স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামীজী পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন নানান অদ্ভুত ঘটনা ঘটছিল। এখানে সেই সব ঘটনাগুলি আলোচনা করা হচ্ছিলো ‌।
এই সময়ে শান্তির খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে কেরালা হতে স্বামী কৃষ্ণানন্দ আশ্রম এসে হাজির হোলেন ।এখানে তিনি শান্তির সন্ধান পেলেন । স্বামীজীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি এই আশ্রমেই রয়ে গেলেন। তিনি পূজা-অর্চনায় স্বামীজীকে সাহায্য করতেন । কিন্তু স্বামীজীর সঙ্গে তাঁর কোনো কথা হতো না স্বামীজীর নিকট তিনি যা শিখেছিলেন, তা মৌনতার মধ্যে দিয়েই!
স্বামীজী সবসময় গভীর চিন্তা নিয়ে থাকতেন । রামকৃষ্ণের নিকট হোতে তিনি যা পেয়েছিলেন __তা সব সময় তিনি মন্থন করতেন। সর্বেসর্বা ঈশ্বর, বিশ্ব এবং তার প্রকাশের রহস্যের কথা চিন্তা করতেন। তাছাড়া জীব কিভাবে সর্বেসর্বা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম প্রাপ্ত হচ্ছে __এইসব বিষয়ে ধ্যান করতেন ! এই সময়ে ‘নরি সীতা আম্মা’ নামে এক ভক্ত এক বিবাহ অনুষ্ঠানে এ গ্রামে এসেছিলেন । তিনি আশ্রম দর্শন করতে এসেছিলেন এবং দু-এক দিন যাতায়াতের পরেই উনি স্বামীজীর প্রতি খুব আকৃষ্ট হলেন । বিবাহ সম্পন্ন করে তিনি আশ্রমে থেকেও গেলেন তবে দু’একদিন আশ্রমে থাকার পর তিনি চলে গেলেন। তিনি বাড়ি ফিরে গেলেন ঠিকই কিন্তু এরপর থেকে তিনি প্রতি মাসে দু-এক দিন করে আশ্রমে আসতেন ও থাকতেন। মৌনভাবে আশ্রমের কাজকর্ম করতে করতে একদিন স্বামীজীর এক অদ্ভুত দর্শন হোলো । সেদিন আশ্রমে অন্য কেউ ছিলনা । স্বামীজী একাই ছিলেন । সন্ধ্যাবেলায় মন্দিরের বাইরে একটা গাছের নিচে তিনি বসে ছিলেন, সেই সময় হালকা ধরনের বৃষ্টি হচ্ছিলো! স্বামীজী দেখলেন একজন গেটে দাঁড়িয়ে আছেন __পরনে তাঁর সাদা গাউন, গাউনটি কোমর পর্যন্ত ঝোলা, সুন্দর মুখ ! কালো চুলগুলো দীর্ঘ, মনমুগ্ধকর কপোল ! একদৃষ্টিতে তিনি স্বামীজীর দিকে চেয়ে ছিলেন ।
স্বামীজী অভ্যাসগতভাবেই নীরব রইলেন! আগন্তুক‌ও কোনো কথা বললেন না। সেখানে আসার কারণ সম্বন্ধেও তিনি কিছু বললেন না । স্বামীজী উঠে আগন্তুকের পাশ দিয়ে কুটিরে প্রবেশ করলেন।
কিছুক্ষণ পরে স্বামীজীকে বাইরে আসতে হোল । বেরিয়ে এসে তিনি দেখলেন __আগন্তুক তখনও গেটে দাঁড়িয়ে আছেন ! স্বামীজী তাঁকে পাশ কাটিয়ে গেটের বাইরে গেলেন । স্বামীজীর পিছু পিছু আগন্তুকও বাইরে গেলো, আবার স্বামিজী আশ্রমে ফিরে এলেধ! আগন্তুকও তাঁর পিছু পিছু আশ্রমে এলো। কিন্তু গেটে দাঁড়িয়ে পড়লো, স্বামীজি পিছু ফিরে দেখলেন আগন্তুক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে ! আগন্তুককে 21 বছরের যুবকের মতো দেখাচ্ছিল ! স্বামীজী ভাবলেন _”কে এই যুবক?” সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভিতর থেকে উত্তর এল _”ইনি যীশুখ্রীষ্ট” !
“যদি ইনি যীশুখ্রীষ্ট হন_ তাহলে তো তাঁর গাল তোবড়ানো হবে, কিন্তু এঁর গালগুলো এতটা সুডৌল কি করে হোলো?”__ স্বামীজী ভাবতে লাগলেন।
তাঁর অন্তর্জগত থেকেই তৎক্ষণাৎ উত্তর এলো __”এটা যুবক যীশুখ্রীস্টের শরীর ! ক্রুশবিদ্ধ হবার বহুপূর্বের শরীর!”
