স্থান:– বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন!
সময় :–15 )10 /1991.
উপস্থিত ব্যক্তিগণ:– নগেন, সাতগেছিয়ার মানুদা,জহর, সিঙ্গুরের ভক্তগণ ও আশ্রমস্থ মহারাজগণ।
জিজ্ঞাসু:—আপনার এখানে অর্থাৎ এই সিটিংয়ে বসে দেখেছি অনেকেরই হাঁপানি রোগ রয়েছে ! এই রোগটি খুবই কষ্টদায়ক ! আমরা আশ্রমের যে ঘরে বিশ্রামের জন্য স্থান পেয়েছি, সেই ঘরেই এমন একজন রয়েছে, যে গত রাত্রিতে ভালো করে ঘুমোতেই পারলো না ! বারেবারে উঠে বসে, নাক ধরে শ্বাস নিচ্ছিলো আর ফোঁস্ ফোঁস্ করে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ছিল!
গুরু মহারাজ:—-ঠিকই বলেছো। হাঁপানি রোগ সত্যিই খুব কষ্ট দেয় ! এই রোগটি বংশগত হতে পারে আবার অন্য কোনো কারণে ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে হোলেও হতে পারে! ইংরেজিতে এই রোগকে Ashtma বলে ! এটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, প্রাচীন ল্যাটিনেও এইরকম শব্দ ছিল । তবে মুল শব্দটি ভারত থেকেই ঐসব দেশে গিয়েছিল। তখন প্রাচীনকালে ভারতবর্ষের আয়ুর্বেদ শাস্ত্র সমস্ত রোগীকেই তিনভাগে ভাগ করেছিল_ কফপ্রধান,পিত্তপ্রধানএবং বায়ু প্রধান রোগী! যদিও এই রোগে লাং বা ফুসফুস কফ দ্বারা আক্রান্ত হয় কিন্তু এরা আদতে বায়ুপ্রধান ব্যক্তি ! উদ্বিগ্নতা, উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা অর্থাৎ এক কথায় টেনশন্-প্রবন লোকদেরই এই রোগ হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে!
যাদের হাঁপানি রোগ রয়েছে, তাদের পক্ষে প্রতিদিন দু-এক কোয়া রসুন খাওয়া ভালো । কিন্তু ওই দু এক কোয়াই খেতে হবে ! কারণ বেশি পরিমাণে রসুন খেলে কিডনিতে stone হবার সম্ভাবনা থাকে।
আমার এখানেও অনেকে এই রোগ নিয়ে আসে । তাদেরকে আমি কিছু প্রাণক্রিয়া করতে বলি ! নাক দিয়ে inhale এবং মুখ দিয়ে exhale অর্থাৎ সুখাসনে বসে__ নাক দিয়ে বায়ু নাভি পর্যন্ত টানতে হবে, তারপর পুরো বায়ু মুখ দিয়ে ছেড়ে দিতে হবে ! বায়ু ছাড়াটাও যেন একেবারে সম্পূর্ণ হয় অর্থাৎ তলপেট পর্যন্ত খালি হয়ে যায় !
সাধারণত মানুষ শ্বাস গ্রহণ করার সময় নাভি পর্যন্ত পুরোটা টানে না । ফলে মানুষের ফুসফুস একশভাগ ক্রিয়াশীল হয় না বা ফুসফুসের পুরোটা expand হয় না । কিন্তু সকলেরই পুরো ফুসফুসকে ক্রিয়াশীল করাটাই উচিত ! যেটা শিশুরা করে __দেখবে শিশুরা যখন ঘুমায়, তখন তাদের পেট ওঠানামা করে অর্থাৎ পুরো ফুসফুসের ক্রিয়া হয় ! ফুসফুস যদি অন্তত শতকরা 80(আশি) ভাগও কাজ করে, তা হোলেও মানুষ শ্বাসজনিত উপসর্গ থেকে সুস্থ থাকবে । জেনে রাখবে, যার হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট আছে, তার ফুসফুসের 20 থেকে 30 ভাগ মাত্র ক্রিয়াশীল ! আমি যে প্রাণ ক্রিয়ার কথা বললাম _ওইটা নিয়মিত অভ্যাস করলে ধীরে ধীরে অসুস্থ lung-ও সুস্থ হয়ে ওঠে ! আমরা দেখেছি, যদি নিষ্ঠা সহকারে কোন হাঁপানি রোগী এই ক্রিয়ার নিয়মিত অভ্যাস করে _তাহলে paralised lung-ও ঠিক হয়ে যায় !
