স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখানে উনি পাহাড়ের উপরে কুটির নির্মাণ করে বেশ কিছুদিন সাধন-ভজন করেছিলেন এবং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ অনেকেরই কৃপা লাভ করেছিলেন।
স্বামীজীর একনিষ্ঠ ভক্ত বিশ্বাসমের পুত্রদের প্রতি স্নেহপরায়ণ হয়ে একদিনের জন্য স্বামীজী তাঁর না খাওয়ার ব্রত ভঙ্গ করেছিলেন। সেদিন খাবার শেষ করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে এলো। স্বামীজী ছেলেদের সঙ্গে সান্ধ্য উপাসনার জন্য মন্দিরে গেলেন । দ্বিতীয় দিনও সেই একই রকম ঘটনা ঘটলো _অর্থাৎ তাঁকে ছেলেদের সঙ্গে খাবার খেতে হোলো। তৃতীয় দিন স্বামীজী তাঁর পরিকল্পনা পাল্টে দিলেন। ছেলেরা আশ্রমে যে সমস্ত কাজ করছিল -সেই সমস্ত কাজেই তাদেরকে তিনি উত্যক্ত করতে লাগলেন! তিনি চাইছিলেন _যে কোনো প্রকারে ছেলেরা যাতে চলে যায় ! কিন্তু ছেলেরা দৃঢ়তা এবং আনন্দের সঙ্গে সমস্ত রকম কাজ করে যেতে লাগলো এবং সব ধরনের বিরক্তি উপেক্ষা করে স্বামীজীকে তাদের সঙ্গে খাবার খাওয়াতে সফল হোল । চার দিন গত হলে বিশ্বাসম এসে ছেলেদের নিয়ে চলে গেলেন । স্বামীজী এই ভেবে খুব খুশি হোলেন যে, খাবার গ্রহণ না করে শরীরপাতের যে বাধা ছিল, তা ঈশ্বর দূর করে দিলেন !
কিন্তু পরের দিন সকালেই বিশ্বাসম ছেলেদের নিয়ে আবার আশ্রমে এলেন এবং সঙ্গে নিয়ে এলেন প্রচুর খাদ্য সামগ্রী ! তিনি বললেন _”স্বামীজী! জরুরী কাজে সমতলে যাচ্ছি ! এক পক্ষকাল ফিরতে পারবো না ! সুতরাং ছেলেরা আপনার এখানেই থাকবে!” স্বামীজি অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজী হয়ে গেলেন ! তিনি অনুভব করলেন যে, ঈশ্বরের ইচ্ছা নয় যে তিনি এভাবে শরীরপাত করেন !
পালুরি সুব্বারাও-এর নেতৃত্বে তাডিপল্লিগুডেম হোতে কিছু ভক্ত আশ্রমে আসতো। সুব্বারাও ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক এবং তান্ত্রিক সাধক । তিনি একজন জ্যোতির্বিদ এবং সংস্কৃতে পন্ডিত ব্যক্তিও ছিলেন । তাছাড়া সুব্বা ছিলেন বেশ ধনী লোক । তিনি বন্ধু-বান্ধবের দল নিয়ে মাঝে মাঝে পেরেন্টাপল্লী আসতেন গাছ-গাছড়া সংগ্রহ করে সময় কাটানোর জন্য ! সুব্বারাও একজন গোঁড়া ব্রাহ্মণ ছিলেন, তিনি অন্য কোনো জাতির ছোঁয়া জল খেতেন না । নিজে রান্না করে খেতেন। ওই দলের অন্যান্যরা তাদের নিজেদের জন্য রান্না করতো।
একদিন রান্নার পর, তাঁরা গাছ গাছড়া সংগ্রহ করার জন্য বনে গেলেন। সেদিন ফিরতে তাঁদের অনেক দেরি হোল ! যে কোন প্রকারে সুব্বারাও-এর মনে সন্দেহ হোল যে, হয়তো কেউ তার খাবার স্পর্শ করেছে ! সে জন্য তিনি সেদিন খাবারই ছুঁলেন না ! তাঁর এই একগুঁয়েমিতে দলের অন্যান্য লোকেরা মনে আঘাত পেলো ।
স্বামীজী সমস্ত ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন কিন্তু তিনি কাউকেই কোন কথা বললেন না । পরের দিন সকালেই সুব্বারাও হলুদ ভাত রান্না করে রেখে জঙ্গলে গেলেন ওষুধ সংগ্রহের জন্য । ফিরে এসে দেখলেন সেদিনও তাঁর রান্নার পাত্র নাড়াচাড়া হয়েছে! সেজন্য তিনি সেদিনও ভাত খেলেন না! তাঁর দলের অন্য লোকেরা এই ঘটনায় খুবই ব্যথিত হোলো ! তাদের দলের নেতা দুদিন ধরে খাচ্ছে না __ এ ব্যাপারটা তারা সহ্য করতে পারছিলো না! তাদের চক্ষু প্রায় সিক্ত হয়ে এলো । তারা বারবার সুব্বারাওকে অনুরোধ জানাতে লাগলো কিন্তু তিনি অটল , কারোর কথা শুনলেন না !
