স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখানে উনি পাহাড়ের উপরে কুটির নির্মাণ করে বেশ কিছুদিন সাধন-ভজন করেছিলেন এবং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ অনেকেরই কৃপা লাভ করেছিলেন।
পাহাড় থেকে অবতরণের পর স্বামী বাউলানন্দজী এক অদ্ভুত মেজাজে সময় অতিবাহিত করছিলেন। শ্রদ্ধা, বিশ্বাসম প্রভৃতি ভক্তগণ প্রায়ই আসতেন এবং দুদিন করে থেকে তারা চলে যেতেন। ভক্তদের এই আসা যাওয়া এবং তাদের দ্বারা আশ্রমের রুটিন মাফিক কাজ করার ব্যাপারটা স্বামীজীর অনবধানেই ঘটে যাচ্ছিলো। স্বামীজী তখন আদৌ কথা বলতেন না! তাঁর এই ভাব ছিল যে, তাঁর ইচ্ছা তো পূর্ণ হয়ে গিয়েছে (মাতৃদর্শন, শ্রীরামকৃষ্ণ দর্শন, বা শ্রীকৃষ্ণ দর্শন হয়ে গিয়েছে)_ তাই তিনি আর শরীর রাখবেন না ! ওই সময়ে আশ্রমে প্রচুর খাদ্যসামগ্রী মজুদ ছিল, কিন্তু তিনি তা আদৌ গ্রহণ করতেন না । সামান্য পরিমাণে ভাতও তিনি রাঁধতেন না । মাঝে মাঝে একটু চা খেতেন। তাঁর এই শরীর না রাখার সংকল্প, তিনি কার‌ও নিকট ব্যক্ত করেননি ! কখন থেকে তিনি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন_ ভক্তরা তা জানতেও পারলো না !
হঠাৎ একদিন বিশ্বাসম তাঁর চার ছেলেকে নিয়ে আশ্রমে এলেন । তিনি স্বামীজীকে বললেন _”একটু কাজে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। এদেরকে এখানে রেখে যেতে চাই । এরা নিজেরাই সব জোগাড় করে রান্না করে নেবে । আপনাকে কোনো জোগাড়ের ঝামেলা পোহাতে হবে না।” এই প্রস্তাব স্বামীজীর ভালো লাগলো না। তিনি বললেন _”ওরা কি করে থাকবে ? ওদেরকে কাঠ জোগাড় করতে হবে, রাঁধতে হবে, বাসন মাজতে হবে _সবকিছুই তো করতে হবে!”
তার উত্তরে ছেলেরাই বলল, তারা নিজেরাই সব করে নেবে । স্বামীজী কোনরকমে ওদেরকে এড়িয়ে যেতে চাইছিলেন ! আশ্রমে তাদের উপস্থিতি তাঁর সিদ্ধান্তের(না খেয়ে দেহত্যাগ করা) ওপর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে! তিনি ছেলেদেরকে তাঁর নিকট রাখতে চাইছিলেন না। কিন্তু বিশ্বাসম স্বামীজীকে পীড়াপীড়ি করে ছেলেদেরকে আশ্রমে রেখে চলে গেলেন ।
পরের দিন ছেলেরা খুব সকালে উঠে আশ্রমের উঠান ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে জল ছিটিয়ে দিলো। স্বামীজি দুধ না দিয়ে চা তৈরি করে ছেলেদেরকে দিলেন । ছেলেদের মধ্যে একজন জিজ্ঞাসা কোরলো _”স্বামীজী! রান্না কোথায় কোরবো?” স্বামীজী রান্নার জায়গা দেখিয়ে দিলেন ।ছেলেটি হাঁড়িকুড়ি পরিষ্কার করে রান্না শুরু করে দিলো।
রান্না শেষ হলে তারা মন্দিরের দেবতাকে ভোগ নিবেদন কোরলো । এরপর প্রসাদ গ্রহণের জন্য স্বামীজীকে আহ্বান করতে তারা স্বামীজীর কুটিরের বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলো। স্বামীজী কুটীরেই ছিলেন, তিনি ছেলেদেরকে দেখলেন কিন্তু কথা বললেন না। অবশেষে ছেলেরা সাহস করে স্বামীজীকে জিজ্ঞাসা কোরলো_ “আপনি ওখানে খেতে যাবেন, না এখানে প্রসাদ নিয়ে আসবো ?” স্বামীজি বললেন _”তাঁর খাওয়ার দরকার নাই!” তিনি আরও বলে দিলেন যে, তারা যেন তাঁর জন্য অপেক্ষা না করে _খেয়ে নেয়।
ছেলেরা কিন্তু সেই স্থান থেকে নড়ল না, দাঁড়িয়েই রইলো‌! অপরাহ্ন প্রায় তিনটা হয়ে গেল ! সান্ধ্য পূজার নিমিত্ত বিল্বপত্র সংগ্রহের জন্য স্বামীজী ঘর থেকে বের হলেন এবং দেখলেন ছেলেরা তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে! তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন_ “তোমরা খেয়েছো?” তারা বললো_” না!”
“দেরি কেন কোরছো! যাও, খেয়ে নাও গে !”_ এই কথা বলে বিল্বপত্র সংগ্রহের জন্য স্বামীজী পাহাড়ের দিকে চলে গেলেন । কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে দেখলেন, ছেলেরা তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ! তারা একটুও নড়েনি !
সবচেয়ে ছোট ছেলেটার বয়স তখন মাত্র 7 বছর ! স্বামীজী তাকে দেখে বললেন _”তোমার দাদাদের মনে হয় খিদে পায় নাই! তুমি গিয়ে খেয়ে নাও !” ছোট ছেলেটি বলল _” না !”
