গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে বা অন্যত্র বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে ভারতবর্ষের প্রাচীন শাস্ত্রাদি থেকে, অনেক সময় নানান কাহিনী বা আখ্যানের উল্লেখ করে __সেগুলির আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করে আমাদেরকে বুঝিয়ে দিতেন অর্থাৎ উনি সেগুলির বৈজ্ঞানিক, সামাজিক বা তাত্ত্বিক ব্যাখা করতেন। আর একথা আমাদেরকে বারবার বলতেন _’এইসব শাস্ত্র সৃষ্টিকারী মহান মানুষগুলি কতটা প্রজ্ঞাবান, কতটা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং মানবজাতির প্রতি কতটা কল্যাণকামী _ তার মূল্যায়ন সাধারন মানুষ কখনোই করতে পারবে না ! উনি আরও বলতেন _’যখন যখন পৃথিবীতে মহামানবরা অবতীর্ণ হ’ন অর্থাৎ ভগবানরূপে ঈশ্বরের শক্তির প্রকাশ ঘটে _ তখন তাঁরা ঐ সমস্ত মহান মানুষদের সম্বন্ধে, সাধারণ মানুষের কাছে কিছু কিছু ধারণা প্রদান করে যান। ফলে জনসাধারণের কাছে আবার নতুন করে তাঁদের মূল্যায়ন হয় ! এইভাবেই চলছে পৃথিবীতে মা জগদম্বার লীলাখেলা !!
গুরুমহারাজ একবার তাঁর নিজের অবতরণ প্রসঙ্গে বলেছিলেন _”আমার আসার কথা ছিল ভোর রাত্রিতে, এসেছি মধ্যরাত্রে, এখন ফিরে যাওয়া ছাড়া আর আমার গত্যন্তর নেই!” এই কথার প্রকৃত অর্থ কি, এর মর্মার্থ কি __এইসব নিয়ে আলাপ-আলোচনা আমাদের নিজেদের মধ্যে অনেক হয়েছে, হয়তো পরবর্তীতে এই নিয়ে আরও বহু আলোচনা হবে ! কিন্তু আমরা এটা বুঝেছিলাম যে, যে কোনো মহাপুরুষ যখন যখন শরীর ধারণ করেন, _ তখন তখন তিনিই যেন সেই যুগের সবচাইতে মডার্ন মানুষ ! ফলে তাঁর চিন্তা-ভাবনা, তাঁর কার্যপ্রণালী ইত্যাদি সমকালীন মানুষেরা ঠিকমতো বুঝতে পারে না ! তাঁকে ঠিকমতো নিতেই পারে না ! ফলে ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাই _বেশিরভাগ এই ধরনের মহাপুরুষের মূল্যায়ন শুরু হয়েছে _ ওই মহাপুরুষের শরীর ছাড়ার একশো-দেড়’শ বছর পর থেকে ! যদিও কোনো মহাপুরুষের সঠিক মূল্যায়ন কখনোই সাধারণ মানুষ করে উঠতে পারে না ! কারণ একজন মহাপুরুষের মূল্যায়ন শুধুমাত্র অন্য একজন মহাপুরুষই করতে পারে।৷
যাইহোক, আমরা ফিরে যাই আমাদের মূল আলোচনায় অর্থাৎ প্রাচীন শাস্ত্রে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা বা আখ্যানের কথায় এবং তার ব্যাখ্যায় ! এখন আমরা উপনিষদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা-উত্তরকারীদের কথায় ছিলাম! আগের দিনই কথা হয়েছিল যম-নচিকেতার ! আজ কথা হবে অন্য দু’জনের সম্বন্ধে !