স্বামীজী পরিস্থিতিটা দেখে সুব্বারাও এর নিকটে এসে তার কান মুলে দিলেন এবং তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন _ঈশ্বরের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে, নিজের প্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি কোরোনা!” স্বামী বাউলানন্দজীর এই কথায় সুব্বারাও ভীত হোলেন! তিনি মৃদু হেসে দাঁড়িয়ে পড়লেন । ওখান থেকে গিয়ে বিনা দ্বিধায় খাবার খেয়ে নিলেন । এতে প্রত্যেকেই খুশি হোলেন।
অন্য একদিন সুব্রহ্মণীয়াম(সুব্বারাও কে স্বামীজী এবং তাঁর ভক্তরা সকলে এই নামেই ডাকতেন ) সকালে উঠোনে ঝাঁট দিচ্ছিলেন। সেদিন তিনি উঠোন পরিষ্কার করে, জল ছিটালেন এবং খড়িমাটির আলপনা দিলেন ! এক খন্ড মেঘ মন্দির চূড়ার ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিলো। হয়তো বৃষ্টি হয়ে তার সমস্ত আলপনার কাজ মুছে দিতে পারে __এই ভেবে ক্রোধান্বিত হয়ে সুব্বারাও বলে উঠলেন _” মেঘ, তুমি চলে যাও ! অন্যথায় গুরুর নাম নিয়ে এই ঝাঁটা দিয়ে তোমাকে আঘাত কোরবো!” স্বামীজী হঠাৎ তার পিঠে হাত দিয়ে বললেন _”প্রকৃতির বিরুদ্ধে কখনো কিছু কোরো না!” এই কথা বলে স্বামীজী সেখান থেকে চলে গেলেন । একটু পরেই বৃষ্টি নামলো এবং তার সমস্ত আলপনা মুছে গেল ! সুব্বারাও বৃষ্টি থামলে আবার আলপনা দিলেন !
সুব্বারাও-এর স্ত্রী যিনি সুব্রামণি নামে পরিচিত ছিলেন, তিনিও ছিলেন স্বামীজীর একজন একনিষ্ঠ ভক্ত । তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে আসতেন এবং সমস্ত রকম অনুষ্ঠান ও উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন । তিনি তাঁর হৃদয়মাঝে তাঁর গুরুর উপস্থিতি সর্বদা অনুভব করতেন । গুরু সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকতেন, তাঁকে উপদেশ দিতেন এবং তাঁকে প্রত্যেকটি কাজের ব্যাপারে নির্দেশ দিতেন!
তাঁর জীবনের কয়েকটি ঘটনা আলোচনা করলেই বোঝা যাবে গুরু-শিষ্যের মধ্যে কি সম্পর্ক এবং গুরু কিভাবে প্রতি মুহূর্তে তাঁর শিষ্যদেরকে রক্ষা করতেন!
