স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। এখন এই প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাক্।।
পূর্বে নিজাম রাজ্যগুলিতে আমদানি দ্রব্যের উপর শুল্ক আদায় করা হোতো ! সমস্ত সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতেই এই শুল্ক আদায়ের ‘কেন্দ্র’ ছিল ! প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে করণিক ও একজন পিয়ন থাকতো ! এখান হতে কিছু বাঁশ রপ্তানি হোতো এবং এই রপ্তানির ওপর শুল্ক আদায় করা হোতো । এই সমস্ত শুল্ক-কেন্দ্রের কর্মচারীরা সাধারণত ছিল মুসলমান ! এদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল গোঁড়া মুসলমান ! পেরেন্টাপল্লীর করণিকটির বেশি কিছু কাজ ছিল না, সে কোরাণ পড়তো এবং সবসময় চিন্তা করত অপরের উপর কি করে আধিপত্য বিস্তার করা যায় !
একদা স্বামীজি যখন মৌন হয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন _____তখন একদিন ওই মুসলমান করণিকটি আশ্রমে গেল ! ওই সময় স্বামীজি কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন_তাই কোনো কথাই বললেন না। করণিকটি স্বামীজীর স্তুতি গাইতে লাগলো ! স্বামীজি এইসব তোষামদের কথা শুনতে ইচ্ছুক ছিলেন না, হাতের যে কাজটা করছিলেন সেটা বন্ধ করার ইচ্ছাও প্রকাশ করলেন না । করণিকটি কিন্তু তোষামোদ করেই চলেছে __এরূপ কিছুক্ষণ করার পর সেই দিন সে চলে গেল !
এরপর থেকে সে প্রায়ই আশ্রমে আসতো, স্বামীজীর সামনে কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে যেতো ! এটাই যেন তার রুটিন মাফিক কাজ হয়ে দাঁড়ালো ! স্বামীজি তাঁর আগমনের ব্যাপারে তেমন খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না !
কয়েক মাস এইভাবে কাটার পর একদিন সে সাহস করে স্বামীজীকে বলল__” স্বামীজি ! আপনি আধ্যাত্মিকতার
বিষয়ে কিছু বলুন ! স্বামীজী মুচকি হাসলেন, মুখে কিছু বললেন না।
এইভাবে আরও কয়েক মাস কেটে গেল ! সে স্বামীজীকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলে স্বামীজী তাকে কোনো কথাই বলতেন না ! একদিন স্বামীজী ঝর্ণার জলে স্নান করছেন এমন সময় করণিকটি দ্রুত বেগে দৌড়ে স্বামীজীর নিকট গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল __”স্বামীজী! যখনই আমি কোরান খুলি, তখনি কোরানের পাতায় আপনাকেই দেখতে পাই ! সব পাতাতেই আপনি !! কয়েক মাস যাবৎ এইরকমই হচ্ছে ! আজ‌ও এইরকমই হোল ! বই বন্ধ না করেই আপনার কাছে ছুটে এসেছি ! কোরানে আদর্শ পুরুষের গুণাবলী যা বর্ণনা করা হয়েছে, তার সবই আপনার মধ্যে রয়েছে ! এখন আপনি যদি দয়া করে মূর্তিপূজা বন্ধ করে দেন_তাহলে এখান থেকে আপনার এক পাও আর নড়ার দরকার হবেনা ! আপনার সমস্ত বাঞ্ছা পূর্ণ হয়ে যাবে ! আমার দিকে তাকান স্বামীজি, আমিও একজন ব্রাহ্মণ সন্তান ছিলাম ! এখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি ! আমার পিতা এখনো জীবিতই রয়েছে_তাই আপনি কোনো দ্বিধা না করেই আমার উপদেশ নিন। আপনি যদি ইসলাম ধর্ম না গ্রহণ করেন, তাহলে হয়তো আমি পাগল হয়ে যাবো ! কারণ, পুস্তক খুললেই আমি আপনাকেই দেখতে পাচ্ছি !” __প্রবল আবেগে বেশ কিছুক্ষণ সেই করণিকটি এইরকমভাবে বকে গেল ! কথার শুরু থেকে স্বামীজী যেমন হাসছিলেন, তেমনই হাসলেন __কিন্তু কোনো কথা বললেন না ! নিরব থেকে গেলে করণীকটি আবার বলতে লাগলো _” স্বামীজী ! আপনি এভাবে নিরব থাকবেন না, যদি কোনো সমস্যা থাকে তাহলে বলুন ! আমি আপনাকে বলছি __আমার দৃঢ় বিশ্বাস_যে আল্লাহকে মুসলমানেরা উপাসনা করে, সেই আল্লাহর চেয়েও আপনি বেশি শক্তিশালী ! স্বামীজী পুনরায় হাসলেন ! এই ধর্মোন্মাদের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ইচ্ছাই হোলো না।।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
…………………………………………………………………
[কোন কাজ – তা শুধুমাত্র-ই কি ঈশ্বরের ইচ্ছা ? – না কি এর সাথে ব্যাক্তির প্রচেষ্টাও দরকার পড়ে — এই প্রসঙ্গে স্বামীজির মীমাংসা ]