স্বামীজী দু’ঘণ্টা ধরে একদৃষ্টিতে যুবকের দিকে চেয়ে রইলেন । ভ্রমণকালে স্বামীজী বাইবেল পড়েছিলেন । যীশু খ্রীষ্টের বাণী সম্বন্ধে তিনি অবহিত ছিলেন । এখন তিনি যখন যুবকের দিকে তাকাচ্ছিলেন, তখন 2000 বছর আগে যীশুখ্রীস্টের জীবনের সমস্ত ঘটনাবলি স্বামীজীর চোখের সামনে ফুটে উঠতে লাগলো! যীশুখ্রীস্টের বলা_ ধর্মের উচ্চ আধ্যাত্মিক বাণী তাঁর মন জুড়ে বসলো!
আধ্যাত্মিকতা সব সময় এক এবং অভেদ ! আধ্যাত্মিকতা প্রচার ও প্রসারের জন্য এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষের উত্তোলনের জন্য বিগত বহু শতাব্দীতে অনেক মহাপুরুষ পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন! শ্রীরামকৃষ্ণ এদেরকে অবতার বলতেন । যীশু খ্রীষ্ট নিশ্চিত এরকম‌ই একজন অবতার।
==============©===========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………
মানুষ সাধারণত: দুটো জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করে। প্রথম হল সুখ এবং দ্বিতীয় হল নিরাপত্তা। কিন্তু এ দুটিই ক্ষণস্থায়ী। সেইজন্য মানুষ এগুলাে হতে সন্তুষ্টি পায় না। এই অসন্তোষের ফলে তারা স্থায়ী সুখ এবং নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী সুখ এবং নিরাপত্তা, চিরস্থায়ী সুখ ও নিরাপত্তা প্রাপ্তির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এই নিদারুণ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে মানুষকে। মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে যা কিছু পায় তা তাদেরকে জাগতিক সুখ এবং নিরাপত্তা দিতে পারে। কিন্তু পার্থিব সুখ এবং নিরাপত্তার মই-এর উপরে উঠে তারা বুঝতে পারে যে, এ সব ক্ষণস্থায়ী এবং তারা এতদিন ভুল করছে। তখন তারা চিরস্থায়ী সুখ এবং নিরাপত্তা অর্থাৎ দ্বিতীয় মই (পর্যায়)-এর জন্য আকাক্ষা করে। ক্রমশঃ তাদের এই আকাক্ষা তীব্র হতে তীব্রতর হয়। তারা ব্যাকুল হয়ে উঠে। তারা বুঝতে পারে এই দ্বিতীয় মই অর্থাৎ ভগবৎ অনুরাগই চিরস্থায়ী সুখ এবং নিরাপত্তা লাভের উপায়।
কিন্তু পুরোনো অভ্যাস অর্থাৎ প্রথম মই তাদেরকে বাধা দেয়। এই মই তাদেরকে নীচে নামাবার চেষ্টা করে। এইভাবে প্রথম মই মানুষের অগ্রগতির বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের মনে সন্তুষ্টি উৎপাদনে বিঘ্ন উৎপাদন করতে থাকে। মানুষের এই যে প্রতিবন্ধকতা এ থেকে কি ভাবে রেহাই পাওয়া যাবে? তাদেরকে কি পুরোনাে মই ত্যাগ করতে হবে? না। কেন? কারণ দৈহিক সুখ এবং নিরাপত্তা ভােগ করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই প্রথম মইকে ঠেলে ফেলে না দিয়ে এটিকে দ্বিতীয় মই-এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাদের ঈশ্বরমুখী করতে হবে।
এইভাবে তারা ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে পারবে। এখন প্রথম মই দ্বিতীয় মইকে টেনে নামাবার পরিবর্তে উহার ভূমি হয়ে দাঁড়াবে এবং ঠেকনো হয়ে ওটিকে ধরে থাকবে, সাহায্য করবে। দুটো মই এক সাথে জুড়ে গেল। মানুষ ধাপে ধাপে প্রথম হতে দ্বিতীয় মই-এ উঠতে শুরু করবে। এই অগ্রগতির ফলে মানুষ প্রকৃতপক্ষে যা চাইছিল তা পাবে।
ধন, দৌলত, সামাজিক মর্যাদা, নাম, যশ প্রভৃতি মানুষকে ক্ষণস্থায়ী সুখ দেয় — যা আগেই বলা হল।
স্ত্রী-পুরুষ নিয়ে পরিবার গঠিত হয়। পরিবারের জন্য উভয়কেই সমান দায়িত্ব পালন করতে হয়। পরিবারটিকে সুখী করতে হলে উভয়কেই কঠোর পরিশ্রম, স্বার্থত্যাগ করতে হবে। বেশী পরিমাণে সুখ নিরাপত্তা ভােগ করার জন্য তাদের এই প্রচেষ্টাকে দৃঢ়তর করতে হবে। এইরূপভাবে চিরস্থায়ী সুখ ও নিরাপত্তা লাভের জন্যও ত্যাগ স্বীকার চাই, সৎ ও সুন্দর হবার জন্য__ প্রয়াসে আরও যত্নবান হোতে হবে–অবশ্য এটা হবে তাদের শারীরিক গঠনক্ষমতা এবং প্রকৃতি অনুযায়ী! (ক্রমশঃ)