*স্বামী বাউলানন্দজীর অধ্যাত্মিক আলোচনা*
…………………………………………………………….
… পঞ্চম ধাপে, যারা কিছুকাল অমানবীয় শরীরে বর্তমান থেকে ক্রমােন্নতির ফলে কাণ্ডজ্ঞান অর্জন করেছে তারাই মানবরূপ নিল। এই সমস্ত মানবের ব্যক্তি অহং-এর স্বভাব হল যে প্রজননের জন্য দৈহিকভাবে মিলিত হওয়া।
ষষ্ঠ ধাপে, অন্যবৃত্তিগুলির তীব্রতা কমে গেল, কিন্ত দৈহিক মিলনের প্রয়ােজনীয়তা রইল।
সপ্তম ধাপে, দৈহিক মিলনের ক্ষেত্রে উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দিল। অমানবীয় বৃত্তি প্রবল আকার নিল। ব্যক্তি-অহং প্রাধান্য পেল। ইন্দ্রিয় সুখভােগই স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেল। যে উদ্দেশ্যে দৈহিক মিলন তা লুপ্ত হল। খাদ্যগ্রহণ এবং শরীরের পরিচর্যার মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখা দিল।
প্রথম ধাপে, আদি পিতা-মাতা যে সমস্ত শরীর সৃষ্টি করেছিলেন তাদের শরীরের পুষ্টির জন্য খাদ্য সরাসরি বিশ্ব হতে তাদের অজ্ঞাতসারেই আসত। অর্থাৎ ব্যক্তির ক্ষুধা বলে কিছু ছিল না, খাদ্যের ব্যাপারে মনােযােগ দেওয়ার প্রয়ােজন ছিল না। অনায়াসেই শরীরের পুষ্টি হােত।
দ্বিতীয় ধাপে, ইচ্ছামাত্রই বিশ্ব হতে পুষ্টির জন্য খাদ্য এসে যেত। এই পর্যায়ে ক্ষুধা অনুভব হতে লাগল। কিন্তু ইচ্ছামাত্রই খাদ্য এসে যেত। তা খেয়ে ব্যক্তি সন্তুষ্টি লাভ করত।
তৃতীয় ধাপে, ইচ্ছামাত্র খাদ্য আসত না। খাদ্য সংগ্রহের জন্য মনােসংযােগ করতে হতাে।
চতুর্থ ধাপে, দীর্ঘক্ষণ ধরে মনােসংযােগের প্রয়ােজন হয়ে পড়ল।
পঞ্চম ধাপে, খাদ্য সংগ্রহের ব্যাপারে কেবল মাত্র মনােসংযােগ এবং একাগ্রতাই যথেষ্ট হল না। দৈহিক প্রচেষ্টারও প্রয়ােজন হল। ফল-মূল সংগ্রহ করে তা খাওয়ার জন্য দৈহিক প্রচেষ্টার প্রয়ােজন হল। এই ভুক্ত খাবারের সার অংশ শরীর নিল এবং অসার অংশ বেরিয়ে যেতে লাগল। এই ধাপেই প্রথম প্রস্রাব-পায়খানা যাওয়ার প্রয়ােজন দেখা দিল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই ধাপ হতেই ব্যক্তির মনে ‘ নিজস্ব সম্পত্তি’-র ধারণা জাগল। এতাবৎ তারা মহাবিশ্ব হতে সরাসরি খাদ্য নিত। এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে তাদের যােগাযােগ ছিল না। এখন ফলমূল সংগ্রহ করার প্রয়ােজন দেখা দিল। ফলমূল অবশ্য প্রকৃতির দান। কিন্তু যে মুহূর্তে ওগুলি ব্যক্তি বিশেষ সংগ্রহ করতে লাগল, সেই মুহূর্তে সেগুলি তার নিজস্ব সম্পত্তি বলে বিবেচিত হল। অপর কেহ বিনা অনুমতিতে তার জিনিস গ্রহণ করতে পারত না। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার উল্লেখ করছি।