গুরু মহারাজ বলেছিলেন __যাজ্ঞবল্ক ও গার্গীর কথোপকথনের মাধ্যমে তৎকালীন যুগের স্ত্রী শিক্ষা এবং স্ত্রী স্বাধীনতার চরম নিদর্শন পাওয়া যায় ! সে যুগের সর্বশেষ্ঠ পন্ডিত এবং প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি বলতে সকলে এক কথায় ঋষি যাজ্ঞবল্ককেই জানতো ! মিথিলার রাজা জনকের রাজসভায় তখন সমস্ত ভারতবর্ষের (হয়তো বা) ভারতের বাইরের জ্ঞানীগুণীরা ব্যক্তিরাও আমন্ত্রিত হোত।)- জ্ঞানী, পন্ডিত, অধ্যাপকদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হোতো। তারা প্রায় একমাস যাবৎ রাজার আতিথ্য গ্রহণ করে মাসকালব্যাপী শাস্ত্রচর্চা করতেন, বিভিন্ন জিজ্ঞাসার মীমাংসা করে দিতেন এবং ভিন্ন ভিন্ন মতের সমন্বয় সাধনও করতেন ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন _’আমেরিকার শিকাগো শহরে 1893 সালে যে বিশ্বধর্ম সম্মেলন হয়েছিল __ওটাই পৃথিবীতে প্রথম ‘বিশ্ব ধর্ম সম্মেলন’ ছিল না ! বহু পূর্বে জনকরাজার রাজসভায় প্রতি বছর শীতের প্রাক্কালে এইরকম ধর্ম সন্মেলনের আসর বসতো।।
একবার আজিমগঞ্জ কনশাস স্পিরিচুয়াল আশ্রমে এবং আরো একবার বনগ্রামে গুরুমহারাজ সিটিংয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে একে একে 4/5-জনকে ডেকে, নিজের পাশে বসিয়ে _”ব্রহ্ম, ঈশ্বর এবং ভগবান” সম্বন্ধে বলতে সুযোগ দিয়েছিলেন ! যে যেমনটা পেরেছিল __সে তেমনটা বলেছিল গুরুমহারাজ সবার সমস্ত বক্তব্য শুনে, শেষকালে নিজেই সেই বক্তব্যগুলি একটা সিন্থেসিস করে দিয়েছিলেন ।
তারপর উনি বলেছিলেন যে মিথিলা রাজার রাজসভায় প্রতি বৎসর বিশ্বধর্মসম্মেলন হোত, কিন্তু তা দীর্ঘ কয়েক হাজার বছর বন্ধ রয়েছে ! পরমানন্দ শরীরে এসে গুরু মহারাজ এইবার এইভাবে তার শুভ সূচনা করে গেলেন !
যাই হোক, আমরা ফিরে যাই তৎকালীন মিথিলার রাজর্ষি জনকের রাজসভায়,_ যেখানে মহাজ্ঞানী, ঋষি যাজ্ঞবল্ক সকলের মধ্যমণি হয়ে বা মন্ডলেশ্বর হয়ে সকলের সমস্ত জীবন-জিজ্ঞাসা, ধর্ম-জিজ্ঞাসা, অধ্যাত্ম-জিজ্ঞাসার মীমাংসা করছিলেন ! কিন্তু সকলকে হতবাক করে দিয়ে সেখানে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন একজন বিদূষী, ব্রহ্মবাদিনী নারী _ যাঁর নাম *গার্গী* ! গার্গী একটা করে জিজ্ঞাসা করেন, আর যাজ্ঞবল্ক তার মীমাংসা করেন ! এইভাবে জিজ্ঞাসা-উত্তর চলতে চলতে যখন যাজ্ঞবল্ক অধ্যাত্মজগতের শেষ তত্ত্ব অর্থাৎ ব্রহ্মতত্ত্ব বা আত্মতত্ত্ব বোঝাচ্ছেন_ তখন গার্গী জিজ্ঞাসা করেছিলেন _”ব্রহ্ম কি? ব্রহ্মের পরে কি আছে?”
প্রচলিত কাহিনীতে রয়েছে __এই জিজ্ঞাসার উত্তরে যাজ্ঞবল্ক বলেছিলেন __”গার্গী ! তুমি এরপর আর অগ্রসর হয়ো না ! এরপর জিজ্ঞাসা করলে তোমার মস্তক স্কন্ধচ্যুত হবে!!”
সাধারণভাবে মানুষ এই ঘটনাটা পড়ে মনে করে থাকে যে, ঋষি যাজ্ঞবল্ক হয়তো গার্গীকে মৃত্যুভয় দেখিয়েছিলেন ! কিন্তু গুরুমহারাজ আমাদের বলেছিলেন _”এখানে ‘মস্তক স্কন্ধচ্যুত’ হওয়ার প্রকৃত অর্থ হোল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষায় বলা যায় _”ব্রহ্ম কি জিনিস তা মুখে বলা যায় না ! সবই উচ্ছিষ্ট হয়েছে, একমাত্র ব্রহ্মা এখনো উচ্ছিষ্ট হয়নি !” ঠাকুর আরও বলেছিলেন __”যেন নুনের পুতুল, সাগরের জল মাপতে গিয়ে সাগরেই মিশে গেল !”