তখন সকলে বলল _”আপনি না খেলে, আমরা খাবো না!” অনেক অনুরোধেও স্বামীজী তাদেরকে সংকল্প থেকে টলাতে পারলেন না! তিনি ভাবলেন ছেলেগুলিকে উপবাসী রাখা ঠিক হবে না । স্নেহ ও ভালবাসায় তাঁর মনের পরিবর্তন হয়ে গেল । তাঁকে যেতেই হোলো এবং ছেলেদের সঙ্গে বসে খাবার‌ও খেতে হোলো।(ক্রমশঃ)
===================®================
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………….
জিজ্ঞাসা :– স্বামীজী, আমার বন্ধুদেরকে বলতে শুনলাম মানবের আজ অধঃপতন হয়েছে। তার মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ধারণা যে, বর্তমান শতাব্দীতে নানারকম আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নয়নের ফলে মানব এগিয়ে চলেছে। আমরা শুনছি সুদূর আমেরিকায় কি হচ্ছে। ঔষধ, কৃষি, শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে কি অদ্ভুত উন্নতি হয়েছে সেখানে। আমাদের দেশেরও দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু আমি এই প্রথম শুনলাম যে আমাদের অধঃপতন হচ্ছে। আপনি দয়া করে এ সম্বন্ধে কিছু বলবেন কি ?
মীমাংসা :– ব্যাখ্যা করে বলছি কি রকম অধঃপতন হয়েছে –
তােমরা জান, সর্বেসর্বা ঈশ্বর সমষ্টি-জীবরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। সমষ্টিজীব ব্যষ্টি-জীবরূপে একটি পুরুষ শরীর ধারণ করেছেন। জগতে ইনিই প্রথম মানব। এই প্রথম মানব সমস্ত মানবজাতির পিতা। সমষ্টি জীবের মতই তিনি শক্তিশালী ছিলেন। তার মধ্যে শক্তি, প্রেম, জ্ঞান, সচেতনতা পূর্ণমাত্রায় ছিল। এই শক্তিশালী পুরুষের ইচ্ছা হল নিজেকে সার্বিকভাবে প্রকাশ করতে। তাঁর এই ইচ্ছার বলে তিনি একটি স্ত্রী শরীর এবং একটি অশরীরী, জীব সৃষ্টি করলেন। এই স্ত্রী শরীর বিশ্বের সমগ্র মানব জাতির মাতা। প্রথম পুরুষ এবং প্রথম স্ত্রীই হল আদি পিতামাতা। বিভিন্ন ধর্ম তাদের বিভিন্ন নাম দিয়েছেন। পৃথিবীতে প্রথম যে কঠিন স্তর পাওয়া গেল সেখানে তারা বসতি স্থাপন করলেন। পৃথিবীর এই প্রথম কঠিন স্তরকেই আমরা সুমেরু পর্বত বলে থাকি।
আদি পিতা-মাতা একই প্রবণতা নিয়ে কিছু পুরুষ এবং স্ত্রী শরীর সৃষ্টি করলেন। ঐগুলির মধ্যে অশরীরী সত্তাও (সূক্ষ্ম শরীরও) রইল। এই অশরীরী সত্তা ভৌতিক পদার্থের (ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ) কণাগুলি সংগ্রহ করে এবং ব্যক্তিসত্তার প্রয়ােজনীয় চেতনার বিকাশ ঘটায় এবং অমানবীয় জীবরূপে প্রকাশিত হয়। আবার এই অমানবীয় জীবশরীর ধারণ না করেও তাদের অগ্রগতি হতে পারে, শক্তি ও কাণ্ডজ্ঞানের বিকাশ ঘটে এবং মানবরূপে প্রকাশিত হওয়া সম্ভব। কিন্তু এইভাবে সৃষ্ট মানব আদি পিতা-মাতার মত পূর্ণ হল না এবং তাদের ইচ্ছাও আদি পিতা-মাতার মত তীব্র হল না। এজন্য তাদের পক্ষে প্রজনন ক্রিয়া চালানো সম্ভব হল না। তাই অশরীরী সত্তাকে অমানবীয় (জীব) শরীর ধারণ করতে হল। তারপর মানবীয় শরীর ধারণ করার জন্য কাণ্ডজ্ঞানের বিকাশের সাথে ঊর্ধ্বপ্রগতি শুরু হল। যখন এই অমানবীয় সত্তা (জীব) মানবশরীর ধারণ করল তখন প্রজননের উদ্দেশ্যে তারা দৈহিকভাবে মিলিত হতে লাগল।
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রথম ধাপে আদি পিতা তীব্র ইচ্ছা শক্তি দ্বারা মানবীয় স্ত্রী শরীর সৃষ্টি করলেন।
দ্বিতীয় ধাপে, আদি পিতা-মাতা সচেতনভাবে ইচ্ছাশক্তি নিয়ে মানবীয় শরীর সৃষ্টি করলেন।
তৃতীয় ধাপে, অশরীরী সত্তা যাতে অমানবীয় জীবশরীর ধারণ না করেই প্রয়ােজনীয় ইন্দ্রিয়ানুভূতি সহ মানবশরীর ধারণ করতে পারে সে বিষয়ে ব্যক্তি সত্তা খুব মনােযােগী হল।
চতুর্থ ধাপে, অশরীরী সত্তার যাতে কাণ্ডজ্ঞানের বিকাশ ঘটে এবং তারা যাতে মানবশরীর ধারণ করতে পারে সে বিষয়ে ব্যক্তিসত্তাকে আরও বেশী মনােযােগী হতে হল। … (ক্রমশঃ)