা প্রয়ােজন।
ক্ষেতে যে শস্য উৎপন্ন হচ্ছে তার সমস্ত অংশ আমাদের নয় । যে অংশ আমাদের শস্য-ভাণ্ডারে পৌঁছাচ্ছে তা আমাদের। আবার শস্য-ভাণ্ডারে যে শস্য মজুত হচ্ছে তার সবটাই আমরা ভােগ করতে পারছি না। ইঁদুর, চোর, দেশের শাসনকর্তা, ভিক্ষুক – প্রভৃতি সকলে এর অংশ ভােগ করে। যে খাবার আমাদের ঘরে রান্না হচ্ছে তার সবটাই আমরা ভােগ করছি না। অতিথি, কুকুর, বিড়াল এবং আরও অনেকে এর অংশ গ্রহণ করে। যে খাদ্য বস্তু আমরা গ্রহণ করছি তার সবটা আমাদের নয়। যে অংশ পরিপাক হচ্ছে সেই অংশটুকু আমাদের, বাকী অংশ মলমূত্রাদিরূপে আমাদের শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। খাদ্য সংগ্রহ, খাদ্য গ্রহণ এবং খাদ্য পরিপাক – সব ব্যাপারেই ঈশ্বরের কৃপা প্রয়ােজন।
রামের কৃপা ছাড়া কিছু হবার উপায় নেই। এখন কথা হচ্ছে কেমন করে আমরা রামের কৃপা লাভ করব। রামকে সেবা করে রামের কৃপা লাভ করা সম্ভব। রামকে মনে মনে চিন্তা করতে হবে। রামের সেবা করতে হবে। রামকে সেবা করার সুযােগ পাওয়ার জন্য মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। আমরা সকলে মন্দিরে রামের পূজা করার সুযোগ পাব। এই পূজা-অর্চনার মাধ্যমে সকলের মধ্যে একটা ঐক্য গড়ে উঠবে। কিন্তু অনেক মানুষ এই সুযোগ হতে বঞ্চিত । তাদেরকে পূজা করতে দেওয়া হয় না। … (ক্রমশঃ)