স্বামী বাউলানন্দের পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো।
উৎসবের কর্মীরা যখন বস্তা নিয়ে যাচ্ছিলো তখন করণিকের কিছুই করার ছিল না ! সে হেরে গেল ! সে দেখল স্বামীজীর লোকেরা, তার ওপর যে আটক করার ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে_ তা গ্রাহ্যই কোরলো না ! তারা অফিসে এসে সব লুট করে নিয়ে গেল ! মুসলমান রাজ্যে কোনো কাফের এত খারাপ কাজ করতে পারে বলে তার ধারণা ছিল না ! সে এই ঘটনাটি অতিরঞ্জিত করে তার উর্ধতন কতৃপক্ষের নিকট রিপোর্ট কোরলো।
দুমাস পরে শুল্ক বিভাগের একজন উর্ধ্বতন কর্মচারী পেরেন্টাপল্লীতে সার্ভে করতে এলেন ‌ তিনি এসে ওই করণিকের শিবিরেই আস্তানা নিলেন ‌। শিবরাত্রির দিন কি ঘটেছে সব তিনি করণিকের নিকট শুনলেন । দুদিন পরে স্বামীজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য তিনি আশ্রমে এলেন ।
তিনি স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন _”স্বামীজী! শিবরাত্রির দিন কি ঘটেছে, তা আপনি দয়া করে আমাকে বলবেন কি?” স্বামীজী তখন বেলপাতা আনতে যাচ্ছিলেন, সুতরাং তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি পাহাড়ের উপরে র দিকে চলে গেলেন । স্বামীজী বেলপাতা নিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত ওই অফিসারটি আশ্রমেই রয়ে গেলেন । তিনি আশ্রমের সমস্ত কিছু খুঁটিনাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন । তবে অফিসারটির আচরণ ছিল খুব বিনীত । শিবরাত্রির দিন কি ঘটেছিল তা স্বামীজী তাকে জানালেন । এদিকে ততক্ষণে চারটে বেজে গেছে । অফিসারটি স্বামীজীকে আরো কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু সেই কথাগুলির স্বামীজী কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি স্নান করতে ঝর্নার ধারে চলে গেলেন । সেদিন রাত্রি ন’টা পর্যন্ত অফিসারটি আশ্রমে অপেক্ষা করেছিলেন। সমস্ত কাজ সেরে একটা গাছের নিচে বসে তিনি এবং স্বামীজী কথোপকথন শুরু করলেন !
অফিসার বললেন_”স্বামীজী! আপনি বললেন আপনি অবগত আছেন যে, এই রাজ্যে সমস্ত আমদানি দ্রব্যের উপর শুল্ক আদায় করা হয় ! এটা শুধুমাত্র এই গ্রামের জন্য‌ই নয় _এই শুল্কের আওতা থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না ! তাহলে এই শুল্ক দিতে আপনার আপত্তি কি ? আর আপনাকে যা দিতে হচ্ছে, তা তো যৎসামান্য! আমি মনে করি _এটা আপনার পক্ষে দেওয়া সম্ভব ! যারা ব্যাপক হারে লোককে খাওয়াতে পারে _ তাদের পক্ষে শুল্ক হিসেবে কয়েকটা পয়সা দেওয়া মোটেই অসম্ভব নয় !” তিনি করুণভাবে বললেন _”স্বামীজী! দয়া করে আমার ওপর সহানুভূতিশীল হয়ে শুল্ক দিন !”
স্বামীজী উত্তর দিলেন _”যে অর্থ এখানে খরচ করা হয়েছে, তা আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে নয় ! এটা খুব গরীব লোকের স্বার্থে খরচ হয়েছে ! এরূপ সৎ উদ্দেশ্যে আনীত দ্রব্যের জন্য শুল্ক দেওয়া যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করিনা ! গরীব লোকের সেবা করা, ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া সরকারের কাজ ! সরকার তা করছে না ! তারা যা পারছে না _তা অন্য কেউ করলে তাতে আবার শুল্ক চাপানো হচ্ছে কেন ? ওই সমস্ত দ্রব্যের জন্য শুল্ক দেওয়া অন্যায় ! শুল্কের টাকাটাও ঐ সমস্ত গরীব লোকের জন্য খরচ করা যেতে পারে !”
অফিসারটি খুব ভাল লোক ছিলেন ! তিনি বিশেষ মনোযোগ সহকারে স্বামীজীর যুক্তি শুনলেন ! তিনিও হিন্দু ছিলেন ‌। স্বামীজীর প্রতি তাঁর খুব শ্রদ্ধা ছিল ! কিন্তু মুসলমান করনিক_ আশ্রমের বিরুদ্ধে সরকারের নিকট রিপোর্ট দিয়েছে ! এটা সরকারের কাছে মানসম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে ! কোনো প্রকারে তিনি সমস্যাটির সমাধান করতে চাইছিলেন । তিনি স্বামীজীকে বিনীত ভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলেন _”স্বামীজী! আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে আমি একমত ! আপনার কথাগুলি খুবই যুক্তিযুক্ত, কিন্তু সরকার তো এসব কথা মানবেনা ! আইন-কানুন হচ্ছে ‘ধর্ম’ থেকে আলাদা ! এই দুইয়ের মিলনসাধন সম্ভব নয় । সরকারের আদেশ লঙ্ঘন করা কোনো নাগরিকের‌ই উচিত নয় ! দয়া করে শিবরাত্রির দিন যে সমস্ত দ্রব্যসামগ্রী এসেছে, তার জন্য আপনি শুল্ক টা দিয়ে দিন !”
