গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-য়ে প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রাদি (পুরাণ, মহাকাব্য ইত্যাদি)-তে যে সমস্ত কাহিনী বর্ণিত রয়েছে – অনেক সময় সেগুলির বৈজ্ঞানিক, সামাজিক এবং তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতেন ! সেগুলি শুনে আমাদের অপূর্ব লাগতো, ভারতীয় শাস্ত্রাদির প্রতি শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা অবনত হয়ে যেতো ! মনে হতো, আমাদের পূর্বজ-রা জীবনের এতটা গভীরে গিয়ে – চরম এবং পরম সত্যকে কি সুন্দরভাবে গল্পের আকারে ব্যাখ্যা করে গেছেন ! কি অদ্ভুত এই স্টাইল বা ভঙ্গিমা ! এমনটা নিশ্চয়ই পৃথিবীর অন্য কোথাও হবে না – এই জন্যেই তো মহাজন কবিরা এই দেশকে বলেছেন – “সকল দেশের সেরা”!
গুরুমহারাজের কাছে যেদিন প্রথম ভাগবতের ব্যাখ্যা শুনেছিলাম সেইদিন সত্যিই আমি স্তম্ভিত, বিস্মিত, আশ্চর্যান্বিত (আরও যদি বিশেষণসমূহ থাকে সেগুলিও বলা যায়) হয়ে গিয়েছিলাম ! পণ্ডিতদের ভাগবত-ব্যাখ্যা মানেই শ্বাশ্বত দুই তরুণ-তরুণী (রাধাকৃষ্ণ)-র রগরগে প্রেম কাহিনী ! তার সাথে যুক্ত কিছু সখা ও সখী, যারা এই দুই প্রেমিকযুগলের প্রেমকার্যকে রূপ দেবার চেষ্টা করছে ! আর নায়িকা যেহেতু বিবাহিতা, তাই শাশুড়ি-ননদী-স্বামীর বাধা ! তাছাড়া রয়েছে সমাজের বাধা – কুলবতীর লোকলাজ ! কিন্তু এই সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করে – কিভাবে প্রিয়-মিলনের জন্য রাধার অভিসার হয়, কিভাবে মিলন হয় – তারই ঘটনাবহুল চিরন্তন প্রেম-কাহিনী, একে অপরের বিরহে কতটা কাতর – তার কাহিনী, একে অপরের রূপ দেখে কতটা বিভোর – সেই কাহিনী – এইসব নিয়েই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, ভাগবতের কাহিনী পাঠ, এইভাবেই আমাদের ধারণা ছিল !
কারণ আমরা ছোটোবেলা থেকে এগুলোই শুনে আসছি । আর ক্যালেন্ডারে ছবি থাকতো – কৃষ্ণ যমুনায় স্নানরতা গোপিনীদের বসন চুরি করে নিয়েছে – আর উলঙ্গ বা অর্ধউলঙ্গ কয়েকটি যুবতী নারী উঁচুর দিকে তাকিয়ে দুহাত তুলে বস্ত্র চাইছে, আর নদীর তীরে অবস্থিত একটি কদমগাছের ডালে বসে কিশোর শ্রীকৃষ্ণ বস্তুগুলি আটকে রেখেছে – দিতে চাইছে না ! বলছে – “দুহাত দিয়ে লজ্জা না আটকে – দুহাত উপরে তুলে বস্ত্র ভিক্ষা করো – তাহলে দিতে পারি !”
গুরু মহারাজ এগুলির ব্যাখ্যা করলেন! এই সবকিছুর কি সাংঘাতিক আধুনিক ব্যাখ্যা ! উনি বললেন_ “গোপনে গোপনে গোবিন্দ ভজে যারা, তারাই গোপী!” সেই অর্থে যে কোন ভক্ত সাধক সাধিকা বা যোগী-যোগিনী ই গোপী। আর রসিক শেখর পুরুষোত্তম সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ‌ই একমাত্র পুরুষ ! বাকি সবই তাঁর প্রকৃতি ! সেইটা বোঝাতেই ভক্তদেরকে নারী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে !
আর কাহিনীগুলি একটু রগরগে করার প্রয়োজন টা কেন হয়েছে__ তার কারণ সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করার জন্যই এই কৌশল ! কথিত আছে কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভায় সভাকবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায় _যখন অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনা সম্পন্ন করেছিলেন, সেই কাব্যে কোনোখানে আদিরস ছিল না বলে রাজাদেশে ভারতচন্দ্রকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আদি রসাত্মকমূলক কাব্য “বিদ্যাসুন্দর” রচনা করতে হয়েছিল ! জয়দেব গোস্বামীকে অপূর্ব রাধাকৃষ্ণ তত্ত্ব বর্ণনা করার জন্য কিছু কিছু অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করতে হয়েছিল !
