গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ পৌরাণিক (মহাকাব্য সহ) কাহিনীসমূহের যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক সামাজিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতেন, সেইগুলোই এখানে আলোচনা করার চেষ্টা করা হচ্ছিলো।
গুরু মহারাজের বলা ‘ভাগবতের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা’_ আগের দিন শুরু করেছিলাম কিন্তু অনেকটা টেনে নিয়ে যাওয়ার পরেও একটু তাড়াতাড়ি করে শেষ করা হয়েছিল ! তাই অনেক কথাই বাদ পড়ে গেছিলো! আজ সেইগুলিকেই বলার চেষ্টা করা হচ্ছে ! অবশ্য এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, ‘ভগবানের কথা যে শাস্ত্রে লেখা হয়েছে, সেই শাস্ত্রই “ভাগবত” ! সেই অর্থে ব্যাসদেব কৃত “শ্রীমদ্ভাগবত” গ্রন্থের কথাই যে এখানে বলা হচ্ছে তা নয় ! যে কোনো ভক্তি শাস্ত্রের কথাই এখানে “ভাগবত-কথা” হিসাবে ধরে নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে!
গুরু মহারাজ বলেছিলেন __’ভক্তিশাস্ত্রে বলা হয়েছে আয়ান ঘরনী রাধা এবং আয়ানকে পুরুষত্বহীন একজন ব্যক্তি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে! সাধারণতঃ সমাজের সাধারণ মানুষ এমনকি অধিকাংশ সাধকেরাও_ সংসারকেই ‘সার’ বা ‘স্বামী’ হিসাবে ভেবে নেয় ! কিন্তু সংসারে সারবস্তু কিছুই নাই, সংসার অসার ! এই “অসার সংসার”- কেই “ক্লীব আয়ান” হিসাবে শাস্ত্রকাররা বর্ণনা করেছেন !
সংসার অসার কেন __কারণ এটি অনিত্য, নশ্বর বা বিনাশশীল! আর যা অনিত্য বা নশ্বর, তা কখনোই সত্য-শাশ্বত-চিরন্তন হোতে পারে না !
ব্রহ্মই একমাত্র শাশ্বত, চিরন্তন ! এই ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকারই আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন বা ভক্তের সঙ্গে ভগবানের মিলন অথবা ভক্তি শাস্ত্রের রাধার সাথে কৃষ্ণের মিলন!
আগের দিন উল্লেখ করা হয়েছিল __শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা গোপীগণের বস্ত্রহরণের কথা! গুরু মহারাজ বলেছিলেন_এখানে উলঙ্গ গোপী অর্থে _’নির্বসনা’ নয় , “নির্বাসনা”।। ভক্ত যখন শাশ্ত্রে উল্লেখিত গোপীগনের ন্যায় লজ্জা-মান-কুল-শীল-ভয় সর্বস্ব ত্যাগ করে,মায়া-মোহ বিসর্জন দিয়ে দু’হাত তুলে ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হয় _ তখনই হয় কৃষ্ণ দর্শন বা আত্ম-সাক্ষাৎকার! বসন-চুরির_এটাই তাৎপর্য!
এরপরে আসা যাক্ শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির কথায়! যে বাঁশির সুরে রাধা সহ অন্যান্য গোপীনীরা পাগল হয়ে যেতো_ গৃহকর্ম ভুলে তারা ছুটে যেতো যমুনার কূলে ! তাদের স্বামী-সন্তান-সংসার ইত্যাদি কোনো কিছুরই টান থাকতো না ! তাদের শুধু একটাই টান বা আকর্ষণ, আর তা হোল ‘কৃষ্ণের বাঁশির আকর্ষণ’!! আকর্ষণ করেন যিনি তিনিই তো কৃষ্ণ!
এবার দেখা যাক__ কৃষ্ণের বাঁশি সম্বন্ধে গুরু মহারাজ কি কি বলেছিলেন ! __মানুষের শরীরেই শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি রয়েছে, সপ্ত গ্রন্থি বা চক্রই হোল বাঁশির সাতটি ছিদ্র ! যেগুলি থেকে রাগরাগিণীর সুর বাজে এবং হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে তা ছড়িয়ে পড়ে! সাধক কুলকুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগিয়ে একেকটি চক্রে উন্নীত করতে পারলেই ওই রাগ রাগিনী সুর শোনা যায় !
