শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ পৌরাণিক বিষয় নিয়ে অনেক সময় আলোচনা করতেন এবং সেগুলির বৈজ্ঞানিক, সামাজিক বা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতেন । এখানে সেইসব আলোচনাগুলিই সাধ্যমতো তুলে ধরা হচ্ছিলো ।
গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন – পুরাণে কোনো কাহিনীতে রয়েছে “ব্রহ্মা” তার কন্যা “সন্ধ্যা”-র সাথে প্রণয়াসক্ত হয়ছিল ইত্যাদি ! কিন্তু এই কাহিনীগুলির ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে ! ব্রহ্মা কোন ব্যক্তি নয়, প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এই তিনটিই তত্ত্ব ! এদের তাত্ত্বিক রূপ বোঝাতে তিনটি পৃথক পৃথক মূর্তির কল্পনা করা হয়েছে ! কোথাও কোথাও আবার কোনো জ্ঞানী বা মহাজন “ত্রিদেব”-এর কল্পনা করে এই তিন মূর্তিকে__ একটাই মূর্তিতে রূপদান করেছেন ।
এগুলো সবই ঠিক । এক তত্ত্ব-ই তিন তত্ত্বে প্রকাশ পায় এবং এই বিশ্বচরাচরের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের ধারাটি অব্যাহত থাকে ৷ ব্রহ্মা হোল theory of creation , বিষ্ণু– theory of sustaintion এবং মহেশ্বর হলো theory of destruction ! সদা-সর্বদা এই সমগ্র বিশ্বচরাচর জুড়ে এই তিনটি ক্রিয়া ঘটে চলেছে, প্রতি মুহূর্তেই নতুন কিছু না কিছু সৃষ্টি হচ্ছে, সেইগুলি কিছুকাল স্থিতিলাভ করছে এবং তারপরে সেগুলির “লয়” হয়ে যাচ্ছে ! এখানে “লয়” হয়ে যাওয়া কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে – “নষ্ট হয়ে যাওয়া” বা “হারিয়ে যাওয়া-ফুরিয়ে যাওয়া” এই সব শব্দ ব্যবহার করা হয় নি ! “লয়” হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো – যেসব তত্ত্ব থেকে এদের সৃষ্টি হয়েছে, সেই তত্ত্বেই আবার নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা ! ফলে এই মহাবিশ্বে সবসময়েই একটা balance থাকে । জড় বিজ্ঞানে এটাকেই “ভর ও শক্তির নিত্যতাসূত্র” বলে বর্ণনা করেছে ! উদাহরণ হিসেবে বলা যায় – যেমন, কোনো মানুষ বা অন্য স্থূল জীবদেহের মৃত্যু হলে – তার পাঞ্চভৌতিক উপাদান বিশিষ্ট শরীরটা পুনরায় পঞ্চভূতেই মিশে যায় ! ওই দেহটা পুড়িয়েই দেওয়া হোক অথবা মাটিতে কবরে বা কফিনে রেখে পুঁতে দেওয়া হোক — তার শরীরের কিছুটা ক্ষিতিতত্ত্বে, কিছুটা অপতত্ত্বে, কিছুটা তেজতত্ত্বে, কিছুটা মরুৎতত্ত্বে এবং সবশেষটা ব্যোমতত্ত্বে মিশে যায় বা লয় হয়ে যায় !