গুরুমহারাজ এটাই বলতে চেয়েছিলেন , ‘যাজ্ঞবল্ক ওই কথা বলে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, ব্রহ্মজ্ঞানী ছাড়া ব্রহ্মের কথা কে–ই বা বলবে, আর কে–ই বা শুনবে!!’ জীবের ব্রহ্মজ্ঞান হয়ে গেলে আর মুখে কোনো বাক্য থাকে না, practically মস্তিস্ক সহ কোনো ইন্দ্রিয়ই কোনো কাজ করে না। তার উপরে আবার “ব্রহ্মের পরের কথা” জিজ্ঞাসা করাটাই অবান্তর!!” [ক্রমশঃ]
গুরুমহারাজ একবার তাঁর নিজের অবতরণ প্রসঙ্গে বলেছিলেন _”আমার আসার কথা ছিল ভোর রাত্রিতে, এসেছি মধ্যরাত্রে, এখন ফিরে যাওয়া ছাড়া আর আমার গত্যন্তর নেই!” এই কথার প্রকৃত অর্থ কি, এর মর্মার্থ কি __এইসব নিয়ে আলাপ-আলোচনা আমাদের নিজেদের মধ্যে অনেক হয়েছে, হয়তো পরবর্তীতে এই নিয়ে আরও বহু আলোচনা হবে ! কিন্তু আমরা এটা বুঝেছিলাম যে, যে কোনো মহাপুরুষ যখন যখন শরীর ধারণ করেন, _ তখন তখন তিনিই যেন সেই যুগের সবচাইতে মডার্ন মানুষ ! ফলে তাঁর চিন্তা-ভাবনা, তাঁর কার্যপ্রণালী ইত্যাদি সমকালীন মানুষেরা ঠিকমতো বুঝতে পারে না ! তাঁকে ঠিকমতো নিতেই পারে না ! ফলে ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাই _বেশিরভাগ এই ধরনের মহাপুরুষের মূল্যায়ন শুরু হয়েছে _ ওই মহাপুরুষের শরীর ছাড়ার একশো-দেড়’শ বছর পর থেকে ! যদিও কোনো মহাপুরুষের সঠিক মূল্যায়ন কখনোই সাধারণ মানুষ করে উঠতে পারে না ! কারণ একজন মহাপুরুষের মূল্যায়ন শুধুমাত্র অন্য একজন মহাপুরুষই করতে পারে।৷
যাইহোক, আমরা ফিরে যাই আমাদের মূল আলোচনায় অর্থাৎ প্রাচীন শাস্ত্রে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা বা আখ্যানের কথায় এবং তার ব্যাখ্যায় ! এখন আমরা উপনিষদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা-উত্তরকারীদের কথায় ছিলাম! আগের দিনই কথা হয়েছিল যম-নচিকেতার ! আজ কথা হবে অন্য দু’জনের সম্বন্ধে !
গুরু মহারাজ বলেছিলেন __যাজ্ঞবল্ক ও গার্গীর কথোপকথনের মাধ্যমে তৎকালীন যুগের স্ত্রী শিক্ষা এবং স্ত্রী স্বাধীনতার চরম নিদর্শন পাওয়া যায় ! সে যুগের সর্বশেষ্ঠ পন্ডিত এবং প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি বলতে সকলে এক কথায় ঋষি যাজ্ঞবল্ককেই জানতো ! মিথিলার রাজা জনকের রাজসভায় তখন সমস্ত ভারতবর্ষের (হয়তো বা) ভারতের বাইরের জ্ঞানীগুণীরা ব্যক্তিরাও আমন্ত্রিত হোত।)- জ্ঞানী, পন্ডিত, অধ্যাপকদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হোতো। তারা প্রায় একমাস যাবৎ রাজার আতিথ্য গ্রহণ করে মাসকালব্যাপী শাস্ত্রচর্চা করতেন, বিভিন্ন জিজ্ঞাসার মীমাংসা করে দিতেন এবং ভিন্ন ভিন্ন মতের সমন্বয় সাধনও করতেন ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন _’আমেরিকার শিকাগো শহরে 1893 সালে যে বিশ্বধর্ম সম্মেলন হয়েছিল __ওটাই পৃথিবীতে প্রথম ‘বিশ্ব ধর্ম সম্মেলন’ ছিল না ! বহু পূর্বে জনকরাজার রাজসভায় প্রতি বছর শীতের প্রাক্কালে এইরকম ধর্ম সন্মেলনের আসর বসতো।।
একবার আজিমগঞ্জ কনশাস স্পিরিচুয়াল আশ্রমে এবং আরো একবার বনগ্রামে গুরুমহারাজ সিটিংয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে একে একে 4/5-জনকে ডেকে, নিজের পাশে বসিয়ে _”ব্রহ্ম, ঈশ্বর এবং ভগবান” সম্বন্ধে বলতে সুযোগ দিয়েছিলেন ! যে যেমনটা পেরেছিল __সে তেমনটা বলেছিল গুরুমহারাজ সবার সমস্ত বক্তব্য শুনে, শেষকালে নিজেই সেই বক্তব্যগুলি একটা সিন্থেসিস করে দিয়েছিলেন ।
তারপর উনি বলেছিলেন যে মিথিলা রাজার রাজসভায় প্রতি বৎসর বিশ্বধর্মসম্মেলন হোত, কিন্তু তা দীর্ঘ কয়েক হাজার বছর বন্ধ রয়েছে ! পরমানন্দ শরীরে এসে গুরু মহারাজ এইবার এইভাবে তার শুভ সূচনা করে গেলেন !
