গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ, পরমানন্দ মিশন (বনগ্রাম) সহ অন্যত্র_ প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র থেকে যেসব আলোচনা করতেন, সেগুলির উনি বৈজ্ঞানিক, সামাজিক এবং তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও দিতেন। আমরা এখানে চেষ্টা করছি_ সেগুলোকে উল্লেখ করে গুরুমহারাজের দেওয়া ব্যাখ্যার কথা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার!
ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রে বিভিন্ন কাহিনীগুলি সত্যি সত্যিই এককালে ঘটেছিল অথবা কাহিনীগুলি ভারতীয় প্রজ্ঞাবান ঋষিরা ওইসব শাস্ত্রে রূপকাকারে বর্ণনা করেছেন কোন তত্ত্বকে বোঝাতে ! আমরা এখন আলোচনাক্রমে উপনিষদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা ও উত্তরকারীদের কথা বলছিলাম ! তাদের এই জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে উপনিষদে উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগুলি লিপিবদ্ধ হয়েছে !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন আধ্যাত্মিক শিক্ষা এইভাবেই গুরু-শিষ্যের মাধ্যমে একপ্রজন্ম থেকে অন্যপ্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। বর্তমানে যে বক্তৃতার মাধ্যমে ধর্মশিক্ষা বা অধ্যাত্মশিক্ষা দেওয়ার প্রচলন হয়েছে_ এটা প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক প্রথা ছিল না ! সেখানে সমস্ত শিক্ষাই হোত জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে। বরং শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, _’ জিজ্ঞাসিত না হলে কাউকে কোনো জ্ঞান দান করা উচিত নয়’! “জিজ্ঞাসা” _ এই কথাটির অর্থ হল জানার ইচ্ছা! কোন মানুষের মধ্যে যদি জানার ইচ্ছাই তৈরি না হয়, তাহলে তাকে যদি মাথায় মুগুর মেরেও শেখানো হয় _তাহলেও সে বুঝবে না, কারণ যেহেতু তার জানার আগ্রহই তৈরি হয়নি ! এই জন্যই ওই ব্যক্তিকে হাজার কথার সাহায্যে শেখাতে চাইলেও সে কিছুই শিখতে পারবে না, হাজার জানাতে চাইলেও সেই ব্যক্তি জানতে পারবে না ! তাহলে বোঝা গেল যে, যেকোনো বিদ্যালাভের জন্য প্রথম শর্তই হলো ওই ব্যক্তির মধ্যে ‘জানার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হওয়া’! আর দ্বিতীয় শর্ত হলো ‘শ্রদ্ধা’! ‘শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম্’ –উপনিষদেই রয়েছে এই কথা । গুরুকে তুষ্ট করার উপায় কি, তা বলার জন্য উপনিষদে বলা হয়েছে ‘প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন, সেবয়া’ ! গুরু কে তুষ্ট করার অন্যতম একটা শর্তই হলো ‘পরিপ্রশ্ন’ বা শ্রদ্ধাপূর্বক জিজ্ঞাসা।
যাইহোক, আমরা গুরুমহারাজের বলা কথায় ফিরে যাই ! উপনিষদের কাহিনী বলতে গিয়ে উদ্দালক-শ্বেতকেতুর কথাও বলেছিলেন গুরুমহারাজ ! ঐ যে একটু আগে বলা হোল__আসলে উপনিষদের বেশিরভাগ জ্ঞানচর্চাই জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে ! উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যেমন__ যম-নচিকেতা, উদ্দালক-শ্বেতকেতু, যাজ্ঞবল্ক-গার্গী প্রমুখদের জিজ্ঞাসা ও উত্তর ! এগুলির মাধ্যমেই বহু গুঢ় তত্ত্বের ব্যাখা রয়েছে উপনিষদের পাতায় !