যে সাধক যে গ্রন্থিতে মনোনিবেশ করেন সেখানেই পৃথক পৃথক সুর-মূর্ছনা ধ্বনিত হয় ! এই সুরের মূর্ছনায় সাধক পাগলপারা হয়ে আরো উজানে যেতে চায় ! তার চেতনা আরো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে !
যেমনটা রাধার ক্ষেত্রে হয়েছিল ! পাগলিনী রাধা কোন বাধা মানে না,শাসন-বারন মানে না ! বারবার বাঁধন কেটে, ছুটে যেতে চায় যমুনার উজানে__ প্রিয় মিলনের আকাঙ্খায়!
যারা একটু-আধটু সাধন-ভজন করেন, তারা এই ব্যাপারটা খুবই ভালভাবে বুঝতে পারবেন! যে কোনো গুরুমন্ত্র একাগ্রচিত্তে জপ করতে করতেও এই বাঁশির সুর শুনতে পাওয়া যায় ! যখন বাইরের শব্দ বন্ধ হয় , তখনই অন্তরের শব্দ শোনা যায় অর্থাৎ তখনই বাঁশির সুর শোনা যায় ___এটাই সাধন রহস্য!
এবার আমরা পুরোনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি! যেখানে বলা হয়েছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ খুব শিশু অবস্থাতেই অনেকগুলো অসুরদের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন এবং তাদেরকে একাই মেরে ফেলেছিলেন !
সেই প্রসঙ্গে গুরু মহারাজকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল! গুরুজী বলেছিলেন _”ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই সময় সমাজে প্রচন্ড হিংসা, মারামারি, দ্বেষ, রক্তপাত এবং যুদ্ধ লেগেই থাকতো ! পাশাপাশি রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ হোতো, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব লেগে থাকতো _ এক কথায় সেই সময়কালীন পৃথিবী খুবই অশান্ত ছিল ! আর যখন-যখনই পৃথিবীতে অশান্তির বাতাবরণ তৈরি হয় বা পৃথিবীর মানুষ চরমভাবে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তিতে ভোগে _ তখনই ভগবানের শরীর ধারণ করে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। নরশরীর ধারণ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নানারকম অসম্ভব কার্য সাধন করতে হয়েছিল ! যার জন্য তাঁকে সর্বাধিক ঐশ্বর্য বা সিদ্ধির প্রয়োগ ঘটাতে হয়েছিল ! এত বৈচিত্র্যপূর্ণ আচরণ অন্য কোন ভগবৎ-শরীরে দেখা যায়নি বা দেখানোর প্রয়োজন হয়নি ! এই জন্যই বলা হয় _”কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং!”
গুরু মহারাজ বলেছিলেন _মানুষের শরীরে এমন সাতটা পয়েন্ট আছে, যেগুলিতে সামান্য আঘাত করলে বা একটু খোঁচা মারলেই মানুষের মৃত্যু হয়ে যাবে! মার্শাল আর্টের যারা ‘মাস্টার’, তারা এই পয়েন্টগুলি শরীরে কোথায় তা জানে ! ভারতীয় যোগ-পরম্পরার লোকেরাও জানে ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শিশু বয়সে বা বালক বয়সে যে সমস্ত ভয়ঙ্কর অসুরদের নিধণ করেছিলেন সেগুলো ওই কৌশলেই করেছিলেন ! যুদ্ধকালীন সময়ে উনি কোনক্রমে সেই সব অসুরদের শরীরের কাছাকাছি এসে যেতেন এবং নিমেষের মধ্যে বিশেষ পয়েন্টগুলোতে hit করতেন ! কিছুক্ষণের মধ্যেই অসুরদের শক্তি বা দম্ভ শেষ হয়ে যেতো ! তারা নিস্তেজ হয়ে সেখানেই পড়ে থাকতো বা সেই স্থান ত্যাগ করে পালাতো। গুরু মহারাজ বলেছিলেন _”দ্রোণাচার্যকে যখন ধৃষ্টদ্যুম্ন হত্যা করেছিল, তখন অতি সহজেই প্রণাম করার ছলে গিয়ে ধনুকের উপরের অংশ থুতনি ও গলার মধ্যিখানে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ! আর এতেই কুরু-পাণ্ডবের অস্ত্রগুরু, মহাবলী দ্রোন সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়েছিল ! যে বীরকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনদিন ধরে ক্রমাগতভাবে আক্রমণ করেও অর্জুনের মত মহা মহাবীর সহ অন্যান্যরা এতোটুকু টলাতে পারেনি __সেই মহাবীর দ্রোনাচার্য, মাত্র সামান্য একটা আঘাতেই সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়েছিল !