স্বামীজি বললেন _” না, এই উদ্দেশ্যে কোনো টাকাই দেওয়া হবে না !” অফিসারটি সেদিনের মতো চলে গেলেন, কিন্তু পরের দিন তিনি আবার এলেন। গ্রামে অফিসারটির ক্যাম্পে প্রায় 100 জন লোক ছিল । অনেকেই ছিল ওই অফিসের কর্মচারী, বাকি সকলে তাদের নিজেদের কাজে অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল !
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………
[কোন একজন ভক্ত কোন একটি ভজন গান শুনতে শুনতে তার মনে হচ্ছিল যে, তীর্থ ভ্রমণ করার থেকেও ঈশ্বরের মহিমা কীর্তন (ভক্তির প্রয়োজন) করা অনেক ভালো। সেই প্রসঙ্গে স্বামীজীকে জিজ্ঞাসা করলে স্বামীজী মীমাংসা করলেন –]
এই গান রামকৃষ্ণদেবের গাওয়া। এই গানের উদ্দেশ্য হল তীর্থ দর্শনের চেয়ে ভক্তি অধিকতর প্রয়ােজন। ঈশ্বরকে বােধেবােধের কয়েকটা উপায় আছে — জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি — এইগুলির যে কোন একটা অবলম্বন করলে তা সম্ভব হয়।
জ্ঞানযোগ কি? জ্ঞানীর লক্ষ্য হল ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার। সে নেতি, নেতি বিচার করতে থাকে। এইভাবে সে সৎ ও অসৎ বিচার করে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে।
কর্মযোগ কি? কর্মের মাধ্যমে ঈশ্বরে মন নিবিষ্ট করা। একজন গৃহী যদি নিরাসক্ত হয়ে কর্ম করে এবং কর্মের ফল ঈশ্বরে অর্পণ করে তাহলে তাকে কর্মযােগ বলা হয়। যদি তুমি তপশ্চর্যা কর, ধ্যান কর এবং এ সকলের ফল ঈশ্বরে অর্পণ কর তাহলেও তুমি একজন কর্মযােগী হবে। ঈশ্বরকে অপরােক্ষ অনুভব করাই হল কর্মযােগীরও লক্ষ্য।
ভক্তিযােগ কি? দৃঢ়ভাবে ঈশ্বরে মন রেখে তার মহিমা কীর্তন করা হল ভক্তিযােগ। মহর্ষি নারদ, চৈতন্য মহাপ্রভূ, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সাঁইবাবা বলেছেন — ভাক্তিই ঈশ্বর লাভের সহজ উপায়। কর্মযােগ খুব জটিল এবং খুব কষ্টসাধ্য। যুগে শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী কর্ম করার সময় কোথায়? মানুষের আয়ুষ্কাল সীমিত। কেউ জানে না কতদিন তার জীবনকাল স্থায়ী হবে। যে সময়টুকু পাওয়া গিয়েছে তা প্রয়ােজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। যে মানুষ তার প্রয়ােজনীয় জিনিস সংগ্রহের জন্য একস্থান হতে অন্যস্থানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার পক্ষে কখনই সম্ভব নয় ফলের আকাঙ্ক্ষা না করা। ফলের আকাঙ্ক্ষা অজ্ঞাতসারে তার মনে প্রবেশ করে।
জ্ঞানযােগে ব্রহ্মজ্ঞানলাভ আরও কঠিন। অনেক বাধা আছে। প্রথমতঃ, জীবন-কাল খুবই সংক্ষিপ্ত । দ্বিতীয়তঃ, মানুষ খাদ্যের উপর নির্ভরশীল। তৃতীয়তঃ, মানুষ দেহ-বােধ ভুলতে পারে না। যতক্ষণ দেহ-বােধ থাকে ততক্ষণ ব্ৰহ্ম উপলব্ধি করা যায় না। ব্রহ্মজ্ঞানী বলে ‘আমি, ব্রহ্মা, আমি শরীর নই, আমি ক্ষুধা-তৃষ্ণা, ব্যাধি, সুখ-দুঃখ সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে। কিন্তু ঐ অবস্থায় পৌঁছানাে সহজসাধ্য নয়। জ্ঞানীর পায়ে কাঁটা ফুটলেও সে যন্ত্রণা অনুভব করে না।
একমাত্র ভক্তিযােগই অনেকের পক্ষে সহজসাধ্য। কিন্তু যে পথেই যাও না কেন গন্তব্যস্থল একটাই। ভক্তির মাধ্যমে ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ হয়। ঈশ্বর হলেন করুণা এবং কৃপায় প্রতিমূর্তি। তিনি প্রেমের অবতার । তিনি সন্তুষ্ট হলে ভক্তকে যে কোন জিনিস এমনকি ব্রহ্মজ্ঞানও দেন । ভক্ত ভগবানকে সাকাররূপ পরিগ্রহ করে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রার্থনা করে। সে ভগবানের সঙ্গে কথা বলতে চায়। ব্রহ্মজ্ঞানের জন্য তার কোন মাথাব্যথা নাই। কিন্তু ভগবান যদি তার উপর সন্তুষ্ট হন তাহলে তিনি তাকে কেবলমাত্র ভক্তির পরাকাষ্ঠায় পৌঁছে দেবেন তা নয়, তাকে ব্রহ্মজ্ঞানও দান করবেন। (ক্রমশঃ)