আমরা জানি, সমষ্টিমন সর্বেসর্বা ঈশ্বরের প্রকাশ। শক্তি-জ্ঞান-প্রেম এইগুলি সমষ্টিমনের মধ্যে পুরোপুরিভাবেই রয়েছে। সমষ্টিমনের এক ক্ষুদ্র অংশের প্রকাশ হলো ব্যষ্টিমন। সমষ্টিমনের চিন্তারই সৃষ্টি হল সমগ্র বিশ্ব। যেহেতু তোমার, আমার এবং আমাদের প্রত্যেকের ব্যষ্টিমন সমষ্টিমনের অংশ, সেইহেতু সমষ্টিমনের অভিজ্ঞতাই হচ্ছে ব্যষ্টিমনের অভিজ্ঞতা। যদি সমষ্টিমন কাউকে পশুভাবে অনুভব করে তাহলে ব্যষ্টিমন তাকে অন্যরূপে ভাবতে পারে না। ব্যষ্টিমন সমষ্টিমনের অধীন। প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে রয়েছে ব্যক্তি অহং। জীবের পূর্ব পূর্ব জন্মের ভাল-মন্দ কর্মের ফলাফলের মধ্যেই রয়েছে তার ব্যক্তি অহং। ব্যক্তি অহং জীবের বর্তমান শরীরের উপর প্রভাব সৃষ্টি করে। ব্যক্তি অহং-এর প্রেরণাতেই জীবের বর্তমান জীবনের সমস্ত দোষ-ত্রুটি ঘটে থাকে। সমষ্টিমন ব্যষ্টিমনকে নিত্যকর্ম করতে প্রেরণা দেয়। এই প্রেরণাই হল কাণ্ডজ্ঞান। কিন্তু অধিকতর শক্তিশালী ব্যষ্টি অহং মনকে নির্দেশ দেয় কাণ্ডজ্ঞানকে অগ্রাহ্য করে কর্ম করতে। মানুষের বুদ্ধি আছে। এই বুদ্ধি সিদ্ধান্ত নেয় এবং মানুষ সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করে। দোষ-ত্রুটির জন্য ব্যক্তিই দায়ী; ঈশ্বর বা সমষ্টিমন নয়।
ঈশ্বর বা সমষ্টিমন সাক্ষীস্বরূপ থাকে। যদি ব্যক্তির বুদ্ধি বা বিচার ব্যক্তি অহংকে প্রবল হতে না দেয় তাহলে কাণ্ডজ্ঞানের নির্দেশ এবং ব্যক্তির কর্মের সঙ্গে সমষ্টিমনের কর্মের সঙ্গতি থাকবে। এর ফলে ঊর্ধ্বপ্রগতি হবে।
সমষ্টিমনের প্রেরণা সব সময় নিঃস্বার্থ হবে। কিন্তু ব্যক্তি অহং-এর প্রেরণা বা নির্দেশ তার পূর্ববর্তী (পূর্ব পূর্ব জীবনের) প্রবৃত্তি অনুযায়ী হবে। সুতরাং তারা স্বার্থপর হবেই। এর ফলে ঊর্ধ্বপ্রগতি সম্ভব হবে না। যদি তাদের কর্ম বা নির্দেশ সফল হয় তাহলে খুব জোর জাগতিক উন্নতি সম্ভব হবে; তার বেশী নয়।
যদি ব্যক্তির সিদ্ধান্ত সমষ্টিমনের অনুরূপ না হয় তাহলে তা সাফল্য লাভ করতে পারে না। বস্তুতঃ যে কোন সময়ে জগতে যা কিছু ঘটে সবই ঈশ্বরের ইচ্ছায় ঘটে। বর্তমানে ঘটছে এবং ভবিষ্যতে ঘটবে। কালে মানুষ সমষ্টিমনের নির্দেশ বুঝতে পারবে। তখন সে ব্যক্তি ইচ্ছাকে সমষ্টি ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলবে।
তাহলে কি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই? হ্যাঁ আছে। ধর, একটি লােক একটা লম্বা দড়ি দিয়ে একটি গরুকে খোঁটায় বেঁধে রেখেছে। লােকটির ইচ্ছা গরুটি খোঁটার চারিদিকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে চরতে থাকুক। মুনিবের ইচ্ছার অধীন গরুটি। নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে গরুটির পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। এর মধ্যেই ও শুতে পারে, উঠে চলাফেরা করতে পারে। সেইরকম ঈশ্বরও মানুষকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন। সে তার ইচ্ছা অনুযায়ী ঐ ক্ষমতা প্রয়ােগ করতে পারে। এই ক্ষমতা প্রয়ােগ করার ব্যাপারে সে স্বাধীন। সুতরাং নির্দিষ্ট কিছু কর্মের জন্য সে দক্ষ এবং সেগুলি সে অনায়াসে করতে পারে। কিন্তু ব্যক্তির ক্ষমতা অসীম নয়। খোঁটায় বাঁধা গরুর মত তারও ক্ষমতা সীমিত। যদি সে ঈশ্বরের নিকট ব্যাকুলভাবে প্রার্থনা করে তাহলে ঈশ্বর তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তার ক্ষমতার পরিসর বাড়িয়ে দেন।
সবকিছুই ঈশ্বরের ইচ্ছায় হচ্ছে। সাধনাও ঈশ্বরের ইচ্ছার অধীন। ঈশ্বরের ইচ্ছা না হলে সাফল্য দূরে থাকুক, তুমি সাধনা করতেই পারবে না। যদি ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় শুরুও করে, তাহলে সে বরাবর তা করতে পারবে না। ঈশ্বরের ইচ্ছা না হলে বহুজনের হিতে নিঃস্বার্থ কর্ম করার ইচ্ছা জাগবে না। স্বার্থপ্রণোদিত কর্মের মধ্যে তুমি স্বার্থপরতাই দেখতে পাবে–যা স্বার্থপ্রণোদিত নয় __তাকে ঈশ্বরের কৃপা বলেই ধরে নেবে।