প্রথম প্রথম এই ক্রিয়া যেমন ভাবে বললাম ওই ভাবে _বসে অভ্যাস করতে হয় ! তারপর এই অভ্যাস হাঁটতে-চলতে, বিভিন্নভাবে এমনকি শোয়া অবস্থাতেও করা যায় ! তুমি একটু আগে গতরাত্রে যাকে দেখেছো বলছিলে _ সে হয়তো এই ধরনেরই ক্রিয়া করছিল।
সাধারণ মানুষ অর্থাৎ যাদের শ্বাসের কোনো সমস্যা নেই _তারাও এই প্রাণক্রিয়ার অভ্যাস করতে পারে অর্থাৎ নাক দিয়ে শ্বাস টেনে মুখ দিয়ে ছাড়তে পারে ! এই ক্রিয়া রেগুলার করলে ফুসফুস এতো বেশি শক্তিশালী হয় যে, মানুষ অধিক হাঁটাচলা করলে বা কোনো পরিশ্রমের কাজ করলেও সহজে ক্লান্ত হবে না ! যে কোনো স্পোর্টসম্যানরা বা athletic-রা যদি এই অভ্যাসে রপ্ত হয়ে যায় _ তাহলে তারা দীর্ঘক্ষণ ছোটাছুটি করলেও সহজে ক্লান্ত হবে না ! দেখা যাবে, যখন তার সহ-খেলোয়াড়েরা ক্লান্ত হয়ে কোমরে হাত দিয়ে হাঁপাতে থাকবে, তখনও ওই ছেলেটি অনায়াসে ছোটাছুটি করছে এবং মনে হবে সে যেন একদম ফ্রেশ, এইমাত্র মাঠে তাকে নামানো হোলো ! অবশ্য খেলোয়াড়দের ট্রেনাররা এই বিজ্ঞানটা জানে এবং তাদেরকে এই ভাবেই ট্রেনিং দেয় ! মাউন্টেনিয়ারিং করার সময় পর্বত-অভিযাত্রীদেরকেও এই ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয় ! দেখা যায় প্রাণীজগতে ঘোড়াদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এই ক্রিয়া ঘটে থাকে ! সেই জন্যই ঘোড়া সারারাত ধরে ছুটেও ক্লান্ত হয় না ! ভারতীয় যোগীরা “প্রকৃতি”(mother nature) থেকেই বিভিন্ন যোগ, প্রাণায়ামের ক্রিয়া ইত্যাদি শিক্ষা করেছিলেন এবং তার মধ্যে যেগুলি মানুষের পক্ষে মঙ্গলজনক সেগুলি সমাজের মানুষকে শিক্ষা দিয়ে গেছিলেন ! এইজন্যেই তো যুগ যুগ ধরে তাঁরা আমাদের নমস্য ! মানব সভ্যতার অগ্রগতির মূলে তো এঁরাই ! ঋষিদের এই অবদানের কথা স্বীকার না করাটা চরম আহাম্মকি ছাড়া আর কিছুই নয়!
যাইহোক, হাঁপানি রোগীদের কথা হচ্ছিলো_ আমরা সেখানেই ফিরে যাবো । যাদের লাংয়ের ক্রিয়া 20 বা 30 পার্সেন্ট হয়ে গেছে অর্থাৎ রোগীটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে __তাদের সুস্থ থাকতে হলে যে প্রদ্ধতিতে প্রাণক্রিয়া করতে বললাম, তা তো করতেই হবে __তাছাড়া ওই রোগীকে তার food habit এবং life-style ও বদলে ফেলতে হবে ! তাদেরকে নিরামিষাশী হয়ে যেতে হবে । আমিষ দ্রব্য গ্রহণ করা একদমই চলবেনা । আর নিরামিষ খাবার তৈরিতে উগ্র ঝাল-মসলা এবং অধিক তেল-ঘিয়ের ব্যবহার করা চলবেনা ! সহজপাচ্য খাবার খাওয়া অভ্যাস করতে হবে । দুধ বা দুগ্ধজাতীয় খাবার খাওয়া চলবে না, চিনি জাতীয় মিষ্টি খাওয়া চলবে না দেশি গুড় বা মধু খাওয়া যেতে পারে ! রাত্রের খাওয়া-দাওয়া হালকা করতে হবে । দুপুরের প্রধান আহার সেরে ফেলতে হবে বেলা বারোটার মধ্যে!
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাতেও এই রোগের অনেকটা উপকার হয়। আমাদের আশ্রমে দাতব্য চিকিৎসালয় রয়েছে, সেখানে এই ধরনের রোগীদের ঔষধ দেওয়া হয়। তবে অন্য সবকিছুর সাথে যদি রোগীরা প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১/২_আউন্স স্বমূত্র পান করতে পারে_তাহলে আরও দ্রুত ফল পাবে(তবে অবশ্যই রোগীদের নিরামিষাশী হোতে হবে)। স্বমূত্র-চিকিৎসা সর্বরোগহর। যে কেউ এই practice টি জীবনে গ্রহন করতে পারে। বেশিরভাগ সাধু-সন্তরাই এই পদ্ধতিতে নিজের শরীরকে সুস্থ রাখেন।
এইভাবেই_শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভোগা কোনো রোগী যদি এইভাবে food habit বদলে ফেলে, তাহলে কিছুদিনের মধ্যে থেকেই সে উপকার পেতে শুরু করবে । তবে এই সঙ্গে সঙ্গে তার life style ও বদলে ফেলতে হবে । শরীরে এবং মনে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এমন ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশা করা বন্ধ করতে হবে ! ওইসব রোগীর উচিত সাধুসঙ্গ-সৎসঙ্গে অধিক সময় থাকা । এছাড়া সদ্গ্রন্থ পাঠ করা, সৎপ্রসঙ্গ আলোচনা করা_ এই সব করলে প্রাণের স্বাভাবিক ক্রিয়া বজায় থাকে, প্রাণচঞ্চল হয় না ! ফলে মনের একাগ্রতাও বাড়ে।
যেসব কথা বললাম_ কিছুদিন এই রকম অভ্যাস করলে ওই ধরনের রোগী সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে যাবে ! আমাদের আশ্রমে যাদেরকে দেখছো_ তাদেরকে এইসব আচরন-বিধিই পালন করতে বলা হয়েছে এবং তারা খুবই অসুস্থ অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে!