একদিন শিলাখণ্ডের উপর একটা আমগাছের নীচে বসে আছি। গাছটা বেশ বড়। হাজার হাজার আম ধরেছে। খুব মিষ্টি আম। কিন্তু খুব ছােট। প্রত্যেক দিন সকালে গাছের নীচে শত শত পাকা আম পড়ে থাকত। এই গাছ বনের। কোন ব্যক্তি বিশেষের সম্পত্তি নয়। গাছের নীচে বসে থাকতে থাকতে দেখলাম গ্রামের কয়েকটা মেয়ে আম কুড়াতে এল। প্রত্যেকেই আম কুড়ানাের কাজে ব্যস্ত। তারা অনেক আম কুড়িয়েছে। এক-একজন একটা স্তূপ করে ফেলেছে। এখন দেখা গেল, কিছুক্ষণ আগে যে আম প্রকৃতির দান বলে গণ্য হচ্ছিল এখন প্রত্যেকটা আমের স্থূপ এক-একজনের নিজস্ব সম্পত্তি বলে বিবেচিত হল।
এই সময় হঠাৎ এক জনের জড়াে করা আমের মধ্য হতে একটা আম গড়িয়ে পড়ে গেল। অন্য একটি মেয়ে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে নিজের জড়াে করা আমের মধ্যে রেখে দিল। প্রথম মেয়েটি (যার স্তূপ হতে আমটি গড়িয়ে পড়ল) আপত্তি করল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়েটি ওর কথা গ্রাহ্য করল না, যেহেতু ওটি প্রকৃতির দান। গাছ হতে প্রতি মুহূর্তে অনেক আম পড়ছে। প্রথম মেয়েটি ঐ আম কুড়িয়ে নিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে পারত। কিন্তু সে তা না করে দ্বিতীয় মেয়েটিকে তার কুড়ানো আম ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য জিদ করতে লাগল।
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি ব্যক্তিগত সম্পত্তি, মালিকানার ধারণা এবং স্বার্থপরতা এই ধাপ (পঞ্চম) হতে শুরু হল। … (ক্রমশঃ)
স্বামীজীর একনিষ্ঠ ভক্ত বিশ্বাসমের পুত্রদের প্রতি স্নেহপরায়ণ হয়ে একদিনের জন্য স্বামীজী তাঁর না খাওয়ার ব্রত ভঙ্গ করেছিলেন। সেদিন খাবার শেষ করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে এলো। স্বামীজী ছেলেদের সঙ্গে সান্ধ্য উপাসনার জন্য মন্দিরে গেলেন । দ্বিতীয় দিনও সেই একই রকম ঘটনা ঘটলো _অর্থাৎ তাঁকে ছেলেদের সঙ্গে খাবার খেতে হোলো। তৃতীয় দিন স্বামীজী তাঁর পরিকল্পনা পাল্টে দিলেন। ছেলেরা আশ্রমে যে সমস্ত কাজ করছিল -সেই সমস্ত কাজেই তাদেরকে তিনি উত্যক্ত করতে লাগলেন! তিনি চাইছিলেন _যে কোনো প্রকারে ছেলেরা যাতে চলে যায় ! কিন্তু ছেলেরা দৃঢ়তা এবং আনন্দের সঙ্গে সমস্ত রকম কাজ করে যেতে লাগলো এবং সব ধরনের বিরক্তি উপেক্ষা করে স্বামীজীকে তাদের সঙ্গে খাবার খাওয়াতে সফল হোল । চার দিন গত হলে বিশ্বাসম এসে ছেলেদের নিয়ে চলে গেলেন । স্বামীজী এই ভেবে খুব খুশি হোলেন যে, খাবার গ্রহণ না করে শরীরপাতের যে বাধা ছিল, তা ঈশ্বর দূর করে দিলেন !
