স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। কঠোর তপশ্চর্যার ফলে স্বামী বাউলানন্দ মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন ও স্পর্শন করেছিলেন । এই দর্শন ও স্পর্শন পাওয়ার পর থেকে সবসময় তিনি পরম আনন্দে ভরপুর হয়ে থাকতেন । কারো সাথে কথা বলার তাঁর কোনো ইচ্ছাই হোতো না । কিন্তু তিনি নিয়মিত মন্দিরে পুজো করতেন।
বনবিভাগের কর্মী ‘শ্রদ্ধা’ (স্বামী বাউলানন্দ যখন রামচন্দ্রপুরমে বিষাক্ত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন তাঁর সেবা যিনিকরেছিলেন) প্রতি সপ্তাহের শেষের দিকে আশ্রম দর্শন করতে এসে __একদিন করে থাকতেন । তিনি সঙ্গে করে খাদ্যদ্রব্য এবং রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে আসতেন। তিনি এখানে রান্না করে স্বামীজীকে খাওয়াতেন। সমস্ত আগাছা তুলে ফেলে আশ্রম প্রাঙ্গনকে বাসোপযোগী করে তোলার জন্য তিনি গ্রামবাসীদের সঙ্গে কাজ করতেন । বন্যার জলের ভাঙ্গনের হাত থেকে ওই প্রাঙ্গনকে রক্ষা করাই ছিল তার বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ ।
আশ্রমে আগত ব্যক্তি যিনিই হ’ন না কেন এবং তাঁর যে কাজ‌ই থাকুক না কেন __স্বামীজি কারো সঙ্গে কথা বলতেন না । তিনি হাত দিয়ে সংকেত করে কাজের নির্দেশ দিতেন ।
একদিন স্বামীজি এবং শ্রদ্ধা পায়ে হেঁটে পোলাভরম যাচ্ছিলেন । ওই পথে পড়ে করুতুরু গ্রাম । এখানে ছোট পাহাড়ের উপর রেঞ্জ অফিসারের বাংলো। স্বামীজি এবং শ্রদ্ধা সেখানে গেলেন। ওই অফিসার শ্রী আপ্পা রাও ‘শ্রদ্ধা’র ঘনিষ্ঠ বন্ধু । শ্রদ্ধা স্বামীজীর সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন।
প্রথমদিনেই আপ্পা রাও স্বামীজীর প্রতি আকৃষ্ট হলেন । শীঘ্রই তিনি স্বামীজীর শিষ্য এবং অন্তরঙ্গ সহচর হয়ে উঠলেন । প্রায়ই তিনি আশ্রম দর্শন করতে আসতেন এবং প্রতিবারেই চার পাঁচ দিন করে আশ্রমে থেকে যেতেন । আশ্রম তৈরীর কাজে তিনি দৈহিক পরিশ্রমও করতেন । তাঁকে স্বামীজী নাম দিয়েছিলেন _ ‘বিশ্বাস’ ! সত্যসত্যই তিনি বিশ্বাসের প্রতীক ছিলেন । স্বামীজী যা বলতেন, ফলাফল চিন্তা না করে তিনি তাই করতে প্রস্তুত ছিলেন । এই ‘বিশ্বাসে’র সঙ্গেও স্বামীজী কদাচিৎ কথা বলতেন ‌। বিশ্বাস বলতেন __’স্বামীজীর কথা শোনার জন্য তাঁকে কখনো কখনো চারদিন ধরে অপেক্ষা করতে হোতো।’
কথিত আছে ওই সময়ে ভদ্রাচলমের সাব কালেক্টর গোপালস্বামী আয়েঙ্গারকে চারদিন পেরেন্টাপল্লীতে নৌকায় থাকতে হয়েছিল ! তাঁর স্ত্রী পূজা করার জন্য মন্দিরে যেতেন কিন্তু স্বামীজীকে দেখতে পেতেন না ! তৃতীয় দিনে আয়েঙ্গার সস্ত্রীক স্বামীজীর দেখা পেলেন এবং পুজো করাতে পারলেন। তাছাড়া দু এক কথায় স্বামীজীর আশীর্বচন‌ও শুনতে পেলেন! শ্রী আয়েঙ্গার ভারতীয় সরকারি অফিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীও হয়েছিলেন।।
~~~~~~~~~~~~~©~~~~~~~~
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
…………………………………………………………
[‘রামরাজত্ব প্রসঙ্গে’ আলোচনাকালীন স্বামী বাউলানন্দজী বলছিলেন……..]