সাংখ্যদর্শনে কপিলমুনি যে কোনো বস্তুর সমগ্র দশাগুলি সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন – সেগুলি হলো প্রাগ্উৎপত্তি, উৎপত্তি, প্রবৃদ্ধি, রূপান্তর, ক্ষয় ও লয় – এই ছয়টি ! এইগুলিকে বস্তুটির দশার বিকার বলা হয়েছে – এগুলো একত্রে বলা হয়েছে “ষট্-বিকার”! কোনো বস্তু সৃষ্টির পূর্বে যে “কারণ অবস্থা” – একেই “প্রাগ্উৎপত্তি” বলা হয়েছে এবং শেষে বস্তু সম্পূর্ণভাবে লয় হবার আগে যে সেটি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে — তাও বলা হয়েছে ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – সাংখ্যকার কপিল যেভাবে এইসব বিশ্লেষণ করেছেন – এখনও আধুনিক বিজ্ঞান ততটা সূক্ষ্মতায় পৌঁছাতে পারেনি ! কণাদের বৈশেষিক দর্শন বা জড়-দর্শনেও বস্তুর গঠন সংক্রান্ত গবেষণার কথা রয়েছে ! বস্তুর সূক্ষাতিসূক্ষ রূপ যে ‘কণা’ বা particle এই নামটিও ঋষি কণাদের নাম থেকেই এসেছে ।
অতি আধুনিক বিজ্ঞানে ‘মন’-কে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, মনকেও জড়বস্তু হিসেবে ধরে নিয়ে জড়বিজ্ঞানীরা এবং জীববিজ্ঞানীরা একত্রে পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে এই গবেষণা চালাচ্ছে ! কিন্তু মন, বুদ্ধি, চিত্ত এবং অহংকার – এই অন্তঃকরণ চতুষ্টয়কে নিয়েই সাংখ্যকার কপিল প্রচুর গবেষণা করেছিলেন ! আর তারই ফসল ভারতীয় সাংখ্যদর্শন ! বর্তমানের প্রাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরা এই গ্রন্থগুলিকে base করেই তাদের এখনকার গবেষণা এগিয়ে নিয়ে চলেছে ! কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এইগুলি যে দেশের সম্পদ – সেই দেশেরই অধিকাংশ তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ – এই গ্রন্থগুলিকেই “চাষাদের গান, পৌত্তলিক ধার্মিকদের গ্রন্থ, গ্রন্থগুলি আধুনিকতার পরিপন্থী”– ইত্যাদি নানা কথা বলে ব্রাত্য করে রেখেছে ! প্রায় হাজার বছরের পরাধীনতা এই দেশের মানুষের মধ্যে পরম্পরার প্রতি “শ্রদ্ধাবোধ”-টাকেই অনেকাংশে নষ্ট করে ফেলেছে !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – হাজার বছরের পরাধীনতা এবং বিদেশী শাসকদের দেশীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপর নৃশংস আঘাতে –ভারতবর্ষের আচার্য্যকুল তাদের কার্য্য সম্পন্ন করতে পারে নি ! জ্ঞানী, পন্ডিত, শিক্ষিত মানুষেরা বিদেশী শাসকদের অত্যাচারে সমাজে থেকেও আত্মগোপন করেছিল অথবা গ্রন্থিরাজি নিয়ে গিরি-গুহা-অরণ্যে চলে গিয়েছিল ৷ এইভাবেই ভারতবর্ষের বৃহত্তর সমাজে সুদীর্ঘকাল ধরে প্রকৃত ভারতীয় সংস্কৃতির আচার্য্যের অভাব ঘটে গিয়েছিল । আর তার বদলে ঢুকে পড়েছিল বিদেশীদের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি ! এইভাবে মিশ্র-সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল ভারতবর্ষে ! সেইসঙ্গে মিশ্ররক্তের বা মিশ্র-জিনের মানুষের সংখ্যাও বাড়তে থাকল সমাজে । এইসব বিভিন্ন কারণে বহুকাল ধরে ভারতের মূল শিক্ষা, মূল সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিরাট ব্যাঘাত ঘটে গেছে ! তাই আধুনিককালের শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা জানেই না বা কারো কাছে শুনলেও বিশ্বাস করতে চায় না যে, সমগ্র বিশ্বের সমস্ত যা কিছু ভালো – তার origin ছিল ভারতবর্ষ !
কেন ? – ভারতবর্ষ থেকেই সবকিছু ভালো সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল কেন ? গুরুমহারাজ বলেছিলেন – তার কারণ এই পৃথিবী সৃষ্টির সময়েই প্রথমে যে স্থলভাগ মহাসমুদ্র থেকে আত্মপ্রকাশ করেছিল, তাই সুমের পর্বত বা বর্তমানে হিমালয় অঞ্চল (যদিও আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছে যে, হিমালয়ের অঞ্চলের শিলা অপেক্ষাকৃত নবীন, তুলনায় রাজস্থান অঞ্চলের পর্বতের শিলা অনেক প্রাচীন ! কিন্তু এরও ব্যাখ্যা রয়েছে !)! ফলে ওই অঞ্চলেই প্রথম জীব-বিবর্তন শুরু হয় এবং জীব উন্নত হোতে হোতে মানুষে রূপ পেয়েছিল । ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের সভ্যতার সূচনাও হয়েছিল এখান থেকেই!!(ক্রমশঃ)