কিন্তু পরের দিন সকালেই বিশ্বাসম ছেলেদের নিয়ে আবার আশ্রমে এলেন এবং সঙ্গে নিয়ে এলেন প্রচুর খাদ্য সামগ্রী ! তিনি বললেন _”স্বামীজী! জরুরী কাজে সমতলে যাচ্ছি ! এক পক্ষকাল ফিরতে পারবো না ! সুতরাং ছেলেরা আপনার এখানেই থাকবে!” স্বামীজি অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজী হয়ে গেলেন ! তিনি অনুভব করলেন যে, ঈশ্বরের ইচ্ছা নয় যে তিনি এভাবে শরীরপাত করেন !
পালুরি সুব্বারাও-এর নেতৃত্বে তাডিপল্লিগুডেম হোতে কিছু ভক্ত আশ্রমে আসতো। সুব্বারাও ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক এবং তান্ত্রিক সাধক । তিনি একজন জ্যোতির্বিদ এবং সংস্কৃতে পন্ডিত ব্যক্তিও ছিলেন । তাছাড়া সুব্বা ছিলেন বেশ ধনী লোক । তিনি বন্ধু-বান্ধবের দল নিয়ে মাঝে মাঝে পেরেন্টাপল্লী আসতেন গাছ-গাছড়া সংগ্রহ করে সময় কাটানোর জন্য ! সুব্বারাও একজন গোঁড়া ব্রাহ্মণ ছিলেন, তিনি অন্য কোনো জাতির ছোঁয়া জল খেতেন না । নিজে রান্না করে খেতেন। ওই দলের অন্যান্যরা তাদের নিজেদের জন্য রান্না করতো।
একদিন রান্নার পর, তাঁরা গাছ গাছড়া সংগ্রহ করার জন্য বনে গেলেন। সেদিন ফিরতে তাঁদের অনেক দেরি হোল ! যে কোন প্রকারে সুব্বারাও-এর মনে সন্দেহ হোল যে, হয়তো কেউ তার খাবার স্পর্শ করেছে ! সে জন্য তিনি সেদিন খাবারই ছুঁলেন না ! তাঁর এই একগুঁয়েমিতে দলের অন্যান্য লোকেরা মনে আঘাত পেলো ।
স্বামীজী সমস্ত ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন কিন্তু তিনি কাউকেই কোন কথা বললেন না । পরের দিন সকালেই সুব্বারাও হলুদ ভাত রান্না করে রেখে জঙ্গলে গেলেন ওষুধ সংগ্রহের জন্য । ফিরে এসে দেখলেন সেদিনও তাঁর রান্নার পাত্র নাড়াচাড়া হয়েছে! সেজন্য তিনি সেদিনও ভাত খেলেন না! তাঁর দলের অন্য লোকেরা এই ঘটনায় খুবই ব্যথিত হোলো ! তাদের দলের নেতা দুদিন ধরে খাচ্ছে না __ এ ব্যাপারটা তারা সহ্য করতে পারছিলো না! তাদের চক্ষু প্রায় সিক্ত হয়ে এলো । তারা বারবার সুব্বারাওকে অনুরোধ জানাতে লাগলো কিন্তু তিনি অটল , কারোর কথা শুনলেন না !