উদ্দালক ও শ্বেতকেতু সম্পর্কে ছিলেন মামা-ভাগ্নে ! ছোটবেলা থেকেই উন্নত সংস্কার নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্বেতকেতু! তৎকালীন সমাজের প্রচলিত কঠিন ও কঠোর বিধি-বিধান তাঁর ভালো লাগতো না ! বিভিন্ন কুসংস্কারগুলিকে ছিন্ন করে মানবসমাজকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন তিনি ! এই ব্যাপারে তার সম্পর্কিত মামা এবং গুরুস্থানীয় উদ্দালক ঋষি তাঁকে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন।
গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম বর্তমান যে বিবাহব্যবস্থা এটা তখনকার যুগে ছিল না। পশুসমাজে যেমন নিয়ম রয়েছে যে, একমাত্র দলপতিরই দলের সমস্ত নারীর গর্ভ সঞ্চারের অধিকার রয়েছে, ঠিক তেমনি তখনকার দিনে ছোট ছোট মানবগোষ্ঠীর গোত্রপিতা (গোষ্ঠীপতি)-রাই সেই দলের সকল নারীর ভর্তা ছিল ! তাছাড়া তখনকার সমাজে আরেকটা নিয়ম ছিল (যেটা বৈষ্ণবসমাজে গুপ্তভাবে এখনো রয়েছে) বাইরে থেকে কোনো সম্মানীয় অতিথি অর্থাৎ মুনি-ঋষি কেউ এলে, রাত্রির বিশ্রামের সময় তার সেবার জন্য ওই গোষ্ঠীর যেকোনো একটি নারীকে তার শয়নকক্ষে পাঠানো হোতো ! শ্বেতকেতুর জননীকেও ঐরকম একবার তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কোনো এক অতিথির শয়নকক্ষে পাঠানোর দৃশ্য বালক শ্বেতকেতু স্বচক্ষে দেখেছিল ! মায়ের সেই অবস্থার করুন মুখখানি দেখে বেদনায় ভরে উঠেছিল বালকের বুক! চোয়াল এবং মুঠি দৃঢ় করে সেই বালক প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, সে বড় হয়ে এর শুধু প্রতিবাদই করবে না, এই কুপ্রথার একটা প্রতিবিধানও সে করবে ! তারই ফলস্বরূপ ভারতীয় সমাজ উপহার পেয়েছিল বিবাহপ্রথা অর্থাৎ একটি পুরুষের সাথে একটি নারীর মন্ত্রোচ্চারণ করে সমাজের সকলকে সাক্ষী রেখে দেবতাদেরকে সাক্ষী রেখে বিবাহ প্রথার অনুষ্ঠান ! উদ্দালক এবং শ্বেতকেতু সেই সময় সমগ্র ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বিভিন্ন সামাজিক কুপ্রথা সমাজ থেকে দূর করেছিলেন । তারা দুইজনে মিলে যেখানে গিয়েছিলেন, সেখানেই সমাজের বিভিন্ন অসুবিধা এবং কুপ্রথা দূর করতে সমর্থ হয়েছিলেন ! তাই আজও বাংলায় একটা প্রবাদ রয়েছে _”মামা ভাগ্নে যেখানে, কার্যসিদ্ধি সেখানে।।” [ক্রমশঃ]
ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রে বিভিন্ন কাহিনীগুলি সত্যি সত্যিই এককালে ঘটেছিল অথবা কাহিনীগুলি ভারতীয় প্রজ্ঞাবান ঋষিরা ওইসব শাস্ত্রে রূপকাকারে বর্ণনা করেছেন কোন তত্ত্বকে বোঝাতে ! আমরা এখন আলোচনাক্রমে উপনিষদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা ও উত্তরকারীদের কথা বলছিলাম ! তাদের এই জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে উপনিষদে উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগুলি লিপিবদ্ধ হয়েছে !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন আধ্যাত্মিক শিক্ষা এইভাবেই গুরু-শিষ্যের মাধ্যমে একপ্রজন্ম থেকে অন্যপ্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। বর্তমানে যে বক্তৃতার মাধ্যমে ধর্মশিক্ষা বা অধ্যাত্মশিক্ষা দেওয়ার প্রচলন হয়েছে_ এটা প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক প্রথা ছিল না ! সেখানে সমস্ত শিক্ষাই হোত জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে। বরং শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, _’ জিজ্ঞাসিত না হলে কাউকে কোনো জ্ঞান দান করা উচিত নয়’! “জিজ্ঞাসা” _ এই কথাটির অর্থ হল জানার ইচ্ছা! কোন মানুষের মধ্যে যদি জানার ইচ্ছাই তৈরি না হয়, তাহলে তাকে যদি মাথায় মুগুর মেরেও শেখানো হয় _তাহলেও সে বুঝবে না, কারণ যেহেতু তার জানার আগ্রহই তৈরি হয়নি ! এই জন্যই ওই ব্যক্তিকে হাজার কথার সাহায্যে শেখাতে চাইলেও সে কিছুই শিখতে পারবে না, হাজার জানাতে চাইলেও সেই ব্যক্তি জানতে পারবে না ! তাহলে বোঝা গেল যে, যেকোনো বিদ্যালাভের জন্য প্রথম শর্তই হলো ওই ব্যক্তির মধ্যে ‘জানার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হওয়া’! আর দ্বিতীয় শর্ত হলো ‘শ্রদ্ধা’! ‘শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম্’ –উপনিষদেই রয়েছে এই কথা । গুরুকে তুষ্ট করার উপায় কি, তা বলার জন্য উপনিষদে বলা হয়েছে ‘প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন, সেবয়া’ ! গুরু কে তুষ্ট করার অন্যতম একটা শর্তই হলো ‘পরিপ্রশ্ন’ বা শ্রদ্ধাপূর্বক জিজ্ঞাসা।
যাইহোক, আমরা গুরুমহারাজের বলা কথায় ফিরে যাই ! উপনিষদের কাহিনী বলতে গিয়ে উদ্দালক-শ্বেতকেতুর কথাও বলেছিলেন গুরুমহারাজ ! ঐ যে একটু আগে বলা হোল__আসলে উপনিষদের বেশিরভাগ জ্ঞানচর্চাই জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে ! উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যেমন__ যম-নচিকেতা, উদ্দালক-শ্বেতকেতু, যাজ্ঞবল্ক-গার্গী প্রমুখদের জিজ্ঞাসা ও উত্তর ! এগুলির মাধ্যমেই বহু গুঢ় তত্ত্বের ব্যাখা রয়েছে উপনিষদের পাতায় !