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মার্শাল আর্টের এই কৌশল অবলম্বন করে, অনায়াসেই অসুর নিধন করতে পারতেন। তবে উনি কংসকে যখন বধ করেছিলেন, তখন উনি পূর্ণবয়স্ক যুবক! নিখুঁত মার্শাল আর্ট এবং দৈহিক শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রকাশ্য রাজসভায় 10 /12 ফুট উঁচুতে অবস্থিত সিংহাসনে বসে থাকা কংসকে spot jump করে জোড়া পায়ের লাথি মেরে নিচে ফেলে দিয়েছিলেন! তারপর সঠিক পয়েন্টে দুটো-একটা আঘাতেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহাবলী কংস ধ্বংস হয়েছিল!
গুরুমহারাজ এই ব্যাপারে আরেকটা বিষয় আলোচনা করেছিলেন, তা হোল __’প্রকাশ্য রাজসভায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মথুরার রাজা কংসকে একাকী নিধন করেছিলেন (সঙ্গে শুধু দাদা বলরাম উপস্থিত ছিল) কিন্তু সভাসদসহ রাজরক্ষীরা বা রাজার সৈন্যবাহিনী_ শ্রীকৃষ্ণকে প্রতিআক্রমণ করেনি ! তারা বরং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই আচরণ মেনে নিয়েছিল ! এর কারণ হিসেবে গুরু মহারাজ বলেছিলেন_’ কংসের ভয়ঙ্কর অত্যাচারে প্রজাগণ, সভাসদবৃন্দ, তার আত্মীয়স্বজন ইত্যাদি সকলেই এতো অসন্তুষ্ট ছিল যে, শ্রীকৃষ্ণ যখন তাদের সামনেই রাজা কংসকে বধ করেছিল__ তখন তারা মনে মনে খুশিই হয়েছিল এবং শ্রীকৃষ্ণের ন্যায়বিচারকে মর্যাদা দিয়েছিল!
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার জন্যই কৃষ্ণলীলা সংগঠিত করেছিলেন ! তাঁর সমস্ত জীবন জুড়ে ছিল ত্যাগ- ত্যাগ আর ত্যাগ ! বৃন্দাবনে মাত্র দু-চার বছরের জন্য মধুরলীলার সংক্ষিপ্ত সময়কাল বাদ দিলে _ওনার সমস্ত জীবনকালই সংগ্রামপূর্ণ এবং পরার্থে নিবেদিত! তিনি মথুরার রাজা কংসকে অপসারণ করেছিলেন ঠিকই _কিন্তু নিজে মথুরার রাজা হন নি! কংসের পিতা উগ্রসেনকে তিনি কারাগার থেকে বের করে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়েছিলেন ! এমনি আরো অনেকগুলি উদাহরণ রয়েছে __যে রাজ্যগুলিতে তিনি অত্যাচারী রাজাদের অপসারণ করেছিলেন, সেই রাজ্যের উপযুক্ত একজনকে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়েছিলেন _ কখনোই তিনি সেই সব রাজ্যে, নিজে রাজা হোতে চাননি !
গুরু মহারাজ বলেছিলেন__গীতার সারকথা হোলো “ত্যাগ” বা “ত্যাগী”হয়ে ওঠা ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সমগ্র জীবনটাই ছিল গীতা! তাইতো তিনি রাজা না হয়েও রাজার রাজা _রাখালরাজা,হৃদয়ের রাজা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ!!!!
(ক্রমশঃ)