স্বামীজী পরিস্থিতিটা দেখে সুব্বারাও এর নিকটে এসে তার কান মুলে দিলেন এবং তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন _ঈশ্বরের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে, নিজের প্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি কোরোনা!” স্বামী বাউলানন্দজীর এই কথায় সুব্বারাও ভীত হোলেন! তিনি মৃদু হেসে দাঁড়িয়ে পড়লেন । ওখান থেকে গিয়ে বিনা দ্বিধায় খাবার খেয়ে নিলেন । এতে প্রত্যেকেই খুশি হোলেন।
অন্য একদিন সুব্রহ্মণীয়াম(সুব্বারাও কে স্বামীজী এবং তাঁর ভক্তরা সকলে এই নামেই ডাকতেন ) সকালে উঠোনে ঝাঁট দিচ্ছিলেন। সেদিন তিনি উঠোন পরিষ্কার করে, জল ছিটালেন এবং খড়িমাটির আলপনা দিলেন ! এক খন্ড মেঘ মন্দির চূড়ার ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিলো। হয়তো বৃষ্টি হয়ে তার সমস্ত আলপনার কাজ মুছে দিতে পারে __এই ভেবে ক্রোধান্বিত হয়ে সুব্বারাও বলে উঠলেন _” মেঘ, তুমি চলে যাও ! অন্যথায় গুরুর নাম নিয়ে এই ঝাঁটা দিয়ে তোমাকে আঘাত কোরবো!” স্বামীজী হঠাৎ তার পিঠে হাত দিয়ে বললেন _”প্রকৃতির বিরুদ্ধে কখনো কিছু কোরো না!” এই কথা বলে স্বামীজী সেখান থেকে চলে গেলেন । একটু পরেই বৃষ্টি নামলো এবং তার সমস্ত আলপনা মুছে গেল ! সুব্বারাও বৃষ্টি থামলে আবার আলপনা দিলেন !
সুব্বারাও-এর স্ত্রী যিনি সুব্রামণি নামে পরিচিত ছিলেন, তিনিও ছিলেন স্বামীজীর একজন একনিষ্ঠ ভক্ত । তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে আসতেন এবং সমস্ত রকম অনুষ্ঠান ও উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন । তিনি তাঁর হৃদয়মাঝে তাঁর গুরুর উপস্থিতি সর্বদা অনুভব করতেন । গুরু সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকতেন, তাঁকে উপদেশ দিতেন এবং তাঁকে প্রত্যেকটি কাজের ব্যাপারে নির্দেশ দিতেন!
তাঁর জীবনের কয়েকটি ঘটনা আলোচনা করলেই বোঝা যাবে গুরু-শিষ্যের মধ্যে কি সম্পর্ক এবং গুরু কিভাবে প্রতি মুহূর্তে তাঁর শিষ্যদেরকে রক্ষা করতেন!
*স্বামী বাউলানন্দজীর অধ্যাত্মিক আলোচনা*
…………………………………………………………….
… পঞ্চম ধাপে, যারা কিছুকাল অমানবীয় শরীরে বর্তমান থেকে ক্রমােন্নতির ফলে কাণ্ডজ্ঞান অর্জন করেছে তারাই মানবরূপ নিল। এই সমস্ত মানবের ব্যক্তি অহং-এর স্বভাব হল যে প্রজননের জন্য দৈহিকভাবে মিলিত হওয়া।
ষষ্ঠ ধাপে, অন্যবৃত্তিগুলির তীব্রতা কমে গেল, কিন্ত দৈহিক মিলনের প্রয়ােজনীয়তা রইল।
সপ্তম ধাপে, দৈহিক মিলনের ক্ষেত্রে উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দিল। অমানবীয় বৃত্তি প্রবল আকার নিল। ব্যক্তি-অহং প্রাধান্য পেল। ইন্দ্রিয় সুখভােগই স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেল। যে উদ্দেশ্যে দৈহিক মিলন তা লুপ্ত হল। খাদ্যগ্রহণ এবং শরীরের পরিচর্যার মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখা দিল।
প্রথম ধাপে, আদি পিতা-মাতা যে সমস্ত শরীর সৃষ্টি করেছিলেন তাদের শরীরের পুষ্টির জন্য খাদ্য সরাসরি বিশ্ব হতে তাদের অজ্ঞাতসারেই আসত। অর্থাৎ ব্যক্তির ক্ষুধা বলে কিছু ছিল না, খাদ্যের ব্যাপারে মনােযােগ দেওয়ার প্রয়ােজন ছিল না। অনায়াসেই শরীরের পুষ্টি হােত।