উদ্দালক ও শ্বেতকেতু সম্পর্কে ছিলেন মামা-ভাগ্নে ! ছোটবেলা থেকেই উন্নত সংস্কার নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্বেতকেতু! তৎকালীন সমাজের প্রচলিত কঠিন ও কঠোর বিধি-বিধান তাঁর ভালো লাগতো না ! বিভিন্ন কুসংস্কারগুলিকে ছিন্ন করে মানবসমাজকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন তিনি ! এই ব্যাপারে তার সম্পর্কিত মামা এবং গুরুস্থানীয় উদ্দালক ঋষি তাঁকে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন।
গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম বর্তমান যে বিবাহব্যবস্থা এটা তখনকার যুগে ছিল না। পশুসমাজে যেমন নিয়ম রয়েছে যে, একমাত্র দলপতিরই দলের সমস্ত নারীর গর্ভ সঞ্চারের অধিকার রয়েছে, ঠিক তেমনি তখনকার দিনে ছোট ছোট মানবগোষ্ঠীর গোত্রপিতা (গোষ্ঠীপতি)-রাই সেই দলের সকল নারীর ভর্তা ছিল ! তাছাড়া তখনকার সমাজে আরেকটা নিয়ম ছিল (যেটা বৈষ্ণবসমাজে গুপ্তভাবে এখনো রয়েছে) বাইরে থেকে কোনো সম্মানীয় অতিথি অর্থাৎ মুনি-ঋষি কেউ এলে, রাত্রির বিশ্রামের সময় তার সেবার জন্য ওই গোষ্ঠীর যেকোনো একটি নারীকে তার শয়নকক্ষে পাঠানো হোতো ! শ্বেতকেতুর জননীকেও ঐরকম একবার তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কোনো এক অতিথির শয়নকক্ষে পাঠানোর দৃশ্য বালক শ্বেতকেতু স্বচক্ষে দেখেছিল ! মায়ের সেই অবস্থার করুন মুখখানি দেখে বেদনায় ভরে উঠেছিল বালকের বুক! চোয়াল এবং মুঠি দৃঢ় করে সেই বালক প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, সে বড় হয়ে এর শুধু প্রতিবাদই করবে না, এই কুপ্রথার একটা প্রতিবিধানও সে করবে ! তারই ফলস্বরূপ ভারতীয় সমাজ উপহার পেয়েছিল বিবাহপ্রথা অর্থাৎ একটি পুরুষের সাথে একটি নারীর মন্ত্রোচ্চারণ করে সমাজের সকলকে সাক্ষী রেখে দেবতাদেরকে সাক্ষী রেখে বিবাহ প্রথার অনুষ্ঠান ! উদ্দালক এবং শ্বেতকেতু সেই সময় সমগ্র ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বিভিন্ন সামাজিক কুপ্রথা সমাজ থেকে দূর করেছিলেন । তারা দুইজনে মিলে যেখানে গিয়েছিলেন, সেখানেই সমাজের বিভিন্ন অসুবিধা এবং কুপ্রথা দূর করতে সমর্থ হয়েছিলেন ! তাই আজও বাংলায় একটা প্রবাদ রয়েছে _”মামা ভাগ্নে যেখানে, কার্যসিদ্ধি সেখানে।।” [ক্রমশঃ]