“সাধারণ লােক যাতে রাম-তত্ত্ব, রাম-শক্তি, রাম-ধর্ম বুঝতে পারে সে বিষয়ে আমাদেরকে সচেষ্ট হতে হবে। রাম সম্বন্ধে তাদেরকে চিন্তন করতে শেখাতে হবে। রামকে সেবা করার সুযোগ করে দিতে হবে। একমাত্র তখনই রাম-রাজত্ব গড়া সম্ভব হবে। অনেক পণ্ডিত এর আগে বললেন আর রামরাজ্য হবে না। পরিবেশ গড়তে পারলে রামরাজ্য আবার আসবে। আমাদেরকে ঐ সময়কার পরিবেশের মত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
আলো এবং অন্ধকার যেমন পাশাপাশি চলে তেমনি রঘুবংশের রাজারা যখন রাজত্ব করছিলেন তখনও ধর্ম এবং অধর্ম পাশাপাশি বিরাজ করছিল। রঘুবংশের রাজারা তাঁদের আদর্শ অনুযায়ী রাজত্ব করছিলেন। ঐ সময় রাক্ষসরাও প্রতাপশালী হয়ে উঠেছিল। তারা এঁদের বিরুদ্ধাচারণ করছিল। এই রাক্ষসরা অপরের স্ত্রী হরণে বিশ্বাসী ছিল। এরা পুলস্ত-এর বংশধর। এরা শিবের উপাসনা করত। এর অজ্ঞ ছিল না। এদের মধ্যেও বেদজ্ঞ ছিল। এই রাক্ষসদের বধ করার জন্য ভগবান স্বয়ং রামরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এই রাক্ষসদের আমরা ঘৃণা করি। এরা কঠোর তপস্যা করে ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করে বরলাভ করেছিল। তথাপি আমরা এদের ঘৃণা করি। কিন্তু কেন? কারণ, এদের কার্যকলাপ মানুষের নিরাপত্তার পরিপন্থী। তারা চাইত না যে, দেবতাকে উপাসনা করে অন্য কেউ দেবতাকে খুশী করুক। যে সমস্ত মহর্ষি যজ্ঞ করে দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে চাইতেন তারা তাতে বাদ সাধত। তারা ঈশ্বর এবং ভক্তের মধ্যে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়াত। দেবতারা ভক্তের পক্ষ নিলে রাক্ষসরা দেবতাদের বিরুদ্ধে লড়াই করত। এমন কি সেই দেবতাকে নিধন করতেও চেষ্টা করত। রাম যদি সত্ত্ব গুণের প্রতীক হয়ে থাকেন, রাবণ রজঃ ও তম গুণের প্রতীক। রাবণ সত্ত্ব গুণের বিরােধী। রামায়ণের যুগেই রামতত্ত্বের চেয়ে রাবণতত্ত্ব খুব বেশী প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল।
সে যুগ চলে গেছে। সেই রামও নেই, সেই রাবণও নেই। কিন্তু রাম-তত্ত্ব এবং রাবণ-তত্ত্ব এখনও আছে। সমস্ত শ্রেণী এবং বর্ণের লোকের মধ্যে রাম এবং রাবণ বিদ্যমান। সেই দৈত্য বা রাক্ষস আকার বর্তমান না থাকার অর্থ এই নয় যে, বর্তমানে রাক্ষস নেই। একই পরিবারের মধ্যে রাম এবং রাবণ বর্তমান। যারা ভক্ত এবং ভগবানকে পৃথক করতে চায়, যারা অপরের স্ত্রী হরণ করে, যারা অপরের ধন আত্মসাৎ করে, যারা দানবিক কার্য করতে অপরকে ইন্ধন জোগায় — এরা সকলে রাক্ষস বলে গণ্য। সাত্ত্বিক গুণের বিরােধী যারা তারাই রাক্ষস।
বর্তমান যুগের কথা ভেবে দেখুন। যে মন্দির ঈশ্বরের আবাসস্থল সেই মন্দিরে প্রবেশ করার অধিকার ক’জন পায়! অনেককেই আমরা মন্দিরে ঢুকতে দিই না। এ বিষয়ে সরকার আইন প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু সেই আইন কার্যকরী হচ্ছে না। আমাদের এই সংকীর্ণতা এবং হৃদয়হীনতা আসুরিক গুণের লক্ষণ। আসুরিক-প্রবৃত্তি হৃদয়ে পােষণ না করে আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত করতে হবে। তখন রাম আমাদের হৃদয়ে বিরাজ করবেন এবং রামরাজ্যও প্রতিষ্ঠিত হবে।
আসুন, আমরা যারা রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করার মানসে এখানে সমবেত হয়েছি তাঁরা সকলে মিলে সঙ্কল্প করি — এই শহরে যত মন্দির আছে সবগুলিতে সকলে প্রবেশাধিকার পাক্। এই সভা সমাপ্তির পরই আমরা সকলে মিলে মন্দিরগুলি দর্শন করব। এরূপ করে আমরা রামরাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করব।”(ক্রমশঃ)