যাই হোক, আমরা ফিরে যাই তৎকালীন মিথিলার রাজর্ষি জনকের রাজসভায়,_ যেখানে মহাজ্ঞানী, ঋষি যাজ্ঞবল্ক সকলের মধ্যমণি হয়ে বা মন্ডলেশ্বর হয়ে সকলের সমস্ত জীবন-জিজ্ঞাসা, ধর্ম-জিজ্ঞাসা, অধ্যাত্ম-জিজ্ঞাসার মীমাংসা করছিলেন ! কিন্তু সকলকে হতবাক করে দিয়ে সেখানে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন একজন বিদূষী, ব্রহ্মবাদিনী নারী _ যাঁর নাম *গার্গী* ! গার্গী একটা করে জিজ্ঞাসা করেন, আর যাজ্ঞবল্ক তার মীমাংসা করেন ! এইভাবে জিজ্ঞাসা-উত্তর চলতে চলতে যখন যাজ্ঞবল্ক অধ্যাত্মজগতের শেষ তত্ত্ব অর্থাৎ ব্রহ্মতত্ত্ব বা আত্মতত্ত্ব বোঝাচ্ছেন_ তখন গার্গী জিজ্ঞাসা করেছিলেন _”ব্রহ্ম কি? ব্রহ্মের পরে কি আছে?”
প্রচলিত কাহিনীতে রয়েছে __এই জিজ্ঞাসার উত্তরে যাজ্ঞবল্ক বলেছিলেন __”গার্গী ! তুমি এরপর আর অগ্রসর হয়ো না ! এরপর জিজ্ঞাসা করলে তোমার মস্তক স্কন্ধচ্যুত হবে!!”
সাধারণভাবে মানুষ এই ঘটনাটা পড়ে মনে করে থাকে যে, ঋষি যাজ্ঞবল্ক হয়তো গার্গীকে মৃত্যুভয় দেখিয়েছিলেন ! কিন্তু গুরুমহারাজ আমাদের বলেছিলেন _”এখানে ‘মস্তক স্কন্ধচ্যুত’ হওয়ার প্রকৃত অর্থ হোল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষায় বলা যায় _”ব্রহ্ম কি জিনিস তা মুখে বলা যায় না ! সবই উচ্ছিষ্ট হয়েছে, একমাত্র ব্রহ্মা এখনো উচ্ছিষ্ট হয়নি !” ঠাকুর আরও বলেছিলেন __”যেন নুনের পুতুল, সাগরের জল মাপতে গিয়ে সাগরেই মিশে গেল !”
গুরুমহারাজ এটাই বলতে চেয়েছিলেন , ‘যাজ্ঞবল্ক ওই কথা বলে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, ব্রহ্মজ্ঞানী ছাড়া ব্রহ্মের কথা কে–ই বা বলবে, আর কে–ই বা শুনবে!!’ জীবের ব্রহ্মজ্ঞান হয়ে গেলে আর মুখে কোনো বাক্য থাকে না, practically মস্তিস্ক সহ কোনো ইন্দ্রিয়ই কোনো কাজ করে না। তার উপরে আবার “ব্রহ্মের পরের কথা” জিজ্ঞাসা করাটাই অবান্তর!!” [ক্রমশঃ]