যাইহোক, গুরু মহারাজের ভাগবত কথায় আসি উনি বলছিলেন “রাধা” অথবা অন্যান্য গোপীনীরা কোনো নারী নয়_ ভক্ত সাধকদেরকেই “গোপী” বলা হয়েছে! কারণ তারাই গোপনে গোবিন্দ ভজনা করে! আর ভক্তশ্রেষ্ঠ যিনি, যাঁর অন্তরে শুধু কৃষ্ণপ্রেম, ভগবানের সঙ্গসূধা লাভের ঐকান্তিকতা, যা‍ঁর সংসারের অন্য কিছু ভালো লাগে না __তাঁকেই “রাধা” হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে !
এবার রাধার প্রাণ আকুল কৃষ্ণ দর্শনের জন্য __কিন্তু কে তাকে প্রিয়মিলনের কাজে সাহায্য করবে ! এই মুশকিল আসানের কাজ করতে এসে গেলেন ললিতা (দ্বিজ চন্ডীদাসের কাহিনীতে বড়াই বুড়ি)! রুপকাকারে উনিই হোলেন _ভক্ত সাধকের জীবনের ক্ষেত্রে সদ্গুরু ! উনিই একমাত্র পারেন শাশুড়ি ননদীকে রাজি করিয়ে, রাধাকে বাড়ির বাইরে বের করতে! উনিই পারেন রাধাকে নিয়ে যেতে যমুনার ঘাটে ! এই শুরু হোল জল আনতে ছল করা! রাধার অভিসার! অর্থাৎ সদ্গুরুর সঙ্গলাভে সাধকের কুলকুন্ডলিনীর জাগরন!!
যে শাশুড়ি ননদের বাধায় রাধা বাড়ি থেকে বের হতে পারে না_ তাঁরা হচ্ছেন জটিলা এবং কুটিলা ! গুরু মহারাজ বললেন _ভাগবতে রুপকাকারে মানবজীবনের জটিল বাসনা এবং কুটিল কামনাকেই “জটিলা”এবং “কুটিলা” হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে ! মানুষ সাধারণত কামনা এবং বাসনাতেই সংসারে বদ্ধ হয়ে থাকে ! এরাই মানুষকে ঈশ্বরমুখী হোতে দেয় না ! মানুষের purpose of life বা মানবজীবনের উদ্দেশ্যলাভের পথে বাধা দেয় ! এদের হাত থেকে মানুষকে উদ্ধার করে কামনা বাসনার পাশ কাটিয়ে মানুষকে ঈশ্বরমুখী করে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন শ্রীগুরু ! সদ্গুরুর সান্নিধ্যে কামনা, বাসনা মাথাচাড়া দিতে পারে না_যেমন ওস্তাদ সাপুড়ের সামনে উদ্যত ফনা সাপ‌ও মাথা নিচু করে থাকতে বাধ্য হয় _ _এখানেও ব্যাপারটা সেইরকমই হয়।
ভাগবতে রুপকাকারে এই ভাবেই উল্লেখ রয়েছে যে, ঘরের বউ রাধার বাড়িতে আটকে থাকতে ভালো লাগে না, সব সময় সে বিরসবদনে বসে থাকে, কারোর সাথে বড় একটা কথা বলে না ! কি হয়েছে এই বউয়ের ? এর সমস্যাটা কি_ সেকথা বাড়ির কেউ বুঝতে পারে না! এমন সময় সেই বাড়িতে এসে উপস্থিত “ললিতা” ! এঁকে সবাই মানে, সবাই জানে যে, ইনি খুব ভালো মানুষ ! ইনি সবার মঙ্গল করতে পারেন, অনেক রকমের রোগের ঔষধ আছে এঁর কাছে(গুরুকে ভবরোগ বৈদ্য বলা হয়) ! এই ললিতা বিধান দিলেন _ “তোদের বৌমার এক দারুণ ব্যাধি হয়েছে ! একে ঘরের বাহির করতে হবে!” জটিলা কুটিলা রাজি ! কিন্তু _”কে করবে ঘরের বাহির?” কেন ললিতাই সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন!
এই প্রথম গুরুর হাত ধরে সাধকের পথচলা শুরু ! কোথায় যাবে তারা?_ কোথায় আবার_ “যমুনার উজানে”! গুরু মহারাজ বললেন _”এর অর্থ হচ্ছে কুলকুণ্ডলিনী কে জাগ্রত করে সেই শক্তিকে ঊর্ধ্বমুখী করা!” গুরুর হাত ধরে শুরু হোল অভিসার ! এরপর থেকে অভিসারিকা রাধাকে একাই যেতে হবে সেই দুর্গম পথ ধরে যমুনার উজান পথ ধরে! যেখানে কোথাও রয়েছে কদমতলা! যার ডালে বসে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন ! এখানে সহস্রারকেই সহস্রদল কদমফুল বা কদমবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে! এখানে পৌঁছালেই পরমাত্মার সাথে আত্মা(সাধকরূপী ব্যক্তি শরীরের মূল সত্তা)-র মিলন ঘটে! এটাকেই রাধা কৃষ্ণের মিলন হিসাবে ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে !!(আগামী দিনে বস্ত্রহরণের রহস্য!)[ক্রমশঃ]