গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্র অর্থাৎ বেদ-উপনিষদ, মহাকাব্য সহ বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যানের বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতেন বিভিন্ন সিটিং-এ। সেগুলো শুনে তখন সত্যি সত্যিই আমরা মুগ্ধ হয়ে যেতাম ! ভারতীয় প্রাচীন পরম্পরা সম্বন্ধে, পুরাণাদি শাস্ত্র সম্বন্ধে – আমাদের নতুন করে শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হোতো ।
আমরা বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারতাম যে, ইউরোপ নয়, আমেরিকা নয়, বিদেশের কোনো পন্ডিত‌ই নয় – ভারতীয় ঋষিরাই সকলের চাইতে শ্রেষ্ঠ ! তাদের জ্ঞান বা প্রজ্ঞাই এককালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল । আর ভারতবর্ষের ‘পরাধীন অবস্থার সুযোগে’, ভারত থেকেই ছড়িয়ে পড়া বিদ্যাগুলিকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা পুনরায় নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে সংকলন করে এদেশে নিয়ে এসেছিল । পরাধীন ভারতবর্ষের পণ্ডিতেরা সেগুলিকে পেয়ে মনে করেছিল যে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ফর্সা ফর্সা, লালমুখো স্বর্গের দেবতারা (ইউরোপীয়রা) তাদের জন্য নতুন সভ্যতা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাণ্ডার নিয়ে এসেছে !
তাছাড়া বিদেশীরা যেহেতু এই দেশটাকে দীর্ঘদিন ধরে শাসন করতে চেয়েছিল, এদেশের জনগণকে পদানত করে রাখতে চেয়েছিল – তাই ওরা ‘দীর্ঘদিনের পরাধীনতাক্লিষ্ট’ ভারতে, বৈদিক গুরুকুল প্রথার শিক্ষাব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়ে নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল। ফলে পরাধীন ভারতে আধুনিক যত শিক্ষিত মানুষ ছিল তারা প্রত্যেকেই এটাই জানতো যে, প্রাশ্চাত্যের লোকেরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ ! ওরা শিক্ষায়-দীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে সবদিক থেকে উন্নত ।
তার উপর আবার কিছু তৎকালীন পণ্ডিতদের এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরকে purchase করে নিয়েছিল ইউরোপীয়রা এবং তাদেরকে দিয়েই ওদের শ্রেষ্ঠত্বের এবং ভারতীয়দের নিকৃষ্টত্বের advertisement-টা করিয়ে নিয়েছিল ।
বিদেশি শিক্ষা, বিদেশি দর্শন পরাধীন ভারতবর্ষে এবং স্বাধীনোত্তর কালেও এমনভাবে ভারতীয় পণ্ডিতসমাজে চেপে বসেছিল যে, আজও পর্যন্ত সেই সব মানুষেরা বিদেশি দার্শনিক, বিদেশি পণ্ডিতদের শিক্ষাকে প্রচার করতে গৌরব বোধ করে ! অপরপক্ষে ভারতীয় প্রাচীন পরম্পরার শিক্ষা, বেদ-বেদান্তের শিক্ষা, এমনকি আধুনিককালের ভারতীয় মহাপুরুষদের শিক্ষা (মাত্র 100 বছর আগেকার স্বামী বিবেকানন্দ বা ভগবান ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা)-কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে না পারলে যেন তাদের জাত নষ্ট হয়ে যায় ! এইভাবে ভারতবাসীদের একাংশই বর্তমানে যেন ভারতের সবচাইতে ক্ষতিকারক, সবচাইতে বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছে ! কি করে যে এদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে, আর কত দিনে তা হবে – এটা একমাত্র স্বয়ং ভগবান পরমানন্দ‌ই জানেন।৷
যাক্ এসব কথা! আমরা আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে যাই অর্থাৎ ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রাদি অর্থাৎ বেদ-বেদান্তে উল্লেখিত ঘটনা বা পৌরাণিক ও মহাকাব্যের ঘটনাগুলির যেসব বৈজ্ঞানিক, সামাজিক বা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা গুরুমহারাজ করতেন – সেইগুলির আলোচনায় চলে আসি।
গুরুমহারাজ একবার উপনিষদের বিভিন্ন কাহিনীর আলোচনার সময় যম ও নচিকেতার ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন ‌। উনি বলেছিলেন যে গুরু-শিষ্য পরম্পরার এক অনবদ্য উদাহরণ হলো যম-নচিকেতার আখ্যান।
নচিকেতা যখন পিতার কথা রক্ষার জন্য যমলোকে গিয়েছিলেন, তখন কোন কারণে ধর্মরাজ যম যমলোকে উপস্থিত ছিলেন না, অন্য কোথাও গিয়েছিলেন। নচিকেতা যমলোকের বহির্দ্বারে তিনদিন-তিনরাত না খেয়ে না ঘুমিয়ে এক আসনে স্থির হয়ে যমরাজের প্রতীক্ষায় বসে ছিলেন ! যমরাজ যখন ফিরে এসে ওই নিষ্ঠাবান তরুণের সংকল্পে অটলতা, কর্তব্যনিষ্ঠার কথা শুনলেন তখন উনি নিজেই এসে সেই তরুণ অতিথিকে সাদর সম্ভাষণ সহ অন্দরে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাকে প্রথম দর্শনেই শিষ্যত্বে বরণ করে নিয়েছিলেন।
গুরুমহারাজ আমাদেরকে বলেছিলেন নচিকেতার প্রথম গুন ছিল শ্রদ্ধা, দ্বিতীয় গুনছিল কর্মনিষ্ঠা এবং তৃতীয় গুন সংকল্পে অটলতা – এইরূপ আরও অনেক গুনে গুনী ছিলেন তিনি। যে কাজের জন্য নচিকেতা ওখানে গিয়েছিলেন (আত্মতত্ত্বের বোধ), তাঁর প্রথম গুন দিয়েই তা লাভ করা যায় ! কারণ মহাজনেরাই বলে গেছেন –”শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম্”!
সুতরাং যে জ্ঞান লাভ করার জন্য নচিকেতা ওখানে গিয়েছিলেন, উনি শুধু শ্রদ্ধা দিয়েই তা লাভ করতে পারতেন । তার উপরে নচিকেতার আরো গুন ছিল কর্মনিষ্ঠা, সংকল্পশক্তি ইত্যাদি ! ফলে যমরাজ সহজেই তাঁকে শিষ্য হিসাবে বরণ করে নিয়েছিলেন এবং নচিকেতার জীবনের সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে তাঁর সমস্ত সংশয়‌ ও সন্দেহের অবসান এবং সমস্ত অজ্ঞানতার অবসান ঘটিয়েছিলেন । আর এইটার মাধ্যমে ভারতীয় সমাজ পেয়েছিল, জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে ( উপনিষদের বেশিরভাগ মীমাংসাই জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমেই বর্ণনা করা হয়েছে) আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও আত্মতত্ত্বের এক অনন্য উপস্থাপনা !
তিনদিন ধরে অন্নজল স্পর্শ না করে যে তরুন, একাসনে সংকল্প সিদ্ধির জন্য বসে থাকতে পারে – সে যে কোনো জ্ঞান লাভের উপযুক্ত এটাই যমরাজ (গুরু) বুঝেছিলেন । ফলে আত্মতত্ত্ব লাভের অধিকারী চিনতে তাঁর ভুল হয়নি ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন আধ্যাত্মিক গুরু উপযুক্ত শিষ্যকে এইভাবেই পরীক্ষা করেন এবং তার level জেনে নেন ! [ক্রমশঃ]