দ্বিতীয় ধাপে, ইচ্ছামাত্রই বিশ্ব হতে পুষ্টির জন্য খাদ্য এসে যেত। এই পর্যায়ে ক্ষুধা অনুভব হতে লাগল। কিন্তু ইচ্ছামাত্রই খাদ্য এসে যেত। তা খেয়ে ব্যক্তি সন্তুষ্টি লাভ করত।
তৃতীয় ধাপে, ইচ্ছামাত্র খাদ্য আসত না। খাদ্য সংগ্রহের জন্য মনােসংযােগ করতে হতাে।
চতুর্থ ধাপে, দীর্ঘক্ষণ ধরে মনােসংযােগের প্রয়ােজন হয়ে পড়ল।
পঞ্চম ধাপে, খাদ্য সংগ্রহের ব্যাপারে কেবল মাত্র মনােসংযােগ এবং একাগ্রতাই যথেষ্ট হল না। দৈহিক প্রচেষ্টারও প্রয়ােজন হল। ফল-মূল সংগ্রহ করে তা খাওয়ার জন্য দৈহিক প্রচেষ্টার প্রয়ােজন হল। এই ভুক্ত খাবারের সার অংশ শরীর নিল এবং অসার অংশ বেরিয়ে যেতে লাগল। এই ধাপেই প্রথম প্রস্রাব-পায়খানা যাওয়ার প্রয়ােজন দেখা দিল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই ধাপ হতেই ব্যক্তির মনে ‘ নিজস্ব সম্পত্তি’-র ধারণা জাগল। এতাবৎ তারা মহাবিশ্ব হতে সরাসরি খাদ্য নিত। এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে তাদের যােগাযােগ ছিল না। এখন ফলমূল সংগ্রহ করার প্রয়ােজন দেখা দিল। ফলমূল অবশ্য প্রকৃতির দান। কিন্তু যে মুহূর্তে ওগুলি ব্যক্তি বিশেষ সংগ্রহ করতে লাগল, সেই মুহূর্তে সেগুলি তার নিজস্ব সম্পত্তি বলে বিবেচিত হল। অপর কেহ বিনা অনুমতিতে তার জিনিস গ্রহণ করতে পারত না। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার উল্লেখ করছি।
একদিন শিলাখণ্ডের উপর একটা আমগাছের নীচে বসে আছি। গাছটা বেশ বড়। হাজার হাজার আম ধরেছে। খুব মিষ্টি আম। কিন্তু খুব ছােট। প্রত্যেক দিন সকালে গাছের নীচে শত শত পাকা আম পড়ে থাকত। এই গাছ বনের। কোন ব্যক্তি বিশেষের সম্পত্তি নয়। গাছের নীচে বসে থাকতে থাকতে দেখলাম গ্রামের কয়েকটা মেয়ে আম কুড়াতে এল। প্রত্যেকেই আম কুড়ানাের কাজে ব্যস্ত। তারা অনেক আম কুড়িয়েছে। এক-একজন একটা স্তূপ করে ফেলেছে। এখন দেখা গেল, কিছুক্ষণ আগে যে আম প্রকৃতির দান বলে গণ্য হচ্ছিল এখন প্রত্যেকটা আমের স্থূপ এক-একজনের নিজস্ব সম্পত্তি বলে বিবেচিত হল।
এই সময় হঠাৎ এক জনের জড়াে করা আমের মধ্য হতে একটা আম গড়িয়ে পড়ে গেল। অন্য একটি মেয়ে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে নিজের জড়াে করা আমের মধ্যে রেখে দিল। প্রথম মেয়েটি (যার স্তূপ হতে আমটি গড়িয়ে পড়ল) আপত্তি করল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়েটি ওর কথা গ্রাহ্য করল না, যেহেতু ওটি প্রকৃতির দান। গাছ হতে প্রতি মুহূর্তে অনেক আম পড়ছে। প্রথম মেয়েটি ঐ আম কুড়িয়ে নিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে পারত। কিন্তু সে তা না করে দ্বিতীয় মেয়েটিকে তার কুড়ানো আম ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য জিদ করতে লাগল।
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি ব্যক্তিগত সম্পত্তি, মালিকানার ধারণা এবং স্বার্থপরতা এই ধাপ (পঞ্চম) হতে শুরু হল। … (ক্রমশঃ)
